মঙ্গলবার | সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০ | ৭ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

ধান নেব কিন্তু মান দেব না

নাজমুল হক তপন

করোনাক্রান্তির মধ্যে ধান উৎপাদনের খবর বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে মিডিয়াতে। বোরো ধান, পাকা  ধান কাটা ও মাড়াই, শ্রমিক সংকট, ধানা কাটার মেশিন , কত শতাংশ ধান কাটা হচ্ছে, শিলা বৃস্টিতে ধান কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হল , সব কিছু নিয়ে সবিস্তারে খবর আসছে শহরভিত্তিক মিডিয়াতে।  

একইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে শুটেড বুটেড মানুষদের  ধান কাটার শোডাউন। উপরের তলার মানুষের ধান কাটার ফটোসেশন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে হয়েছে তর্ক-বিতর্কের ঝড়। সবমিলিয়ে আমাদের মিডিয়া তথা দেশের পরিবেশটাই যেন হঠাৎ করেই , কৃষিবান্ধব হয়ে উঠেছে।  এর চেয়ে ভালো সংবাদ আর কী হতে পারে! 

ধান নিয়ে প্রতিদিনই সংবাদ মাধ্যম কেন পাল্লা দিয়ে খবর পরিবেশন করছে , এটা বুঝতে খুব বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। যেহেতু দেশে-বিদেশে আমরা কম বেশি সবাই ঘরবন্দি। স্বভাবতই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  কিংবা মোবাইলে কথা বলাটা ঢের বেড়েছে। গত দু/আড়াই সপ্তাহ ধরে যত জনের আলাপ হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই কথা বলেছেন বোরো ধান নিয়ে। 

কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করছেন এমন ঘনিষ্ঠ কয়েকজনও বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে, এটা শুনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। সবার বক্তব্যের সারকথা, এই করোনাকালে এই ধানই আমাদের জীবন বাঁচাবে। না খেয়ে আমাদের মরতে হবে না। ধানের কল্যাণে আমরা বেঁচে যাব আর বেঁচে থাকলে ঘুরে দাঁড়াতে আমাদের খুব একটা সময় লাগবে না।  

এবারের ধান  নিয়ে দেশ বিদেশের শিক্ষিত, আলোকপ্রাপ্ত মানুষদের বাড়তি মনযোগের কারণটি সুস্পষ্ট। এই ধান আমাদের ভীষণ দরকারি। বাঁচার তাগিদেই কৃষকদের কাছ থেকে আমরা এই ধান নেব। ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য শ্রমিক সংকট, অকাল বন্যা কিংবা শিলাবৃষ্টিতে পাকা ধান যেন নষ্ট না হয় সেজন্য সরকারকে যথাসম্ভব চাপে রেখেছে মূল স্রোতের মিডিয়া এমনকি সোস্যাল মিডিয়াও। 

ধান কাটার যন্ত্র (হার্ভেস্টার ও রিপার) কৃষকদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না কেন এ নিয়েও কম রিপোর্ট হয়নি! ধানের মৌসুমে  ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে  ক্রমিক সংকট একটা নৈমিত্তিক ব্যাপার। তবে অতীতের সঙ্গে এবারের পার্থক্যটা খুবই লক্ষ্যণীয়। অতীতে ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে সংকটকে আমরা সেভাবে গায়ে মাখিনি। এই করোনাকালে গরজ যে বড় বালাই!  

এবারের বোরো ধান নিয়ে আমাদের মত শহুরে লোকগুলো কেন উদ্বিগ্ন সেটা অনুধাবন করতে খুব বেশি জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ে না। রমজান মাস শুরুর আগে চালের দাম কীভাবে হু হু করে বাড়ছিল সেটা নিশ্চয়ই মনে আছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে চালের দাম বেড়ে গিয়েছিল ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। বোরো ধান ওঠাতে রক্ষা। চালের বাজার স্থিতিশীল হয়ে উঠেছে অনেকটায়। 

অতীতে অনেক সময়ই দেখা গেছে যে আমাদের ভরা ধানের মৌসুমেও বিদেশ থেকে চাল আমদানি বন্ধ হয়নি। এখকার বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। করোনাক্রান্তিতে গোটা দুনিয়া হয়ে আছে স্থবির। এ অবস্থায় চাল আমদানি করে যে বাঁচতে পারব না,  সেটা আমরা ভালভাবেই বুঝে গেছি। সামনের কয়েকটা মাসে আর যাই হোক আমদের ভাতের অভাবে মরতে হবে না, এর চেয়ে বড় স্বস্তি আর কী হতে পারে! বোরোর পর কৃষক যদি আউশ ধান ভালমত ফলাতে পারে, তাহলে তো কথাই নাই!

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এরই মধ্যে হাওড় অঞ্চলের সাত জেলায় ৯৮ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। হাওড় অঞ্চলের ধান দ্রুত সংগ্রহের জন্য সরকার থেকে ৩৫২টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ১ হাজার ২৪টি রিপার সরবরাহ করা হয়। এর সুফলও মিলেছে। দ্রুত ধান পাওয়া গেছে। 

উল্লেখ্য, দেশে বছরে ধানের যে চাহিদা আর ২০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করে এসময়ে হাওড় অঞ্চলের উৎপাদিত বোরো ধান। 

মিডিয়ার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার বোরো ধানের উৎপাদন ছাপিয়ে গেছে লক্ষ্যমাত্রাকেও। আমাদের জন্য খুব বড় স্বস্তির খবর। মহামারীকালে আমাদের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় অবলম্বন কৃষকের উৎপাদিত ধান। তাই ধানের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে আমরা তাকিয়ে ছিলাম। এই ধান ফলিয়ে কৃষকের কী লাভ সেটা অতীতের মতই আমরা বিবেচনায় রাখব না। রক্ত পানি করা ঘামে ভেজা ধানের প্রকৃত মূল্য পাবে কি-না এ নিয়ে চাষীদের ঘুম হারাম হওয়ার যোগাড়। যতদূর জানা গেছে, সরকারিভাবে ২৬ এপ্রিল থেকে বোরো ধান কেনা শুরুর কথা থাকলেও সেটা এখনো শুরু হয়নি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত দেরির পেছনে যে ফড়িয়া , মধ্যস্বত্বভোগী ও চাল কল ব্যবসায়ীদের  হাত আছে তা বলাই  বাহুল্য। 

সরকারিভাবে  প্রতি কেজি ধানের দাম ধরা হওয়ছে ২৬ টাকা। অর্থাৎ মন প্রতি মূল্য ১ হাজার ৪০ টাকা। এবারে বাস্তব চিত্রটা একটু দেখে আসা যাক। পুরো দেশে নতুন ধান বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। নাটোর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া , মৌলভীবাজার সর্বত্রই একই চিত্র। ধান ওঠা পর্যন্তই কৃষকের দাম। এরপর কৃষককে সেই কথাটি, ‘পোছার টাইম নাই’। 

এদিকে ধান সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা নেই কৃষকের। আবার অনেকেই ঋণের টাকায় ধান চাষ করেন। ধান ওঠামাত্রই তা পরিশোধ করতে চাষীরা বাধ্য। করোনাকালে হাটবাজারে সেভাবে ধানের ক্রেতাও মিলছে না। অবশ্য উৎপাদিত ধান নিয়ে কৃষকের এ বিড়ম্বনা নতুন কিছু নয়। গতবছর ধানের বাম্পার উৎপাদন করেও চোখের পানি ফেলতে হয়েছিল চাষীদের। উৎপাদনের যে খরচ তার ৬০ /৭০ শতাংশ  কিংবা অর্ধেক দামে ধান বিক্রি বাধ্য হয়েছিলেন চাষীরা। এবারেও এখন পর্যন্ত যা পরিস্থিতি তাতে ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে কৃষকদের আশাবাদী হওয়াটা কঠিন। রাজশাহীসহ বেশ কয়েকটা অঞ্চলে ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার দাবিতে প্রতিবাদ মিছিল করার সংবাদও এসেছে। 

কৃষকদের মান দিই না বলে তাদের উৎপাদিত ধানের দামও দিতে চাই না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা এমনই যে, যত উচ্চশিক্ষিত হই ততই দ্রুত সম্ভব নিজেদের কৃষক পরিবারের পরিচয় মুছে ফেলতে চেষ্টা করি। কৃষক পরিচয় যে জাতে ওঠার অন্তরায়! গ্রামের থেকে শহরের কলেজে পড়তে আসার পরই শিক্ষার্থীদের এই জাতে ওঠার পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। গ্রামের শিক্ষার্থীদের বলা হয় ক্ষ্যাত। ক্ষেত থেকে উঠে আসা বলে শুনতে হয় ক্ষ্যাত সম্বোধন! যত বেশি উৎপাদনবিচ্ছিন্ন আমরা তত বেশি অভিজাত। আমরা ধরেই নিই, কৃষক তাদের ফলানো ধান আমাদের দিতে বাধ্য। কেন বাধ্য, সে প্রশ্ন করার মানসিকতা আমাদের থাকবে কেন? আমাদের আকাঙ্ক্ষা যে অভিজাত হওয়া!

লেখক: নাজমুল হক তপন, সাংবাদিক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন