শুক্রবার | জুলাই ১০, ২০২০ | ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

আন্তর্জাতিক খবর

করোনা কূটনীতি রক্ষা করতে পারবে তো সুলতানকে

রাহুল আনজুম

২০১৬ পশ্চিমাদের মদদে পরিচালিত ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের জটিল আভ্যন্তরীণ এবং পররাষ্ট্রনীতি আঙ্কারাকে কূটনৈতিকভাবে বিছিন্ন করেছে। এই বিছিন্নতাকে গভীর করেছে সিরিয়া ও লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধ অবস্থান, সময়েভেদে প্রতিরোধ এবং সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগজির হত্যার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকীকরণ। আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব পড়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও, মলিন হয়েছে এরদোয়ান এবং তার একেপির আন্তর্জাতিক ইমেজ। 

তবে করোনা মহামারির দরূণ সল্প পরিসরে আবার এরদোয়ান ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। সাম্প্রতিক এক জরিপে, করোনা মোকাবেলার দক্ষতায় এরদোয়ানের ওপর মানুষের আস্থা প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত কয়েক বছরে বিরল। 

করোনা মহামারী মোকাবেলায় তুরস্ক আক্রান্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রেরণ করেছে মহামারী প্রতিরোধ সামগ্রী। করোনাকেন্দ্রিক নতুন এক কূটনৈতিক যুগের সূচনা করেছে। এই সুবাদেই বরফ গলেছে আঙ্কারা-ওয়াশিংটন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের। আপাতত আঙ্কারা রাজি হয়েছে ন্যাটোর আকাশসীমায় রাশিয়ার তৈরি এস ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় রাখতে। আগামী দিনে ন্যাটোর আকাশে ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার নিষ্ক্রিয়তা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘর্ষকে বৃদ্ধি করতে পারে। 

মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং আমেরিকা, রাশিয়াসহ ৫৭টি দেশে করোনা মহামারি প্রতিরোধ সামগ্রী প্রেরণ করেছে আঙ্কারা। যার মধ্যে রয়েছে করোনা টেস্ট কিট, মাস্ক, পিপিই এবং জীবাণু প্রতিরোধক ওষুধ। প্রথাগত মিত্রদের বাইরেও করোনা প্রতিরোধ সামগ্রী পাঠিয়েছে ইসরায়েলে এবং লাতিন আমেরিকার দেশ কলাম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলায়। 

প্রথম কিস্তিতে মার্কিন মুলুকে আঙ্কারা প্রেরণ করেছে পাঁচ লাখ মাস্কসহ অন্যান্য করোনা মহামারী প্রতিরোধক চিকিৎসা সামগ্রী। এই পদক্ষেপ আঙ্কারা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের জট খুলতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। সিরিয়ায় পিকেকের সঙ্গে মার্কিনদের দহরম এবং রাশিয়ার তৈরি এস ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্রয় নিয়ে আঙ্কারা এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে মুখ দেখাদেখি প্রায় বন্ধ ছিল। সিনেট থেকে শুরু করে কংগ্রেস, ডেমোক্র্যাট, রিপাবলিকান সবাই আঙ্কারা বিরোধী। 

তবে ওয়াশিংটনের সব কর্তাব্যক্তির লাগাতার বিরোধিতা সত্ত্বেও একমাত্র ট্রাম্পের সুনজর বারবার আঙ্কারাকে অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে। আঙ্কারা অবরোধ থেকে নিষ্কৃতি পেলেও উভয় দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তৈরি হয়েছিল এক অনাক্রম্য অচলাবস্থা। এই অচল অবস্থার মধ্যেই সাম্প্রতিক লিবিয়া এবং ট্রাম্পের ফিলিস্তিন নিয়ে ‘শতাব্দীর চুক্তিতে’ আঙ্কারার অমত এবং নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এফ ৩৫ প্রকল্পে তুরস্কের সদস্য পদ স্থগিত করে স্তিমিত হয়ে যায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের খবরে প্রকাশ, আঙ্কারা রাশিয়ার তৈরি এস ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সচলের তারিখ স্থগিত করেছে। আঙ্কারা-ওয়াশিংটনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্তিমিত হলে আঙ্কারা মস্কোর ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে, যা লিবিয়া ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের গতি পরিবর্তন করে। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে লাতিন আমেরিকা ও উত্তর আফ্রিকাতেও বিস্তৃত হয়েছিল এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রভাব। বিশ্ব নতুন করে কথা বলতে শুরু করেছিল রাশিয়া-তুরস্ক বলয়ের। 

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আঙ্কারাকে মস্কোর ক্রমাগত উপেক্ষা; সৌদি বলয়ের কাতার অবরোধে রাশিয়ার নিরপেক্ষতা বজায়; ভূমধ্যসাগরের তেল গ্যাস নিয়ে সৃষ্ট বিবাদে আঙ্কারার বিপক্ষে অবস্থান; মস্কো থেকে খলিফা হাফতারের যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর ছাড়াই মস্কো ত্যাগ এবং সর্বশেষ সিরিয়ার ইদলিবে ৩৩ তুর্কি সৈন্যের নিহতের ঘটনা আঙ্কারাকে রাশিয়া সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন অনুরোধে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রবল চাপে আঙ্কারার পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির প্রথম পদক্ষেপ রাশিয়ার তৈরি এস ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় রাখা।

তবে আঙ্কারা থেকে ন্যাটোর আকাশসীমায় সক্রিয় করার সবুজ সংকেত পাওয়ার পরেই মস্কো এস ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিক্রিতে সম্মত হয়েছিল। যদি আঙ্কারা এস ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় না করে তাহলে ন্যাটোকে ঘিরে রাশিয়ার পরিকল্পনায় ছেদ পড়বে এবং রাশিয়া ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারে। 

এটি তুরস্ককের দুইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। প্রথমত, অর্থনৈতিকভাবে। প্রতি বছর গ্রীষ্মে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ রুশ পর্যটক গ্রীষ্মে তুরস্ক ভ্রমণ করে এবং তুরস্কের পর্যটন শিল্পের বড় একটি মুনাফা আসে এই রুশ পর্যটকদের কাছে থেকে। একই সঙ্গে আনাতলিয়া যা অপেক্ষাকৃত অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া একটি অঞ্চল,  সে অঞ্চলের মানুষের বার্ষিক আয়ের বড় একটি অংশ আসে পর্যটন শিল্পে কাজ করে এবং রাশিয়ায় রফতানিকৃত কৃষিপণ্যের মাধ্যমে। এই অঞ্চল একই সঙ্গে একেপির ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত। তাই রুশ পর্যটকবিহীন অবস্থা তুরস্কের লাখো মানুষকে বেকার করতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ভাবে আঙ্কারা বেকায়দায় পড়তে পারে ইদলিব, লিবিয়া এবং ভূমধ্যসাগরের তেল গ্যাসের হিসাব নিয়ে। সিরিয়ার ইদলিবে ৫৬ চেকপোস্টে প্রায় পঁচিশ হাজার তুর্কি সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। আঙ্কারা-মস্কোর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে কোন উত্তেজনা এই সৈন্যদের প্রাণহানির কারণ হতে পারে। যার সর্বশেষ নমুনা মিলেছে ইদলিবে তুরস্কের ৩৩ সৈন্য নিহতের ঘটনায়।

পক্ষান্তরে যদি আঙ্কারা ন্যাটোর আকাশসীমায় রাশিয়ার তৈরি এস ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করে তাহলে মার্কিনদের CAATSA নীতির বলি হতে হবে আঙ্কারাকে। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অবরোধ এড়ানো অসম্ভব হবে। ২০১৯ সালে হোয়াইট হাউসের বৈঠকে ট্রাম্প এরদোয়ানকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, আঙ্কারা যদি এস ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করে তাহলে তিনি সিনেটকে কোনোভাবেই অর্থনৈতিক অবরোধ দেয়া থেকে বিরত রাখতে পারবেন না। তুরস্কের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি মার্কিনীদের যে কোনো অবরোধ সহ্য করতে অক্ষম। পরাশক্তিদের চাপে পড়ে এখন বেহাল অবস্থায় আঙ্কারা। 

সিরিয়ায় আবার তুর্কি সৈন্যদের প্রাণহানির খবর এরদোয়ান এবং একেপিকে ভোটের মাঠে চরম অসহায় করবে। হুমকিতে পড়তে পারে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা। মস্কো-ওয়াশিংটনের মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষা করে পররাষ্ট্রনীতিতে সফলতা আদায় আঙ্কারার দীর্ঘদিনের মন্ত্র। 

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ভারসাম্যের নীতির অসফলতা প্রকাশ পাচ্ছে। কারণ দুই পরাশক্তি রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র আঙ্কারার পরিষ্কার অবস্থান দেখতে চায়। তাই করোনা পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার তৈরি এস ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তা লিবিয়া ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করে অনেকাংশে এরদোয়ানের রাজনৈতিক ভবিষ্যত গতিপথও ঠিক করে দিতে পারে।

লেখক: রাহুল আনজুম, গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন