মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

টকিজ

সভ্যতার জন্য আর্ট-কালচার বিশিষ্ট দাওয়াই

থিয়েটারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক অভিনেতা নাট্যকার আজাদ আবুল কালামের তার অভিনয়জীবনের শুরুই হয়েছিল মঞ্চনাটক দিয়ে শুরুটাআরণ্যকনাট্যদলের মধ্য দিয়ে হলেও পরে নিজেইপ্রাচ্যনাটনাট্যদল গড়ে তোলেন তার সময় এখনকার থিয়েটারের হালচাল নিয়ে সম্প্রতি টকিজের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি কথা বলেছেন থিয়েটারের নানা বিষয় নিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাইসা জান্নাত

আপনি দীর্ঘ সময় ধরে থিয়েটারের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে সময় থিয়েটার শুরু করেছিলেন তখনকার পরিস্থিতি কেমন ছিল? আর এখন কেমন?

আমি প্রথমে ১৯৮৫ সালের ২০ অক্টোবরআরণ্যকনাট্যদলের সঙ্গে কাজ শুরু করি তখনকার সামাজিক, অর্থনৈতিক বাস্তবতা একরকম ছিল এখন অন্য রকম দুটো সময়কে মেলানো কঠিন তখন কাজের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল প্রধান উপজীব্য টেকনিক, প্রবাবিলিটি এসব নিয়ে ভাবনা কম ছিল কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত চিন্তার একটি ধারাবাহিকতা ছিল এখন স্বতঃস্ফূর্ততার জায়গায় এসেছে নানা ধরনের টেকনিক প্রয়োগ বিষয়বস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে এটা একধরনের অগ্রগতি কিন্তু বাস্তব সময়টা পরিবর্তিত হয়েছে ওই সময়ের একজন থিয়েটার কর্মীকে এখন বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে থিয়েটার করতে হয় কারণ আগের থেকে এখন শারীরিক পরিশ্রম বেশি নানান বাস্তবতার ভেতর থেকে সময় বের করে থিয়েটার করতে হয় কাজটা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে গেছে আর দেশের প্রেক্ষাপটে যেহেতু শুধু থিয়েটার করে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন, তাই অনেক কষ্ট করে এখন থিয়েটার করতে হয় আর থিয়েটারে যেহেতু অর্থ নেই, তাই অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়েও পড়ছে এখন পৃষ্ঠপোষক পাওয়াও দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে মূল পৃষ্ঠপোষক হলো দর্শক দর্শকদের যেভাবে থিয়েটারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার কথা ছিল, সে জায়গায়ও খুব উন্নতি হয়েছে বলে আমার মনে হয় না সময়ের বিচারে আগে সংখ্যায় গুণগত মানে দর্শক বেশি ছিল 

পৃষ্ঠপোষকতার প্রসঙ্গ ধরেই বলছি, দেশে থিয়েটারের ক্ষেত্রে সরকার কতটা পৃষ্ঠপোষকতা করে?

যেসব দেশে থিয়েটার ভালো চলে সেখানে সরকার একটা মুখ্য ভূমিকা পালন করে এছাড়া নানা ধরনের সংস্থা রয়েছে এটা হতে পারে সরকারি সংস্থা আবার কিছু ফাউন্ডেশন, কমিউনিটি ফান্ড থাকে কিছু করপোরেট হাউজ থাকে তারা সাধারণত সামাজিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের এগুলো কিছু নেই

সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে থিয়েটারের ভূমিকা কেমন?

যেকোনো শিল্প-সাহিত্যের কাজই হলো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা মানুষকে উদার করা নতুন নতুন চিন্তা তৈরি করা মানুষকে আরো বেশি গণতান্ত্রিক মুক্ত করাই তার কাজ সৃজনশীলতার সঙ্গে সংযুক্ত থাকা বা এর

দর্শক-শ্রোতা হওয়া একজন মানুষের জন্য মানসিক খাদ্যের মতো আর্ট সমাজের চেহারা পাল্টাতে পারে সভ্যতার জন্য আর্ট-কালচার বিশিষ্ট দাওয়াই

আগে থিয়েটারের মাধ্যমে রাজনৈতিক, সামাজিক অনেক বার্তা তুলে ধরা হতো এখনকার বাস্তবতায় তা কতটুকু হচ্ছে?

এখন আরো বেশি হয় আগে তো চার-পাঁচটি দল স্ট্রিট থিয়েটার করত এখন নানা ইস্যুতে অনেক দল স্ট্রিট থিয়েটার করে দেশের থিয়েটার এখন ভীষণভাবে রাজনৈতিক আগের থেকে এর চেহারা হয়তো একটু পরিবর্তন হয়েছে কারণ আর্ট তো স্থিতিশীল নয় সময়ের সঙ্গে এটাকে পরিবর্তিত হতে হয় এখনকার প্রতিবাদের ভাষা-ভঙ্গি ভিন্ন

থিয়েটারের এখনকার প্রডাকশন নিয়ে আপনার মন্তব্য...

শুধু এখন নয়, আগেও আমার মনে হতো এগুলো নট ওয়েল রিহার্সড এটা এখন একটা প্রক্রিয়ার মতো দেখানোর উপযুক্ত হওয়ার আগেই আমরা প্রযোজনাগুলো দর্শককে দেখিয়ে ফেলি কিন্তু আমার মনে হয় দর্শকদের নাটকগুলো দেখানোর জন্য আরো সময় দেয়া দরকার অবশ্য সেক্ষেত্রে আমাদের বাস্তবতাও অনুমতি দেয় না আরো ভালো করার জন্য অনেক ছেলেমেয়ে দরকার সময় দরকার শুদ্ধতম জায়গার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য যে পরিমাণ শ্রম, সময়, অর্থ দরকার তা বাস্তবতায় পাওয়া সম্ভব নয়


আগে থিয়েটার থেকে অনেক গুণী শিল্পী বেরিয়ে আসতেন এখনকার অবস্থা কী রকম?

এখনো থিয়েটারে গুণী শিল্পী রয়েছেন কিন্তু টেলিভিশনে এখন তাদের প্রয়োজন হয় না মিডিয়ায় একটা নতুন গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যারা ভুল, অশুদ্ধতা, অচর্চিত বিষয়গুলোকে ছড়িয়ে দিতে চায় থিয়েটারে অনেক প্রতিভাবান ছেলেমেয়ে রয়েছে কাজের ক্ষেত্রে যাদের প্রতিদিনের প্রস্তুতি থাকে কিন্তু তাদের প্রয়োজন হয় না

এক্ষেত্রে এখন তরুণ যারা কাজ করছেন, থিয়েটারের প্রতি তাদের আগ্রহ কেমন

এটা একেকজনের ওপর নির্ভর করে কারো পাঁচ বছর, কারো তিন বা দুই বছর থিয়েটার করার আগ্রহ থাকে তাছাড়া শুধু থিয়েটার করে এখন জীবন চালানো সম্ভব হয় না থিয়েটার মানসিক আনন্দ দিতে পারে সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারে কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে না রকম সংকট থাকা সত্ত্বেও থিয়েটারে অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে রয়েছে

যে স্বপ্ন নিয়ে থিয়েটার শুরু করেছিলেন তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মনে হয়?

আসলে কেউ পরিপূর্ণ স্বপ্ন নিয়ে আর্ট-কালচার করতে আসে না অনেক অলীক স্বপ্ন থাকে মানুষের যা আসলে বাস্তব নয় আমিও কিছু উড়াধুরা স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম অভিনয়ের উদ্দেশ্যে নয়, লেখালেখি করতে পরে অন্য অনেক জিনিসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি 

করোনার সময়গুলো কীভাবে কাটছে আপনার?

খুবই অদ্ভুত একটা সময় এর সঙ্গে আমরা কেউ পরিচিত না ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, মানুষের মধ্যে মানসিক ট্রমা শুরু হয়েছে এটা দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে আমি নিজেও একধরনের মানসিক ট্রমার ভেতরে রয়েছি এরপর একটা অর্থনৈতিক ধাক্কা আসবে যা বেশির ভাগ শিল্পীই সামলাতে পারবে বলে আমার মনে হয় না কারণ ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রণোদনা নেই গার্মেন্টসসহ নানা সেক্টর নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে কিন্তু আর্ট-কালচারের মানুষদের নিয়ে তেমন কোনো ভাবনা দেখছি না তাই করোনা-পরবর্তী জীবন ব্যবস্থা নিয়ে আমি শঙ্কিত

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন