মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

শেষ পাতা

চট্টগ্রামের গুমাইবিল

ধান কাটা শ্রমিকের অভাবে শঙ্কায় কৃষক

সুজিত সাহা চট্টগ্রাম ব্যুরো

সারা দেশের বোরো মৌসুমের ধান প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কিছুটা বিলম্বে আবাদের কারণে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত গুমাইবিলের বোরো ধান নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা। সাধারণ ছুটি লকডাউনের কারণে অন্যান্য জেলা থেকে ধান কাটা শ্রমিক আসতে না পারায় ফসল কাটা নিয়ে সংকটে রয়েছেন এখানকার কৃষকরা।

শুধু গুমাইবিল অঞ্চল নয়, গোটা চট্টগ্রামেই এখন ধান কাটা শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। দেশের হাওড় অঞ্চলের অধিকাংশ ধান এরই মধ্যে কাটা হয়ে গেলেও বিপরীত চিত্র গুমাইবিলসহ গোটা চট্টগ্রামে। এর মধ্যে রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় এখন পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে মাত্র - শতাংশ। এর মধ্যে গুমাইবিল এলাকায় হার আরো কম।

কৃষকরা জানান, ধান কাটার মৌসুমে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন উপকূলীয় জেলা থেকে প্রচুর ধান কাটা শ্রমিক এলাকায় আসেন ধান কাটতে। এখানকার ফসল সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাইরের এসব শ্রমিকই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। কিন্তু আন্তঃজেলা চলাচল বন্ধ থাকার পাশাপাশি লকডাউনের কারণে এবার তারা আসতে পারেননি। ফলে আবাদকৃত জমির ধান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাটা সম্ভব হবে কিনা সে বিষয়ে সংশয়ে রয়েছেন কৃষকরা।

সরেজমিনে গুমাইবিল গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ধান কাটছেন আবদুল আজিজ নামের এক স্থানীয় কৃষক। বর্গা নিজের জমি মিলিয়ে মোট ১৬০ শতক (চার কানি) জমিতে ধান চাষ করেছেন তিনি। ধান পাকলেও শ্রমিকের অভাবে একাই মাঠে নামতে হয় তাকে। উপায়ান্তর না দেখে ছেলের সহযোগিতায় মাঠে নেমেছেন তার ষাটোর্ধ্ব পিতাও। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ধান কাটতে হচ্ছে তাকে। আবার রোজার মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে ধান কাটা বেশ কষ্টকরও। জমির বেশির ভাগ ধানই কাটা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা আবদুল আজিজের।

একই অবস্থা মরিয়ননগর ইউনিয়নের বাসিন্দা ইয়াকুব আলীরও। তিনি আবাদ করেছেন সাত কানি (২৮০ শতক) জমি। ধান পাকতে থাকায় স্থানীয় দুয়েকজন শ্রমিক নিয়ে ধান কাটা শুরু করেছেন। আগে কাজের জন্য প্রত্যেক শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৭০০-৮০০ টাকা। কিন্তু এবার হাজার টাকা মজুরিতেও শ্রমিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ইয়াকুব আলী বলেন, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা গুমাইবিলে ধান কাটা শুরু হয় বিলম্বে। বছর উত্তরবঙ্গের শ্রমিকরা আসতে পারেননি। এখানে আগে থেকেই থেকে যাওয়া কিছু শ্রমিক রয়েছেন। তারা হাতে গোনা কিছু কৃষকের ধান কাটছেন।  শ্রমিকদের সবাই সেসব কৃষকের ধান কাটার পর আরো কয়েকজনের ধান কেটে দেয়ার জন্য এরই মধ্যে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। বিপাকে পড়েছেন অন্য কৃষকরা। এর মধ্যে যেসব কৃষক এবার ধানের আবাদ বেশি করেছিলেন, তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে গিয়েছেন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার (ডিএই) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বছর রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় বোরোর আবাদ হয়েছে হাজার ৮৮৮ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি আবাদ হয়েছে গুমাইবিলে। গুমাইবিলের চার হাজার হেক্টর জমির মধ্যে বোরো আবাদ হয়েছে প্রায় দুই হাজার হেক্টরের কিছু বেশি জমিতে। সম্প্রতি করোনা পরিস্থিতির কারণে লকডাউনের মধ্যেও কয়েক জায়গা থেকে শ্রমিকরা গুমাইবিলের ধান কাটতে এসেছেন। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। কারণে কৃষকরা ধান কাটতে কৃষি অফিসের সহযোগিতা চেয়ে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে শ্রমিকের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে কৃষি অফিস কৃষকদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, সরকারিভাবে ধান কেটে দেয়ার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা শুনেছি। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছে এখনো কেউ আসেনি। সময়মতো ধান কাটা না গেলে আগামী এক মাসের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়সহ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে কী হবে, সে আশঙ্কায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বিস্তীর্ণ গুমাইবিলের কয়েক হাজার কৃষক।

জানতে চাইলে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কৃষি অফিসার কারিমা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রামের অধিকাংশ উপজেলার কৃষকরা শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও কয়েকদিন আগে নেত্রকোনা থেকে ১২ জন শ্রমিক এসেছেন। তাছাড়া সাধারণ ছুটির আগেও দীর্ঘমেয়াদে কাজ করা অনেক শ্রমিক রাঙ্গুনিয়াতে রয়েছেন। পাশাপাশি সরকারিভাবে পাঁচটি রিপার মেশিন দেয়া হয়েছে কৃষকদের। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরো দুটি রিপার মেশিন দেয়া হবে। চাহিদা বেশি থাকলেও সীমিত সম্পদ দিয়ে কৃষকদের ধান কাটা নিশ্চিত করতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।

ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, গুমাইবিলের মোট জমির পরিমাণ হাজার ৪০০ হেক্টর। এর মধ্যে নিট ফসলি জমি চার হাজার হেক্টর। গুমাইবিলের মাটি সর্বোচ্চ পরিমাণ শস্য উৎপাদনের জন্য উপযোগী। খালের মাধ্যমে সেচ সুবিধা দেয়ায় গুমাইবিলের জমির গড় ফলনশীলতা চট্টগ্রামের অন্যান্য এলাকার চেয়েও হেক্টরপ্রতি ছয় টন বেশি। 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন