শুক্রবার | অক্টোবর ৩০, ২০২০ | ১৫ কার্তিক ১৪২৭

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রক্ষেপণ ও কিছু কথা

ড. মো. হাসিনুর রহমান খান

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের গতি-প্রকৃতি কী হবে এর সহজ উত্তর পাওয়া অনেকটা কঠিন। তবে অদূর ভবিষ্যতে সংক্রমণের ও মৃত্যুর সংখ্যা কেমন হতে পারে প্রক্ষেপণের মাধ্যমে সে ব্যাপারে অনেকটা ধারণা পাওয়া যায়। বিশ্বের প্রায় সব দেশই এই প্রক্ষেপণ করে থাকে। পরিসংখ্যানিক অনেকগুলো মডেল আছে যার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য প্রক্ষেপণ করা সম্ভব। এগুলোর মধ্যে বহুল ব্যবহৃত কিছু মডেল হল- SIE, SIER, SIRD প্রভৃতি যেগুলো ‍Susceptible-infected-Recovered এর গোত্রভুক্ত। এই মডেলগুলো মানসম্মত ডাটার উপর ভিত্তি করে অনেকটাই নিখুঁত প্রক্ষেপণ দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী প্রক্ষেপণের ক্ষেত্রেও এদের জনপ্রিয়তা অনেক। অন্যদিকে কিছু রিগরেশন মডেল আছেন যেমন টাইম সিরিজ মডেল, পলিনমিয়াল রিগরেশন যেগুলো স্বল্প মেয়াদে ভালো ও গ্রহণযোগ্য প্রক্ষেপণ দিতে পারে।

অমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত এই ধরনের মডেল নিয়ে করোনাভাইরাসের প্রক্ষেপণ করছি। আমার এই লেখার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রভাব আগামী দিনে কী হতে পারে এবং আমাদের কী কী আশু পদক্ষেপ নিতে হবে সে ব্যাপারে আলোচনা করা। আগেই বলেছি যে কোন মডেলের ফলাফলের কার্যকারিতা নির্ভর করে আমরা কত ভালো মানের ডাটা ব্যবহার করেছি। ধরে নিচ্ছি, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সকল ডাটার মান একটা আকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে রয়েছে। আগেই বলে নেই আগামী দিনগুলোতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা মৃতের সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটা জানা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যুর সংখ্যা বা হাসপাতালের বেডের সংখ্যা বা আইসিইউ বেডের সংখ্যা- এই সংখ্যাগুলো এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এককথায় সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য। এই পদক্ষেপগুলোর মূল উদ্দেশ্যই হলো সুষ্ঠুভাবে এই মহামারীকে মোকাবেলা করা ও দ্রুত ঠেকানো। আমরা সবাই চাই এই মহামারী যেন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং আমাদের যেন যতটা কম ক্ষতি করতে পারে। একজন ফলিত পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে আমি সবসময় ডাটা বা তথ্য কি বলছে বা বলতে চায় সেটা জানতে চাই। সেই আলোকে বাংলাদেশের করোনাভাইরাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে যা পেয়েছি সেটাই তুলে ধরছি এই লেখায়।

আমার এই বিশ্লেষণে বাংলাদেশের প্রথম করোনা শনাক্ত হওয়ার দিন ৮ মার্চ থেকে এপ্রিলের ৩০ তারিখ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও ৩ মে পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ৪৫৫ জন, মৃত্যুর সংখ্যা ১৭৭ জন। এবং এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৮১ হাজার ৪৩৪ জনের। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতি ১০০ জনের করোনা টেস্টে করোনা ধরা পড়ছে ১২ জনের এবং করোনায় আক্রান্তদের প্রতি ১০০ জনে মারা যাচ্ছেন দুই জন। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রতি লাখে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ জন, প্রতি এক লাখ লোকের মধ্য থেকে টেস্ট করা হচ্ছে ৪৩ জনের।

পলিনমিয়াল রিগরেশন প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৩ হাজার অতিক্রম করবে, যেটা মে মাসের মাঝামাঝিতে প্রায় ২০ হাজারে দাঁড়াতে পারে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ শেষে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ২৫০ জনে এবং মাঝামাঝিতে তা ৩৫০ জন ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রথম সপ্তাহে হাসপাতালে ভর্তিযোগ্য রোগীর সংখ্যা হতে পারে ২ হাজার ৫০০ এবং দ্বিতীয় সপ্তাহে তা দাঁড়াতে পারে ৩ হাজার ৮৫০ জনে। অন্যদিকে, আইসিইউতে ভর্তিযোগ্য রোগীর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রথম সপ্তাহে ৭৫০ জন এবং দ্বিতীয় সপ্তাহে ১১৫০ জনে। এখানে উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট আইসিইউর সংখ্যা ১১৬৯টির মতো। ফলে সকল বিদ্যমান আইসিইউ ব্যবহৃত হলেও মে মাসের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে সংকট দেখা দিতে পারে। যদিও শোনা যাচ্ছে, সরকার আইসিইউ বেডের সংখ্যা বাড়াতে এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে আমার অভিমত, এই উদ্যোগ আরো ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যার ধারাটা অনুসরণ করছে বেলারুশ ও ভারতের ধারার মতো। যেটাকে আমি বলছি, ট্রাজেকটরি পাথওয়ে অনুসরণ পদ্ধতি। এই পদ্ধতি অনুযায়ী মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহ শেষে বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আরেকটু ব্যাখ্যা করে বললে, বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ২১ দিন পর যা দাঁড়াবে, সেটা সবসময় ভারতের বর্তমান সংখ্যার সমান। এই প্রক্ষেপণটি ঠিক থাকবে যদি আমরা বরাবরই ভারতের ক্রম ধারাকে অনুসরণ করি। বিশ্লেষণে আরো দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি ৮ দিন অন্তর আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটা ক্রমান্বয়ে বাড়বে এবং ২০ মে-র দিকে তা ১১ বা ১২ দিনে গিয়ে দাঁড়াবে। সে অনুযায়ী মে মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৬৫ থেকে ৭০ হাজারে। হিসাব অনুযায়ী, মাস শেষে মৃত্যুর সংখ্যাও দাঁড়াতে পারে ১৩০০ থেকে ১৪০০ পর্যন্ত।

আগে যেমনটি বলেছি, পলিনমিয়াল রিগরেশন অনুযায়ী মৃত্যুর সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়ে যেতে পারের মে মাসের মাঝামাঝিতে। তবুও স্বস্তির বিষয় হলো মৃত্যুর ট্রাজেকটরি পাথওয়ে পদ্ধতি অনুসারে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ অনুসরণ করছে দক্ষিণ কোরিয়াকে। আমরা সবাই জানি, দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের কয়েকটি দেশের মধ্যে অন্যতম যারা অত্যন্ত সফলভাবে করোনা মহামারীকে রুখে দিয়েছে। এ পর্যন্ত সেখানে ২৫০ জন মারা গেছেন এবং এখনো প্রতিদিনই এক বা দুজন করে মারা যাচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশেও প্রতিদিন যদি দুই বা তিনজন করে মৃত্যুবরণ করে তাহলে মে মাসের শেষ সপ্তাহে সে সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়াবে ২৫০ জনের মতো। তবে বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ট্রাজেকটরি পাথওয়ে অনুসরণ করলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে এই এই ধারা বজায় নাও থাকতে পারে। কারণ আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। দ্রুত আক্রান্তের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি মৃত্যুর হার উল্লেখিত হারে বজায় থাকলে কেবল দক্ষিণ কোরিয়ার পথ অনুসরণ করতে পারার সম্ভাবনা আছে।

যে কোন দেশের জন্য দ্রুত আক্রান্তের সংখ্যা কমানোর সহজাত উপায় হলো সামাজিক দূরত্ব ও লকডাউন বিদ্যমান রেখে দ্রুত  টেস্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে অতি আক্রান্ত প্রবণ এলাকাগুরোতে। সহজাত পদ্ধতি হলেও পৃথিবীতে অধিকাংশ দেশের জন্য দ্রুত টেস্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব নয় বা সহজ নয়। কারণ এর সঙ্গে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিষয়টি সরাসরি জড়িত। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তবে গত দশ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশে ২০ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত টেস্টের সংখ্যা ৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি পলেও গড়ে প্রতি ১০০টি নমুনা পরীক্ষায় ১২ জনের করোনা পজিটিভ হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন করোনা বিস্তারের বৃদ্ধির হার প্রায় ৮ শতাংশ প্রতিফলিত হয়েছে। সুতরাং করোনা বিস্তারের বৃদ্ধির হার দ্রুত কমানোর জন্য ৮ শতাংমের অনেক বেশি হারে প্রতিদিন টেস্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করা উচিৎ। ফলে আমরা সামাজিক দূরত্ব ও লকডাউন বিদ্যমান রেখে পাশাপাশি প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে টেস্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দ্রুত করোনার মহামারীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি। এমনটি আমি বিশ্বাস করি। টেস্টের সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের পেছনে পড়েছে। এর কারণ হলো- ভারত ও পাকিস্তান আক্রান্তের শতক পার করে যথাক্রমে ১৪ ও ১৬ মার্চ। সাধারণ দেখা গেছে, আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি ব্যাপকভাবে ঘটে আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ পার হওয়ার পরেই। সেদিক থেকে বাংলাদেশ টেস্টের সংখ্যার হারের ভিত্তিতে পিছিয়ে আছে। কেননা বাংলাদেশ আক্রান্তের শতক পার করে ৬ এপ্রিল এবং এখন পর্যন্ত প্রতি এক লাখ লোকের জন্য বাংলাদেশে টেস্ট করেছে ৪৩টি। যা ভারত ও পাকিস্তান করেছে যথাক্রমে ৭১ এবং ৮৮টি। সাধারণ হিসেবে তাই বলা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে যে হারে টেস্ট করছে তাতে করে ২২ এবং ২০ দিন পর যথাক্রমে ভারত ও পাকিস্তানের বর্তমান এই টেস্টের হারের চেয়েও অনেক বেশী অর্জন করবে। আমি বিশ্বাস করি, এই পরিসংখ্যান আবারও প্রমাণ করে বাংলাদেশের সক্ষমতা ভারত বা পাকিস্তানের তুলনায় বেশি।

পরিশেষে যে প্রশ্নটি হয়তো অনেকেই ইতোমধ্যে ভাবছেন যে, বাংলাদেশ কবে নাগাদ দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যার দিক দিয়ে চূড়ায় যাবে। এর সরাসরি উত্তর দেয়া কঠিন। তবে সরকারি মহলে বলা হচ্ছে, মে মাসের শেষের দিকে। প্রক্ষেপনের SIR মডেল অনুযায়ী সেটি ধরা পড়ছে জুনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে। আবার এই প্রক্ষেপণের সঠিকতা পুরোপুরি নির্ভর করছে আমরা যে তথ্য ব্যবহার করছি সে তথ্যগুরো কতটা গুণগত মান সম্পন্ন ও বাস্তব অবস্থার নিরিখে সংগৃহীত হয়েছে। শেষ করবো বিখ্যাত পরিসংখ্যান বিদ জর্জ ই পি বক্সের একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘সকল মডেলই ভুল, কেবল মাত্র কিছু উপকারী।’

প্রতিদিনের প্রক্ষেপণ দেখতে ক্লিক করুন এখানে

লেখক: ড. মো. হাসিনুর রহমান খান
সহযোগী অধ্যাপক, ফলিত পরিসংখ্যান, আইএসআরটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন