মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

ফিচার

ব্রিটেনে কৃষিকাজ করতে বিপুল আবেদন, শহুরেদের ওপর ভরসা পাচ্ছেন না কৃষকরা

বণিক বার্তা অনলাইন

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত থমকে পড়েছে। কয়েক মাস ধরে ঘরবন্দি অবস্থায় দিন পার করছে মানুষ। লকডাউনে নিজের পেশা হারিয়ে বেকার হয়ে বসে আছে কোটি কোটি মানুষ। ভেঙে পড়ার মুখে খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল। অচিরেই খাদ্য সঙ্কট দেখা দেয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।

এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যে প্রকৌশলী থেকে রেস্তোরাঁর ওয়েটার পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ কৃষি খামারে কাজের জন্য আবেদন করছেন। এতে সহায়তা করছে দেশটির সরকার।

ব্রিটিশ কৃষকরা প্রতিবছর বসন্তে ফসল কাটার সময়টা পূর্ব ইউরোপীয় অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু  লকডাউনে এদিকে হাজার হাজার ব্রিটিশ নাগরিক কাজ হারিয়েছে, পাশাপাশি অভিবাসী শ্রমিক প্রাপ্তিও কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে সরকার চাচ্ছে স্থানীয়দের মাধ্যমেই ফসল তোলার কাজটি করতে। 

গতকাল রোববার ব্রিটিশ কর্মকর্তা জর্জ ইউস্টিস বলেছেন, আমরা ধারণা করছি, এবার যুক্তরাজ্যের প্রায় এক তৃতীয়াংশ অভিবাসী শ্রমিক মাঠে কাজ করবেন। এছাড়া লাখ লাখ মানুষকে বিশেষ করে ‘সেকেন্ড জব’ হিসেবে খামারিদের সঙ্গে ফসল তুলতে সহায়তা করার জন্য  উৎসাহ দেবে সরকার।

৩২ বছর বয়সী ড্যানিয়েল মার্টিন লকডাউনের আগের দিন পর্যন্ত নির্মাণ প্রকৌশলী হিসেবে ব্রিটিশ নির্মাণ শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। মহামারীতে সব কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি ঘরে অলস বসে ছিলেন। তার বন্ধু খামারে কাজ করতেন। এজন্য মার্টিন ভেবেছিলেন পুরো গ্রীষ্মকাল ঘরে বসে থাকার চেয়ে অন্তত কিছু করা ভালো। মার্টিন বলেন, আমি কেবল কাজের মধ্যে থাকতে চেয়েছিলাম। আমি বাড়ির বাইরে থাকাটা উপভোগ করি।

মার্চে যুক্তরাজ্য সরকার লকডাউন ঘোষণা করলে রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের চাকরি হারান ৪৫ বছর বয়সী স্যালি পেনফোল্ড। তিনি বলেন, বাড়ির মধ্যে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেছি। আমি কেবল বাইরে বের হতে চাই এবং কিছু একটা করতে চাই। 

তিনি স্থানীয় রেডিওর মাধ্যমে খামারে কাজের কথা শুনেছিলেন। এরপরই সিদ্ধান্ত নেন বাড়িতে আটকে থাকার চেয়ে জমির ফসল তোলার কাজ করা ভালো। 

৩২ বছর বয়সী থমাস ট্যানসওলও করোনাভাইরাসের কারণে শেফের চাকরি হারিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি মূলত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমাকে আবার বাস্তব জগতে ফেরত আসতে হবে। 

কৃষি খামারে কাজ করতে আগ্রহী ব্রিটিশের অভাব নেই। প্রচুর শহুরে মানুষ এরই মধ্যে আবেদন করেছেন। কিন্তু এই শহুরে শিক্ষিত নাগরিকদের দিয়ে মাঠে কাজ করাতে ভরসা পাচ্ছেন না কৃষকরা। তাদের উদ্বেগ- নতুনরা তো টিকবে না, সম্ভবত তারা কঠোর পরিশ্রম করতে পারবেন না, দুদিন কাজ করে বিরক্ত হয়ে উঠতে পারেন। শিগগিরই তাদের পুরনো চাকরিতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। শেষে ফসল তোলার মৌসুমের মাঝপথে তারা চলে গেলে বরং কৃষকদেরই বিপাকে পড়তে হবে। 

বিশ শতকের শুরু থেকে খামারভিত্তিক কৃষিকাজ করে আসছে বেটস পরিবার। এই পরিবারের নিক ওটওয়েল বলেন, করোনাভাইরাস মহামারী একদিকে শ্রমশক্তি ঘরে আটকে রেখেছে, অন্যদিকে ম্যাকডোনাল্ডসের মতো ক্রেতাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। এভাবে খামার পরিচালনা করা কার্যত অসম্ভব। তিনি আশঙ্কা করছেন, এ বছর তার খামারটি বন্ধই হয়ে যাবে। অথচ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফসল আইসবার্গ লেটুস তুলতে হবে। 

তিনি বলেন, কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন না দিয়েও ৫০ জন স্থানীয় লোক খামারে কাজ করতে আগ্রহ জানিয়েছিলেন। সেখান থেকে মাত্র ৮ জনকে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়েছি।

খামারে শ্রমিক সরবরাহ করে এমন একটি সংস্থা বলছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ খামারে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে তাদের মধ্যে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৫০ জনেরও কম মানুষ চাকরি পেয়েছে।

ওটওয়েলকে তার খামারের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ফসল কাটা শুরুর আগে ৪৫টি পদ পূরণ করতে হবে। তবে তিনি এ নিয়ে এখনো যথেষ্ট সন্দিহান। তিনি বলেন, আমি এখানে প্রায় ২৫ বছর ধরে কাজ করছি। আমার অভিজ্ঞতা বলে, এবারে ফসল কাটা সহজ হবে না। এটা মৌসুমী কাজ। আর ব্রিটিশ জনগণ যে কোনো কারণেই হোক মৌসুমী কাজ করতে চান না। এজন্য কয়েক দশক ধরে আমরা অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করছি।

ওটওয়েল বলেন, এরপরও আমরা এখানে আছি। এখানে কাজ করতে আগ্রহীদের স্বাগত জানাই। তবে আসুন এবং পুরো গ্রীষ্মকাল এখানে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হোন।

সিএনএন

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন