সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

শেষ পাতা

উত্তরবঙ্গে মিলারদের পরিবহন, শ্রমিক ও ক্রেতা সংকট

অর্ধেকে নেমেছে মিল থেকে চাল সরবরাহ

সাইদ শাহীন

দেশের চালের সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলা। এর মধ্যে বগুড়া, দিনাজপুর, নওগাঁ, রংপুর, জয়পুরহাট কুড়িগ্রাম ছয় জেলা থেকে চাল সরবরাহ হয় সবচেয়ে বেশি। কিন্তু গত এক মাসে জেলাগুলো থেকে চাল সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। আমন মৌসুমের চাল সরবরাহের সংকটাপন্ন চিত্র বজায় থাকতে পারে বোরো মৌসুমেও।

উত্তরবঙ্গের ছয় জেলার চালকলগুলো থেকে চাল সরবরাহ পরিস্থিতির তথ্য সংগ্রহ করেছে বণিক বার্তা। চালকল, আড়ত মালিক পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে উত্তরবঙ্গের ছয় জেলার প্রত্যেকটি মিল থেকে আমন মৌসুমের চাল সারা দেশে গড়ে সরবরাহ হয় দৈনিক ৬৫০-৭০০ ট্রাক করে। কিন্তু গত এক মাসে তা নেমে এসেছে ২৫০-৩০০ ট্রাকে। আমন মৌসুমের তুলনায় বোরো মৌসুমে সরবরাহ আরো বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে বোরো মৌসুমের চাল সরবরাহের ক্ষেত্রেও সংকট বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালকলগুলোয় শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি পরিবহন ক্রেতা সংকটও দেখা দিয়েছে। কারণে চাল সরবরাহ পরিস্থিতিতে অধোগতি দেখা যাচ্ছে। আমনের পর বোরো মৌসুমের বেশকিছু চালকল মেরামতজনিত কারণে বন্ধ থাকে। সাধারণত আমনের পর বোরোর আগে মৌসুমি বিরতির কারণে সরবরাহ কিছুটা কম থাকে। যদিও সময় মিলাররা পূর্ণ গতিতেই ধান সংগ্রহ করে থাকেন। কিন্তু চলমান করোনা পরিস্থিতিতে চালের সরবরাহ যেমন অর্ধেকের বেশি কমেছে, তেমনি বোরো মৌসুম শুরু হলেও ধান কেনায় আগ্রহ পাচ্ছেন না মিলাররা। মূলত মজুদ চাল বিক্রি করতে না পারায় বাজার থেকে ধান সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। ফলে কৃষকদের জন্যও ভালো দামে ধান বিক্রির বিষয়টি মুশকিল হয়ে উঠতে যাচ্ছে। অবস্থায় মিলারদের সংকট পরোক্ষভাবে কৃষকদেরও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলে দেয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে।

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের তথ্যমতে, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৯৬০টি মিল চলমান আছে। এর মধ্যে হাস্কিং মিল ৯০৫টি অটোমেটিক রাইস মিল ৫৫টি। মিলগুলোয় প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক কাজ করে থাকেন। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে সব শ্রমিক কাজে না আসায় মিল চালু করতে পারেননি মিলাররা। এছাড়া লকডাউনের কারণে ধান-চাল পরিবহন করাও ব্যাপক কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এসব চালকল থেকে গত আমন মৌসুমে গড়ে প্রতিদিন ৮০-৯০ ট্রাক চাল সরবরাহ করা হতো। এসব ট্রাকের প্রতিটিতে চাল সরবরাহ করা হতো প্রায় ১৪ টন করে। গতি অব্যাহত ছিল মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত। কিন্তু মার্চের শেষ সপ্তাহে সরবরাহের গতি কমা শুরু হয়। বর্তমানে তা ২০-২৫ ট্রাকে নেমে এসেছে বলে জানালেন নওগাঁ ধান্য-চাউল আড়ৎদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোধ বরণ সাহা চন্দন।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমন মৌসুমে সাধারণত ১০০ ট্রাকের নিচে সরবরাহ হলেও বোরো মৌসুমে প্রায় ১৫০ ট্রাকের বেশি সরবরাহ করে থাকে জেলাটি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক চালকল বন্ধ রয়েছে। বোরো মৌসুমের জন্য অনেক চালকল প্রস্তুতি নিতে সাহস পাচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চালের পাইকাররা না আসায় চাল বিক্রি করতে পারছি না। মিলগেটে চালের দাম প্রতি সপ্তাহেই কমছে। জেলাটি মূলত দেশের বিভিন্ন বাজারে চাল সরবরাহ করে থাকে। জেলার চালকলগুলোও সরকারের কাছে সরবরাহ খুব অল্প পরিমাণেই করে থাকে। ফলে বাজার ভালো না হলে বা পরিস্থিতির অবনতি হলে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনায় আগ্রহ হারাতে পারে জেলার চালকলগুলো।

এদিকে দেশের অন্যতম চাল উৎপাদনকারী বগুড়া জেলায় আড়াই হাজারের বেশি বড় মাঝারি চালকল রয়েছে। এসব চালকলের মধ্যে শতাধিক অটো রাইস মিল রয়েছে। অধিকাংশ হাস্কিং চালকল বন্ধ রয়েছে। জেলাটি থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় বগুড়া জেলাসহ অন্যান্য জেলায় ৮০০-৯০০ ট্রাক চাল সরবরাহ করা হতো। জেলার বাইরে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ ট্রাক সরবরাহ করা হতো। কিন্তু সে সরবরাহ এখন অর্ধেকের কম হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল মালিক সমিতির বগুড়া জেলার সভাপতি এবং সুমন রাইস আটা মিলের স্বত্বাধিকারী এটিএম আমিনুল হক।

তিনি বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চাল সরবরাহের চেষ্টা করছেন চালকল মালিকরা। চাল সরবরাহে স্থানীয় প্রশাসন থেকে বেশ ভালো সহযোগিতা পাচ্ছি। কিন্তু সক্ষমতা থাকলেও মৌসুমি গ্যাপ এবং পাইকার সংকটে চাল সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। অনেক চালকল চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। তারা করোনা পরিস্থিতিতে চালু করতে পারছে না। তবে পুরোদমে ধান কাটা এবং সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলে পরিস্থিতির একটু উন্নতি হতে পারে।

একই অবস্থা উত্তরবঙ্গের আরেক জেলা দিনাজপুরের। জেলাটিতে মেজর হাস্কিং মিলসহ প্রায় হাজার ৮০০ চালকল রয়েছে। এর মধ্যে বড় চালকলগুলো গড়ে প্রতিদিন পাঁচ-সাত ট্রাক চাল সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে মূলত অটো মেজর প্রায় ২৫০টি চালকলের মাধ্যমে সারা দেশে চাল সরবরাহ করা হতো বলে জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

দিনাজপুর জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, অন্য সময়ে পুরো আমন মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ট্রাক সারা দেশে সরবরাহ করেছে দিনাজপুর জেলা। বর্তমানে সেটি ৩০-৫০ ট্রাকে নেমে এসেছে। বিশেষ করে ২৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মিলগুলো চাল সরবরাহ করতে পারছে না। এর প্রধান কারণ পরিবহন সংকট। আবার কিছু ট্রাক পাওয়া গেলেও দ্বিগুণের বেশি ভাড়া হাঁকাচ্ছেন মালিকরা। এক্ষেত্রে প্রশাসন সহযোগিতা করলেও ট্রাকের সংকটে সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না।

উত্তরবঙ্গের আরো তিন জেলা রংপুর, জয়পুরহাট কুড়িগ্রাম থেকে রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য জেলায় চাল সরবরাহ এখন একেবারেই বন্ধের উপক্রম হয়েছে। চালকলগুলো এখন বোরো মৌসুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু সেখানে ট্রাক পাইকারের সংকট নিয়ে এখন চিন্তায় পড়ে গেছেন এসব জেলার মিলাররা।

দিনাজপুর ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাদাকাতুল বারী জানালেন, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ড্রাইভাররা যেতে আগ্রহী নন। ট্রাক নিয়ে মহাসড়কে গেলে খাওয়া বিশ্রামের জায়গা পাচ্ছেন না তারা। আবার গাড়ি বিকল হলে রাস্তায় কোনো গ্যারেজও খোলা পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে ট্রাক চালানোর অনুকূল পরিবেশ না থাকায় ড্রাইভাররা ট্রাক ছাড়তে চাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সারা দেশে ২২ হাজারের বেশি চালকল রয়েছে।

এসব চালকলের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যাহত হলে খাদ্য নিরাপত্তা যেমন ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তেমনি মিল মালিকরাও বিপাকে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়ে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন বণিক বার্তাকে বলেন, চালকল মালিকরা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে চালকলগুলোয় কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। সরকারকে আয়কর দিয়েই চালকল মালিকরা তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তারা। এখন চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে না পারায় ব্যাংকঋণের সুদের টাকা পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া শ্রমিক-কর্মচারীদেরও নিয়মিত বেতন-ভাতা চালু রাখতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে একটি খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন চালকল মালিকরা। তাই সংকটকালে চালের সরবরাহ সঠিক রাখতে এখনই উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেনবণিক বার্তা দিনাজপুর প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম ফুলাল, বগুড়া প্রতিনিধি এইচ আলীমনওগাঁ প্রতিনিধি আরমান হোসেন রুমন)

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন