মঙ্গলবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২১ | ১৩ মাঘ ১৪২৭

প্রথম পাতা

নভেল করোনাভাইরাস

মে মাসের মধ্যে আক্রান্ত হতে পারে অর্ধলক্ষ

জেসমিন মলি

মে মাস শেষে দেশে কভিড-১৯- আক্রান্ত হতে পারে ৪৮ থেকে ৫০ হাজার মানুষ। এদের মধ্যে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৮০০ থেকে হাজারে। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তারের গতিপ্রকৃতি ভবিষ্যৎ প্রক্ষেপণ নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তথ্য জানানো হয়। রোগতত্ত্ব জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রক্ষেপণের ভিত্তিতে তথ্য জানানো হয়েছে। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় গৃহীত কার্যক্রম পর্যালোচনা পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের জন্য বৈঠকটি আয়োজন করা হয়।

বৈঠকে আরো একটি প্রক্ষেপণের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে, এই ভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্তের সংখ্যা হতে পারে এক লাখ। বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাহিদ মালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী . কে আব্দুল মোমেন তথ্যমন্ত্রী . হাছান মাহমুদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান, শ্রম কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান প্রমুখ। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব পুলিশ মহাপরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সচিবরাও সভায় অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকেও সভার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয়। এছাড়া বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, সচিব, ডিজিএফআই জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম রোগ বিস্তারের গতিপ্রকৃতি ভবিষ্যৎ প্রক্ষেপণ নিয়ে রোগতত্ত্ব জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রস্তুতকৃত সম্ভাব্য দৃশ্যপটের ভিত্তিতে রোগটির মোকাবেলা ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম আজাদ বৈঠকে জানান, বিশেষজ্ঞরা দুটি সিনারিও প্রস্তুত করেছেন। প্রথমটি একটু রক্ষণশীল। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত  ৪৮ থেকে ৫০ হাজার ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন এবং মৃত্যুবরণ করতে পারেন প্রায় ৮০০ থেকে হাজার ব্যক্তি অন্য একটি প্রক্ষেপণ অনুসারে প্রায় এক লাখ মানুষ আক্রান্ত হতে পারে।

বৈঠকে তিনি জানান, সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ দৃশ্যপট বিবেচনায় রেখে আমাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে এসব সিনারিও মডেলিংয়ে অনেকগুলো ফ্যাক্টর বিবেচনা ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন লকডাউন, সোস্যাল ডিসট্যান্সিং ইত্যাদি এবং এগুলোর বর্তমান পর্যায়। আলোচ্য প্রক্ষেপণটি বিবেচনায় রেখে করোনা নিয়ন্ত্রণ চিকিৎসার প্রস্তুতি গৃহীত হয়েছে।

তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ চিকিৎসা নির্দেশনা অনুযায়ী আক্রান্তদের মধ্যে ২০ শতাংশ রোগীর হাসপাতাল সেবা প্রয়োজন পড়ে।

পরিপেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসান জানান, সারা দেশে কভিড-১৯ রোগীদের হাসপাতাল সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকের একটি ম্যাপিং সম্পন্ন করা হয়েছে। সে অনুযায়ী বর্তমানে সরকারিভাবে হাজার শয্যা প্রস্তুত আছে। ধারাবাহিকতায় সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে সারা দেশে মোট ২০ হাজার শয্যা প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তথ্যমন্ত্রী . হাছান মাহমুদ বৈঠকে বলেন, ঘরে বসেই করোনার চিকিৎসা পাওয়া যায় এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি প্রণয়ন করে সামাজিক যোগাযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। রোগ বিস্তার প্রক্ষেপণের ক্ষেত্রে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের মডেল এবং চিকিৎসার জন্য চীন-দক্ষিণ কোরিয়ার মডেল গ্রহণ করতে পারি। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনে প্রতি সপ্তাহে প্রক্ষেপণ হালনাগাদ করতে হবে।

জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক বলেন, করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বিষয়ে প্রক্ষেপণটি যথাযথভাবে প্রণয়ন করে প্রস্তুতি রিসোর্স প্ল্যানিং করা প্রয়োজন। এজন্য বেসরকারি খাতকে সরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বৈঠকে বলেন, নভেল করেনাভাইরাস প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর নিদের্শনা তত্ত্বাবধানে পুলিশসহ দেশের সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করছে এবং এজন্য এখনো অনেকটা ভালো আছি। আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন, সংক্রমণ এবং লকডাউন কার্যকর করার ক্ষেত্রে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মুহূর্তে কোনো রোহিঙ্গাকে দেশে ঢুকতে দেয়া যাবে না। অনেক ডাক্তার-নার্স ভয়ে আছেন। স্বাস্থ্যসেবার মান আরো বৃদ্ধি করার জন্য চিকিৎসকদের আরো আন্তরিক হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক বৈঠকে জানান, হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল চিকিৎসা টিম গঠনের জন্য প্রয়োজনে নতুন চিকিৎসক নিয়োগ করতে হবে। এজন্য পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ কিন্তু পদের অভাবে চাকরিতে যোগ দেননি এমন জনবল নিয়োগ করা যেতে পারে।

জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব বৈঠকে জানান, সংক্রমণ ঠেকাতে এবং কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার জন্য পাড়া-মহল্লায় প্রচার মাইকিং কার্যক্রম অব্যাহত আছে। সুযোগ পেলেই লোকজন একত্র হচ্ছে। গ্রামে প্রচার সচেতনতার জন্য ৬০ লাখ আনসার সদস্য কাজ করছেন। নতুন করে রোহিঙ্গাদের আগমন কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হচ্ছে।

দুর্যোগ ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বৈঠকে জানান, বর্ধিত খাদ্য সহায়তার জন্য যথেষ্ট খাদ্য মজুদ রয়েছে। এছাড়া তিনি চিকিৎসক, নার্সদের প্রথম, দ্বিতীয় তৃতীয় লাইনে বিভক্ত করে রাখার পরামর্শ দেন।

সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার বৈঠকে জানান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ বিদেশফেরত নাগরিকদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করছে। প্রয়োজনে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেয়া হবে।

এছাড়া রোজার সময়ে আলোচ্য বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে চিকিৎসকদের পরামর্শ প্রচারের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

পুলিশ মহাপরিদর্শক বৈঠকে বলেন, ক্রমান্বয়ে হোম কোয়ারেন্টিন আইসোলেশনের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ছয়টি জেলায় আংশিক লকডাউন প্রত্যাহার করা যেতে পারে। আর যদি সম্পূর্ণ লকডাউনে যেতে হয়, তাহলে মানুষের সম্পূর্ণ খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। কাজে ব্যাপক রিসোর্সের প্রয়োজন হবে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ নেত্রকোনা জেলায় ধান কাটার জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ১২ হাজার শ্রমিক পাঠানো হয়েছে।

ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক বলেন, নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধ শুধু চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জনগণের ঘরে অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য আরো এক সপ্তাহ লকডাউন বাড়ানো যেতে পারে। হাসপাতালগুলোয় সব ধরনের চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের দেয়া খাদ্যসহায়তার আরো সম্প্রসারণ প্রয়োজন, যাতে সব জনগণের  কাছে তা পৌঁঁছে। যেসব এলাকায় পাকা ধান কাটার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, ওই সব এলাকায় ধান কাটার শ্রমিক পাঠানোর বিষয়টি সমন্বয়ের কাজও জোরদার করা যেতে পারে। সংসদ সদস্যরা যদি নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে রিলিফসহ অন্যান্য কার্যক্রম সমন্বয় করেন, তাহলেও নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধ সহজ হবে।

ওই বৈঠকে উঠে আসা তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত মিডিয়া সেলের ফোকাল পয়েন্ট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান খান বলেন, সভায় নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধির যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, তা সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞদের মতামত নয়। মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কভিড-১৯ প্রতিরোধে বিভিন্ন প্রস্তুতি নিচ্ছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের আক্রান্ত হওয়ার মৃত্যুর প্রক্ষেপণ করার কারণ হলো, যদি পরিমাণ আক্রান্ত হয়ও, তবু যাতে আমাদের প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি না থাকে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন