শনিবার | অক্টোবর ২৩, ২০২১ | ৮ কার্তিক ১৪২৮

সম্পাদকীয়

শ্রদ্ধাঞ্জলি

স্মৃতির দর্পণে শ্রদ্ধেয় ড. সা’দত হুসাইন

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

মানুষের স্বল্প আয়ু নিয়ে একটু দুঃখ ছিল হুমায়ূন আহমেদের। ২০০৭- জনাথনের বয়স ১৭৫ হলে বিষয়টা পত্রিকার খবরে এসেছিল। ১৮৮২ থেকে সে সেন্ট হেলেনার অধিবাসী। জনাথন এখনো বেঁচে আছে। সে পৃথিবীর দীর্ঘতমজীবী প্রাণী; বিশালাকার কচ্ছপ জনাথনের বয়স এখন প্রায় ১৮৭ বছর। হুমায়ূন আহমেদ আফসোস করে বলেছিলেন, কচ্ছপের মতো প্রাণী চার-পাঁচশ বছর বাঁচে। অথচ মানুষের আয়ু কত কম! এই আক্ষেপ নিয়েই ২০১২ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন বাংলা কথাসাহিত্যের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ। তার জন্ম ১৯৪৮ সালে, মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৬৩ বছর।

মাসের শুরুর দিকে . সাদত হুসাইনের কিছুটা স্বাস্থ্যাবনতি হয়। ১২ এপ্রিল হঠাৎ করে তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে ইউনাইটেড হসপিটালে ভর্তি করা হয় ১৩ এপ্রিল সোমবার। মস্তিষ্কের মেনিনজাইটিস। খবরটা জানাজানি হলে ফেসবুকের পাতায় শত শত মানুষ তার রোগমুক্তি কামনা করেন। তিনি করোনায় আক্রান্ত হননি শুনে সবাই স্বস্তি বোধ করেছেন। লেখিকা রোকেয়া খাতুন রুবী . সাদতের দীর্ঘায়ু কামনা করে ফেসবুকে লিখেছিলেন, কত মানুষই তো দীর্ঘকাল বেঁচে থাকে, . সাদত হুসাইন স্যার আর কয়েকটি বছর বেঁচে থাকলে কী হয়! কেবল তার একার আকুতি ছিল না, হাজার হাজার মানুষ চেয়েছিলেন এই প্রজ্ঞাবান সজ্জন মানুষটি আমাদের মধ্যে থাকুন। আমার বন্ধু শাহরিয়ার মোল্লার মতে, তিনি ছিলেন একজন আদর্শ স্থানীয় খাঁটি মানুষ, যাকে হূদয় থেকে সম্মান করা যায়। রকম মানুষ এখন আর তেমন দৃষ্টিগোচর হয় না।

২০ এপ্রিল তার জ্বর খুব বেড়ে গিয়েছিল। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ২২ এপ্রিল শরীরের তাপমাত্রা হ্রাস পেতে থাকে, কিন্তু বিকালের দিকে রক্তচাপ নেমে আসতে থাকে দ্রুত। এক পর্যায়ে ইউনাইটেড হসপিটালের ডাক্তাররা ভেন্টিলেটর খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে . সাদত হুসাইন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

১৯৯৫- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান . আকবর আলি খানকে বদলিপূর্বক অর্থ সচিব হিসেবে পদস্থ করা হয়। সময় . সাদত হুসাইন নারী শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে কর্মরত। তাকে দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবই পদাধিকার বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

চেয়ারম্যানের অফিস ছিল রাজস্ব ভবনের পঞ্চম তলায়। বলা দরকার যে, তখনো রাজস্ব ভবন নামকরণ হয়নি। ভবনে কর্মকর্তাদের স্থান সংকুলান হয় না বলে পঞ্চম তলা নির্মাণ করে চেয়ারম্যান সদস্যদের জন্য কামরা সাজানো হয়েছিল। . সাদত হুসাইন বোর্ডে যোগদানের আগেই পঞ্চম তলা ব্যবহার শুরু হয়েছিল। কিন্তু আদ্যিকালের পুরনো লক্কড়-মার্কা লিফটে করে পাঁচতলায় উঠতে তিনি অসম্মত। তিনি সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় চেয়ারম্যানের পুরনো বিদ্যমান কামরাতেই অফিস করতে থাকেন।

তখন মেম্বার প্রশাসন জনাব এমএসআই চৌধুরী। তিনি গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিন-চার মাসের মধ্যে পশ্চিম পাশের পুরনো লিফট পাল্টে একটি নতুন লিফট লাগিয়ে ফেলেন। সেই নতুন লিফট দিয়ে পাঁচতলায় উঠে তবেই নতুন কামরায় অফিস শুরু করলেন . সাদত। এরপর প্রায় তিন যুগ হতে চলল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পূর্বদিকের দ্বিতীয় লিফটটি এখন পর্যন্ত প্রতিস্থাপন করা হয়নি। এটির বয়স ৪৫ বছরের বেশি। 

. সাদত নিয়মিত বোর্ডের সভা করতেন। তাতে কাস্টমস, ভ্যাট আয়কর তিন বিভাগেরই প্রথম সচিব পর্যন্ত সব কর্মকর্তার উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিল। সভাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হতো। মেম্বারসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নানা বিষয়ে জবাবদিহি করতে হতো। এতে অনেক কর্মকর্তা অসন্তুষ্ট হতেন। তারা জবাবদিহি করতে অভ্যস্ত ছিলেন না। 

রাজস্ব বোর্ড ভবনের কোনো সাইনবোর্ড ছিল না। বোর্ডের এক সভায় . সাদত বললেন, এটি একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের কর-রাজস্বের ৯২ শতাংশ সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠান। এটি কি-পয়েন্ট ইনস্টলেশন নয় শুনে আমি অবাক হয়েছি। জনগণের জানা উচিত প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর কোথায়। বড় আকারের একটি সাইনবোর্ড লাগানোর ব্যবস্থা নিন। 

বোর্ডের পরবর্তী সভায় জাননো হলো, বড় সাইনবোর্ড লাগানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এতে ৫০ হাজার টাকার মতো ব্যয় হবে। সভায় উপস্থিত একজন মেম্বার বললেন, সাইনবোর্ডের পেছনে এত টাকা খরচ করা সমীচীন হবে না। নম্রকণ্ঠে চেয়ারম্যান উত্তর দিলেন, মেম্বার সাহেব, হাজার-লাখ টাকায় সরকার চলে না; যা প্রয়োজন তার জন্য ব্যয় করতে কার্পণ্য করার মানে হয় না।

একদিন আমার কাছে দুঃখ নিয়ে . সাদত বলেছিলেন, বাইরে থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সম্পর্কে আমার উঁচু ধারণা ছিল। কিন্তু রকম দীনদশা একেবারেই আশা করিনি। একটা উন্নয়ন প্রকল্প পর্যন্ত নেই। আপনি একটা প্রকল্প করেন তো ফয়জুল লতিফ।

তার কথা শিরোধার্য। আমি এক মাসের মধ্যে ভ্যাট ব্যবস্থার ডিজিটাইলেশনের লক্ষ্য নিয়ে ছোট একটি প্রকল্পের জন্য টিএপিপি প্রণয়ন করেছিলাম এবং ডিএফআইডির কাছ থেকে অর্থায়ন আদায় করেছিলাম। তিনি সন্তুষ্ট বোধ করেছিলেন।

১৯৯৬ শুরু হলো গভীর রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্য দিয়ে। সারা দেশে অভূতপূর্ব নৈরাজ্য। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে লাগাতার হরতাল, আন্দোলন ভাংচুরে অর্থনীতি বিপর্যস্ত। আমদানি-রফতানি কমেছে, স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত; রাজস্ব আদায়ে ভাটা। . সাদত হোসেন অবিচল। তিনি বললেন, একটা অর্থনীতির সুনির্দিষ্ট রাজস্ব ক্যাপাসিটি থাকে। অর্থনীতি সংকুচিত হলে রাজস্ব সমানুপাতে হ্রাস পেতেই পারে। নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনারা লিকেজ বন্ধ করার জন্য কাজ করেন। যারা কর দেয় না, তাদের করের আওতায় আনেন। মানুষের হয়রানি বন্ধ করার ব্যবস্থা নেন।

এরই মধ্যে ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু হলো। একদিন তার অফিসে আমরা কয়েকজন প্রথম সচিব উপস্থিত। . সাদত জিজ্ঞেস করলেন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কী করে নির্ধারণ করা হয়?

আমরা জানালাম, চলতি বছরের আদায়ের ওপর ১০-১৫ শতাংশ যোগ করে নতুন অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কখনো কখনো অর্থ মন্ত্রণালয়ই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়।

নিখাদ বিস্ময় প্রকাশ করে . সাদত বললেন, কি অদ্ভুত ব্যাপার! মডেলিং করে রেভিনিউ ফোরকাস্ট করা হয় না?


আমরা জানালাম, না।

তিনি বললেন, সেটি হবে না। এবার আপনারা মডেল তৈরি করে রেভিনিউ ফোরকাস্ট করেন। সেটাই হবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা। একটি কমিটি গঠন করেন। আমি আহ্বায়ক থাকব। তিনি ওই কমিটির সদস্য হিসেবে . ফওজুল কবির খান, . জাহিদ হোসেন, মাহবুব হোসেন এবং আমার নাম বললেন। আদেশ জারি হলো। এই প্রথম এবং অদ্যাবধি শেষবারের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ইকোনমিক মডেল তৈরি করে একটি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বার্ষিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা এবং আদায় হয়েছিল ১২ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।

বাজেট করার সময় তিনি কাস্টম এক্সাইজ এবং আয়কর বিভাগের কর্মকর্তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। আমরা সবকিছু চূড়ান্ত করে তার কাছে যেতাম। ব্রডশিটে থাকত বর্তমান অবস্থা এবং আমাদের প্রস্তাবনা তার ইমপ্যাক্ট। কোনো কিছু স্বতঃস্পষ্ট না হলে তিনি অকপটে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতেন।

বাটা সু কোম্পানির কাছ থেকে ভ্যাট আদায়ের ব্যাপারে তার মাথায় একটি অভিনব ধারণা এসেছিল। তিনি সেটা আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে বলেছিলেন। একটি মাত্র কোম্পানির কথা মাথায় রেখে আইনে নতুন কিছু যোগ করা অদ্ভুত মনে হওয়ায় ভ্যাটের সদস্য সাইফুল ইসলাম খান উষ্মা প্রকাশ করে বলেই ফেললেন, আপনি বাইরে থেকে এসেছেন, বুঝতে পারছেন না। রাজস্বনীতির একটা প্যাটার্ন আছে, ওর বাইরে যাওয়া যায় না।

. সাদত হুসাইন সম্পর্কে সবার ধারণা, তিনি একজন কঠিন মানুষ। কিন্তু না, তিনি দৃঢ় নিয়মানুবর্তী কিন্তু কঠিন নন, আদৌ রূঢ় নন। তিনি সেদিন রেগে যাননি। খুব শান্ত স্বরে বলেছিলেন, সাইফুল ভাই, আপনার কথাই হয়তো ঠিক। আপনাদের সব প্রস্তাবই আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমি তো চেয়ারম্যান। একটি মাত্র প্রস্তাব আমার মাথায় এসেছে, এটি আপনারা রাখতে পারেন না?

তার শান্ত প্রতিক্রিয়ায় জাদুর মতো কাজ হলো। সাইফুল ইসলাম খান স্যার হেসে . রফিকুল ইসলামকে বললেন, রফিক, তবে তা- হোক। চেয়ারম্যান সাহেবের ধারণাটা ভালো করে বুঝে নিয়ে ফিন্যান্স অ্যাক্টে ঢুকিয়ে দাও। পরিস্থিতি এত দ্রুত প্রশমিত হয়ে গেল যে আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। বোর্ডের প্রথম সচিব দ্বিতীয় সচিব পর্যায়ের প্রায় সব কর্মকর্তাই ততদিনে তার ভক্তে পরিণত হয়েছে।

শুধু এটা নয়, যত দূর মনে পড়ে তারই পরামর্শে সম্পদ কর উঠিয়ে দেয়া হছিল সে বছর। তার যুক্তি ছিল, সম্পদ কর বাবদ যে সামান্য রাজস্ব আদায় হয়, তার বিপরীতে মানুষের কষ্ট হয় অনেক বেশি।

নবগঠিত সংসদে ১৯৯৬-৯৭ সালের বাজেট পেশ করা হলো। মাসের শেষভাগে বাজেট যেদিন পাস হয়, সেদিন সংসদ সদস্যদের নৈশভোজে আপ্যায়নের রীতি আছে। আয়োজনের দায়িত্ব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে এই নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। চাঁদার কথা শুনেই . সাদত বললেন, নৈশভোজ করতে হলে সরকারের টাকায় হবে; চাঁদার টাকায় না।

অতঃপর অর্থ বিভাগে চিঠি লেখা হলো। লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেল। তারপর প্রথমবারের মতো রাজস্ব বোর্ডে সরকারি বরাদ্দের টাকায় নৈশভোজের আয়োজন করা হলো।  

একদিন তিনি ডেকেছেন। তার অফিসে যাওয়ার পথে দেখি ভিজিটরস রুমে মোশাররফ হোসেন স্যার সোফায় বসে আছেন। পিএটিসিতে অনুষ্ঠিত ফাউন্ডেশন কোর্সের ফার্স্ট ব্যাচে আমি অংশ নিয়েছিলাম। মোশাররফ হোসেন স্যার ছিলেন কোর্স ডিরেক্টর। আমাদের জানা ছিল তিনি . সাদত হুসাইন স্যারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জিজ্ঞেস করি, স্যার আপনি এখানে বসে?

মৃদু হেসে বললেন, সাদতের কাছে এসেছি। জানলাম . সাদত হুসাইন সম্যক অবহিত এবং সময় হলে বন্ধুকে ডাকবেন। অফিসের সাক্ষাতের ধারাটি সর্বজনবিদিত। পরে পিএস মাসুদের কাছে শুনেছি, একদিন তার বড় ভাই অফিসে এসেছিলেন। স্যার বলেছিলেন, মিয়া ভাইকে গাড়ি করে বাসায় পৌঁছে দেন। অফিসে বড় ভাইয়ের সঙ্গে তিনি দেখা করতে চাননি। অফিসকে তিনি ব্যক্তিগত পরিসর বিবেচনা করতেন না কখনো। অফিসের পবিত্রতায় বিশ্বাস করতেন।

১৯৯৬ সালে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ। ইন্টারকমে শব্দ হলো। তাকিয়ে দেখি এলসিডি ডিসপ্লেতে CHAIRMAN লেখা ভেসে উঠেছে। দ্রুত রিসিভার তুলি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান . সাদত হোসেন বললেন, ফয়জুল লতিফ, আপনার না বিদেশ যাওয়ার কথা?

জি স্যার, ফ্লাইট দুই সপ্তাহ পর।

আপনার সামারি কোথায়?

আপনার টেবিলে স্যার, ডান পাশে, সম্ভাবত ওপরে আছে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে ভর্তি হয়েছি। এক বছরের জন্য বৃত্তিও জোগাড় করেছি। লিয়েন ডেপুটেশনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অফিসে সামারি যাবে। সামারি তৈরি হয়েছে সাত-আটদিন আগে। চেয়ারম্যানের অফিসেই আছে। পিয়ন মুজিব দয়াপরবশ হয়ে রোজ সকালে সামারির ফোলিওটা সবার ওপর তুলে দেয়, যাতে স্যারের চোখে পড়ে। ইন্টারকমে প্রতিদিন বিকালে পিএস মাসুদ apologetic কণ্ঠে জানায়, এখনো স্যার সই করেননি।

ফ্লাইটের সময় নিকটবর্তী, অক্টোবরের তারিখ রেজিস্ট্রেশনের লাস্ট ডেট, তারিখ থেকে লেকচার শুরু। আমি ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করি। চেয়ারম্যান সাহেবের অফিসে যাই, বসি, আলোচনায় অংশ নেই। সামারির প্রসঙ্গ তোলার সাহস হয় না। কয়েক মাস আগে ট্যাক্সের সৈয়দ আমিনুল করিম তার সামারি স্বাক্ষরের কথা তুললে স্যার কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেনএকথা মনে রাখি। . সাদত অসন্তুষ্ট বোধ করবেন রকম কাজ করার কথা ভাবাও যায় না।

ইন্টারকমে . সাদত বললেন, আপনি বসি আছেন, মিনিস্টার সাহেব তো আজ প্যারিস চলি যাবেন। দুপুরে ফ্লাইট। আপনি এক্ষুনি আমার রুমে চলি আসেন। সবাইকে আপনি বলে সম্বোধন করতেন তিনি।

গিয়ে দেখি আমার সামারি হাতে নিয়ে তিনি অপেক্ষা করছেন, একটু চিন্তিত। বললেন, সময় কম। আমার গাড়ি নিয়ে যান, ড্রাইভারকে বলি দিছি। এখনি চলি যান। সোজা মিনিস্টার সাহেবের বাসায় চলি যান। ১২টার মধ্যে পৌঁছবেন। মিনিস্টার সাহেবকে বলি রেখেছি। স্যারের গাড়িতে ঝিকাতলায় অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেবের বাসায় যখন পৌঁছলাম, তখন ঘড়িতে বেলা সাড়ে ১১টা।

কিছু পরে প্রথমে নেমে এল দুটো সুটকেস। একটু পরেই অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেব সিঁড়ি দিয়ে নামলেন। ডানে-বামে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, রাজস্ব বোর্ড থেকে কে এসেছেন?

আমি পরিচয় দিলে শুধালেন, . সাদত পাঠিয়েছেন?

জি স্যার।

সামারিটা দিন। এলএসইতে যাচ্ছেন?

জি স্যার।

কাভার খুলে সবুজ কাগজের সারসংক্ষেপ তুলে ধরলাম। তিনি স্বাক্ষর করলেন। শুভকামনা জানালেন।

রোজার মধ্যে লন্ডন থেকে স্যারের বাসায় ফোন করলাম। তার মেয়ে ফোন ধরে বললেন, আব্বু নামাজ পড়ছেন। আধা ঘণ্টা পরে ফোন করতে বলেছেন।

৩০ মিনিট পরে আবার ফোন করলাম। ঈদের জন্য ঢাকা যাওয়ার অনুমতি চাইলাম। স্যার বললেন, চলি আসেন। যাওয়ার আগে অবশ্যি আমার সঙ্গে দেখা করি যাবেন।

দুঃখের বিষয়, আমি যেদিন দেখা করতে গেলাম, তখন তিনি বদলি হয়ে প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। ভূতপূর্ব শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খানের মতে, তার আমলে প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনা এতটাই সুষ্ঠু রূপ নিয়েছিল যে এখনো তার আলামত অবশিষ্ট আছে।

অনেক পরের কথায় যাই। . আকবর আলি খানের পর ক্যাবিনেট সেক্রেটারি হিসেবে . কামাল সিদ্দিকী কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালের মে মাসে সরকার . সাদত হুসাইনকে ক্যাবিনেট সচিব হিসেবে পদস্থ করে। সময়ে তিনি স্বরাষ্ট্র সচিব হিসেবে কর্তব্যরত ছিলেন। ক্যাবিনেট সচিব হিসেবে তিনি প্রায় সাড়ে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৩ সালের একদিন। প্রধানমন্ত্রীর অফিসে অর্থ পরিকল্পনাবিষয়ক ডেস্কের পরিচালক হিসেবে কাজ করছি। লিভ সাবস্টিটিউট হিসেবে অন্য কোনো এক পরিচালকের কাজও দেখছিলাম কয়েক দিন। এমন সময় দেখি ক্যাবিনেট ডিভিশন থেকে একটি সামারি এসেছে।

যত দূর মনে পড়ে সামারি ছিল সরকারি কর্মচারীদের বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে ভ্রমণের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেয়াসংক্রান্ত। কিন্তু সঙ্গে মূল সরকারি আদেশটির অনুলিপি ছিল না। ক্যাবিনেট ডিভিশনের কাউকে চিনি না। ভয়ে ভয়ে সচিবকেই ফোন করি। স্যার কুশল জিজ্ঞেস করে বললেন, সামারিটি ফেরত না পাঠিয়ে ধরি রাখেন। আমি ওটা পাঠিয়ে দিচ্ছি। তিনি খুব নীতিপ্রাণ মানুষ ছিলেন; একই সঙ্গে যুক্তিশীল। কখনই রেগে যেতেন না। যুক্তিগ্রাহ্য বিষয় সহজে গ্রহণ করতেন। নিরাবেগ নিরাসক্ত ভাবের জন্য তাকে কঠিন মনে হতো। সবাই ভয় পেত তাকে। কিন্তু অনুজদের প্রতি ছিলেন সহানুভূতিশীল মমতাময়।

২০০৭ সালের মে মাসে . সাদত হুসাইন সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন। পদে তিনি ২০১১-এর নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। সময়ে মওলা ব্রাদার্সের আহমেদ মাহমুদুল হক তাকে একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনার অনুরোধ করেন এবং মওলা ব্রাদার্স থেকে তা প্রকাশের প্রস্তাব দেন। অনুরোধের সূত্র ধরে . সাদত হুসাইন ১৯৭১- মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ নিয়ে একটি বই প্রকাশের কথা ভাবেন।

২৬ মার্চ ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি লাহোরে এক বছর ট্রেনিং নিয়ে আসা তরুণ সিএসপি অফিসার, যশোর কালেক্টরেটে পদস্থ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্বিচারে আক্রমণে বাঙালিদের নিহত হতে দেখে তিনি অবিলম্বে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। দেশের অভ্যন্তরে মে মাস পর্যন্ত অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধ করেন। তারপর তিনি বয়রা সীমান্ত দিয়ে ভারত গমন করেন। তাকে অর্থমন্ত্রীর একান্ত সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়। কলকাতায় অবস্থান কালে তিনি ডায়রি লিখতেন। পাশাপাশি ২৬ মার্চ থেকে শুরু করে মে মাসে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কলকাতা গমনের বৃত্তান্ত ধীরে ধীরে লিখে ফেলেছিলেন।

মাওলা ব্রাদার্সের অনুরোধের সূত্র ধরে তিনি ১৯৭১ সালে কলকাতায় অবস্থান এবং ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২২ ডিসেম্বর হেলিকপ্টারে সরকারের মন্ত্রী সরকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের কাহিনী লিখতে শুরু করেন। ২০০৮ সালের শেষভাগে পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে যায়। মাওলা ব্রাদার্স থেকে গ্রন্থটি ২০০৯ এর বই মেলায় প্রকাশিত হয়, প্রচ্ছদনাম মুক্তিযুদ্ধের দিন-দিনান্ত প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। ২০১১তে বইটির ২য় সংস্করণও প্রকাশিত হয়।

২০১১-এর মাঝামাঝি একদিন সাদত স্যার ফোন করে তার সঙ্গে দেখা করতে বললেন। তখনও পর্যন্ত সরকারি কর্মকমিশনের অফিস তেজগাঁতেই। সকাল ১০টায় দেখা করার কথা। আমি যথা সময়ে উপস্থিত। আমাকে বিস্ময়াভিভূত করে তিনি বললেন,ফয়জুল লতিফ, আমি তো মাঝে মাঝে কবিতা লিখি। একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছি। আপনি প্রকাশের ব্যবস্থা করে দেন।

আমি পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে মঈনুল আহসান সাবেরের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি অনুরোধ রাখলেন। দিব্য প্রকাশ থেকে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হলো অন্তরজ ভাবনার রং বেরং নামে। সাত ফর্মার বই। কবিতার সংখ্যা ৪৭। মানানসই প্রচ্ছদ করে দিলেন শফিক শাহীন।

প্রিয় মানুষ . সাদত হুসাইনের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল গত বছর ২৩শে নভেম্বরে সকালে একটি সেমিনারে। ইনিশিয়েটিভ ফর প্রোমোশন অব লিবারেল ডিমোক্রেসি নামের একটি গবেষণা সংস্থার নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। সংস্থারই সেমিনার। সেদিন . সাদতকে দেখেছি শক্ত সক্রিয়। মার্চে আরেকটি সেমিনারে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের একটি কাজে হঠাৎ আটকে গিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

. সাদত হুসাইন স্যার পরিণত বয়সে প্রয়াত হলেও তার প্রস্থান আকস্মিক অপ্রত্যাশিত। গত - বছরে পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি টেলিভিশনের অসংখ্য টক শোতে অংশ নিয়ে তিনি জাতীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। তার যুক্তিপূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান সাধারণ মানুষের কাছে তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। তার মৃত্যু সংবাদে ফেইসবুকে অসংখ্য মানুষের যে মন্তব্য দেখেছি তা অবিস্মরণীয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তিনি এক কিংবদন্তী মানুষ হিসাবে পরিচিতি লাভ করবেন, বিষয়ে সন্দেহ নেই। আল্লাহ রাব্বুল য়ালামিন তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন।

 

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী: অর্থনীতিবিদ সাহিত্যিক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন