মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

ফিচার

কোয়ারেন্টিন কুইন লি জিকি

বণিক বার্তা অনলাইন

কোয়ারেন্টিনে আর সবার রান্নার মতো আমি পেঁয়াজের সবুজ পাতাগুলো ব্যবহারের পর গোড়াগুলো (কন্দ) গ্লাসের পানিতে রেখে দিয়েছি। যাতে আবার নতুন পাতা গজায়। সবমিলিয়ে নিজের বোধবুদ্ধি ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিজেই সন্তোষ বোধ করছি।

গত সপ্তাহে চীনের ইউটিউব তারকা লি জিকি ইউটিউবে ‘দ্য লাইফ অব গার্লিক’ শিরোনামে নতুন একটি রান্নার ভিডিও পোস্ট করার পর আমি আশাবাদী যে জানালার গোড়ায় পেঁয়াজ চাষ নিয়ে রীতিমতো একটা গ্র্যাজুয়েশন করে ফেলতে পারি। ১২ মিনিটের ওই ভিডিওটি এরই মধ্যে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ দেখেছে। 

ভিডিওতে দেখা যায়, লি তার বাড়ির পাশের জমিতে রসুনের কোয়াগুলো রোপণ করছেন। একটু পর কোয়াগুলো থেকে সবুজ কচি পাতা বের হতে দেখা যায়। গাছগুলো বড় হলে লি সবুজ পাতাগুলো কুচি কুচি করে কেটে মাংসে দিয়ে রান্না করেন। রসুনগুলো পূর্ণবয়স্ক হয়ে গেলে কচি পাতা ফুলকাগুলো সংগ্রহ করেন আর গাছগুলো  কন্দের উপর থেকে ভেঙে দেন। পাতা ও ফুলকা দিয়ে রান্না করা হয় মাংস। আর কন্দসহ থেকে যাওয়া গাছ শুকিয়ে রসুন সংগ্রহ করেন তিনি। সেগুলো শুকিয়ে চমৎকার কায়দায় বেনী পাকিয়ে ঝুলিয়ে রাখেন আগামী মৌসুম পযন্ত সংরক্ষণের জন্য। কিছু কন্দ খোসা ছাড়িয়ে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে আর বাকিটা দিয়ে রান্না করেন মুরগীর ঠ্যাং। কিছু দিয়ে তৈরি হয় সালাদ।

চীনের সিচুয়ান প্রদেশের একটি গ্রামে দাদীর সঙ্গে বাস করেন লি জিকি। ভিডিওতে তিনি খুব কম কথা বলেন। দেখতেও ডিজনি রাজকন্যার মতো নন। তবুও ওয়েইবো ও ইউটিউবে তিনি তুমুল জনপ্রিয়। প্রতিটি ভিডিও স্বনির্ভরতারও দৃষ্টান্ত। করোনাকালে বিশ্বজুড়ে কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনে থাকা বন্দি মানুষগুলোর সান্ত্বনার এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হয়ে উঠেছেন তিনি!

আমি মাত্র একটি ভিডিও দেখবো বলে স্থির করেছিলাম। কিন্তু লি জিকির ভিডিওতে পাখির ডাক ও অন্য উপকরণগুলোর প্রশান্তির ছায়া আর ইউটিউবের অ্যালগরিদম আমাকে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে গিয়ে ফেলে লি জিকির চ্যানেলে। আমি নিশ্চিত, লির ক্ষেতখামারের অনেক দূরে থেকেও তার কাছ থেকে দরকারি সব তথ্য আমি পাচ্ছি।

আমাকে যদি দুই ডজন আলুর সঙ্গে আটকে রাখা হয়, তবে আমি এখন জানি যে এগুলো কীভাবে পুনর্ব্যবহার করতে হয় এবং নুডলস তৈরিতে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। এটাই আমি নিজেকে বলছি। আমাকে এখন পদ্মপুকুরে ছেড়ে দেয়া হলে আমি জানি পদ্মগুলো কীভাবে সংগ্রহ এবং খাওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে হয়। 

ভিডিওতে লি যা করছেন, তার কিছুই ব্যাখ্যা করছেন না। আসলে আধুনিক কোনো রান্নাঘরের গেজেট ব্যবহার না করে তার নীরবে কাজ করার ঝোঁক আছে। বাড়ির পাশে ছোট্ট পাহাড়ি নদীর জলপ্রবাহের মতো কলকল করে কাজ করে যান তিনি, সেখানেই শাকসবজি ধুয়ে পরিষ্কার করেন। তার রান্নাঘরে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া নেই। 

ল্যাপটপে লির ভিডিও দেখে রাতের খাবারের জন্য এক বাটি মাখানো পপকর্ন খাওয়ার সময় ভাবলাম, গ্রামের নিখুঁত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে থেকে ঐতিহ্যবাহী রান্নায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারলে আমিও তার মতো সুখী জীবন পাবো।

লি জিকি তথাকথিত জনপ্রিয় শর্টকাট পদ্ধতির জন্য পরিচিত নন। মাশরুমের একটি ভিডিওতে ইট দিয়ে চুলা তৈরির মাধ্যমে তার রান্না শুরু হয়, এরপর জঙ্গল থেকে মাশরুম সংগ্রহ করে গ্রিল করা এবং রান্না সবমিলিয়ে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এছাড়া মাছ রান্নার একটি ভিডিওতে তীব্র তুষারপাতের মধ্যে তিনি মাছ শিকার করতে যান। ধৈর্য সহকারে বসে থাকেন এবং ছোট মাছ ধরা পড়লে সেগুলোকে তিনি ছেড়ে দেন। মাছ ধরতে অপেক্ষার জন্য তুষারপাতে তার চুলগুলো জমাট বেঁধে যায়।

রহস্য উপন্যাসের মূল চরিত্রের মতো লিও সর্বদা একা থাকেন। যদিও তিনি নিজেকে একাকী বলে মনে করেন না। তিনি তার ঘোড়াটিকে বুনো ফুলের ক্ষেতের উপর দিয়ে চালিয়ে নিয়ে যান বা কাঁধে মিষ্টি আলুর ঝুড়ি নিয়ে হাঁটেন। তাকে দেখে অক্লান্ত, দারুণ মনোযোগী, আত্মবিশ্বাসী আর স্বাধীন বলে মনে হয়। তার ভিডিওগুলো অন্য রান্না চ্যানেলগুলোর থেকে একেবারেই আলাদা। এটা নিঃসন্দেহে আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে, মনে হবে আপনি এমন হতে পারেন, এটা তো একেবারেই সহজ কাজ। শুধু চাই ইচ্ছা।

লি তার অন্ন সংস্থানের লড়াইকে রোম্যান্টিক করে তুলেছেন। তিনি ভিডিওগুলোর মাধ্যমে তার অনলাইন শপের ঐতিহ্যবাহী কাপড়, মধু ইত্যাদির বলতে গেলে বিজ্ঞাপন করেন।

লি তার জীবনের গল্পে বলেছেন, কিশোর বয়সেই তিনি কাজের সন্ধ্যানে বাড়ি ছেড়েছিলেন। কিন্তু দাদীর যত্ন নেয়ার জন্য  গ্রামে ফিরে যান। পাহাড়ি গ্রামের এই বাড়ি, ক্ষেতখামার দাদীর হাতেই গড়া। তারপর তিনি তার দৈনন্দিন কাজগুলোই ভিডিও রেকর্ড করতে শুরু করেন। শুরুর দিকে ভিডিওগুলো একাই ধারণ করতেন। তবে এখন একজন সহকারী ও একজন ভিডিওগ্রাফার তার সঙ্গে কাজ করেন। 

বিরল এক সাক্ষাৎকারে লি বলেছিলেন, শহরের মানুষগুলোর খাবার কোথা থেকে আসে আমি কেবল সেটাই জানাতে চাই।

যদিও অনেক দেশেই এখন এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অনেক শহরেই এখন আর গ্রাম থেকে মানুষের খাবারের জোগান দেয়া হয় না। শহরের কারখানাতেই খাবার তৈরি হয়।

লি জিকি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ার সেই ব্যবস্থার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। তার এই মুহূর্তের ভিডিওগুলোর শক্তিশালী ফ্যান্টাসি হলো- মানুষ নিজের খাবার নিজেই তৈরি করে ও রান্না করে, কোনো কিছু নষ্ট করে না এবং তার চারপাশে যা আছে- তার চেয়ে বেশি কিছুই প্রয়োজন হয় না। আর হোম কোয়ারেন্টিনে এ শিক্ষাটাই জরুরি।

তেজাল রাও, রেস্তোরাঁর সমালোচক ও নিউইয়র্ক টাইমস কলামিস্ট

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন