বুধবার | জুলাই ১৫, ২০২০ | ৩১ আষাঢ় ১৪২৭

খবর

হেলিনের আত্মাহুতি, রাষ্ট্রের পতন ও সমাজের উত্থান

ইরফানুর রহমান রাফিন

হেলিন ওলিক ২৮৮ দিন আমরণ অনশনে ছিলেন। তারপর মারা গেছেন। এটা নিছকই কোনো মৃত্যু নয়, একটি হত্যাকাণ্ড।

হত্যাকাণ্ডের দায় তুরস্ক সরকারকে নিতে হবে। হেলিনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তার ব্যান্ড ইয়োরামকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, ব্যান্ডের সদস্যদের ওপর ভয়ানক জুলুম-নিপীড়ন চালানো হয়েছিল। স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন এই তুর্কি সংগীতশিল্পী।

পৃথিবী করোনা ক্রাইসিসের কারণে এতটাই আতঙ্কে আছে যে তার এই অসামান্য আত্মাহুতির মূল্যটা বুঝতে পারছে না। সংকটের সময় অনেকের সংবেদনশীলতাই দুঃখজনকভাবে কমে যায়। তাই স্বাভাবিক সময়ে যারা সংবেদনশীল আচরণ করেন, তারাও সময়ে অসংবেদনশীল আচরণ করেন, হয়তো সেটা পরিস্থিতির চাপেই।

হেলিনকে কী বলা উচিত, কমরেড নাকি বন্ধু? কমরেড আর বন্ধুতে কোনো যান্ত্রিক বিভাজন আছে? থাকা কি উচিত?

কমরেডশিপকে ব্যক্তিসম্পর্কের বাইরে একটা কালেকটিভিজমের জায়গা থেকে দেখলে টোটালিটারিয়ানিজমের বিপদ তৈরি হয়, যার শেষ গন্তব্য লুবিয়ানকা কারাগার বা আউশভিত্জ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। ব্যক্তি নিশ্চয়ই তার সমাজ সমষ্টির অংশ, কথিত ইনডিভিজুয়ালিজম একটি লিবারাল মিথ মাত্র; যা বিশ্বজুড়েই ভেঙে পড়ছে। কিন্তু মানবিক অনুভূতির জায়গা থেকে বিবেচনা করলে ব্যক্তির একটা গুরুত্ব আছে, যা বন্ধু শব্দটা যতটা ধারণ করতে পারে, কমরেড শব্দটা ততটা পারে না।

রোজাভান কুর্দিরা বিষয়টা বুঝেছে। তাই তারা তাদের কমরেডদের হেভাল ডাকে। হেভাল কুর্দি শব্দ, এর অর্থ বন্ধু।

আমিও তাই হেলিন ওলিককে বন্ধু ডাকার পক্ষপাতী। কমরেড মানে বন্ধুই। রাজনীতি মানবিকতার বাইরের কোনো যান্ত্রিক ব্যাপার নয়।

যে শিক্ষাটা বন্ধু হেলিন আমাদের দিয়ে গেলেন, সেটা হচ্ছেআমরা কেউ একা নই। মানে অস্তিত্ববাদী নিঃসঙ্গতার অর্থে সব মানুষই একা। কিন্তু সামাজিক অর্থে আমরা কেউ একা নই।

নইলে তিনি ইয়োরামের জন্য জীবন দিতেন না। বন্ধুদের জন্য, স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতেন না। গা বাঁচিয়ে চলতেন।

তবে জীবন দেয়াটাকে অতিমহিমান্বিত করারও কিছু নেই। হেলিনের অনুভূতিটা মূল্যবান, সেটা প্রকাশের ভঙ্গিটা না। ভিন্ন প্রকাশভঙ্গিও গ্রহণযোগ্য।

বেঁচে থেকেও মানুষের জন্য কাজ করা যায়।

বাংলাদেশে সেই কাজ সবচেয়ে কম করছে রাষ্ট্র। অবশ্য রাষ্ট্র একটি প্রাণহীন প্রতিষ্ঠান, সে মানুষের পক্ষে ঠিক ততটুকুই কাজ করে যতটুকু সমাজের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে থাকে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র যেহেতু ঐতিহাসিকভাবেই পুঁজিবাদের প্রান্তে অবস্থান করে, তাই রাষ্ট্র হিসেবেও কেন্দ্রস্থ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় এটা আরো পেছনের, এর ওপর সমাজের কোনো গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে।

সরকার তিন মাস সময় পেয়েছিল করোনা মোকাবেলায়। তখন তারা দলীয় কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আর মানুষকে স্রেফ ঘরে থাকার আর হাত ধোয়ার পরামর্শ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছিল।

তারপর দেখা গেল প্রয়োজনীয় সুরক্ষা পোশাক নেই, টেস্টিং কিট নেই, ডাক্তার আর নার্সদের প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেই। সারা দেশে সর্দি-কাশি জ্বরে বেঘোরে মারা পড়ছে মানুষ। যেই শ্রমজীবী মানুষেরা দিন আনে দিন খায়, যাদের ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই, তারা পড়ল সবচেয়ে বিপদে।

রাষ্ট্র প্রণোদনা দিল অতিমুনাফালোভী তৈরি পোশাক মালিকদের। শ্রমজীবীদের আগেই দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল, এবার তাদের কড়া রোদের মধ্যেই হাঁটিয়ে নিয়ে আসা হলো রাজধানীতে। এসে শুনল গার্মেন্ট বন্ধ থাকবে, কাজ নেই। উচিত ছিল শ্রমজীবী মানুষকে খাবার-পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার কাজে পুলিশ-আর্মিকে ব্যবহার করা। অথচ দেখা গেল মাস্ক না পরার মতো একটা ফালতু গ্রাউন্ডে এরা কিছু অসহায় শ্রমজীবী মানুষকে ধরে পেটাচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা মানুষকে কানে ধরিয়ে ছবি তুলছেন। দেশের মানুষ কি মার খেতে আর চরম অমর্যাদার শিকার হতে ট্যাক্স দেয়? রেস্তোরাঁয় খাবার খাওয়ার সময় আর দোকান থেকে পণ্য কেনার সময় পাই পয়সা গুনে ভ্যাট দেয়?

কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হলে একটা রাষ্ট্র রকম হয়? এটা কি আদৌ একটা স্বাধীন দেশ? এই স্বাধীনতার অর্থ কী?

ধরনের পরিস্থিতিতে সমাজকেই সক্রিয় হতে হয়। অস্তিত্ব টেকানোর জন্য। সীমিত আকারে হলেও সেই চেষ্টা শুরু হয়েছে।

দেশে ত্রাণকার্য যা চলছে, অধিকাংশই সামাজিক উদ্যোগে। বিদ্যানন্দ বা আমাদের পাঠশালার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে; গণসংহতি আন্দোলন, রাষ্ট্রচিন্তা আর মুক্তিফোরামের মতো রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগে। তারা শ্রমজীবীদের কাছে খাবার-পানি পৌঁছে দিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খানের আহ্বানে গঠিত হওয়া করোনাদুর্গত সহযোগিতা কেন্দ্র দিন-রাত কাজ করে চলেছে। দেশ-বিদেশ থেকে বহু মানুষ অর্থসাহায্য পাঠিয়ে চলেছে। স্বেচ্ছাসেবীরা মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা পোশাক প্রদান করা শ্রমজীবীদের খাবার-পানি পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন।

পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল, শিক্ষক-গবেষক আর অ্যাকটিভিস্টরা মানুষের পক্ষে মাঠের কাজের পাশাপাশি তাদের কলমও চালাচ্ছেন। হোক সে পত্রিকার পাতায় বা অনলাইন পরিসরে। লিখে যাচ্ছেন আনু মুহাম্মদ, জিয়া হাসান, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, তাসলিমা আখতার, ফিরোজ আহমেদ, ফারুক ওয়াসিফ, মোশাহিদা সুলতানা ঋতু, মাহা মির্জা, পারভেজ আলম, বখতিয়ার আহমেদ, সারোয়ার তুষারসহ আরো অনেকেই। তাদের চিন্তা তত্পরতায় বহু অমিল আছে, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে সেটা অস্বাভাবিকও নয়। কিন্তু এদের মধ্যে একটা জায়গায় মিল আছে। আর তা হলো, তারা শাসক বা অতিধনীদের সহযোগী নন; তারা রাষ্ট্রের কাছে তাদের আত্মা বেচেননি। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পক্ষপাত সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি।

এসব সামাজিক উদ্যোগ, বলাই বাহুল্য, যথেষ্ট নয়। উপনিবেশিক আমল থেকেই এখানে সমাজকে যত বেশি কোণঠাসা করা হয়েছে, ঠিক তত বেশি দানবিক হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র। সেই পরাধীনতার জোয়াল আমরা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি।

শ্রমজীবী মানুষের ভাত-কাপড়ের দায়িত্বটুকু রাষ্ট্রেরই নেয়া উচিত। কেন্দ্রস্থ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো পর্যন্ত না যাই, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের কেরালা আর পশ্চিমবঙ্গেই রাজ্য সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই তত্পরতা দেখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্র নেয়ার বেলায় আছে, দেয়ার বেলায় নেই। তাই শাহবাগে ছোট্ট শিশু মাটিতে পড়ে থাকা চাল মুঠো করে জমাচ্ছে, ৭২ ঘণ্টা পানি খেয়ে কাটিয়েছে প্রান্তিক এলাকার এক হাড্ডিসার বৃদ্ধ, ত্রাণের গাড়ির পেছনে দৌড়াচ্ছে ক্ষুধার্ত মানুষএমন সব নারকীয় দৃশ্য তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে শুধু প্রাণহীন বললে কম হবে। এই রাষ্ট্র পুরোপুরি একটা পাষাণে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পতন ঠেকানো অসম্ভব মনে হচ্ছে। যেটা সম্ভব, সেটা হচ্ছে সমাজের উত্থান। আরো সক্রিয়ভাবে, ব্যাপকভাবে।

এই উত্থান নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করবে। এটা ওপর থেকে হুকুমদারি করার ব্যাপার নয়। তলা থেকে সংগঠিত হওয়ার ব্যাপার, সমাজের ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাপার, ফুলবাড়ীতে ঠিক যেমনটা ঘটেছিল।

আসল যুদ্ধটা শুরু হবে করোনা সংকটের পরে। রাষ্ট্রের শাসক আর অতিধনীদের বিরুদ্ধে। লড়াইটা সহজ হবে না।

আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে মিসরের এক মন্দিরগাত্রে ইব্রাহিমি দাসেরা লিখেছিল, অত্যাচারীর স্পর্ধা যদি পিরামিডের চূড়াও স্পর্শ করে, তার পতন হবেই। স্বাধীনতার চেয়ে প্রিয় কিছুই আর নেই মানুষের। হেলিন স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিলেন, অন্যরা লড়ছেন। এই লড়াইটা দীর্ঘ হবে এবং আমাদের এই লড়াইটা জিততে হবে।

একদিন এই দুঃখী দেশটা সত্যিই স্বাধীন হবে। সেই দেশের প্রাণকেন্দ্র হবে সমাজ। সেই বাংলাদেশ হবে বন্ধুত্বের বাংলাদেশ।

লেখক, গবেষক অনুবাদক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন