বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

প্রথম পাতা

বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের তীব্রতা থাকবে জুলাই পর্যন্ত

মেহেদী হাসান রাহাত

দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) পরিস্থিতি। এরই মধ্যে ১৮৩টি দেশ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৬৭ হাজার মানুষ। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশে দেশে চলছে লকডাউন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠন বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) পূর্বাভাস বলছে, সহসা পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছে না বিশ্ব। বিশ্বের প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোয় সংক্রমণের তীব্রতা বছরের জুলাই পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এদিকে বৈশ্বিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, রেমিট্যান্স, ভোগ্যপণ্য, আর্থিক খাত ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের (এলএসই) এক নিবন্ধে।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বের শীর্ষ ২০ অর্থনীতির দেশে লকডাউনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে সম্প্রতি একটি পূর্বাভাস দিয়েছে বিসিজি। বিশ্বে প্রতিদিন কভিড-১৯-এর নতুন কেস এবং মোট আক্রান্তের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পূর্বাভাস দিয়েছে তারা। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য।

বিসিজির বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে করোনা সংক্রমণ মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। এখনো পুরোপুরি লকডাউন শুরু না হলেও স্বল্পমেয়াদে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে এবং দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত দেশটিতে লকডাউন থাকতে পারে। জার্মানিতে সংক্রমণ মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। দেশটিতে স্বল্পমেয়াদে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ আর দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত লকডাউন স্থায়ী হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিসিজি।

আর যুক্তরাজ্যে করোনা সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে। আর দেশটিতে স্বল্পমেয়াদে লকডাউন থাকতে পারে জুনের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত, যা দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের চতুর্থ সপ্তাহে গড়াতে পারে। ফ্রান্সে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে সংক্রমণ। স্বল্পমেয়াদে লকডাউন থাকতে পারে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ আর দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে এরই মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে স্পেন ইতালি। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়া হালনাগাদ তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত ইতালিতে ১৫ হাজার ৩৬৫ স্পেনে ১২ হাজার ৪১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে বিসিজির পূর্বাভাস বলছে, এটিই শেষ নয়। স্পেনে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে এপ্রিলের চতুর্থ সপ্তাহে। আর স্বল্পমেয়াদে লকডাউন থাকতে পারে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত, যা দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে গড়াতে পারে। ইতালিতে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। দেশটিতে স্বল্পমেয়াদে লকডাউন থাকতে পারে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। দীর্ঘমেয়াদে দেশটিতে লকডাউন অব্যাহত থাকতে পারে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত।

কানাডায় মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। দেশটিতে স্বল্পমেয়াদে জুনের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত লকডাউন থাকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে যা থাকতে পারে জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। বেলজিয়ামে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। দেশটিতে স্বল্পমেয়াদে লকডাউন বলবৎ থাকতে পারে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত, আর দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের চতুর্থ সপ্তাহে।

ভারতের বিষয়ে বিসিজির বিশ্লেষণ বলছে, দেশটিতে জুনের তৃতীয় সপ্তাহে সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। স্বল্পমেয়াদে লকডাউন থাকতে পারে জুনের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত, দীর্ঘমেয়াদে যা সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

দেশের মোট রফতানির প্রায় ৬৪ শতাংশই হয় যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, কানাডা বেলজিয়ামে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এসব দেশের করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নভেল করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবে বিষয়টি সংকট কতদিন স্থায়ী হতে পারে তার ওপর নির্ভর করবে বলে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের এক নিবন্ধে উঠে এসেছে।

এলএসইর ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, সংকটের স্থায়িত্ব বেশি হলে তৈরি পোশাক রফতানি রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। তৈরি পোশাক খাতের বিষয়ে বলা হয়েছে, নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে ইউরোপ আমেরিকার প্রধান ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ বাতিল কিংবা স্থগিত করছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি পোশাক খাতের রফতানিও স্থবির হয়ে পড়বে। তাছাড়া ২০০৮ সালের মন্দার সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণে দেখা যায় বাংলাদেশেও সে সময় প্রবৃদ্ধির পরিমাণ কমেছিল। যদিও তা ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় কম নেতিবাচক ছিল।

বাংলাদেশের সিংহভাগ রেমিট্যান্সই আসে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য মালয়েশিয়া থেকে। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী লকডাউন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকায় প্রবাসী বাংলাদেশীরাও কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফলে করোনা সংকট দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্সের পরিমাণও কমে যাবে। এরই মধ্যে মার্চে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, আমাদের তৈরি পোশাক রফতানির ৬৫ শতাংশ আসে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে। আর বর্তমানে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে ইউরোপের দেশগুলো ভয়াবহ সংকটের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাও ভালো নয়। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক রফতানি হয়। আমাদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যত দুর্যোগই আসুক না কেন আমরা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারি। তাই প্রধানমন্ত্রী সবার জন্য যে প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছেন সবাই মিলে সমন্বিতভাবে সেটি কাজে লাগিয়ে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব বলে আশা করছি।

দেশে কয়েক মাস ধরেই বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমছে। তৈরি পোশাক খাতে বড় আকারের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে যাওয়ার কারণে খাতে খেলাপি ঋণ বাড়তে পারে। তাছাড়া অধিকাংশ শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকায় ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ আরো বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান . আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিশ্বের প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোতে করোনা সংকট দীর্ঘায়িত হলে স্বাভাবিকভাবেই দেশের তৈরি পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তৈরি পোশাক খাত সমস্যায় পড়লে ব্যাংকগুলোও এক্ষেত্রে সমস্যায় পড়বে। তবে আশার কথা হলো সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সংকট কাটাতে সেটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে সংকট অনেকাংশে লাঘব হবে।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দেশব্যাপী লকডাউন থাকায় এরই মধ্যে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আয় সীমিত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিক শহর থেকে গ্রামে চলে গেছেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। সংক্রমণ রোধে পহেলা বৈশাখের আয়োজনও স্থগিত হয়ে গেছে। ফলে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর অর্থনীতিতে যে মূল্য সংযোজন হয়ে থাকে বছর সেটিও হচ্ছে না। সংকটের শুরু থেকেই স্থবির হয়ে গেছে পর্যটন এভিয়েশন খাত। প্রতি বছরই দেশে রমজান ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে বড় ধরনের অর্থপ্রবাহ হয়ে থাকে। করোনা সংকট দীর্ঘায়িত হলে বছরের ঈদুল ফিতর হয়তো মানুষকে ঘরে থেকেই কাটাতে হতে পারে। সব মিলিয়ে অর্থনীতি কর্মজীবী মানুষ চাপে থাকায় একেবারে মৌলিক খাদ্যদ্রব্য বাদে অন্যান্য পণ্যের ভোগের হার কমে যাবে।

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সময়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা স্টার্টআপ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যবসার প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করাটা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যায়। অর্থনীতি চাঙ্গা থাকার সময়েও ঝুঁকির কারণে অনেকে স্টার্টআপে বিনিয়োগ করতে চায় না। ফলে সংকটকালে স্টার্টআপের জন্য তহবিল জোগাড় করাটা আরো দুষ্কর। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসা। সংকট যত দীর্ঘ হবে ক্ষতির পরিমাণ ততই বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন