শুক্রবার | জুন ০৫, ২০২০ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

টকিজ

সুনসান নীরবতা ঢাকার আর্ট গ্যালারিগুলোয়

আর্থিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ফ্রিল্যান্স আর্টিস্টরা

রাইসা জান্নাত

দেয়ালজুড়ে রঙিন বিচিত্র সব ছবি। তার সামনে ভাবুক চোখে ঠায় দাঁড়িয়ে কিছু দর্শক। কেউবা দেয়ালের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ঘুরে ঘুরে দেখছেন। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছেন শিল্পী। তাকে ঘিরে হালকা জটলা। চলছে শিল্পী আর দর্শকের মাঝে কথোপকথন। কথার ফাঁকে শিল্পীর সঙ্গে সেলফি তুলতেও ভুলছেন না কেউ কেউ।

বেশ কিছুদিন আগেও রাজধানীর গ্যালারিগুলোর দৃশ্য ছিল খানিকটা রকমই। কিন্তু এখন বদলে গেছে সেই দৃশ্যপট। দেয়ালজুড়ে এখন কেবলই শূন্যতা, যার কারণ নভেল করোনাভাইরাস। মহামারী ভাইরাসের ছোবল পড়েছে দেশের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে, যার প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি চিত্র প্রদর্শনীর গ্যালারিগুলোও। নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেয়া হয় বিভিন্ন প্রদর্শনী। সেই সঙ্গে বন্ধ রাখা হয়েছে গ্যালারিগুলোও।


বিষয়ে কথা হয় শিল্পী কলাকেন্দ্র আর্ট গ্যালারির কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমানের সঙ্গে। তিনি টকিজকে বলেন, সারা বিশ্বে কী ঘটছে তা নিয়ে আমাদের এক ধরনের পর্যবেক্ষণ ছিল। দেশে করোনার প্রভাব পড়ার পর বেশকিছু অনুষ্ঠান চললেও আমরা খুব দ্রুত কলাকেন্দ্র বন্ধ করে দিই। লাইফ ইজ মোর ইন্টারেস্টিং দ্যান আর্ট, স্টে হোম অ্যান্ড সেফনোটিস দিয়ে গ্যালারির কর্মকাণ্ড স্থগিত রাখি। সে সময় এটাই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল।

বছরজুড়েই গ্যালারিগুলোয় থাকে বিভিন্ন প্রদর্শনীর আয়োজন। চলমান সময়টায়ও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বিভিন্ন গ্যালারিতে অনেক চিত্র প্রদর্শনীর কথা ছিল। করোনার প্রভাব পড়ার আগেই বেঙ্গল আর্ট গ্যালারিতে প্রায় তিনটি প্রদর্শনী চলছিল। পরে নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই সেগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। কলাকেন্দ্রেই চলতি মাসে অটিজম নিয়ে একটি প্রদর্শনীর কথা ছিল বলে জানান ওয়াকিলুর রহমান। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু প্রোগ্রামের শিডিউল ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে সেগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে, তিনি বলেন।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছে বিভিন্ন ক্ষেত্র। গ্যালারি পরিচালকদেরও লোকসান গুনতে হচ্ছে এবং এর প্রভাব দীর্ঘ সময় থাকবে বলে মনে করছেন গ্যালারি-সংশ্লিষ্টরা। গ্যালারিতে অতিরিক্ত কিছু ব্যয় থাকে। যেগুলো বহন করতেই হয়। তাছাড়া রাতারাতি কোনো গ্যালারিই দাঁড় করানো সম্ভব না। ১৬ বছর ধরে কাজ করে একটি অবস্থানে এসেছি। আবার কবে একটি ফাংশনাল জায়গায় পৌঁছতে পারব, শিল্পকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারব তা অনিশ্চিত। কথাগুলো বলছিলেন চিত্রশিল্পী গ্যালারি কায়ার প্রতিষ্ঠাতা গৌতম চক্রবর্তী।


তবে করোনার প্রভাবে গ্যালারি পরিচালকদের পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স আর্টিস্টরা আর্থিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ ধরনের শিল্পীরা অন্য কোনো পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন না। কেবল শিল্পচর্চা করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। কাজেই সামনে তাদের বড় ধরনের আর্থিক সমস্যার মুখে পড়তে হবে। বিষয়ে শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী বলেন, দেশে শিল্পের বাজার তেমন সমৃদ্ধ নয়। ফলে একজন শিল্পীর খুব বেশি ছবি বিক্রি হয় না। আর হলেও সেগুলো থেকে মোটা অংকের অর্থ আয় হয়, তেমনটাও নয়। আর ফ্রিল্যান্স আর্টিস্টদের মধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছেন তরুণ। তাদের অনেকেরই হয়তো পরিবার রয়েছে। কাজেই তাদের জন্য জীবিকা নির্বাহ খুব কষ্টকর হয়ে যাবে।

শিল্পী গৌতম চক্রবর্তীর সঙ্গে একমত পোষণ করলেন ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট রুহুল আমিন তারেক। মার্চ থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত গ্যালারি কায়ায় তার টাইম অ্যান্ড রিয়ালিটি শীর্ষক একক চিত্র প্রদর্শনী চলছিল। শিল্পীর মতে, বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। আমরা ফ্রিল্যান্স আর্টিস্টরাও তার থেকে বাদ পড়ছি না। ছবি এঁকে অর্থনৈতিক সংস্থান করা অনেকটা কষ্টকর। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের শিল্পের বাজার ততটা সমৃদ্ধ নয়। খুব পরিচিত মানুষ ছাড়া ছবি কিনতে চায় না। তবে যেটুকু বাজার তৈরি হয়েছে, তা চলমান সংকটের কারণে সমস্যায় পড়েছে বলে মনে করছেন শিল্পী। গ্যালারি, প্রদর্শনী সব বন্ধ। এরই মধ্যে ফ্রিল্যান্স আর্টিস্টদের মাঝে অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে’—বলেন তিনি।

বিষয়ে কথা হয় আরেক ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট হাবিবা নওরোজের সঙ্গে। যিনি একজন ফটোগ্রাফার। তার ভাষ্য, দেশে কভিড-১৯-এর প্রভাব বেশি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবার মাঝেই উদ্বিগ্নতা তৈরি হয়। আর্টিস্টদের মধ্যেও তা-ই। রোহিঙ্গা শিশুদের নিয়ে আমাদের একটি প্রজেক্টের কথা ছিল। তাদেরকে ফটোগ্রাফি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া চলমান কিছু প্রজেক্টের কাজও বন্ধ রাখা হয়।

বিশ্বজুড়েই রকম পরিস্থিতি চলছে। কিন্তু আমাদের জন্য এটা একটু বেশি কষ্টদায়ক। কারণ ধরনের কাজের ওপর আমরা নির্ভর করি। এগুলো আমাদের আয়ের প্রধান উৎস’—তিনি যোগ করেন। আগামী দিনগুলোয় কী হবে তা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে এসব শিল্পীর মাঝে।

তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখে, আশায় বাঁচে। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন মত্যুর খবর, অর্থনৈতিক সংকট, ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকারসবকিছু যেন মানুষকে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত করে তুলছে। তাই মানসিক প্রশান্তি লাভে ঘরে বসেই শিল্পচর্চা করছেন অনেক শিল্পী। স্বপ্ন দেখছেন এক নতুন পৃথিবীর। আর ভাবছেন কীভাবে তাকে ফুটিয়ে তোলা যায় রঙ-তুলির আঁচড়ে।

একজন শিল্পীর কাজই হলো যেকোনো কিছুর মধ্যে নতুন কিছুর সন্ধান করা। এই মহামারীর কারণে মানুষ বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিশ্বায়ন, স্থানিক বাস্তবতা, যোগাযোগ, পরিবহন সবকিছু নিয়ে এক ধরনের নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে। নতুন এই অভিজ্ঞতাকে শিল্পচর্চার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার ভাবনাও কাজ করছে শিল্পীমনে। কারণ অনেকেই মনে করছেন, তাদের ভাবার জন্য একটি বড় ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। যেগুলো নিয়ে পরবর্তীতে অনেক কাজ হতে পারে।

আবার অনেক শিল্পীই প্রদর্শনীর স্পেস হিসেবে বেছে নিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে। ফেসবুককে ব্যবহার করছেন আর্ট স্পেস হিসেবে। যেসব শিল্পী ফেসবুককেন্দ্রিক এই প্রদর্শনী বন্ধ রেখেছিলেন, তারাও যেন নতুন করে আবার শুরু করেছেন। সময়ে কমিউনিটিকে কীভাবে আর্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়, তা নিয়েও চলছে নানান জল্পনা-কল্পনা। তবে সময়েই হয়তো বাতলে দেবে সঠিক পথ। অপেক্ষাই যেন এখন ভরসা শিল্পী গ্যালারি পরিচালকদের।

 

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন