রবিবার | মে ৩১, ২০২০ | ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

শেষ পাতা

পোশাক কারখানা ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ রাখার অনুরোধ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯-এর ব্যাপকতা ক্রমেই বাড়ছে। ধীরগতিতে হলেও ধারা অব্যাহত রয়েছে বাংলাদেশেও। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বঘোষিত সাধারণ ছুটি ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বর্ধিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পোশাক খাতের শিল্প মালিকদের প্রতি ওইদিন পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) পক্ষ থেকেও। এর আগে শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার সর্বোচ্চ মাত্রা নিশ্চিত করা সাপেক্ষে আজ থেকে কারখানা চালু করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন খাতসংশ্লিষ্ট কারখানা মালিকরা।

বিজিএমইএ সভাপতি . রুবানা হক গতকাল রাতে গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখার জন্য সব কারখানা মালিক ভাই বোনদের বিনীত অনুরাধ জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, এখানে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের কল-কারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর যে সার্কুলার দিয়েছিল, সেখানে স্পষ্ট করে লেখা আছে, যেসব রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ আছে এবং যারা পিপিই বানাচ্ছেন, সেসব কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা সাপেক্ষে শিল্প-কলকারখানা চালু রাখতে পারবেন। কাজেই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি হলো কীভাবে আমরা আমাদের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা দেব। দ্বিতীয় যে জায়গাটিতে আমরা একেবারেই স্পষ্ট, সেটি হলো মার্চের বেতন নিয়ে কোনো ধরনের অনীহা বা অনাগ্রহের কোনো অবকাশ নেই। মার্চের বেতন আমাদের শ্রমিকরা পাবেনই, এটি আমি নিশ্চিত করতে চাই। যত কষ্ট হোক, আমরা আমাদের শ্রমিকদের মার্চের বেতন দেব।

রুবানা হক বলেন, তৃতীয় বিষয়টি হলো শ্রমিক যদি কোনো সংগত কারণে কারখানায় উপস্থিত না থাকেন, তাহলে মানবিক বিবেচনায় তিনি চাকরিটি যেন না হারান। বিষয়ে আমি আমাদের প্রত্যেক সদস্যের কাছে অনুরোধ করব। আমি আশা করি, বিশ্বাস করি, শিল্প খাত; যেটি অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখে; সে খাতের মালিকরা অন্তত উপস্থিতির কারণে শ্রমিকরা যেন চাকরি না হারান, সে বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। আমি আশা করি, তারা অনুরোধ শুনবেন এবং রাখবেন।

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলার লক্ষ্যে দেশের পোশাক কারখানাগুলোর ৮০ শতাংশই গতকাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল। কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব ছড়ানোর ঝুঁকি থাকলেও পোশাক খাতের কারখানাগুলো আজ থেকে সচল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন সংশ্লিষ্ট শিল্প মালিকরা।

বিজিএমইএর মতো কারখানা বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে দেশের নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পক্ষ থেকেও। বিষয়ে বিকেএমইএ প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পোশাক শিল্প মালিকদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, যদি আপনাদের সুযোগ থাকে, তাহলে সরকার যেহেতু ছুটি এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িয়েছে, আপনারাও শ্রম আইনের ধারা উল্লেখ করে লে-অফ হোক বা অন্য কোনোভাবে হোক, ছুটি ১০ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত এক্সটেনশন বা বাড়িয়ে নিতে পারেন। তাহলে আমাদের বিশ্বাস, নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে কিছুটা হলেও আপনারা নিরাপদ থাকবেন।

বিকেএমইএ প্রতিনিধিরা বলছেন, পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ছিল না। পরে কল-কারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে যে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছিল, সেখানেও জরুরি প্রয়োজনে পোশাক শিল্প-কারখানাগুলো খোলা রাখার নির্দেশনা ছিল। বিকেএমইএ-বিজিএমইএর অবস্থানও শুরু থেকে এমনটাই ছিল। একপর্যায়ে বিকেএমইএ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলেও জরুরি প্রয়োজনে কারখানা খোলা রাখার কথা বলা হয়েছিল। সময় কারখানা বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের তাদের নিজ নিজ স্থানে অবস্থান করতে বলা হয়েছিল। তাদের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। কারণ বিকেএমইএ চায় না, কোনো অবস্থায়ই কভিড-১৯ মহামারী ছড়িয়ে পড়ুক।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, যে কয়দিন কারখানা চালু রাখা হয়েছিল, সে কয়দিনও যথাসম্ভব নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েই চালু রাখা হয়েছিল। একই সঙ্গে সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

আশুলিয়া ছাড়া দেশের শিল্প অধ্যুষিত সব এলাকায়ই গতকাল বেশির ভাগ পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। শিল্প অধ্যুষিত আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ খুলনায় বিজিএমইএ-বিকেএমইএর সদস্য মোট পোশাক কারখানা রয়েছে হাজার ২৮টি। এর মধ্যে গতকাল বন্ধ কারখানার সংখ্যা ছিল হাজার ৪২৬। অর্থাৎ দেশের শিল্প এলাকাগুলোয় গতকাল মোট ৬০২টি বা ২০ শতাংশ কারখানা সচল ছিল।

চালু এসব কারখানার অধিকাংশই দেশের শিল্প অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম সক্রিয় অঞ্চল আশুলিয়ায় অবস্থিত। এলাকাটিতে বিজিএমইএ বিকেএমইএর সদস্য পোশাক কারখানা আছে ৫০৬টি। এর মধ্যে গতকাল খোলা ছিল ৪৬৭টি, বন্ধ ছিল মাত্র ৩৯টি।

গতকাল আশুলিয়া এলাকার বড় প্রায় অর্ধশত পোশাক কারখানার মালিকরা একটি সভায় মিলিত হন। সেখানে তারা আশুলিয়া এলাকার পোশাক কারখানা সচল বা বন্ধ রাখাসহ বেশকিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাবেক বিজিএমইএ সভাপতি বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী।

সভার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আবদুস সালাম মুর্শেদী বণিক বার্তাকে বলেন, আশুলিয়া এলাকাটা সবচেয়ে বড় শিল্প অঞ্চল। এলাকায় ছোট-বড় অনেক কারখানা আছে। এলাকার শ্রমিকের বিষয়ে সব সিদ্ধান্তে যেন ইউনিফর্মিটি থাকে, সেজন্য আমরা সভা করেছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সাপেক্ষে আগামীকাল (আজ) থেকে আশুলিয়ার কারখানা খোলা থাকবে। কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই করা যাবে না। 

১১ এপ্রিল পর্যন্ত যেহেতু সাধারণ ছুটি আছে তাই ১২ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে শ্রমিকদের মার্চের বেতন অবশ্যই পরিশোধ করা হবে।   

এদিকে রাত ১২ টা ৩ মিনিটে বিকেএমইএ প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গণমাধ্যম কর্মীদেরকে জানান। এ সময় তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সবার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের ছুটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিকেএমইএ’র সদস্য প্রতিষ্ঠান সমূহ আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, দেশের শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় পোশাক খাতের পাশাপাশি বস্ত্র, চামড়া চামড়াজাত শিল্প-কারখানা, ফার্নিচার, সেলফোন হ্যান্ডসেট সংযোজন, ওষুধসহ আরো বেশকিছু খাতের শিল্প-কারখানা রয়েছে। দেশের ছয়টি শিল্প এলাকায় মোট শিল্প-কারখানা আছে হাজার ৬০২টি। এর মধ্যে গতকাল সচল ছিল হাজার ৭৮১টি। বন্ধ ছিল হাজার ৮২১টি কারখানা। 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন