মঙ্গলবার | জুন ০২, ২০২০ | ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

শেষ পাতা

বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলা

জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থ দিচ্ছে জাতিসংঘ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় জাতীয় প্রস্তুতি সাড়া প্রদান পরিকল্পনা বা কান্ট্রি প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স প্ল্যানের আওতায় প্রায় ৩০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য চাহিদা প্রাক্কলন করা হয়েছে। সরকারের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগে তৈরি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি তহবিল গঠনে সহায়তা দেবে জাতিসংঘ।

চাহিদার প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামসহ অন্যান্য খাতে ২৯ কোটি ৭৯ লাখ ৬৭ হাজার ৪৭৯ ডলারের পরিকল্পনা দেয়া হয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জামসহ অন্যান্য উপকরণকে পরিকল্পনায় ছয়টি খাতে ভাগ করে দেখানো হয়েছে। মোট ১২৫ ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জামসহ অন্যান্য উপকরণ সচেতনতামূলক প্রচারণায় অর্থ ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। এসব উপকরণের মধ্যে ৪৩টি জরুরি প্রয়োজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, বাংলাদেশে ভাইরাসটির বিস্তার রোধে ব্যবস্থা না নেয়া হলে মহামারী আকারে বিস্তার ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সৃষ্ট রোগ কভিড-১৯ রোধে বাংলাদেশ সরকার যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তার সঙ্গে জাতিসংঘ পুরোপুরি একমত। এক্ষেত্রে সংস্থাটি বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে।

সমন্বিত পর্যালোচনার মাধ্যমে চাহিদার প্রাক্কলন করা হয়েছে বলে জানান ঢাকাস্থ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচওকমিউনিকেশনঅ্যান্ড মিডিয়া রিলেশনস ক্যাটালিন বেরকারু। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কভিড-১৯ মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের চেষ্টাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী এরই মধ্যে অর্থ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে এতে অংশ নিয়েছে। প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় সামনের দিনগুলোতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। এছাড়া চাহিদার যতটুকু সম্ভব তা পূরণে আন্তর্জাতিক অংশীদারগুলো সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে।

এদিকে জাতিসংঘ ঢাকা কার্যালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, জাতীয় প্রস্তুতি সাড়া প্রদান পরিকল্পনা হলো একটি পরিকল্পনার নথি, যা যৌথভাবে জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, বেশকিছু সুশীল সমাজের অংশীদার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় প্রস্তুত করা হয়েছে। ডব্লিউএইচওর বৈশ্বিক নির্দেশনার সঙ্গে সংগতি রেখে প্রস্তুত করা নথির উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ মহামারীর প্রেক্ষাপটে সরকারের সাড়া প্রদানে সহায়তা করতে জাতিসংঘের সংস্থা অংশীদারদের কার্যকরভাবে প্রস্তুত করা।

বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ, সুশীল সমাজ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বে অতি দ্রুততার সঙ্গে বেশকিছু ব্যবস্থা নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিন আইসোলেশন, ভাইরাসটির ঝুঁকির ব্যাপারে ব্যাপকভাবে অবহিত করা, সামাজিক দূরত্ব (সোস্যাল ডিসট্যান্সিং), সামাজিকসুরক্ষা (সোস্যাল প্রটেকশন) এবং বিদ্যালয় জনসমাগম হয় এমন স্থানগুলো বন্ধ করে দেয়া। বৈশ্বিক স্বীকৃত মডেলিং পদ্ধতির দ্বারা নথিটি পরিচালিত।

ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়া রোধ করার জন্য অতি দ্রুত কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে তা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আমরা সবাইকে এসব ব্যবস্থা মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছি। এর ফলে সরকার জাতিসংঘের সংস্থা, সুশীল সমাজ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশব্যাপী স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরো জোরদার করার জন্য বেশকিছুটা সময় পাবে এবং তার ফলে বাংলাদেশ সরকারকে মহামারীকে দমন করতে সহযোগিতা করতে পারবে।

জাতীয় প্রস্তুতি সাড়া প্রদান পরিকল্পনায় সবচেয়েবেশি ব্যয় ধরা হয়েছে লজিস্টিক অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট খাতে। খাতের ৩৪ ধরনের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন পড়বে ২৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪৭ হাজার ১০ ডলার। আর ৩৪টি চাহিদার মধ্যে ১৮টি চাহিদাকে জরুরি প্রয়োজনীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় তথ্য অবাধ করতে অংশগ্রহণমূলক পোর্টালের জন্য লাখ ডলার, পরীক্ষাগারে চোখের সুরক্ষার জন্য ২৯ লাখ ২০ হাজার ৫০০ ডলার, স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের জন্য চশমা ক্রয়ে কোটি ৯০ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪০ ডলার, হাতের জীবাণুনাশক স্প্রের জন্য লাখ ১৮ হাজার ২৮ ডলার, স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের হ্যান্ড স্যানিটাইজারের জন্য কোটি ৮৯ লাখ ৪৩ হাজার ৯৫৬ ডলার, থার্মোমিটার ক্রয়ে লাখ ১৫ হাজার ৫০০ ডলার, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আরএনএ এক্সট্রাক্টরের জন্য লাখ ২৫ হাজার ডলার, স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের মাস্কে কোটি ৩৩ লাখ ৭৮ হাজার ৫০০ ডলার, স্বাস্থ্যকর্মীদের এন৯৫ মাস্কে ১৪ লাখ ৮২ হাজার ৭৫০ ডলার, পরীক্ষাগারে কর্মীদের এন৯৫ মাস্কে লাখ ৮৫ হাজার ডলার, ২০টি পিসিআর মেশিন তার রক্ষণাবেক্ষণে ১২ লাখ ডলার, আইসোলেশন ইউনিটের জন্য পিপিই ক্রয়ে ৮৯ লাখ ৩২ হাজার ডলার, ওপিডিতে কর্মীদের জন্য পিপিই ক্রয়ে কোটি লাখ ডলারের জরুরি প্রয়োজনীয় চাহিদা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এছাড়া লজিস্টিক অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট খাতে জরুরি প্রয়োজনীয় চাহিদায় প্রথম মাসের বিকারক পরীক্ষাগারের সরঞ্জামে ২০ লাখ ডলার, ২০টি আরএনএ এক্সট্রাক্টর মেশিন ক্রয় রক্ষণাবেক্ষণে ৬০ হাজার ডলার, আইআর থার্মোমিটারে লাখ ৯৫ হাজার ডলার, ব্লিচ ক্রয়ে লাখ ৩২ হাজার ৫৭২ ডলার পরিষ্কারে লাখ ৬০ হাজার ডলার ধরা হয়েছে।

কেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফেকশন প্রিভেনশন কন্ট্রোল (আইপিসি) খাতে ৯২ লাখ ৬৯ হাজার ১৭ ডলার ধরা হয়েছে। খাতে ১৭টি প্রয়োজনের মধ্যে তিনটিকে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সব জেলার স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের আইপিসি, রোগী শনাক্তকরণ, আইসোলেশন এবং পিপিইর ব্যবহার নিয়ে প্রশিক্ষণে লাখ ৫১ হাজার ৭৬৪ ডলার ধরা হয়েছে। এছাড়া সব জেলায় আইসিইউর ডাক্তার অন্যান্য কর্মী এবং পালমোনোলজিস্ট সংকটপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রশিক্ষণেও লাখ ৫১ হাজার ৭৬৪ ডলার ধরা হয়েছে। আর ডাক্তার নার্সদের জটিল রোগী ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্যও লাখ ৫১ হাজার ৭৬৪ ডলার ধরা হয়েছে। তথ্য ব্যবস্থাপনায় লাখ হাজার ডলার ধরা হয়েছে। ১০টি প্রয়োজনে অর্থ খরচের পরিকল্পনা দেয়া হয়েছে।

ঝুঁকি সচেতনতা কমিউনিটিকে যুক্ত করার খাতে ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ডলারের চাহিদা ধরা হয়েছে। খাতের ২৮টি চাহিদার মধ্যে ৯টিকে জরুরি প্রয়োজনীয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। খাতে মূলত সচেতনতা বৃদ্ধি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা স্থাপন করা থেকে শুরু করে প্রচার প্রচারণার বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড ল্যাবরেটরি সহায়তা খাতে ১১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৫৪ ডলার প্রাক্কলন করা হয়েছে। ১৮টি চাহিদার মধ্যে সাতটিকে জরুরি প্রয়োজনীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। খাতে আন্তর্জাতিক মানের দুজন ল্যাবরেটরি বিশেষজ্ঞ নিয়োগসহ গবেষণা পরীক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আর সর্বশেষ কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং অ্যান্ড পয়েন্ট অব এন্ট্রি স্কিনিং খাতে ৭৯ লাখ ৮৮ হাজার ৮১৬ ডলার চাহিদা পরিকল্পনা করা হয়েছে। খাতের ১৮টি চাহিদার মধ্যে ছয়টিকে জরুরি প্রয়োজনীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন