রবিবার | মে ৩১, ২০২০ | ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

পণ্যবাজার

তিউনিসিয়ার অলিভ অময়ল

বাড়তি উৎপাদন কাল হয়েছে যে শিল্পের

বণিক বার্তা ডেস্ক

তিউনিসিয়ার অলিভ বা জলপাই চাষী মোহাম্মাদ সিদ অপেক্ষা করছেন সোনালি আলোর। তবে তার জীবনের অন্ধকার অলিভ উৎপাদনে মন্দা নিয়ে নয়, বরং উল্টো। শুধু তিউনিসিয়া নয়, গোটা বিশ্বে গত মৌসুমে পণ্যটির উৎপাদন এত বেড়েছে যে আন্তর্জাতিক বাজার উদ্বৃত্ত সরবরাহে সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে কৃষিপণ্যটির রেকর্ড দরপতন ঘটেছে। আর প্রধান কাঁচামালের এমন মূল্যহ্রাসে অলিভ অয়েলের দাম কমে তলানিতে ঠেকেছে। এতে তিউনিসিয়ার খাতসংশ্লিষ্টদের লোকসান এতটাই বেড়েছে যে জীবনযাপনের খরচ তোলাই দায় হয়ে পড়েছে। 

উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া। অলিভ অয়েলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশটির দৃঢ় পদচারণা। উন্নত মানের অলিভ অয়েল উৎপাদন রফতানিতে সেই প্রাচীনকাল থেকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়ে আসছে দেশটি। কৃষিপণ্যটি দেশটির ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে সম্প্রতি দেশটির অলিভ অয়েল শিল্পে নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা। 

তিউনিসিয়াতে গত মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে। মৌসুমজুড়ে প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত অলিভ উৎপাদনের জন্য কার্যকর। কারণে দেশটিতে অলিভের উৎপাদন অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে গেছে। বাড়তি উৎপাদনে অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যটির সরবরাহ বেড়ে গেছে। দাম কমেছে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি। 

মোহাম্মাদ সিদ জানান, অন্য মৌসুমে তার বাগানগুলোতে যে পরিমাণ অলিভ উৎপাদিত হয়, এবার তা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু অন্য মৌসুমের তুলনায় তার আয় কমে অর্ধেকে নেমেছে। এমনকি বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই তার কাছে। বিরক্ত হয়ে শেষমেশ তিনি কৃষিপণ্যটির বিক্রি বাড়াতে মূল্যছাড়ের ঘোষণা দেন। তাতেও খুব একটা সাড়া পাওয়া যায়নি। ছাড়কৃত মূল্যে তার কাছ থেকে অলিভ কেনেনি কেউ। 

তিউনিসিয়া মূলত অর্গানিক অলিভ অয়েল উৎপাদনের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় গুণগত মানের জন্য দেশটির অলিভ অয়েল শিল্প প্রচুর পুরস্কার অর্জন করেছে। তবে খাতে দেশটির প্রাপ্য সুখ্যাতি এখনো অসম্পূর্ণ বলে দাবি করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। 

দেশটির সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ওমর বাহি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যথাযথ সুনাম পাচ্ছে না তিউনিসিয়ার অলিভ অয়েল শিল্প। দেশটির মানসম্মত অলিভ অয়েল রফতানির অধিকাংশের গন্তব্য স্পেন ইতালিতে। এসব দেশ আমদানির পর অপেক্ষাকৃত নিচু মানের লোকাল অলিভ অয়েলের সঙ্গে মিশিয়ে পুনরায় তা আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করে, যা বিভিন্ন স্প্যানিশ বা ইতালিয়ান ব্র্যান্ডের নামে ভোক্তাদের হাতে পৌঁছে যায় এবং বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠে। ফলে তিউনিসিয়া তার প্রাপ্ত অর্জন থেকে ছিটকে পড়ে। 

গত বছর তিউনিসিয়ায় অলিভ অয়েলের উৎপাদন একলাফে দ্বিগুণ বেড়ে লাখ ৫০ হাজার টন ছাড়িয়েছে, যা স্পেনের পর দেশটিকে দ্বিতীয় শীর্ষ উৎপাদকে পরিণত করেছে। সঙ্গে রফতানিও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। তবে খাতটির এমন উল্লম্ফনে খুশি হতে পারছেন না খাতসংশ্লিষ্টরা। কারণ আগে থেকেই উদ্বৃত্ত সরবরাহে থাকা বাজারে পণ্যটির সরবরাহ আরো বেড়ে চাপ তৈরি করেছে দামে। ফলে উৎপাদন রফতানি বাড়িয়েও লোকসানে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। 

দেশটির ন্যাশনাল অলিভ অয়েল অফিসের প্রধান নির্বাহী চোকরি বায়ৌধ বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশটিতে প্রতি কেজি এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের দাম দাঁড়িয়েছে মাত্র ডলার ৫০ সেন্ট। এর প্রধান কারণ পণ্যটির প্রধান কাঁচামাল অলিভের ব্যাপক হারে দরপতন।

অলিভ অয়েলের রফতানি হ্রাস তিউনিসিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বড় বাধা হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। দেশটির অর্থনীতিতে পণ্যটির অবদান অনেক। তিউনিসিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি থেকে রফতানি হওয়া মোট কৃষিপণ্যের অর্ধেক হিস্যা থাকে অলিভ অয়েলের দখলে। এছাড়া প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে দেশটির মোট লাখ মানুষ শিল্পটির সঙ্গে জড়িত, যা দেশটির মোট শ্রমশক্তির প্রায় ১০ শতাংশ। 

প্রায় তিন হাজার বছর আগে ফিনিশীয়দের হাত ধরে তিউনিসিয়ায় অলিভের আবাদ শুরু হয়। এরপর ভূখণ্ডে অনেক সম্রাট এসেছেন আবার চলেও গেছেন। তবে অলিভ গাছ মিশে গেছে দেশটির অধিবাসীদের দৈনিক জীবনের সঙ্গে। হয়ে উঠেছে কৃষ্টি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তেলবীজটি চাষের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয় দেশটির অনেক শ্রমিকের জীবনের চক্র। কৃষিপণ্যটির ভালো ফলনের মানে অঞ্চলের অধিবাসীদের ধুমধাম বিয়ে, নতুন বাড়ি তৈরি বা পুরনো বাড়ি মেরামত করা। তবে মৌমুমে প্রয়োজনীয় ধার-দেনা শোধ করার টাকাও তুলতে সক্ষম হচ্ছেন না তারা। 

অভিল অয়েলের দুর্দশার জন্য অবশ্য তিউনিসিয়া একা দায়ী নয়। এর শুরুটা হয়েছে স্পেন থেকে। দেশটিতে গত মৌসুমে জলপাইয়ের ফলন এত বেড়ে গিয়েছিল যে চলতি মৌসুমের নতুন ফসল ওঠার পরও বাজারে তার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়ে গেছে, যা অলিভ অয়েলের দাম কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। 

পরিস্থিতিতে অলিভ অয়েল খাতে বিদ্যমান সংকট দূর করতে শীর্ষ গন্তব্য রফতানি বৃদ্ধিসহ নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি করার প্রতি তিউনিসিয়ার ব্যবসায়ীদের মনোযোগী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

 

এগ্রিমানি ওয়াশিংটন পোস্ট অবলম্বনে

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন