বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

অর্থনীতির সংকট: অগ্রাধিকার নির্ণয় প্রয়োজন

মনজুর হোসেন

গত বছরের ডিসেম্বরের দিকে চীনের উহান থেকে শুরু হওয়া করোনাভাইরাসের আক্রমণ আজ পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব দেশে হানা দিয়েছে। ধনী-দরিদ্র কোনো দেশ আর বাকি নেই। মহামারী নিরোধে উন্নত বিশ্বের রীতিমতো হাবুডুবু খাওয়া দেখে অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। তাদের অবস্থা অনেকটা আমাদের মতো অনুন্নত দেশের পর্যায় নেমে এসেছে। অর্থবিত্ত, এফিশিয়েন্ট সিস্টেম কিছুই ঠিকমতো কাজ করছে না। তারাও আজ অসহায় বোধ করছে। মহামারী ঠেকানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই এখন পর্যন্ত কার্যকরী পন্থা বলে চিকিৎসকরা বলছেন। পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশেও একটু দেরিতে হলেও বিভিন্ন কার্যক্রম নেয়া শুরু হয়েছে। তবে সেসব কার্যক্রম অগোছালো এবং অগ্রাধিকার নির্ণয়ে ঘাটতি রয়েছে। ধরনের মহামারী মোকাবেলায় স্বল্প, মধ্যম দীর্ঘমেয়াদি ক্রাইসিস রেসপন্স স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এর মধ্যে অর্থনীতির সংকট মোকাবেলার বিষয়ও থাকতে হবে। তবে সবকিছুরই অগ্রাধিকার নির্ণয় করতে হবে। মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি এক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা পালন করতে পারে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সংকট মোকাবেলা কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হবে বলে মনে করি। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বিভিন্ন প্রয়োজনের পরিমাণের একটি দ্রুত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন অবশ্যই একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করতে হবে। তার ভিত্তিতেই প্রণোদনা ঘোষণা করা যেতে পারে। আমার মতে স্বাস্থ্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতের প্রতি সর্বাগ্রে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

এক. আমাদের প্রথম প্রধান কাজ হলো স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বাড়ানো। চিকিৎসকদের জন্য পিপিইর সংস্থান, টেস্ট কিটের ব্যবস্থা করা, হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ স্থাপন ইত্যাদি। এখন পর্যন্ত মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি হাসপাতালকে প্রস্তুত করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। খাতে এখন সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। অনেকে অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতির হিসাবনিকাশ করছেন। কিন্তু আমি মনে করি, মুহূর্তে অর্থনীতির চেয়ে মানুষের জীবন বাঁচানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আগামী দুই মাস করোনা সংক্রমণের জন্য খুবই ভয়াবহ সময়। সময় মোকাবেলার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি প্রয়োজন। যেমন আরো অনেক বেশি পরিমাণ টেস্ট কিটের জোগানের ব্যবস্থা করা। বিশ্বব্যাপী টেস্ট কিটের অভাব রয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও টেস্ট কিটের সংকট তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত পদ্ধতি কতটুকু কাজ করে তা দেখার বিষয়। যদি পদ্ধতি সফল হয় তাহলে গণহারে করোনা টেস্ট শুরু করতে হবে এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রেও ধরনের একটি টেস্ট অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে, যার মাধ্যমে টেস্ট করতে ৪৫ মিনিট লাগবে। আমাদেরকে প্রস্তুতি নিতে হবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থার কথা চিন্তা করে। 

দুই. সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে আরো ব্যাপক হারে সহায়তা দিতে হবে। যাতে তারা লকডাউন অবস্থায় মোটামুটিভাবে জীবন যাপন করতে পারে। দরিদ্রদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার ঘোষণা এখনই আসা প্রয়োজন। যাতে তারা ঘরে থাকতে উৎসাহিত হয়। জনস্বাস্থ্য খাতের জন্য এখনই কয়েক হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। দেশের খাদ্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সরবরাহ চেইন সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। 

তিন. করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে প্রধান কাজ হবে অর্থনীতির কোন কোন খাত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার একটি মূল্যায়ন করা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে। এক্ষেত্রে রফতানি খাত থাকবে, পরিবহন খাত থাকবে, এভিয়েশন খাত থাকবে, ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প খাত থাকবে এবং আরো অন্যান্য খাত থাকবে। তবে যারা রফতানি খাতে ক্ষতির কথা বলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা নেয়ার ঘোষণা আদায় করেছেন, তারা বাস্তবতাকে লুকিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করেছেন বলেই বলব। এমনও তো হতে পারে প্রণোদনার অর্থ খাওয়ার মতো লোক বেঁচে না- থাকতে পারে। সর্বোপরি সরকারের কাছে আবেদন থাকবে অগ্রাধিকার নির্ধারণের জন্য।

গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা ঘোষণা একটু তাড়াহুড়ো করেই করা হলো বলে মনে হচ্ছে। সেক্টরের ওপর প্রভাব কতটুকু হবে তা যাচাই করার সময় এখনো আসেনি বলেই আমার মনে হয়। যেমন মুহূর্তে গার্মেন্ট সেক্টরকে প্রণোদনা দিলেই কি তাদের সংকট কেটে যাবে যদি ইউরোপ বা আমেরিকার অবস্থার উন্নতি না হয়? যদি সংকট আরো এক বছর চলতে থাকে তাহলে সমাধান কী হবে? এসব বিষয় না ভেবে তাড়াহুড়ো করে প্রণোদনা চাওয়া এবং তা দেয়া দুটোতেই অপেশাদারিত্ব রয়েছে। আমি আশা করেছিলাম মুহূর্তে ক্ষুদ্র ভাসমান ব্যবসায়ী, দিনমজুর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রণোদনা থাকবে। এদের অনেকেরই কোনো ব্যাংকিং অ্যাকসেস নেই, তাই ঋণের সুবিধা নেয়ারও সুযোগ তাদের নেই। সামনে বাজেট ঘোষণা করতে হবে। বছর রাজস্ব আয় আরো কম হবে। প্রণোদনা ঘোষণা করতে হলে আরো অর্থ লাগবে; তাই বাজেট সাপোর্টের বিষয় আমাদের মাথায় থাকতে হবে। বৈদেশিক সাহায্যেরও দরকার হবে। কিন্তু এসব বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে উল্লেখ না থাকায় কিছুটা হতাশ হয়েছি।

অর্থনীতির ওপর করোনার প্রভাব কী হবে তা নির্ভর করবে মহামারী কতদিন চলবে তার ওপর; বহির্বিশ্বের অর্থনীতির কী অবস্থা, দেশের ক্ষয়ক্ষতির কী অবস্থা তার ওপর। আমরা হয়তো একটি করোনা-পরবর্তী নতুন বিশ্ব দেখতে পাব। সে বিশ্বে দরিদ্র দেশগুলোর প্রতি ধনী দেশগুলোর মনোভাব আগের মতো না- থাকতে পারে। তাই কোনো কিছু তাড়াহুড়ো করে করা ঠীক হবে না।

ব্যক্তি খাতের অনেকেই সংকট মোকাবেলার জন্য যার যা সামর্থ্য আছে তা নিয়ে এগিয়ে আসছেন। ব্যক্তি খাতের অবদানকে সমন্বয় করা প্রয়োজন, যাতে তা আরো সুশৃঙ্খল হয়। কোনো একটি কমিটিও বিষয়ে কাজ করতে পারে। সর্বোপরি সরকারের পক্ষ থেকে ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে। প্রসঙ্গে বলতে চাই, দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী সংগঠন বিজিএমইএ বিকেএমইএর দুর্যোগের মুহূর্তে জনগণ চিকিৎসকদের পাশে মাস্ক, পিপিই নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। দুটো জিনিসই তৈরি করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। জনগণ সরকার দুই ব্যবসায়ী সংগঠনের পাশে থেকে তাদের খারাপ সময়ে সবসময়ই সহায়তা করেছে নগদ অর্থসহায়তা বা নীতিসহায়তা দেয়ার মাধ্যমে। তাদের সিএসআর কার্যক্রমের আওতায় তারা এটি করতে পারে। বাণিজ্যিকভাবেও তারা করতে পারে এবং বিদেশেও রফতানি করতে পারে। যদিও দু-একটি প্রতিষ্ঠান স্বল্প আকারে তা করছে, সবারই এক্ষেত্রে এগিয়ে আসা উচিত। এখনো ধরনের কোনো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিও একই ধরনের আহ্বান রইল।

লকডাউন বা ছুটি ঘোষণার ক্ষেত্রেও কিছুটা ভেবেচিন্তে ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সরকার ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। ১০ দিন পরে আবার কি সব চালু করে দেয়া যাবে? বিষয়টি নির্ভর করছে আমাদের এবং বৈশ্বিক অবস্থা কী হয় তার ওপর। আমার মনে হয় না যে এত তাড়াতাড়ি এই ছুটি তুলে দেয়ার মতো অবস্থায় আমরা থাকব। বরং বাসা থেকে কাজ করার একটা নির্দেশনা দেয়া যেতে পারত। ছুটি ঘোষণার পর পরই প্রায় সবাই ঢাকা ছেড়েছে। এতে একদিক থেকে ভালো হয়েছে যে ঢাকার ওপর চাপ কমেছে। কিন্তু খারাপ দিক হচ্ছে, তাদের মাধ্যমে করোনা সারা দেশে যদি ছড়িয়ে যায়। ঢাকাকে সহজে লকডাউন করা যেত। সারা দেশে ছড়ালে তা মোকাবেলা করা কঠিন হবে। তারা যদি আবার ঢাকায় আসে, ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা আরো বাড়বে। অন্যদিকে তাদের বাসায় থেকে কাজ করতেও বলা যাবে না। কারণ তারা ঢাকার বাইরে অবস্থান করছে। তাই বন্ধ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাস-ট্রেন সব বন্ধ করে দেয়া উচিত ছিল, যাতে কেউ বন্ধে ঢাকা ছেড়ে যেতে না পারে। বিষয়টি সম্পূর্ণ নতুন আমাদের জন্য। তাই আমরা বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখছি। এতে আরো ভাবনাচিন্তা করার সুযোগ রয়েছে। আমি গত দুই মাস জাপানে ছিলাম। সেখানে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ধরনের ক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক লকডাউন বা জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য সংসদে আইন পাস করিয়ে রেখেছেন, যাতে প্রয়োজন হলেই তা প্রয়োগ করতে পারেন। আমদেরও আইনের দিক থেকে কোনো ঘাটতি থাকলে তা পূরণের ব্যবস্থা দ্রুত করতে হবে।

জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে কিছু ব্যবস্থা নিয়েছি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য। আমি আমার কাজের বুয়া ড্রাইভারকে ছুটি দিয়েছি (পূর্ণবেতনে) পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছি। অনলাইনে পত্রিকা পড়ি। কোনো কিছুর দরকার হলে সীমিত আকারে আনানোর ব্যবস্থা করি। দরজার সামনে ডেলিভারি দিয়ে চলে যায়। সময় কাটে কিছুটা পেশাগত কাজ করে, টিভি মুভি দেখে, আর নামাজ পড়ে। সবাইকে আহ্বান জানাই ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। সাময়িক কষ্টের বিনিময়ে যদি আমরা সবাই ভালো থাকি, তা সবারই করা উচিত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিপদ থেকে রক্ষা করুন! আমাদের দেশকে রক্ষা করুন।

 

মনজুর হোসেন: বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষক অর্থনীতিবিদ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন