বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণে আইনের প্রয়োগ

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

চীনের উহান প্রদেশে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর থেকে সারা বিশ্ব বেশ লম্বা সময় পেয়েছিল এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য। ভাইরাসের ভয়াবহতা বুঝতে না পারার কারণে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে ইতালির জনগণকে। তার পরের অবস্থানে আছে স্পেন ফ্রান্স। হালে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের তালিকায় অবস্থান করছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায়  বেশি ঝুঁকিতে ছিল বা আছে। কেননা দেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, যাদের একটি বড় অংশ এরই মধ্যে দেশে ফিরেছেন। প্রবাসীদের একটি বড় অংশ যে দেশে ফিরবেন, এটা প্রত্যাশিত ছিল কিন্তু তাদের প্রত্যাগমনের পর যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা আক্রান্তদের চিকিৎসার কোনো প্রস্তুতি আগে থেকে নেয়া হয়নি। ফলে বিদেশ প্রত্যাগতদের আশকোনায় অবস্থিত হজ ক্যাম্পে রাখাসহ নানা অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। বিদেশ প্রত্যাগতদের সবাই করোনা আক্রান্ত হিসেবে ধরে নেয়ার ফলে তাদের প্রতি স্থানীয়দের বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে, যা খুবই অপ্রত্যাশিত অগ্রহণযোগ্য।

করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে আইইডিসিআর যেসব বক্তব্য হাজির করেছে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাদের কাছে রোগ নির্ণয়ের পর্যাপ্ত উপকরণ ছিল না এবং এখনো নেই। যে কারণে পাঁচ লাখেরও অধিক প্রবাসী, যারা এরই মধ্যে দেশে ফিরেছেন কিংবা স্থানীয়ভাবে যারা আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের পরীক্ষা করার মতো প্রাথমিক কাজটিও তারা যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি। কমসংখ্যক ব্যক্তিকে পরীক্ষা করার ফলে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম দেখানো গেছে বলে অভিযোগ আছে সচেতন মহলে। পরিকল্পিতভাবে লকডাউন না করে দশদিনের সরকারি ছুটি ঘোষণার ফলে সাধারণ নাগরিকদের কাছে করোনা সম্পর্কে সঠিক বার্তা পৌঁছেনি বলেই প্রতীয়মান হয়। ফলে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার মতো করে সবাই গাদাগাদি করে, যে যেভাবে পেরেছেন বাড়ির উদ্দেশে ছুটেছেন। ফলে ঘরে থাকা মধ্যবিত্তদের সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যমে গালমন্দ করার নতুন উপকরণ যোগ হয়েছে, অথচ যদি পরিকল্পনা করে পর্যায়ক্রমে সব প্রতিষ্ঠান ছুটি কিংবা বন্ধ ঘোষণা করে একে একে যানবাহন বন্ধ করা হতো তাহলে সবাই পড়িমরি করে ছুটতেন না। গত ঈদের সময় রকম একটি প্রয়াস লক্ষ করা গেছে। যে কারণে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যাও কম হয়েছে।

প্রবাসী প্রত্যাগতদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় মাদারীপুরের শিবচর উপজেলাকে ইতিমধ্যেই অবরুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আইইডিসিআরের পক্ষ  থেকে করোনা মোকাবেলায় নাগরিকদের নানা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যেখানে নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করা, নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখা, হাঁচি, কাশি দেয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখা, পরিষ্কার কাপড় পরিধান করাসহ নানা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সবাই কমবেশি এসব নির্দেশনা মেনে চলার  চেষ্টা করছেন, কিন্তু যাদের জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে কিংবা শ্রমজীবী মানুষ, যাদের ঘরে বসে থাকলে উপোস থাকতে হবে তাদেও বের হতেই হচ্ছে। অনেকেরই মুখে মাস্ক নেই কিংবা হাতে গ্লাভস নেই, রকম পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা তাদের সঙ্গে থাকা অতি উৎসাহী একদল লোক তাদের লাঠিপেটা করছে কিংবা কান ধরে উঠবস করতে বাধ্য করছে। ২৭ মার্চ যশোরের মণিরামপুরের সহকারী কমিশনার দুই বৃদ্ধকে কান ধরে উঠবস করানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের এসব আচরণের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না কেন। মহামারীর এই সময়ে তাহলে আইনি কী বিধিবিধান আছে তা পর্যালোচনা করা জরুরি। 

মহামারী নিয়ন্ত্রণের জন্য মহামারী রোগ আইন, ১৮৯৭ বিলোপ করে ২০১৮ সালের ৬১ নং আইন দ্বারা নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়, যা সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ নির্মূল) আইন, ২০১৮ নামে পরিচিত। আইনের শুরুতে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসকরণের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ নির্মূলের উদ্দেশ্যে বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত আইন। আইনে বিভিন্ন সংজ্ঞা দেয়া হলেও জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা বলতে কী বোঝাবে তা উল্লেখ করা হয়নি, ফলে জরুরি অবস্থ বলতে সরকার কী বোঝাচ্ছে তা নিয়ে নানা সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। ধারায় সংক্রামক রোগের তালিকা থাকলেও তাতে করোনার নাম নেই বা থাকার কোনো কারণও নেই কিন্তু ধারা ()-তে সরকারকে নবোদ্ভূত বা পুনরুদ্ভূত কোনো রোগকে  গেজেটে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করার অধিকার দেয়া হয়েছে। গত ১৮ মার্চ জনাব আশরাফুল কামাল ও জনাব রাশেদ জাহাঙ্গীরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এর এক আদেশের ফলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত ১৯ মার্চ করোনা ভাইরাসকে সংক্রামক ব্যধির তালিকাভুক্ত করে।  আইনের ধারার অধীনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় নানা দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। যেমন ধারা ()-তে জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলা এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাসকরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ নির্মূলের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অধিদপ্তর এসব দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছে বা করছে তা এখনই প্রশ্নবিদ্ধ। ধারা () অনুযায়ী অধিদপ্তর সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক, প্রতিষেধক টিকা বা ওষুধ প্রয়োগ করতে বাধ্য। কিন্তু অধিদপ্তরের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করে অনেকেই ন্যূনতম পরীক্ষা করানোর সেবাও পাচ্ছেন না মর্মে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া রক্তের নমুনা সংগ্রহের পর রিপোর্ট দেয়ার ক্ষেত্রে ধীরগতির ফলে অনেকের জীবন হুমকিতে পড়ার অভিযোগও রয়েছে। 

আইনের ধারা () অনুযায়ী অধিদপ্তর সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এমন কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট হাসপাতাল, অস্থায়ী হাসপাতাল, স্থাপনা বা গৃহে অন্তরীণ বা পৃথককরণ করতে পারেন। আইনের ধারা অনুযায়ী অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আলাদা বড় মাপের উদ্যোগ দেখা না গেলে নাগরিকদের স্বেচ্ছায় নিজ গৃহে অন্তরীণ থাকার যে সরকারি ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তাতে কিছুটা হলেও ফল পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা যায়। 

আইনের ধারা () অনুযায়ী অধিদপ্তর একদিকে যেমন সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে কোনো বাজার, গণজমায়েত, স্টেশন, বিমানবন্দর, নৌ স্থলবন্দরগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করতে পারে, তেমনি ধারা () অনুযায়ী সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে উড়োজাহাজ, জাহাজ, জলযান, বাস, ট্রেন অন্যান্য যানবাহন দেশে আগমন, নির্গমন বা দেশের অভ্যন্তরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল নিষিদ্ধ করতে পারে। এই ধারার বিধান মতে আগেভাগে উদ্যোগ নিয়ে যদি যানবাহন নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করা হতো তাহলে এতটা জনবিশৃঙ্খলা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতো না। আমরা এখনো নিশ্চিত নই কতজন ব্যক্তি তাদের শরীরে করোনাভাইরাস নিয়ে গ্রামে গেছেন এবং তাদের পরিবারের কতজন আক্রান্ত এই রোগে।

এই আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কোনো এলাকাকে সংক্রমিত এলাকা ঘোষণা করতে পারার ক্ষমতা (ধারা ১১) ধারা ১১ ()-এর বিধান মতে মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মচারীর কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে যথাযথভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো সংক্রামক রোগ সীমিত বা নির্মূল করা সম্ভব নয়, তাহলে তিনি সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে বা সংক্রমিত স্থানে অন্য কোনো ব্যক্তির প্রবেশ নিষিদ্ধ, সীমিত বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। শিবচর উপজেলায় যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে তা ধারার অধীনে গৃহীত পদক্ষেপ বলে ধওে নেয়া যায়। এছাড়া ধারা ১৪-তে সংক্রমিত ব্যক্তিকে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে সাময়িকভাবে অন্য কোনো স্থানে স্থানান্তর বা জনবিচ্ছিন্ন করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে এই আইনের অধীনে এখন পর্যন্ত কোনো বিধি প্রণয়ন করা হয়নি, তাই আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে তা পরিষ্কার নয়। 

ধারা ২৪- সংক্রামক রোগের বিস্তার এবং তথ্য গোপন করাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ওই অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ধারা ২৬- মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রদানকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই ধারার বিধান মতে, যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রদান করেন তাহলে অনূর্ধ্ব দুই মাসের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২৫শ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এসব অপরাধকে ধারা ২৪- -আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপসযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার মানে অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী এসব অপরাধের অভিযোগ থানায় করা যাবে না, কেবল আদালতে মামলা করা যাবে।

সরকার প্রজ্ঞাপন দ্বারা লকডাউন, ১৪৪ ধারা জারি বা জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করে সরকারি ছুটি ঘোষণা করায় গণজমায়েত নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে মাঠে কাজ করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুলিশ সেনাবাহিনীকে রাস্তায় লাঠিপেটা কান ধরে উঠবস করানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সুনির্দিষ্ট আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে তেমনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, যা কখনই কাম্য নয়। নির্যাতন হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর বিধান মতে লাঠিপেটা কিংবা কান ধরে উঠবস করানো সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ। এছাড়া সংবিধানের ৩৫ () অনুচ্ছেদে কাউকে নিষ্ঠুর অবমাননাকর দণ্ড দেয়ার বিরদ্ধে নাগরিকদের সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। সুতরাং  কোনো বিচারেই এই অবমাননাকর দণ্ড আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি কর্তাব্যক্তিদের গত দুই সপ্তাহে দেয়া অনেক বক্তব্যই বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে তা সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ নির্মূল) আইন, ২০১৮-এর ধারা ২৬-এর অধীনে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে আইন থাকা আর সেই আইনের প্রয়োগ হওয়া দুটো ভিন্ন বিষয়।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন