বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

বন্ধের শঙ্কায় দুগ্ধ খামার

সহায়তামূলক পদক্ষেপ নিক সরকার

কভিড-১৯ প্রতিরোধে প্রায় সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যেও কৃষকের উৎপাদন থেমে নেই। সবজি থেকে শুরু করে দুধ সবই উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু জটিলতা হলো বাজারজাত নিয়ে। করোনার কারণে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো দুধ কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। কারণে বিপুল পরিমাণ দুধ অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে, যা বিনষ্ট হচ্ছে। এতে কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্যমূল্য থেকে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে দুগ্ধ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের করুণ চিত্র উঠে আসছে। কোথাও কোথাও দুধ নষ্ট করার খবর আসছে, আবার কোথাও কোথাও টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি হচ্ছে। এতে লোকসানের মুখে রয়েছেন খামারিরা। একই অবস্থা সবজি উৎপাদনকারী কৃষকদেরও। পরিবহন বন্ধ থাকায় মাঠেই নষ্ট হচ্ছে সবজি। যতটুকুবা সংগ্রহ করা হচ্ছে জমি থেকে, তাও অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বেসরকারি এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটাও দুধ কেনা বন্ধ রেখেছে। সন্দেহ নেই, দেশে দুধ উৎপাদন বাড়লেও শিল্পের যথাযথ বিকাশ হয়নি। তরল দুধ পাস্তুরিত তা বিক্রির মধ্যে অধিকাংশের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। গুঁড়ো দুধ উৎপাদন তা রফতানিতে নেই বিশেষ কোনো উদ্যোগ। ফলে করোনাসহ বিভিন্ন সময়ে উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতিতে খামারিরা বিপুল লোকসানের সম্মুখীন হন। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে বড় বড় খামারের সঙ্গেই দুধ প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। এতে খামার থেকে দুধ সংগ্রহ করে দ্রুত প্রক্রিয়াজাত অর্থাৎ গুঁড়ো দুধ উৎপাদন করে মুজদ করে রাখা হচ্ছে সঠিক প্রক্রিয়ায়। আমাদের পর্যাপ্ত সুবিধা তো নেই, সংকটের সময় খামারিদের সহায়তার কোনো উদ্যোগও নেয়া হয় না। এমন সংকটকাল উত্তরণে বীমা সুবিধার আওতায়ও নেই তারা। ফলে একদিকে দেশের মানুুষ যেমন পুষ্টিকর দুধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি খামারিরা হারাচ্ছেন অর্থ।

কীভাবে করোনার মধ্যে সচেতন থেকে দুধ সংগ্রহ এবং তা গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়, তার পথ খুঁজে বের করতে হবে। লকডাউন বা ছুটি আরো অনেক দিন চালিয়ে যেতে হতে পারে। একসময়ে গিয়ে দুধের সংকট দেখা যেন না দেয়, তার প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে। চীনও কভিড-১৯-এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে বিশেষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, যেখানে জীবাণুমুক্তকরণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমরাও তাদের নীতি অনুসরণপূর্বক দুধ সংগ্রহ তা প্রক্রিয়াজাত করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারি। একই কথা প্রযোজ্য কৃষকদের ক্ষেত্রেও। আর কয়েকদিন পর বোরো ধান উঠবে। সে সময় সরকারের ক্রয় প্রক্রিয়া জোরদার করা না গেলে কৃষকরা এবারো ধানের যৌক্তিক মূল্য পাবেন না। বোরো ধান ওঠার আগেই করোনা পরিস্থিতিতে কৃষককে কীভাবে পণ্যের ন্যায্যমূল্য দেয়া যায়, তার পরিকল্পনা এখনই করতে হবে। ভারতের বৃহৎ তরল দুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আমুল করোনা লকডাউনের সময়ও খামারিদের কাছ থেকে দুধ কেনা বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ আমাদের কোম্পানিগুলো বিপরীত আচরণ করছে দুধ সংগ্রহ বন্ধ রেখে, যা কাম্য নয়। সময় বরং সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারপূর্বক দুধ কেনা অব্যাহত রাখা জরুরি ছিল।

সরকার দেশের দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলো থেকে সহযোগিতা না পেলে অচিরেই গড়ে ওঠা প্রায় ৫০ শতাংশ খামার বন্ধ হয়ে যাবে। করোনাভাইরাস সমস্যায় আক্রান্ত-পরবর্তী সময় এবং আসন্ন রোজার মাসে আমাদের দেশে দেখা যেতে পারে দুধ দুধজাতীয় পণ্যের সংকট। তাই সময় দুধ মজুদ করে রাখতে পারলেই দেশে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয় হবে, তেমনি দেশের খামার শিল্পকে আমাদের এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ দুগ্ধ খামার রয়েছে, যেখানে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় কোটি ২০ লাখ মানুষ, যাদের জীবন-জীবিকা দুগ্ধ শিল্পের ওপর নির্ভর করে। তাদের জীবন জীবিকার পাশাপাশি প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে খামারিদের ভর্তুকি প্রদান এবং দুধ কেনা তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন দরকার সরকারি সংশ্লিষ্ট বেসরকারি খাতের সহযোগিতা।

দুধ বিক্রি করে অনেকের সংসার চলে। এর আয় থেকে গরুর খাবার কিনতে হয়, দুধ বিক্রি না হলে খামারিরা গরুর খাবার কীভাবে কিনবেন? দুধই বা কোথায় বিক্রি করবেন। বর্তমান পরিস্থিতি বেশি দিন চলতে থাকলে খামারিদের পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। করোনার প্রাদুর্ভাবে খামারিরা চিন্তায় আছেন। আমাদের দেশের তিনটি বড় কোম্পানির প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করে গুঁড়ো দুধ তৈরির সক্ষমতা আছে। পাশাপাশি আরো ১০-১২টি কোম্পানির দুধজাতীয় পণ্য যেমন ঘি, মাখন, ফ্লেভারড মিল্ক, আইসক্রিম, ক্রিম তৈরি করার সক্ষমতা আছে। কোম্পানির সুবিধাগুলো যথাযথ সুরক্ষা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কীভাবে সচল করা যায়, তা নিয়ে দ্রুত চিন্তাভাবনা প্রয়োজন। বিশেষ ব্যবস্থায় সবজি বাজারজাত কীভাবে করা যায়, তার একটা পরিকল্পনা করতে পারি। কৃষকদের কথা সরকারের কাছে তুলে ধরা উচিত। রেলের মাধ্যমে বিনা ভাড়ায় পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা, ঋণ মওকুফ, আর্থিক সহায়তা, প্রণোদনাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। সর্বোপরি খামারিদের অর্থ প্রদান থেকে শুরু করে কারিগরি সহায়তার উদ্যোগ নিতে হবে। দুধ থেকে ঘি, মাখন ইত্যাদি তৈরি করে তা খামারি পর্যায়ে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তা শেখাতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন