বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ফিচার

কভিড-১৯ কি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়?

বণিক বার্তা অনলাইন

নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার ঘটছে খুব দ্রুত। এরই মধ্যে মোট আক্রান্ত সাড়ে ৬ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। হু হু করে বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। এটি এমন এক পরিস্থিতি যে মানুষকে তাদের চিরাচরিত সামাজিকীকরণের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কীভাবে মেলামেশা করবে, বাসন-কোসন আসবাবপত্র কীভাবে পরিচ্ছন্ন রাখবে এবং সর্বোপরী বাকি বিশ্ব থেকে নিজেকে কীভাবে এবং কেনই বা বিচ্ছিন্ন রাখবে এ নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে ভাবতে হচ্ছে মানুষকে। 

একটা বিষয় মোটামুটি সবার জানা যে, করোনা ভাইরাস ছড়ায় মূলত হাঁচি কাশির মাধ্যমে। হাঁচি কাশিতে যে ক্ষুদ্র তরল কণা (ড্রপলেট) থাকে সেটির মাধ্যমে আরেকজন আক্রান্ত হয়। একবার কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে প্রায় ৩  হাজার ড্রপলেট আর হাঁচিতে বেরিয়ে আসে ১০ হাজার পর্যন্ত। 

এই ড্রপলেটগুলো মাটিতে পড়ে অথবা কাছকাছি কেউ থাকলে তার নিঃশ্বাসের মধ্যদিয়ে শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে। এছাড়া এগুলো এমন কোনো বস্তুর পৃষ্ঠতলে পড়তে পারে যেটি পড়ে কোনো সুস্থ মানুষ হাত দিয়ে স্পর্শ করতে পারে এবং তিনি সেই হাত তার মুখে নাকে কানে অথবা চোখে দিতে পারেন।

করোনাভাইরাস এই ড্রপলেটের মধ্যে থাকলেও বাতাসে কিন্তু খুব বেশি সময় বাঁচতে পারে না। তাছাড়া হাঁচি কাশির সময় বেরিয়ে আসা ড্রপলেটগুলো সামান্য দূর যেতেই অভিকর্ষের টানে নিচে পড়ে যায়।

বাতাসে ভাসমান অবস্থায় করোনাভাইরাস কতো দূরত্ব পর্যন্ত বেঁচে থাকে এটি নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তবে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু গবেষণায় বলা হচ্ছে বাতাসে এ ভাইরাস কয়েক সেকেন্ড বাঁচে। আবার কেউ বলছেন দুই থেকে তিন ঘণ্টা।

যাই হোক ড্রপলেটে যদি ভাইরাস থাকে তাহলে হাঁচি বা কাশি দেয়ার লোকের কাছ থেকে দুই মিটারের মধ্যে থাকলে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেখানে কোনো বাধা না থাকলে হাঁচির মাধ্যমে বেরিয়ে আসা ড্রপলেট ৬০ মিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গত সপ্তাহে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, অতি ক্ষুদ্র ড্রপলেটের ওপর ভর করেও করোনাভাইরাস বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেসে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া এবং মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের (এনআইএইচ) বিজ্ঞানীরা এমন দাবিই করেছেন। অবশ্য এ ধরনের কণার মধ্যে ভাইরাসের পরিমান খুবই সামান্য থাকে বলেও উল্লেখ করেছেন তারা।

তবে মনে রাখতে হবে, এসব গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের। তাছাড়া অন্য একাধিক গবেষণায় সাংঘর্ষিক ফলাফলও এসেছে। তারপরও এটি যদি সত্যি হয় তাহলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এতো বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়ার একটি ব্যাখ্যা হতে পারে এটি। 

যখন একটি ভাইরাস বায়ুবাহিত হয় তখন সেটিকে বলা হয় ‘অ্যারোসল’। এর মানে হলো, এ ভাইরাস বায়ুতে অতিক্ষুদ্র পানি কণার মধ্যে মিশ্রিত থাকে। এ কণা হাঁচি কাশির ড্রপলেটের চেয়ে ক্ষুদ্র। বড় ড্রপলেটগুলো মাটিতে বা অন্য কোনো কিছুর পৃষ্ঠে পড়ার পরও এ কণাগুলো বাতাসে ভেসে থাকে।

অনুকূল পরিবেশ পেলে এসব ড্রপলেট কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। অনুকূল পরিবেশ বলতে বাতাসের গতি খুব কম, উন্মুক্ত স্থান এবং উপযুক্ত (কম) তাপমাত্রাকে বুঝায়।

বায়ুবাহিত ভাইরাসের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত একটি হলো হামের ভাইরাস। হাম আক্রান্ত কেউ হাঁচি বা কাশি দিলে এই ভাইরাস ক্ষুদ্র কণার আকারে বাতাসে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত ভেসে থাকে। এসময় ওই এলাকার মধ্যে কেউ শ্বাস নিলে তিনিও আক্রান্ত হবেন।

নভেল করোনাভাইরাসের আচরণও অনেকটা এরকমই। এর সপক্ষে কিছু প্রমাণও আছে। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে এটিরও অ্যারোসলের মতো বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

তবে বাস্তবে এমন বৈশিষ্ট্যের সপক্ষে এখনো প্রমাণ মেলেনি। আক্রান্ত রোগী আছে হাসপাতালের এমন কক্ষে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে সেখানকার বাতাসে করোনাভাইরাস এমন আচরণ করছে না। তবে বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে এখনো সতর্কতার সঙ্গে মন্তব্য করছেন। তারা বলছেন এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে কথা বলার আগে অধিকতর গবেষণার প্রয়োজন। এখন বরং এ ভাইরাসের বিস্তার রোধে বেশি গুরুত্ব দেয়া জরুরি।

ড্রপলেটের মাধ্যমে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে মোটামুটি সবাই একমত। এ ভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় একটি পথ হলো কোনো বস্তুর ভাইরাস দূষিত পৃষ্ঠ হাত দিয়ে স্পর্শ করা এবং সেই হাতে নাকে মুখে কানে না চোখে দেয়া। এ কারণে ঘর ও অফিসের ব্যবহৃত আসবাবপত্রের পৃষ্ঠতল নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

মানবদেহের বাইরে কতোক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে, অর্থাৎ পোষকের বাইরে আয়ু বিবেচনায় করোনাভাইরাসকে কঠিনপ্রাণ বলেই মনে করছেন গবেষকরা। 

সম্প্রতি এনআইএইচের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, অনুকূল পরিবেশে এ ভাইরাস কয়েক ঘণ্টা থেকে তিন দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এটি কার্ডবোর্ডে ২৪ ঘণ্টা, প্লাস্টিক ও স্টেইনলেস স্টিলের পৃষ্ঠে তিন দিন পর্যন্ত দিব্যি বেঁচে থাকে।

গবেষকরা ধারণা করছেন, বাতাসে এ ভাইরাসের আয়ু মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা হওয়ার কারণ হতে পারে দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ তাপমাত্রা বেশি এবং আর্দ্রতা কম এরকম বাতাসে এ ভাইরাস দ্রুত মরে যাবে এমন ধারণা করা যেতেই পারে।

নভেল করোনাভাইরাস বিস্তারের আরেকটি পথ হলো মলদ্বার। একাধিক গবেষণায় এর সপক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, এ ভাইরাস অন্ত্রের মধ্য দিয়ে অনায়াসে চলাচল করতে পারে এবং সর্বশেষ মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে যায়। তবে এটিই এ ভাইরাস বিস্তারের প্রধান পথ নয়। এরপরও সাবধানতার খাতিরে টয়লেট থেকে বেরিয়ে ভালো করে হাত ধোয়া জরুরি।

নতুন এই ভাইরাস সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এটির ব্যাপক বিস্তার রোধ করতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই। সাবান দিয়ে বারবার হাত ধোয়া এবং ব্যবহার্য জিনিসপত্র ঘন ঘন জীবাণুমুক্ত করাই হতে পারে এ ভাইরাস বধের মোক্ষম অস্ত্র।

সূত্র: আল জাজিরা

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন