বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশে করোনা আতঙ্ক, প্রতিরোধ এবং প্রতিকার

আয়েশা সিদ্দিকা শেলী

নভেল করোনাভাইরাস হল এক শ্রেণিভুক্ত ভাইরাস যারা স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিকে আক্রান্ত করে। ভাইরাসটি মানুষের শ্বাসনালীতে সংক্রমণ ঘটায়। এই সংক্রমণের লক্ষণ মৃদু হতে পারে, অনেকসময় যা সাধারণ ঠাণ্ডাজ্বরের মতো মনে হয়। কিছু ক্ষেত্রে তা অন্যান্য মারাত্মক ভাইরাসের জন্য হয়ে থাকে, যেমন সার্স, মার্স এবং কভিড-১৯। অন্যান্য প্রজাতিতে এই লক্ষণের তারতম্য দেখা যায়। যেমন মুরগির মধ্যে এটা ঊর্ধ্ব শ্বাসনালী সংক্রমণ ঘটায়, আবার গরু ও শূকরে এটি ডায়রিয়া সৃষ্টি করে। মানবদেহে সৃষ্ট করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়ানোর মত কোনো ভ্যাক্সিন বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর চীনের উহান রাজ্যে করোনা ভাইরাসের প্রথম কেস শনাক্ত হয়। একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর চীন বিষয়টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) রিপোর্ট করে এবং ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি ডব্লিউএইচও এটিকে ‘পাবলিক ইমার্জেন্সি কনসার্ন’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং এটি কভিড-১৯ নামে পরিচিতি লাভ করে। 

চীনে উদ্ভুত এই মারাত্মক ভাইরাসটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং শুধু চীন নয় উত্তর কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ইরান, ভারতসহ এশিয়ান দেশগুলোর সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় প্রবেশ করে। ইতালি, স্পেনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ইউরোপের অনেক দেশেই ‘লকডাউন’ চলছে। ইউরোপের দেশগুলোতে মৃত্যুর মিছিল চীনকেও ছাড়িয়ে যায়। আমেরিকাতেও মৃত্যুর হার কম নয়। প্রান্তিক জনগণ থেকে শুরু করে বিশ্বনেতা, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক কেউই এই ঝুঁকির বাইরে নাই। নিরাশার কথা হলো অদ্যবধি এই ভাইরাসের কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারেনি বিজ্ঞানীরা। যদিও চেষ্টা অব্যাহত আছে এই ঘাতককে জয় করার।

বাংলাদেশ এই দীর্ঘ প্রায় তিনমাস মূলত করোনা ঝুঁকির বাইরে না থাকলেও করোনা রোগী আছে কিনা যেটি ফরমালি জানা যায়নি। কিন্তু অনেকের মাঝে একটি সন্দেহ বিরাজমান ছিল যে এই ঘন বসতির দেশে মেডিকেলি রিপোর্ট না হলেও কোন না কোনভাবে করোনা রোগী চলে আসতেও পারে। 

বাংলাদেশে এ মাসের ৮ তারিখ প্রথম তিনজন করোনা রোগী শনাক্ত করার কথা জানায় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। পরবর্তীতে ১৪ মার্চ আরো দুজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। গত ১৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়। পরবর্তীতে আরও কয়েকজন করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় দেশে এখন মোট শনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা ৪৮ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৫ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৫ জন। আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আক্রান্তদের বেশিরভাগই বিদেশ ফেরত অথবা বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছিল। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণার পাশাপাশি সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে ঘরে থাকার কথা বলা হচ্ছে। বন্ধ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলও।

বাংলাদেশে করোনা আতঙ্কে ভুগছেন সাধারণ মানুষ। তবে এই ভোগান্তির পেছনের আমাদের দায়ভারও কম নয়। প্রথম দিকে সচেতনতার অভাবও লক্ষ্য করা গেছে বেশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়েছে নানান ভ্রান্ত ধারণা। প্রচার করা হচ্ছিলো- এই ভাইরাস গরম প্রধান দেশে ছড়াতে পারে না, ওজু করলে, নামাজ পড়লে এই ভাইরাস সংক্রমণ ছড়ায় না। আবার অনেকেই বলেছেন, এটি সাধারণ জ্বরের মতো, খুব বেশি গুরুতর কিছু না প্রভৃতি। শুরুর দিকে বিমানবন্দরগুলোও খুব বেশি সুরক্ষিত করা সম্ভব হয়নি। একটু সাবধানতা অবলম্বন করলেই যে ভাইরাসটি থেকে আমাদের প্রতিকার পাওয়া সম্ভব ছিল, তা এখন আমাদের নাগরিক জীবনকে স্থবির করে দিয়েছে।

দেশে করোনাভাইরাস আরো মহামারী আকার ধারণ করলে কী হবে? যথাযথ প্রতিরোধ না নিলে চিকিৎসা প্রদানকালে ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল এসিস্ট্যান্টরা আক্রান্ত হবেন এবং রোগীরা সেবা পাবেন না। সেই সাথে তাদের দ্বারা আরো বেশী রোগী আক্রান্ত হবে। সংবাদ কর্মীরা আক্রান্ত হলে- খবর পাওয়া যাবে না, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস যারা সরবরাহ করে তারা আক্রান্ত হলে জীবনোপকরণ সরবরাহ থেমে যাবে। তাদের মাধ্যমে ক্রেতাও আক্রান্ত হবেন। আইসিইউ বেডে করোনা রোগী দিলে অন্য রোগীরা মারা যাবেন। করোনায় আক্রান্ত রোগী মারা গেলে তাদের শেষকৃত্য করাটাও হবে ভয়াবহ ব্যাপার। করোনা শুধু স্বাস্থ্য নয় অর্থনীতিতেও তুমুল আঘাত হানতে পারে।

এই মুহূর্তে দলমত নির্বিশেষে আমাদের প্রয়োজন সমাজ সেবক। আর প্রকৃত দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত রাখা।  বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে, দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হবে। আর সেইজন্য প্রয়োজনে আরো কিছুদিন ঘরে থাকতে হবে। আর সাধারণ ছুটির সময় যেসব কর্মজীবী মানুষ কাজ হারিয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এই দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু সরকার নয়- দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, ডাক্তার, হাসপাতাল, ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানি, ব্যাংক, বীমা, গার্মেন্টস ব্যবসায়, এনজিও, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকেও এগিয়ে আসতে হবে। এটি আর নির্দিষ্ট কোন অঞ্চল বা দেশের দুর্যোগ নয়, এখন এটি বৈশ্বিক দুর্যোগ। দেশের, সমাজের, পরিবারের এবং প্রতিটি ব্যক্তির দুর্যোগ। সকলে ঐক্যবদ্ধ হলেই বাংলাদেশ এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সফল হওয়া যেতে পারে। সকলের জন্য নিরাপদ দেশ চাই, মানব কল্যাণে পৃথিবীর মঙ্গল হোক। পৃথিবী নামক প্রিয় গ্রহটির বিজ্ঞানীদের কাছে হেরে যাক করোনা ভাইরাসের করাল গ্রাস। আমরা আশায় বুক বাঁধি মানুষের মুক্তির প্রত্যাশায়।

আয়েশা সিদ্দিকা শেলী: অতিরিক্ত কর কমিশনার (ঢাকা)

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন