রবিবার | অক্টোবর ২৫, ২০২০ | ১০ কার্তিক ১৪২৭

প্রথম পাতা

করোনাভাইরাস আতঙ্ক

হাসপাতালগুলোর অর্ধেক শয্যাই ফাঁকা

মেহেদী হাসান রাহাত

করোনাভাইরাস ঝড়ে কাঁপছে পুরো বিশ্ব। ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশের হাসপাতালে চিকিৎসক নার্সদের দম ফেলার ফুরসত নেই। যদিও উল্টো চিত্র এখন বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোয়। তার মানে এই নয় যে দেশে রোগীর সংখ্যা কমে এসেছে। বাস্তবতা হচ্ছে চিকিৎসকের পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ না থাকায় করোনা আতঙ্কে অনেক হাসপাতালই সর্দি-কাশি, জ্বর শ্বাসকষ্ট রয়েছে এমন রোগীদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। সংক্রমণের ভয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন না অন্য রোগীরাও। ফলে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর অর্ধেকের বেশি শয্যা এখন ফাঁকা। অনেকটা একই অবস্থা ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোরও।

রাজধানীর পান্থপথে অবস্থিত স্কয়ার হাসপাতালে ৪০০ শয্যা রয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে মাত্র ১৫০ জন রোগী ভর্তি আছেন। ফাঁকা রয়েছে ২৫০ শয্যা। প্রতিদিন হাসপাতালটির বহির্বিভাগে গড়ে হাজার ২০০ থেকে হাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতেন। করোনাভাইরাসের কারণে গত কয়েকদিনে সংখ্যা ৫৫০-৬০০তে নেমে এসেছে।

স্কয়ার হাসপাতালের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ইউসূফ সিদ্দিক বণিক বার্তাকে বলেন, করোনাভাইরাসের আতঙ্কের পাশাপাশি পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে কমে গেছে। ঢাকার আশপাশের জেলাসহ দেশের অন্যান্য স্থান থেকে এখানে অনেক রোগী আসতেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে একেবারে সিরিয়াস অবস্থা না হলে কেউ আর হাসপাতালে আসছেন না। আমাদের হাসপাতালের ইমার্জেন্সিসহ সব বিভাগই খোলা। চিকিৎসক, নার্স স্টাফ সবাইকে পিপিই দেয়া হয়েছে। করোনার লক্ষণ নিয়ে কোনো রোগী এলেও আমরা তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছি না। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আমরা আইইডিসিআরের কাছে তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমাদের এখানে পর্যাপ্ত অবকাঠামো কারিগরি সুবিধা রয়েছে। ফলে সরকার যদি অনুমতি দেয় এবং কিট সরবরাহ করে তাহলে আমরাও করোনা টেস্ট করতে পারব।

রাজধানীর আরেক খ্যাতিসম্পন্ন বেসরকারি হাসপাতাল গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতাল। ৩৭০ শয্যার বিপরীতে এখানে বর্তমানে ১৫০ জন রোগী ভর্তি আছেন। ফাঁকা আছে ২২০টি। তাছাড়া বহির্বিভাগে সেবা নেয়া রোগীর সংখ্যাও ব্যাপক হারে কমে গেছে।

ইউনাইটেড হাসপাতালের পরিচালক (জনসংযোগ) ডা. সাগুফা আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, করোনাভাইরাস আতঙ্ক পরিবহন সুবিধা বন্ধ থাকায় বর্তমানে রোগীর সংখ্যা কমে গেছে। তবে রোগীদের সুবিধার্থে আমরা আজ থেকে ঢাকায় ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা চালু করেছি। এতদিন সুবিধা আমাদের চট্টগ্রাম সিলেট শাখায় দেয়া হতো। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকার বাইরে থাকা অনেক রোগীর পক্ষে হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিবেচনায় ঢাকায়ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা চালু করেছি।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যা রয়েছে ৩৫০টি। বর্তমানে সেখানে মাত্র ৫৫-৬০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতালটির মেডিকেল কো-অর্ডিনেটর ডা. মোহাম্মদ ইশতিয়াক সাজ্জাদুর রহমান জানান, করোনাভাইরাসের কারণে সবার মধ্যেই আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফলে রোগীরা একান্ত বাধ্য না হলে হাসপাতালে আসছেন না। আমাদের এখানে করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেয়ার মতো আলাদা অবকাঠামো রয়েছে। কারিগরি সুবিধা রয়েছে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও রয়েছেন। ফলে সরকার অনুমোদন দিলে আমরাও করোনা আক্রান্ত রোগীদের টেস্ট চিকিৎসাসেবা দিতে পারব।

ঢাকার অন্যতম নামকরা বিশেষায়িত হাসপাতাল ধানমন্ডির ল্যাবএইড। হাসপাতালটিতে ২৭৫টি শয্যা থাকলেও বর্তমানে এর মাত্র ২৫ শতাংশে রোগী আছে, বাকিগুলো ফাঁকা।  বহির্বিভাগে সেবা নেয়া রোগীর সংখ্যাও কমে গেছে ল্যাবএইড হাসপাতালে। জানতে চাইলে ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম বণিক বার্তাকে বলেন, করোনাভাইরাসের আতঙ্কে হাসপাতালগুলো অনেক ক্ষেত্রে রোগী ভর্তি করছে না। আবার অনেক রোগী নিজে থেকেই হাসপাতালে আসা থেকে বিরত থাকছেন। কারণে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এখন সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম। ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ চিকিৎসায় ইনফ্লুয়েঞ্জা সেরে যায়, হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু করোনাভাইরাস আতঙ্কে সর্দি-কাশি, জ্বর নিয়ে আসা রোগীদের সবাই করোনা আক্রান্ত বলে সন্দেহ করে। পরিস্থিতিতে অনেকেই ডিজিটাল মাধ্যমে আমাদের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছেন। কভিড-১৯ নিয়ে জনমনে আতঙ্ক দূর করতে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই রোগের পরীক্ষা করতে দেয়া উচিত বলে মনে করেন চিকিৎসক।

রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে পান্থপথের হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালেও। হাসপাতালটির চেয়ারম্যান ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিন জানান, করোনাভাইরাসের কারণে সবাই আতঙ্কে রয়েছেন। কারণে বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা তলানিতে এসে ঠেকেছে। অনেকেই রোগ চেপে রাখছেন। কিন্তু এটি কতদিন সম্ভব? এতে রোগ আরো জটিল পর্যায়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অবস্থায় সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স স্টাফের জন্য পর্যাপ্ত পিপিইর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে করে যেকোনো রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে রোগীরা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার কারণে হাসপাতালটির কয়েকজন চিকিৎসক কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন। বন্ধ রয়েছে ইমার্জেন্সি চিকিৎসাসেবা। কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন এ্যাপোলো হাসপাতালের বেশ কয়েকজন চিকিৎসকও। হাসপাতালেরও ইমার্জেন্সিও বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া মিরপুরের ডেল্টা হাসপাতালের আইসিইউ প্রধানসহ আরো দুজন চিকিৎসক কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন। হাসপাতালগুলোয়ও রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় কমে গেছে।

বেসরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোয়ও রোগীর সংখ্যা কমে গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) শয্যা রয়েছে হাজার ৯০৪টি। বর্তমানে হাসপাতালটির ইনডোর-আউটডোর দুই বিভাগেই রোগীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক কণক কান্তি বড়ুয়া বণিক বার্তাকে জানান, করোনার কারণে আমাদের হাসপাতালে ইনডোর-আউটডোর মিলিয়ে আগের তুলনায় ৪৫ শতাংশ রোগী কমে গেছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিত্র একই। হাসপাতালটিতে হাজার ৬০০ শয্যা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে হাসপাতালে শয্যার অতিরিক্ত অনেক রোগী ভর্তি থাকতেন। বর্তমানে সেখানেও রোগীর সংখ্যা কমে গেছে। হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় কমে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও এর সঠিক পরিসংখ্যান দিতে পারেননি।

একই অবস্থা আজিমপুর মা শিশু হাসপাতালেও। হাসপাতালে ৩৭০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ৪২ জন গাইনি বিভাগে ৫৫ জন শিশু বিভাগে ভর্তি রয়েছেন।

ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোয়ও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগে গড়ে প্রায় দেড় হাজার রোগী ভর্তি থাকলেও বর্তমানে হাসপাতালের অর্ধেক শয্যাই ফাঁকা। বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নেয়ার হারও ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। সম্পূর্ণ সুস্থ না হলেও করোনা আতঙ্কে রোগীরা চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে যাচ্ছেন। খুলনার অন্যান্য হাসপাতালেও রোগীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ১০০ শয্যাবিশিষ্ট বাগেরহাট সদর হাসপাতালের গাইনি, শিশু, মেডিসিন, অর্থোপেডিকসহ বিভিন্ন বিভাগের বেডগুলো রোগীশূন্য। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে হাসপাতালটির চিকিৎসকেরা জরুরি সেবা দিচ্ছেন। এক হাজার শয্যার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগে আড়াই হাজারের মতো রোগী ভর্তি থাকত। কিন্তু করোনাভাইরাসের আতঙ্কে হাসপাতালটিতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৭০০তে নেমে এসেছে। রংপুর জেলার আট উপজেলা হাসপাতালের অবস্থাও প্রায় একই। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসময় রোগীর চাপে চিকিৎসকেরা হিমশিম খেলেও বর্তমানে রোগীর সংখ্যা কমে এসেছে। তাছাড়া পর্যাপ্ত পিপিই না থাকায় চিকিৎসকেরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে চিকিৎসা দিচ্ছেন। সর্দি-কাশিসহ করোনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে এমন লক্ষণ থাকা রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালটিতে টেলিমেডিসিন সেবা চালু করা হয়েছে। নোয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি জেনারেল হাসপাতালে আগে কমপক্ষে ৬০০ রোগী ভর্তি থাকতেন। কিন্তু বর্তমানে হাসপাতালটি প্রায় ফাঁকা। আগে প্রতিদিন বহির্বিভাগে হাজারেরও বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও বর্তমানে সেটি -১০ জনে গিয়ে ঠেকেছে। তাছাড়া করোনা আতঙ্কে নোয়াখালী বেসরকারি হাসপাতালের প্রাইভেট চেম্বারও বন্ধ করে দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন