মঙ্গলবার | মে ২৬, ২০২০ | ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

প্রথম পাতা

যেভাবে মহামারী প্রতিরোধ করছে ভুটান

বণিক বার্তা ডেস্ক

গত মার্চ সকালে ঘুম থেকে জাগার পর ভুটানে প্রথম নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তের খবর জানতে পারে দেশটির বাসিন্দারা। স্থানীয় প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা রাতের বেলাতেই পরদিনের পত্রিকার সংবাদ প্রকাশের কার্যক্রম সেরে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন, তাতে খবর ছিল না। প্রিন্ট সংবাদমাধ্যমের কর্মী হওয়ায় পরদিনের পত্রিকা এর মধ্যেই হাতে পেয়ে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ বিবেচনায় খবর প্রকাশের জন্য রাত ৩টায় অফিসে ফিরে আসতে হয় তাদের। প্রকাশিত সংস্করণ বাতিল করে সে সংবাদ অন্তর্ভুক্ত করে আবার পত্রিকা প্রকাশ করতে হয় তাদের।

প্রথমে সবাই ধরে নিয়েছিল কোয়ারেন্টিনে থাকা এক জার্মান দম্পতির কেউ কভিড-১৯- আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু ঘোষণা হাতে পাওয়ার পর জানা গেল আক্রান্ত ব্যক্তি আসলে ৭৯ বছর বয়সী এক মার্কিন ট্যুরিস্ট।

বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয় ভুটানিরা। দেশে করোনা কে নিয়ে এসেছে, তাদের কাছে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে, সংকট কীভাবে মোকাবেলা করা হচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্বের ২০১টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে নভেল করোনাভাইরাস। চীনে প্রথমবারের মতো সংক্রমণ শুরুর ঘোষণা দেয়ার পর প্রতিবেশী ভুটানে পৌঁছতে ভাইরাসটির সময় লেগেছে দুই মাসেরও বেশি।

ভুটানিদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিবেশী ভারতের রাজ্যগুলোয় কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়া। সৌভাগ্যবশত এসব রাজ্যে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ভালোভাবে দেখা দেয়ার আগেই ভুটান সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। সীমান্ত বন্ধের আগে আসাম, অরুণাচল পশ্চিমবঙ্গে করোনার প্রাদুর্ভাব তেমন একটা হয়নি। কারণে এসব রাজ্য থেকে সংক্রমিত কেউ এসে ভুটানিদের জন্য করোনা মোকাবেলার কাজটি জটিল করে তোলেনি। এছাড়া সীমান্ত বন্ধের আগে এসব রাজ্য থেকে যারা দেশে ফিরে গিয়েছিলেন, তাদের প্রত্যেককেই হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়।

ভুটানে নভেল করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার অনেক আগে থেকেই সীমান্ত বন্ধের দাবি তোলা হচ্ছিল। কিন্তু সেবা খাতে কর্মরত প্রায় এক লাখ ভুটানির কথা চিন্তা করে ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না দেশটির সরকার। কারণ এদের বড় একটি অংশ ছিল পুরোপুরি পর্যটন খাতনির্ভর। আতঙ্কিত হয়ে হুড়োহুড়ি করে সীমান্ত বন্ধ না করার সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত সঠিক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে দেশটির বাসিন্দাদের কাছে।

ভুটানের সংবাদমাধ্যমগুলো বর্তমানে এর কৃতিত্ব দিচ্ছে দেশটির সরকারের নেতৃত্বগুণ জনগণের শৃঙ্খলাবোধকে। দেশটির রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক কভিড-১৯ মোকাবেলা ভুটানকে নিরাপদ রাখার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন একেবারে সামনে থেকে।

দেশটির রাজা নিজ দেশকে কভিড-১৯-এর সংক্রমণমুক্ত রাখার জন্য অনেক বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছেন। সরকার স্থানীয় সরকার পর্যায়ে তদারকি চালিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন স্থানে করোনা মোকাবেলার প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি।

প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর পরই বেশ সতর্ক অবস্থানে চলে যায় ভুটানের সাধারণ নাগরিকরা। শেষ পর্যন্ত দেশটির সরকার পরিস্থিতি বেশ ভালোভাবে এবং প্রশংসনীয় উপায়ে সামাল দিয়েছে। এছাড়া পর্যন্ত আক্রান্ত তিনজনকেই ১৬ জন বিশেষায়িত স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে সেবা দেয়ানোর পাশাপাশি রাজা স্বয়ং তাদের স্বাস্থ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিনিয়ত খবর নিয়েছেন।

অন্যদিকে সেখানকার ডাক্তার, নার্সসহ চিকিত্সাকর্মীরাও আক্রান্ত রোগীদের আশপাশে থেকে নিয়মিত সেবা দিয়েছেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে কুণ্ঠাবোধ করেননি তারা।

দেশটির গণমাধ্যমকর্মীরাও ভুটানিদের করোনা প্রতিরোধে নির্ধারিত সাধারণ নিয়মাবলির ওপর জোর দিয়ে গিয়েছেন। বিষয়ে দেশটির নাগরিকদের উদ্দেশে দেয়া রাজার পুরনো একটি ভাষণের বক্তব্য বারবার উল্লেখ করেছেন তারা।

একই সঙ্গে সামনে যে অনেক খারাপ দিন আসছে, সে বিষয়টি স্বীকার করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি ভুটানের সরকার বা গণমাধ্যমের কেউই।

সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভুটানে নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন তিনজন। এর মধ্যে দুজনই বিদেশী। স্থানীয় নাগরিক একজন। সংক্রমণ পরীক্ষা করিয়েছেন প্রায় ১৫০ জন। এছাড়া কোয়ারেন্টিনে আছেন চার শতাধিক।

সংকট মোকাবেলায় এগিয়ে এসেছে দেশটির বিভিন্ন হোটেল কর্তৃপক্ষও। হোটেলগুলোকে কোয়ারেন্টিন সেন্টার হিসেবে ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে তারা। অন্যদিকে তাদের উদ্যোগের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এসব কোয়ারেন্টিন সেন্টারে বিদ্যুৎ বিল মোবাইল ডাটা ফ্রি করে দিয়েছে ভুটান পাওয়ার করপোরেট (বিপিসি) ভুটান টেলিকম লিমিটেড (বিটিএল) হোটেলগুলো যতদিন কোয়ারেন্টিন সেন্টার হিসেবে ব্যবহূত হবে ততদিন সুবিধা চালু থাকবে।

বর্তমানে দেশটিতে জনগণের চলাচল সীমিত করে আনা হয়েছে। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে ভুটানে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আছে দেশটির।

বিষয়ে দেশটির গণমাধ্যমগুলো বলছে, কভিড-১৯ দেশটির জনগণের জন্য বড় ধরনের শিক্ষা হয়ে দেখা দিয়েছে। ভাইরাস মোকাবেলায় প্রতিরোধের প্রথম সারিতেই রয়েছে পরিস্থিতির ওপর যথাযথ নজরদারি স্থানীয় জনগণের সততা। এক্ষেত্রে যারা ভুটানে প্রবেশ করেছে, তাদের প্রত্যেকের ভ্রমণ ইতিহাস জানাটা জনগণের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া দেশটিতে নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে কোনো ধরনের ভুয়া খবর বা আতঙ্ক যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। এছাড়া কোনোভাবে আতঙ্কও যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়টি নিয়েও একযোগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, জনগণ গণমাধ্যম। এছাড়া বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন