বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা

তহবিলের ব্যবহার নিয়ে কিছু কথা

নাজনীন আহমেদ

করোনাভাইরাসের প্রভাবে উদ্ভূত বাস্তবতায় অর্থনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অন্যতম হলো রফতানি খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাবদ হাজার কোটি টাকার তহবিল। রফতানিকারকদের জন্য প্রযোজ্য অন্যান্য সুবিধার মধ্যে আছে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে জুন পর্যন্ত কাউকে খেলাপি করা যাবে না, রফতানির অর্থ ফিরিয়ে আনার সময় এবং আমদানি ব্যয় মেটানোর সময় চার থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করা ইত্যাদি। সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজে গৃহ ভূমিহীনদের জন্য খাবার গৃহ সুবিধার কথাও বলা হয়েছে। তবে সেগুলোর জন্য তহবিলের আকার বা বিতরণ ব্যবস্থার ব্যাপারে এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি।

পরিপ্রেক্ষিতে রফতানি তহবিল প্রণোদনা নিয়ে কিছু ভাবনার অবকাশ আছে বলে বোধ করি। সময়ে বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক সংকট, তা সাম্প্রতিক অন্য যেকোনো সংকটের চেয়ে আলাদা এবং ব্যাপক। যেমন ২০০৭-০৮-এর দিকে যে অর্থনৈতিক সংকট হয়েছিল, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর তেমন কোনো প্রভাব রাখেনি। কেবল বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত বিষয় সে সংকটের অংশ ছিল। ফলে সে সময় রফতানি খাতকে সরকার যেসব বিশেষ প্রণোদনা দেয়, তার যুক্তি বেশ স্পষ্ট ছিল। আবার ২০১৩ সালের মার্চে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে হাজার ১৩৪ জনের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু হাজার হাজার শ্রমিকের পঙ্গুত্ব দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাককে যে সংকটে ফেলেছিল, তা মোকাবেলায় পোশাক খাতের প্রতি সরকারের বিশেষ মনোযোগ ছিল অত্যাবশ্যক। প্রতি বছরের জাতীয় বাজেটে রফতানি খাতের জন্য যে নগদ প্রণোদনা দেয়া হয়, তার মধ্যে তৈরি পোশাক, চামড়া, হিমায়িত খাদ্যসহ সব প্রধান খাতই আছে। কিছু শর্ত মেনে নিয়ে যে নগদ প্রণোদনা পায় রফতানি খাত, তার পরিমাণ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল প্রায় হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রণোদনার সিংহভাগ স্বাভাবিকভাবেই যায় তৈরি পোশাক খাতে। চলমান ২০১৯-২০ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতকে বিগত বছরগুলোর নগদ প্রণোদনা ছাড়াও আরো শতাংশ (রফতানি আয়ের ওপর) বিশেষ নগদ প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। বড়-ছোট সব রফতানিকাররাই পান নগদ প্রণোদনা।

কভিড-১৯-কে ঘিরে বিশ্বব্যাপী সামাজিক দূরত্ব নিয়ম মেনে চলার যে জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, তার প্রভাবে খাদ্য, ওষুধ নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্য সেবা ছাড়া চাহিদা কমে গেছে বেশির ভাগ পণ্যের তাছাড়া নানা পণ্যের বিপণন-প্রচার এসব কাজকর্মে যেমন স্থবিরতা এসেছে, তেমনি হুকমির মুখে পড়েছে নিম্ন আয়ের দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, পরিবহন কর্মীসহ সর্বসাধারণ মানুষের জীবিকা; অণু-ক্ষুদ্র মধ্যম শিল্পের পণ্য উত্পাদন বিপণন। বর্তমাস মংকট কেবল রফতানিনির্ভর শিল্পের সংকট নয়, দেশীয় বাজারনির্ভর শিল্পেরও সংকট। সব শিল্প বাণিজ্যের উদ্যোক্তাই ভাবছেন, চলমান সংকট দীর্ঘ হলে তারা তাদের কর্মচারীদের বেতন দেবেন কোত্থেকে? অবস্থায় রফতানি খাতের শ্রমিকদের হাজার কোটি টাকার তহবিল দেয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে, সময়ের শিল্পের সংকট মূলত শিল্পপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে হচ্ছে। যেমন তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৫ মার্চ পর্যন্ত কভিড-১৯-এর কারণ তাদের প্রায় দশমিক বিলিয়ন ডলারের অর্ডার স্থগিত হয়েছে। যেহেতু তৈরি পোশাকপণ্যের অনেকগুলোই ঋতুভিত্তিক, তাই অর্ডারগুলো বাতিল হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। কোনো সন্দেহ নেই, সংকট পড়েছে আমাদের প্রধান রফতানি খাত। ফলে ১৩ বছর যে খাত ৩৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাকপণ্য রফতানি করেছিল, বছর হয়তো রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ৩৮ বিলিয়ন ডলার। যদি বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল হয়, তবে খাত গত বছরের পরিমাণ রফতানি করবে। কোনো প্রবৃদ্ধি হবে না। তবে খাতে চলমান অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যে রফতানি হয়েছে, তা গত বছরের তুলনায় প্রায় শতাংশ কম। বোঝা গেল, প্রধান রফতানি খাতের সংকট বেশ গভীর। চামড়া, হিমায়িত খাদ্যসহ বেশির ভাগ রফতানি খাতের চিত্র কম-বেশি হতে পারে। রফতানি খাতের সংকট যেমন দৃশ্যমান, দেশীয় বাজারনির্ভর শিল্পেও কিন্তু দুর্যোগের ঘনঘটা। এবারের অর্থনৈতিক ঝুঁকি কিন্তু কেবল রফতানি খাতের নয়, বরং পুরো অর্থনীতির। কাজেই যেকোনো পদক্ষেপে ভাবতে হবে পুরো অর্থনীতির কথাই। যেহেতু বছর সরকারের রাজস্ব আয় আশানুরূপ নয়, তাই চাপ আছে ব্যয়ে শৃঙ্খলা গুরুত্ব নির্ধারণের। সরকার যদি সব খাতের জন্য প্রণোদনা দিতে পারত, তাহলে হয়তো দেশের বাজারের সামষ্টিক চাহিদার সংকট কেটে গিয়ে আবারো ক্ষুদ্র-মাঝারি সব উদ্যোক্তার পণ্যের বিক্রি বাড়ত। রফতানি বাণিজ্যে যারা আছেন, তাদের অনেকেই বড় উদ্যোক্তা, তাই সক্ষমতা ঝুঁকি বহনের ক্ষমতা তাদের বেশি হাওয়ার কথা। আর দেশের বাজারনির্ভর, বিশেষ করে ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষমতা সীমিত। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন দাঁড়ায়, সাহায্য কাদের দরকার বেশি, সবলের না দুর্বলের?

আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না গেলে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রফতানিপণ্যের বাজার আগের অবস্থায় যাবে না। ঠিক একইভাবে দেশের অর্থনীতিতেও চাহিদা স্বাভাবিক না হলে শিল্পপণ্য উত্পাদন তথা জোগান ব্যাহত হয়ে দেশীয় শিল্প বিপদে থাকবে। সংকটে তারা কী করছেন? তারা তাদের নিজস্ব যৎসামান্য মানবতার খাতিরেই চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

তৈরি পোশাক খাতের মতো শক্তিশালী একটি খাত যা এখন দক্ষ নেতৃত্বে আছে, তা কি নিজেদের শ্রমিকদের দুই মাসের বেতন দেয়ার মতো সঞ্চয় করতে পারেনি? খাতে অত্যাধুনিক, পরিবেশবান্ধব বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনেক।

বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর রফতানি বেশি হওয়ায় স্বভাবতই বড় আকারের নগদ সহায়তাও তাদের কাছেই যায়। এরা কি একটা তহবিল তৈরি করতে পারতেন না, তাদের মধ্যেই যারা সংকটে বেশি পড়েছেন তাদের সহায়তায়, না হয় ঋণ হিসেবেই তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ বিকেএমইএর তত্ত্বাবধানে তা হতো।

সংকটে পড়লে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তার সঞ্চয় থেকে কর্মচারীর মজুরি দেন। তাহলে বড় শিল্পপতিরা তা করতে পারবেন না কেন। আর অর্ডার স্থগিত বা বাতিল হয়েছে মোট তৈরি পোশাক রফতানির ভাগের মতো (গত বছরের ৩৪ বিলিয়ন ডলারের রফতানি হিসেবে), বাকি ৯২ ভাগ রফতানি কিন্তু সমস্যায় পড়েনি। তাহলে ৪০ লাখ পোশাক খাতের শ্রমিক সবাই বেতনের শঙ্কায় থাকার কথা নয়। বরং একটা বড় অংশের মালিকপক্ষ এখনো সংকটে না পড়ার কথা।

তৈরি পোশাকের মতো খাতের উদ্যোক্তাদেরই তাদের শ্রমিকের দায়িত্ব নেয়া উচিত। তাদের এতদিনের সঞ্চয় থেকে শ্রমিকদের দু-তিন মাসের বেতন তারা চালিয়ে নেয়ার সক্ষমতা রাখেন। তাদের মধ্যে যারা সে সক্ষমতা রাখেন না, তাদের সতীর্থ সমর্থ শিল্পপতিদের সাহায্য করা উচিত। করোনাভাইরাসের সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলে তা মোকাবেলা করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়। মুহূর্তে সামর্থ্যবানদের এগিয়ে আসা উচিত। সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা দিতে ছোট ব্যবসায়ীদের কিটিয়ে রাখতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই আমাদের সফল কেরছিল। এবারের অর্থনৈতিক সংকট যেহেতু ঘরে-বাইরে সবদিকে, তাই রফতানিকারকরা পুরো অর্থনীতির সবার কথা ভেবে নিজেদেরই তাদের শ্রমিকের দায়িত্ব নেয়া উচিত। সরকারকে সুযোগ দিন হাজার কোটি টাকা সাধারণ হতদরিদ্র মানুষ ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের জন্য ব্যয় করতে।

নাজনীন আহমেদ: জ্যেষ্ঠ গবেষক, বিআইডিএস

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন