রবিবার | মে ৩১, ২০২০ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

শিল্প বাণিজ্য

৩ বছর ধরে রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি

সুকান্ত হালদার

২০১৪-১৫ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রাজস্ব আহরণ করতে সক্ষম হয়েছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তবে এর পরের তিন অর্থবছরেই রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ঘাটতি দেখা গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘাটতির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা আহরণের ব্যবধান ছিল ১৩ হাজার ৩৪৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। পরের দুই অর্থবছরে ঘাটতি ছিল যথাক্রমে ২২ হাজার ৬৮৭ কোটি লাখ ৫৬ হাজার ২৭০ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

এদিকে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আহরণে ঘাটতির পরিমাণ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পুরো অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন এনবিআর-সংশ্লিষ্টরা। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল লাখ ৮৯ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে লাখ ৪৪ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। হিসাবে আট মাসে ঘাটতি রয়ে গেছে ২৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

২০০৯-১০ থেকে ২০১৮-১৯ এই ১০ বছরে এনবিআরের পরিসংখ্যান গবেষণা বিভাগের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা আহরণের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রাজস্ব আহরণ হয়েছে ২০০৯-১০, ২০১০-১১, ২০১১-১২, ২০১৪-১৫ ২০১৫-১৬ এই পাঁচ অর্থবছরে। আর ঘাটতি রয়েছে গেছে বাকি পাঁচ অর্থবছরে।

রাজস্ব লক্ষ্য আহরণের ঘাটতি দিন দিন বেড়ে চলার কারণ হিসেবে জানা গেছে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত না হওয়া। সেই সঙ্গে ভ্যাট আদায়ে আইন প্রণয়ন হলেও যে পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের আশা করা হয়েছিল, তা পূরণ না হওয়া। পাশাপাশি ভ্যাট আদায়ে গতি বাড়াতে যে অটোমেশন প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া হয়েছিল, তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, এর মধ্যে আহরণ হয় লাখ ৭১ হাজার ৬৫৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ১৩ হাজার ৩৪৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

এদিকে আগের অর্থবছরে বড় অংকের ঘাটতি থাকলেও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা আরো বাড়িয়ে লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে আহরণ হয় লাখ হাজার ৩১২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ঘাটতি রয়ে যায় ২২ হাজার ৬৮৭ কোটি লাখ টাকা। টানা দুই অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি বাড়তে থাকার পরও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা আরো বাড়ায়।

২০০৯-১০ অর্থবছরে উদ্বৃত্ত ছিল হাজার ৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে হাজার ৮০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল হাজার ৬৮৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। টানা তিন অর্থবছরে উদ্বৃত্তের পরের দুই বছরে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেয়। তবে এর পরের দুই অর্থবছরে ফের উদ্বৃত্তের ধারায় ফেরে এনবিআর।

বিগত কয়েক বছরে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি ক্রমেই বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান . মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, জাতীয় বাজেটে ব্যয়ের পরিমাণ যে হারে বেড়েছে কিন্তু রাজস্ব আহরণের সে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সক্ষমতা, সুযোগ সম্ভাবনা সে হারে বাড়েনি বা বাড়ছে না। পাশাপাশি যে অর্থনীতি থেকে রাজস্ব আহরিত হবে, সেই অর্থনীতি যথা অবস্থানে নেই, অর্থাৎ যেসব খাত বা ক্ষেত্র থেকে মোটা দাগে ট্যাক্স ভ্যাট শুল্ক আসে, সেখানে (যেমন ব্যাংক, পুঁজিবাজার, আমদানি, অবকাঠামো নির্মাণ ইত্যাদি) অস্থিরতা। এছাড়া মেগা প্রকল্পসহ অনেক ক্ষেত্রেই শুল্ককর অব্যাহতির ফলে রাজস্ব আয় সীমিত হয়ে পড়ছে এবং বড় দাগে ব্যয় বাড়তে থাকলেও রাজস্ব আহরণের উপায় বা সুযোগ সৃষ্টি বা সংস্কার কার্যকর না থাকা বা বিলম্ব হওয়াও রাজস্ব আয়ে ঘাটতি বৃদ্ধির কারণ। তিনি আরো বলেন, ভ্যাট আদায় বৃদ্ধিকল্পে প্রণীত নতুন আইন প্রবর্তন প্রয়োগ, শুল্ক কর আদায়ের ক্ষেত্রে অটোমেশন কিংবা শুল্ক কর আইনের যুগোপযোগীকরণের কাজ বিলম্ব হয়েই চলছে। এনবিআরে দক্ষ জনবল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া সরকারি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা প্রতিষ্ঠান থেকেও সরকারের প্রাপ্য শুল্ক-কর এবং অন্যান্য আয় বা পরিশোধ্য ঠিকভাবে আহরণ হচ্ছে না।

বিষয়ে এনবিআরের সদস্য (কর নীতি) আলমগীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা যখন নির্ধারণ করা হয় তখন এক ধরনের প্রেডিকশন থাকে, তারপর বছর শেষে গিয়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। গত বছরে একটা প্রেডিকশন ছিলভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হবে, এর ফলে রেভিনিউ বাড়বে। কিন্তু তা হয়নি। এছাড়া লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যার কারণে পুরো লক্ষ্যমাত্র অর্জন করা সম্ভব হয় না। আবার অনেক সময় লক্ষ্যমাত্রা বেশি দেয়া হয়, কারণ যাতে আমাদের আদায়ের উদ্যোগটাও বেশি থাকে।

বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, লক্ষ্যমাত্রাগুলো খুবই আর্টিফিসিয়ালি। জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়। যেটা অর্জন করা সম্ভব নয়। এনবিআরে গত ১০-১৫ বছরে ওই রকম কোনো রিফর্ম হয়নি। যা হয়েছে ছোট ছোট রিফর্ম। অটোমেশনও হয়নি। যার কারণে এনবিআরের পক্ষে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব না।

তিনি বলেন, সরকার যদি অবস্থা থেকে এনবিআরকে বদলাতে চায় তাহলে আমার পরামর্শ হবে একটা মধ্যমেয়াদি পাঁচ বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সেটার অধীনে পুরো এনবিআর প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। আর এনবিআরে নীতি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে আলাদা করে দিতে হবে। তবে এর জন্য যে রাজনৈতিক দৃঢ়তা দরকার, সেটা আবার আমাদের সরকারের নেই। সরকারের স্বার্থেই এমনটা করা উচিত।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন