মঙ্গলবার | জুন ০২, ২০২০ | ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

সত্যি বলতে সময়টা সহজ নয়

রুহিনা ফেরদৌস

পৃথিবীর মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও যাপন ভেস্তে দিয়েছে করোনাভাইরাস। আবির্ভাবকালের কিছুদিনের মধ্যেই মহামারী খেতাব ঝুলিতে পুরে করোনা বহাল হালে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার সংক্রমণ। পৃথিবীর মানুষ, যারা কিনা স্ব-স্ব গোলকে ঘুরপাক খেতে খেতে নিজ বিত্ত-বৈভবের গণ্ডি গড়ছিল, তাদের চক্রবাহু ভেঙে পড়েছে চলমান আঘাতে। ভেঙে পড়ছে তিল তিল করে গড়ে তোলা সুরক্ষা প্রাচীরগুলো। করোনা এমন এক গুপ্তঘাতক, যে শুধু এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়ায় না, ওত পেতে পড়ে থাকে রাস্তায়, গলিতে, চৌকাঠে; ভেসে থাকে বাতাসে। করোনার মতো এমন অতিমারী বিরল। অতীতে পৃথিবীতে যেসব ঘাতক ব্যাধি একে একে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছে, করোনা এর অনেকগুলোকেই নিজের ভয়াবহতার মাপকাঠিতে পরাজিত করতে যাচ্ছে বলেই অনুমান হয়। করোনার ব্যক্তিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তার এখনই পরিমাপ করা সম্ভব নয়। বৈশ্বিক করোনাভাইরাস সংকটের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে তাই অর্থনীতিবিদরা এখনো হিসাব কষছেন। তাই বলছি, বর্তমান সময়টা সতিকার অর্থেই কঠিন।

সবচেয়ে কঠিন এ সময়টাকে শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে প্রয়োজন নীতিগত প্রতিক্রিয়া বা সাড়া প্রদানের বিষয়টি। আমরা কতটা প্রস্তুত, তার ওপর নির্ভর করছে আমাদের ভবিষ্যত্। বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রপ্রধানরা তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে ভাইরাসটির সংক্রমণ ঠেকাতে এবং সাধারণের জীবন বাঁচাতে এর বিস্তার রোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। চীন যেমন ভাইরাসটির আঁতুড়ঘর উহানকে পুরোপুরি লকডাউন করে রেখেছিল। ইতালি, স্পেন, ফান্সসহ অনেক দেশ তাদের বিভিন্ন প্রদেশে এ ব্যবস্থা জারি করেছে। দাম্ভিক ট্রাম্প প্রশাসন ভাইরাসটি নিয়ে এককভাবে চীনকে কটাক্ষ করতে না ছাড়লেও তারা কঠোরভাবে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি সব ধরনের গণ-আয়োজন বাতিল করেছে।

করোনা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সর্বাত্মকভাবে নীতিগত সাড়া প্রদানের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তার ব্যাখ্যা হিসেবে বলছি—প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে মানুষ যখন নতুনভাবে অর্থনৈতিক সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করছিল, তখন অতর্কিত শত্রুর মতো ধেয়ে আসে স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী। ১৯১৮-১৯ সাল; কেবল আমেরিকায় ঝরে পড়েছিল ৬ লাখ ৭৫ হাজার প্রাণ। আর বিশ্বব্যাপী মৃত্যু হয়েছিল পাঁচ কোটি মানুষের। আক্রান্ত হয়েছিল বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাত্ তত্কালীন ৫০ কোটি মানুষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় স্প্যানিশ ফ্লুর ক্ষয়ক্ষতি কম নয়। যদিও স্প্যানিশ ফ্লুর সে বাস্তবতা কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব কী হতে পারে সে সম্পর্কে ধারণা দিতে সক্ষম নয়। অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা, এর প্রভাব আরো গভীর ক্ষত সৃষ্টি করবে।

হার্ভার্ডের প্রফেসর কারম্যান এম রেইনহার্ড দেখিয়েছেন ১০০ বছর আগে ইনফ্লুয়েঞ্জার অভিঘাতে আক্রান্ত হয়েছিল মার্কিনসহ বিশ্ব অর্থনীতি। ১৯১৮ সালে যখন স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছিল ঝড়ের গতিতে, তখন অর্ধেকেরও বেশি ব্যবসা পড়ে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অর্থাত্ ১৯১৮ সালে মার্কিনিদের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৬ শতাংশে পৌঁছলেও ফ্লুর সংক্রমণ-পরবর্তী তা ১ শতাংশে হ্রাস পায়। 

কভিড-১৯-এর সংক্রমণ শুরুর আগে থেকেই চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা—সবকিছুর মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি লড়ছিল অদৃশ্য এক অর্থনৈতিক মন্দার বিরুদ্ধে। সে লড়াইয়ে মানুষের মিত্রশক্তির বিপরীতে করোনার মতো মহামারীর অবস্থান নিকট ভবিষ্যতে পৃথিবীর জন্য বড় অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে দিল। বিশ্বজুড়েই সে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ইতালির পর একে একে ধসে পড়ছে স্পেন, ফান্সের রক্ষাব্যুহ। আমেরিকায় বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা। এশিয়ায় ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের অবস্থাও নাজুক বলা চলে। আমাদের হাতে যে সময় ছিল, খরচ হয়ে গেছে। আমরা স্কুল, অফিস বন্ধ করে এবং সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সাধারণের করোটিতে করোনার ভয়াবহতা ছড়িয়ে দিতে পারিনি। চাপা আতঙ্ক ও অস্বস্তি এড়িয়ে মানুষ ছুটছে কোলাহলে, আয়োজনে। আমাদের আচরণ আমাদের জানিয়ে দিয়েছে যে আমাদের জন্য চাই আরো আরোপ, আরো কঠিন কড়া কার্যক্রম।

সারা বিশ্বে ভেঙে পড়েছে চাহিদা ও সরবরাহ কার্যক্রম। আমরা হইহই করে চাল-ডাল-তেল মজুদ করছি। অর্থনীতিবিদরা হিসাব কষতে শুরু করেছেন যে করোনা প্রভাব ২০০৭-০৯ সময়কালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। যদিও করোনা কোনো আর্থিক সংকট রূপে শুরু হয়নি, তবে এটি যেহেতু স্থানীয় বা কোনো বিশেষ জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়, তাই এর পদ্ধতিগত তীব্রতা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। কেননা যখনই অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যাবে বা সীমিত হবে, তার পরিণতি হিসেবে চাকরি খোয়ানো মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে। বাকিটা যে কেউ কল্পনা করে নিতে পারেন।

২০০৮ সালে আর্থিক সংকটের আঁচড় আমাদের গায়ে তেমন না পড়লেও এবার করোনার প্রভাবে সৃষ্ট সংকট এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। গৃহস্থ আয়-ব্যয়ের হিসাব খাতায় নতুন করে খরচ কমানোর অংক কষতে হবে। খোদ আমেরিকার অর্থনীতিবিদরাই সংশয় প্রকাশ করছেন এই মর্মে যে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের তুলনায় ভয়াবহ পরিস্থিতি সামলাতে হবে।

এদিকে রাশিয়া ও সৌদি আরবের জন্য যেন করোনার আঘাতও যথেষ্ট নয়, তেলের মূল্যযুদ্ধ নিয়ে দুই পক্ষের পারস্পরিক লড়াই বৈশ্বিক জ্বালানি সক্ষমতাকে কেবলই কোণঠাসা করছে। কে না জানে, এতে সরবরাহ-শৃঙ্খলায় বাধা তৈরি হবে, আক্রান্ত হবে পরিষেবা খাত, গোটা ব্যবস্থা অচিরেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়বে। আমাদের শঙ্কা, গোটা অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাবে, আক্রান্ত হবে দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্পগুলো। 

২০০৩ থেকে ২০১৩ সালে চীনের বার্ষিক গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশের ওপরে। গত এক দশকে নিম্নমধ্যম থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ চালক চীন। তবে বাণিজ্যযুদ্ধ আর বৈশ্বিক অদৃশ্য আর্থিক মন্দা ২০২০ সালের শুরুর দিকেই চীনের ঋণ প্রদানের পরিধিকে সংকুচিত করে। সেবাস্তিয়ান হর্ন, ক্রিস্টোফ ট্রেবেস ও ক্রেম্যান এম রেইনহার্ট তাদের চায়না’স ওভারসিস লেন্ডিং শীর্ষক গবেষণাপত্রে বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতি বিভিন্ন সময় বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিপর্যয়, বিশ্বব্যাপী পণ্যের দামের হতাশাজনক পতন ও অর্থনৈতিক মন্দার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। তবে বর্তমান করোনা পরিস্থিতি আমাদের ঠিক পতনের কোন খাদে ফেলে দেবে তা এখনো নিশ্চিত অনুমান করা সম্ভব নয়। চরম সত্যিটা হচ্ছে, বিগত দিনের সংকট থেকে এবারের ধাক্কাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাই এটি মোকাবেলায় চাই জোরদার নীতিগত প্রতিক্রিয়া বা সাড়া প্রদান। লকডাউন ও সঙ্গনিরোধ নীতি আমাদের জীবন বাঁচিয়ে দিতে সক্ষম হলেও এর অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। 

আমাদের মনে রাখতে হবে বর্তমান জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা অচিরেই আরো একটি আর্থিক সংকটে রূপান্তরিত হতে পারে। তাই আমাদের নীতিনির্ধারকরা স্থানীয় ও বিশ্বপরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতি নির্ধারণ করছেন কিনা, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত চিন্তা-কাঠামোর বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে। হাতে কিন্তু সময় নেই। যা করার তা এখনই করা চাই। এরই মধ্যে আমরা যে সময়ক্ষেপণ করেছি, তার মাশুল গুনে পরিবর্তিত পদক্ষেপগুলো যদি আমরা সঠিক ও কার্যকরভাবে নিতে না পারি, তখন অদৃষ্টের প্রতি আহাজারি করে কোনো ফল বা সুফল হবে না।

শেষ কথা, বাংলাদেশ কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতির প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। তাই করোনা মোকাবেলার কর্মপন্থা তৈরির পাশাপাশি নিকট ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আর্থিক সংকট সামলানোর প্রস্তুতি নেয়ার বিকল্প বোধ করি নেই।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন