বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

শেষ পাতা

করোনা সংক্রমণ

ঢাকা দক্ষিণে হদিস নেই ৫২% বিদেশফেরতের

নিহাল হাসনাইন

নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে বিদেশফেরতদের তালিকা তৈরি করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) তালিকায় থাকা বিদেশফেরতদের মধ্যে ৫২ শতাংশেরই ঠিকানা অবস্থান এখনো শনাক্ত করতে পারেনি সংস্থাটি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব বিদেশফেরতকে শনাক্ত করে হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা না গেলে ভাইরাসটির সংক্রমণ বিস্তৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

ডিএসসিসির তথ্যমতে, মার্চ থেকে পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বিদেশ প্রত্যাগতের সংখ্যা হাজার ২৪০ জন। এর মধ্যে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ৫৯২ জনের ঠিকানা অবস্থান চিহ্নিত করে তাদের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকি ৬৪৮ জন লাপাত্তা। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা ঠিকানায় গিয়েও তাদের পাওয়া যায়নি। এসব মানুষের বর্তমান অবস্থান এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফোকাল পারসন ডা. মীর মুস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় পাসপোর্টে উল্লেখ থাকা ঠিকানা ধরে বিদেশফেরতদের শনাক্তের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৫৯২ জনের ঠিকানা অবস্থান চিহ্নিত করে তাদের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু বাকি ৬৪৮ জন বিদেশফেরতের পাসপোর্টে দেয়া ঠিকানায় গিয়ে তাদের পাওয়া যায়নি। 

নির্ধারিত ঠিকানায় অবস্থান না করে বিদেশফেরতদের আত্মগোপনে চলে যাওয়ার ঘটনা কেবল দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়ই নয়, রয়েছে সারা দেশেই। নিজেদের বিদেশ থেকে আসার তথ্য গোপন করে প্রবাসীরা অবস্থান করছেন স্বজনদের সঙ্গে। অংশ নিচ্ছেন নানা ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে। তবে এভাবে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিন না মেনে অন্যদের সংস্পর্শে আসায় তারা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছেন বলে মত বিশেষজ্ঞদের। 

এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সৃষ্ট রোগ কভিড-১৯ মোকাবেলায় সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ নির্মূল) আইন, ২০১৮ প্রয়োগের ঘোষণা দিয়ে একটি গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আইনটির বিধান না মানলে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, বিদেশ থেকে আসা অনেক প্রবাসী তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরা কোয়ারেন্টিনের শর্ত ঠিকভাবে পালন করছেন না। তারা অনেকের সংস্পর্শেও যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে নিয়ম না মানলে নির্দেশিত পন্থায় যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করলে এই আইনের আওতায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ নির্মূল) আইন, ২০১৮-এর আওতায় করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয় না মানলে একজন ব্যক্তি আইনে অপরাধী বলে চিহ্নিত হতে পারেন, সেটিও ব্যাখ্যা করা হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে। আইন অনুযায়ী, কোনো অস্থায়ী বাসস্থান বা আবাসিক হোটেল বোর্ডিংয়ে অবস্থানকারীদের কেউ সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন জেলা প্রশাসককে জানাবেন ওই স্থানের মালিক।

২১ মার্চ থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে আসা সব যাত্রীর হাতে অমোচনীয় কালিতে পরবর্তী ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার তারিখ সংবলিত সিল দিয়ে দিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। তবে মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের কেবল মৌখিকভাবে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলা হয়েছিল। তাদের অধিকাংশই হোম কোয়ারেন্টিনে না থেকে নানা সামাজিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছেন। 

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দেশে ফেরা প্রবাসীদের সংশ্লিষ্ট থানায় তাদের অবস্থান নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে অনেকে নির্দেশনা মেনে সংশ্লিষ্ট থানায় তাদের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন। আর যারা এখনো যোগাযোগ করেননি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট থানায় নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এর পরও যারা নির্দেশনা অমান্য করবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবেলায় পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সভা থেকে পুলিশ মহাপরিদর্শক দেশে ছড়িয়ে পড়া প্রবাসীদের অবস্থান শনাক্তের জন্যও মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেন। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা প্রবাসীদের তালিকা ধরে তাদের অবস্থান শনাক্তে কাজ শুরু করেছেন পুলিশ সদস্যরা। কিন্তু পাসপোর্টে উল্লেখ করা ঠিকানায় পাওয়া যাচ্ছে না অধিকাংশ প্রবাসীকে। তাদের খুঁজতে বেগ পেতে হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাঠ পর্যায়ের সদস্যদেরও।

দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদেশফেরত এমন মানুষকে খুঁজছেন পুলিশ সদস্যরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বিদেশফেরত ৯৬ জন প্রবাসীর সন্ধানে মাঠে নেমেছে পুলিশ। মূলত তাদের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে কাজ করছেন তারা। উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাতকানিয়ায় চারজন প্রবাসী হোম কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন। বাকিদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।

গোয়েন্দা সংস্থার কাছে চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে বিদেশ থেকে ঝালকাঠিতে ফেরা হাজার ২৩ জনের তালিকা পাঠানো হয়। অথচ জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এখন পর্যন্ত তাদের কাছে ১৪৫ জনের তালিকা রয়েছে, যাদের সবাই হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন। ঝালকাঠি জেলা পুলিশে কর্মরত একাধিক সদস্য জানান, বিদেশফেরত ব্যক্তিদের পাসপোর্টে উল্লেখ করা ঠিকানা দিয়ে তাদের অবস্থান শনাক্তের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে পাসপোর্টে উল্লেখ করা ঠিকানায় এখন আর ওই প্রবাসীর পরিবার থাকেন না। আবার কিছু ঠিকানা সঠিক থাকলেও সেখানে গিয়ে প্রবাসীদের পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারের পক্ষ থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় অবাধে ঘোরাফেরা করা বিদেশফেরত ছয়জনকে এরই মধ্যে শনাক্ত করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেয়া হয়েছে। 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন