বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

দেশের খবর

করোনাভাইরাসের প্রভাব

সিরাজগঞ্জে প্রতি লিটার দুধ বিক্রি হচ্ছে ৫ টাকায়

অশোক ব্যানার্জী সিরাজগঞ্জ

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত বৃহস্পতিবার থেকে আগামী এপ্রিল পর্যন্ত সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। একই সঙ্গে ওষুধ, মুদি কাঁচাবাজার বাদে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের দোকানপাট। বন্ধের আওতায় রয়েছে মিষ্টি চায়ের দোকানও। অন্যদিকে বাজারে চাহিদা না থাকায় দুধ সংগ্রহ অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি মিল্কভিটা কারখানা। অবস্থায় চরম বিপাকে পড়েছেন সিরাজগঞ্জের দুগ্ধখামারিরা। বাজার বন্ধ থাকলেও দুধ উৎপাদন থেমে নেই। তাই বাধ্য হয়ে পানির দামে বিক্রি করছেন দুধ। গতকাল ননীবিহীন প্রতি লিটার দুধ বিক্রি হয়েছে ননীযুক্ত ১০ টাকায়। অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ১০ দিনে পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না বলে জানিয়েছেন খামারিরা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিরাজগঞ্জ জেলায় প্রায় ২২ হাজার খামার রয়েছে। এসব খামারে প্রতিদিন প্রায় আট লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে সমবায় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি মিল্কভিটা কারখানা প্রতিদিন গড়ে লাখ ২০ থেকে লাখ ৪০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করে। এছাড়া আড়ং, প্রাণ  ডেইরি, ফার্মফ্রেশ, অ্যামোমিল্ক, আফতাব, রংপুর  ডেইরি, ব্র্যাকসহ প্রায় ২০টি দেশী প্রতিষ্ঠান তরল দুধ সংগ্রহ প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করে। এসব প্রতিষ্ঠানের দুধ সংগ্রহের পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ লিটার। বাকি দুধ স্থানীয় মিষ্টি চায়ের দোকানে বিক্রি করা হয়। এছাড়া কিছু খামারি আবার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দুধ দিয়ে ঘি, ছানা তৈরি করে বিক্রি করেন। কিন্তু দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারি ঘোষণায় বন্ধ রয়েছে ঢাকাসহ দেশের সব এলাকার মিষ্টির দোকান। এমনকি পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানও বন্ধ। সরকারি ছুটি ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষ ঢাকা ছাড়ার পর সেখানেও তিনদিন ধরে দুধ বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে। 

এদিকে দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই খামারি কৃষকদের দুধ বিক্রির প্রধান ভরসা। কিন্তু বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই দুধ নেয়া কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া এলাকায় শতাধিক ছানা তৈরির কারখানায় প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটার দুধের প্রয়োজন হতো। কিন্তু দোকান বন্ধ থাকায় তারাও দুধ সংগ্রহ করছে না।

খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাহিদা না থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামে দুধ বিক্রি করছেন তারা। বাসাবাড়িতে প্রতি লিটার ননীযুক্ত দুধ ২০-২৫ টাকা বিক্রি করা হলেও অধিকাংশ এলাকায় ১০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তাছাড়া ননীবিহীন প্রতি লিটার দুধ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।

শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি ওয়াজ আলী জানান, ননীবিহীন দুধ প্রতি লিটার আগে বিক্রি হতো ২০ থেকে ৩০ টাকায়। কিন্তু এখন তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র টাকায়। তার পরেও বাজারে ক্রেতা নেই। তাই কিছুটা লোকসান কমাতে দুধ থেকে যন্ত্রের মাধ্যমে পুরো ননী তুলে নেয়া হচ্ছে। এরপর তা টাকা লিটার দরে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে যারা ননী আলাদা করতে পারছেন না, তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। দুধ বিক্রি করতে না পেরে তারা ভ্যানে করে দুধ নিয়ে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করছেন। কিন্তু তাতে উৎপাদন খরচই উঠছে না খামারিদের।

পোতাজিয়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির ম্যানেজার মাসুদ রানা বণিক বার্তাকে বলেন, সমিতিতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে সাত হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে মিল্কভিটা দুধ সংগ্রহ কমিয়ে দেয়ায় আমরা কমিয়ে দিয়েছি। এখন প্রতিদিন তিন হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে খামারিরা কম দামে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ওপর হঠাৎ করেই গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা চরম লোকসানে পড়ে দিশেহারা।

শাহজাদপুর উপজেলার পোরজনা ইউনিয়নের উল্টাডাব গ্রামের খামারি হাবিবুর রহমান বলেন, আমার খামারে প্রতিদিন হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হয়। মিল্কভিটা প্রাণ ডেইরিতে দুধ সরবরাহ করি। কিন্তু সরকারি ঘোষণার পর এসব কোম্পানি দুধ সংগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু দুধ উৎপাদন তো আর বন্ধ করা যায় না। তাই বাকি দুধ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে দিচ্ছি। এছাড়া এলাকায় ১০ টাকা লিটার দরে কিছু দুধ বিক্রি করেছি। কিন্তু তাতে উৎপাদন খরচই তো উঠছে না।

এসব বিষয়ে বাঘাবাড়ি মিল্কভিটা কারখানার সহকারী ব্যবস্থাপক ডা. এএফএম ইদ্রিস আলী বণিক বার্তাকে বলেন, মিল্কভিটা গড়ে প্রতিদিন (সকাল বিকাল দুই শিফটে) লাখ ২০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করে। কিন্তু করোনার প্রভাবে ঢাকা বা দেশের বিভিন্ন জায়গায় দুধের চাহিদা ব্যাপক হারে কমে গেছে। কারণে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সকালে দুধ সংগ্রহ বন্ধ রাখা হয়েছে। শুধু বিকালে ৫০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ আবার নির্দেশ দিলে নির্দিষ্ট পরিমাণ দুধ সংগ্রহ করা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন