বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলা

অতীতের মতো এ দুর্যোগ মোকাবেলায় এনজিওগুলো সক্রিয় ভূমিকা রাখুক

কয়েকটি এনজিও ছাড়া করোনা মোকাবেলা, প্রতিরোধে সহায়ক কার্যক্রম পরিচালনায় বড় কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এনজিওর সংখ্যা, আর্থিক পরিমাণ, শাখা প্রভৃতির দিক দিয়ে বিশ্বের এক নম্বর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করলেও করোনার মতো ভয়াবহ ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় দৃশ্যমান কোনো তত্পরতা নেই তাদের মধ্যে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্বল্পমূল্যের করোনা শনাক্ত পদ্ধতি উদ্ভাবন, ব্র্যাকের পিপিই মাস্ক তৈরির কার্যক্রম, কোস্ট ট্রাস্টসহ স্থানীয় কিছু এনজিওর সীমিত পরিসরে সচেতনতা বৃদ্ধির পদক্ষেপের বাইরে আর কিছুই চোখে পড়ছে না। বরং স্বেচ্ছাসেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম অধিক দৃশ্যমান।

কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এনজিওগুলোর কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি, গবেষণা কার্যকরী প্রকল্প বাস্তবায়নেরই ফসল। ধানসহ বিভিন্ন ফসলের নতুন নতুন উন্নত জাতের উদ্ভাবন, কৃষকদের কারিগরি সহায়তা প্রদান মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বীজ উত্পাদন, মত্স্য চাষ, অংশীদারিত্বমূলক পশুপালন, গরু মোটাতাজাকরণ, ছাগল পালন, দুগ্ধখামার, পোলট্রি, উন্নত জাতের ঘাসের চাষসহ বহু প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিভিন্ন এনজিও। পাশাপাশি নতুন নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণ সম্পৃক্ত করে উত্পাদন বৃদ্ধি করা, বাজারজাত ব্যবস্থা উদ্যোক্তা তৈরি করে দেশকে সমৃদ্ধিশালী করা এবং বহু লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দেশের বেকারত্বের সংখ্যা হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ এনজিওর অফিস বন্ধ করে বাসায় বসে থাকা ছাড়া কোনো কার্যক্রম নেই। দুর্দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া এনজিওগুলোর হাত গুটিয়ে নেয়া হতাশার বৈকি।

বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক উন্নয়ন বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষা স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রগতির পেছনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সাফল্য সারা বিশ্বে প্রশংসা অর্জন করেছে। খাবার স্যালাইন তৈরি, ডায়রিয়া প্রতিরোধ, দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের মাধ্যমে মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলাসহ সামাজিক নানা অর্জন সত্ত্বেও মহামারী প্রতিরোধের মতো কার্যক্রমে এনজিওগুলোর দুর্বলতা প্রকাশিত হলো এবার। তাদের প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে সচেতনতা তৈরির মতো পদক্ষেপও অধিকাংশ এনজিও পরিচালনা করতে পারছে না। হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো কার্যক্রমেও তাদের অংশগ্রহণ সীমিত। অথচ আফ্রিকার অনেক দারিদ্র্যপ্রবণ দেশে বিষয়ে সচেতনতা গড় মানের ওপরে বলে জানা যাচ্ছে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে করোনার প্রাদুর্ভাব কমিয়ে আনা যায়। চীন বিষয়ে সারা বিশ্বের কাছে মডেল হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। আমাদের দেশে করোনা নিয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি দৃশ্যমান। এক্ষেত্রে এনজিওগুলো দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা তাদের দক্ষ জনবলের মাধ্যমে সহজে আলোচ্য প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করতে পারে।

নিজস্ব তহবিল দিয়েই বেশকিছু এনজিও সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের বেশির ভাগই মাস্ক স্যানিটাইজার উত্পাদন করছে এবং বিনা মূল্যে বিতরণও করছে। কিছু এনজিও তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো কোয়ারেন্টিন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছে। এনজিও পরিচালিত কমিউনিটি রেডিও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সচেতনতামূলক নানা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। স্থানীয় উপজেলা, জেলা বিভাগভিত্তিক এনজিওগুলো বিজ্ঞাপন বানিয়ে নিজেদের কাজের বিষয়ে প্রচারণা চালাতে পারে। স্থানীয় এনজিওগুলোকে উৎসাহিত করতে সরকারের তরফ থেকেও সহায়তার হাত প্রসারিত করতে হবে। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কীভাবে এনজিওগুলোর কাজ আরো সুচারুভাবে সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ ফলাফল নিশ্চিত করা যায়, তার পরিকল্পনা প্রয়োজন। ভুললে চলবে না, এনজিওগুলো নেপথ্য নায়ক হিসেবে স্থানীয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক সামাজিক শক্তি।

শহর গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য কাজবিহীন সময়ে খাদ্যসহ আনুষঙ্গিক সহায়তা প্রদানের মতো কার্যক্রমও নিতে পারে এনজিওগুলো। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো তাদের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে বলে খবর মিলছে। কিছু এনজিও সীমিত পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দৃশ্যমান। এতে প্রকৃতরা সুফল পাবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অথচ প্রতিটি এনজিও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম গতিশীল করার শপথ নিয়েই তাদের কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্স নিয়েছে। দেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সরকারের একার পক্ষে করোনার মতো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধ কঠিন বৈকি। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ এবং তার জন্য একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করতে হবে সর্বাগ্রে। ওষুধ ছিটানো, দরিদ্রদের মধ্যে খাদ্য-ওষুধ বিতরণের মতো পদক্ষেপে কীভাবে এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়, তা এখনই পরিকল্পনা করতে হবে। প্রত্যাশা থাকবে এনজিওগুলো সরকারকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে এবং অতীতের মতো করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় তাদের সব শক্তি নিয়োগ করে বিশ্বের কাছে নতুন উদাহরণ তৈরি করবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন