বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

কভিড-১৯ মহামারী: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা

এসএম জাকারিয়া


করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় যেসব উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে, তার অতিরিক্ত কিছু প্রস্তাব কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য নিম্নে উপস্থাপিত হলো:

ক. ‘কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় জাতীয় টাস্কফোর্স (করোনাটাস্ক)’ বা ‘National Task Force for Tackling COVID-19 Pandemic (CoronaTask)’  নামে

একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। ওই টাস্কফোর্সের দায়িত্ব-কর্তব্য হতে পারে নিম্নরূপ:

১. কভিড-১৯-এর প্রকোপ নির্মূলের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের সব পলিসি, নীতি, কৌশল ও পদক্ষেপ বা কর্মোদ্যোগ চিহ্নিতকরণ ও বাস্তবায়ন;

২. সরকারি পর্যায়ে, ব্যবসায় সার্কেলে, এনজিও পরিসরে, স্থানীয় সরকার লেভেলে, বিভিন্ন সমিতি, সংঘ, ক্লাব, ফোরাম ইত্যাদি পর্যায়ে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে লক্ষ্য নির্ধারণ ও কর্মকৌশল চিহ্নিতকরণ। এটি করতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইটি বিশেষজ্ঞ, জীবাণুবিদ, ওষুধ প্রস্তুতকারক, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মী, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ নিয়ে লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাপ্রোচের (এলএফএ) আওতায় টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স নিয়ে কর্মশালা করা যেতে পারে। দৈনিক ভিত্তিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় কর্মশালা অনুষ্ঠান এবং তার সুপারিশমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ;

৩. চলমান দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের জন্য একটি বাজেট তৈরি করা এবং যতদিন দুর্যোগমুক্তি না হয় ততদিন বাজেট সংশোধন/পরিবর্তন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া;

৪. কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় যেসব কাজ করতে হবে তা চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত করা;

৫. কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি কাজ করবেন, তাদের চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত করা;

৬. প্রণীত তালিকা অনুযায়ী চিহ্নিত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সহায়তায় মহামারী নিরোধক কার্যক্রম বাস্তবায়ন;

৭. মহামারী নিরোধক কার্যক্রম বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কর্মসূচি ও কর্মপন্থায় সময় সময় পরিবর্তন নিশ্চিত করা। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করা বা দায়িত্বে অবহেলা আবিষ্কৃত হলে শাস্তির ব্যবস্থা করা।

৮. দেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ওষুধ ও ভ্যাকসিন তৈরির সম্ভাবনা পরীক্ষা করা এবং সে লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা।

৯. কভিট-১৯ প্রতিরোধে জনগণের সার্বিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাপকভিত্তিক প্রচারণা চালানোর জন্য প্রচারণা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দান। তারা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়াদি উল্লেখপূর্বক মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে এমন নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণা চালানোর ব্যবস্থা করবেন। প্রচারণায় সব বিষয়ের উল্লেখ থাকতে হবে যেমন কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশন বলতে কী বোঝায়, কীভাবে কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা যাবে, কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনে থাকা মানুষকে কীভাবে খাদ্য দিতে হবে, কীভাবে কাপড় দেয়া যাবে, কীভাবে তার কাপড় ধোয়া যাবে, কেউ তার রুমে ঢুকতে পারবে কিনা ইত্যাদি। প্রচারণায় ব্যক্তি পর্যায়ে বা কমিউনিটি পর্যায়ে আর কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায়, তার বিস্তারিত উল্লেখ থাকতে হবে। প্রচারণা ম্যাটেরিয়াল সম্ভবত পরিবর্তন হতে থাকবে, প্রচারণা ব্যবস্থাও সেভাবেই বদলাতে থাকবে।

১০. টাস্কফোর্স বা করোনাটাস্ক কভিড-১৯ বিষয়ে জনগণকে অবগত করা, তথ্য দেয়া, পরামর্শ দেয়া, সরকারের কোনো নোটিস বা বিজ্ঞপ্তি বা বিবৃতি জনসমক্ষে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সরকার একমাত্র মুখপাত্র হিসেবে কাজ করবে।

১১. কভিড-১৯ বিষয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে কাজ করার লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা ডেভেলপ করবে। তাতে টেকনিক্যাল সাহায্য আদান-প্রদান, আর্থিক সাহায্য আদান-প্রদানসহ অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতার বিশদ পরিকল্পনা থাকবে। দুর্যোগ-পরবর্তী বিষয়ে বিদেশের সঙ্গে কীভাবে কাজ করা হবে, কীভাবে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে সে বিষয়ে উল্লেখ থাকতে হবে।

১২. ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক যেকোনো দুর্যোগ বা বিপর্যয় কীভাবে মোকাবেলা করা যাবে সে বিষয়ে একটি পরিকল্পনা তৈরি করা।

খ. ‘টাস্কফোর্স বা করোনাটাস্ক’ নিম্নরূপে গঠিত হতে পারে:

১. ‘চিফ টাস্ক মাস্টার’—কমপক্ষে ষাটোর্ধ্ব, অভিজ্ঞ, জ্ঞানে ভারী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও সামজিক সম্মানে ঋদ্ধ একজন অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্ভেন্ট বা একজন ব্যবসায় কর্মাধ্যক্ষকে এ পদে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। তার র‌্যাঙ্ক ও স্ট্যাটাস একজন ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টারের সমমানের হতে হবে।

টাস্ক মাস্টারের পদে নিয়োজিত হবেন একাধিক ব্যক্তি, যথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনামন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সমাজকল্যাণমন্ত্রী, ক্যাবিনেট সেক্রেটারি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সেনাবাহিনী প্রধান, পুলিশের আইজি, ব্যবসায় খাতের দুজন প্রতিনিধি, এনজিও খাতের দুজন প্রতিনিধি, শিক্ষা খাতের দুজন প্রতিনিধি (গবেষক), তিনজন ডাক্তার, অন্য কোনো সদস্য বা টাস্ক মাস্টার প্রয়োজন অনুযায়ী।

গ. টাস্কফোর্স বা করোনাটাস্ক প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। টাস্কফোর্সের ক্ষমতার উত্স হবেন প্রধানমন্ত্রী। জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সংসদীয় কমিটি চাইলে বা প্রয়োজনে টাস্কফোর্সকে প্রশ্ন করতে পারবে বা জবাবদিহি করতে পারবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্য শেষ হলে টাস্কফোর্স সম্পাদিত কাজের বিবরণী, কাজের ফল বা ইমপ্যাক্ট, সংশ্লিষ্ট খরচ, ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা, সুপারিশমালাসহ একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন সংসদের সামনে উপস্থাপন করবে।

ঘ. টাস্কফোর্সের মেয়াদ হবে ছয় মাস, কাজ শুরুর দিন থেকে। তবে তা অবস্থাভেদে বর্ধিত বা কর্তন করা যেতে পারে। এ বিষয়ে টাস্কফোর্স নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠাবে। পক্ষান্তরে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী নিজে টাস্কফোর্সের মেয়াদ বর্ধিত বা কর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

ঙ. সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন খোলা জায়গায় যেমন স্টেডিয়াম, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে, টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে, খালি আবাসিক এলাকায় যেমন পূর্বাচল আবাসিক এলাকায় ‘তাঁবু হাসপাতাল’ বা ‘টেন্ট হসপিটাল’ স্থাপন করে তা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। এরই মধ্যে চিহ্নিত হাসপাতালের অতিরিক্ত এ ব্যবস্থা নেয়া দরকার, পরিস্থিতির অবনতি হলে তা সামাল দেয়ার জন্য। বিদ্যমান দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রয়োজন মতো ব্যবহার করার লক্ষ্যে প্রস্তুত রাখা দরকার।

চ. আপাতত ৫ হাজার কোটি টাকার একটি ফান্ড রেডি রাখা দরকার। অবস্থাভেদে এটি বাড়তে পারে বা কমতে পারে। এ ফান্ড থেকে কভিড-১৯-এর আঘাতে বিপর্যস্ত প্রবাসী, ছোট ও প্রান্তিক ব্যবসায়ী এবং ভালনারেবল ব্যক্তিদের সাহায্য করা যেতে পারে। দ্রুত এটি শুরু করা দরকার, তাহলে বিপর্যস্ত মানুষ বেঁচে থাকতে পারবে। অন্যদিকে করোনা বিস্তার রোধে গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন সহজতর হবে। প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ফান্ডও এখন জনগণের দুর্দিনে আংশিক হলেও স্বস্তি আনতে পারে।

এসএম জাকারিয়া: সাবেক ব্যাংকার ও ব্যবসায় কর্মাধ্যক্ষ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন