শুক্রবার| এপ্রিল ০৩, ২০২০| ১৮চৈত্র১৪২৬

সম্পাদকীয়

মহামারীর সংকট ও বিশ্বনেতৃত্বের চাপের পরীক্ষা

রঘুরাম রাজন

বৈশ্বিক পর্যায়ে মহামারী হিসেবে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পুরো বিশ্ববাসীকে রীতিমতো হকচকিয়ে দিয়েছে এবং যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, এখন বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পাবে। তবে সংকট আমাদের এটিও মনে করিয়ে দেয় যে আমরা এক গভীরভাবে সংযুক্ত বিশ্বে বাস করি। মহামারীর যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিসৃষ্ট সুবর্ণ সুযোগ (সিলভার লাইনিং) থাকে, সেটি হলো অত্যন্ত জরুরি জনসংলাপের সম্ভাবনা; যা সমাজের সবচেয়ে অরক্ষণীয়/নাজুক গোষ্ঠীর, বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা, পেশাদার নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞদের গুরুত্বের ওপর অধিক মনোযোগ দেবে।

জনস্বাস্থ্যে সরাসরি প্রভাব ছাড়াও সংকটের ভয়াবহতা অন্তত দুটি প্রত্যক্ষ ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে। প্রথমটি হলো, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার কারণে উৎপাদনে বড় ধরনের অভিঘাত। চীন ওষুধের মৌলিক রাসায়নিক উৎপাদন বন্ধ রাখায় ভারতে জেনেরিক ওষুধের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ জাহাজীকরণ হ্রাস পাবে। দ্বিতীয়টি হলো চাহিদায় অভিঘাত। মানুষ সরকারগুলো করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেয়ায় রেস্তোরাঁ, শপিং মল পর্যটক গন্তব্যগুলোয় মানুষের ব্যয়ের পতন ঘটাবে, ঘটছেও।

কিন্তু একটি সম্ভাব্য অপ্রত্যক্ষ পরাঘাতও (আফটারশক) আছে। যেমন উৎপাদন হ্রাসের একটি সমন্বিত প্রচেষ্টায় রাশিয়া সৌদি আরবের সম্মত হতে না পারার ব্যর্থতাসৃষ্ট তেলের দামে সাম্প্রতিক পতন। বিস্তার হওয়া এসব অভিঘাত এবং অন্য অভিঘাতগুলো এরই মধ্যে ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পগুলোকে চাপে ফেলছে; যা কর্মীদের কর্মচ্যুতি, ভোক্তার আস্থা হারানো এবং ভোগে সামষ্টিক চাহিদা আরো হ্রাস করতে পারে।  

অধিকন্তু দমিত বা দেনায় জর্জরিত ব্যাপকভাবে লেভারেজড প্রতিষ্ঠানগুলো/এনটিটিজ (যুক্তরাষ্ট্রের শেল এনার্জি উৎপাদক; উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভোগ্যপণ্যনির্ভর দেশগুলো) বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। এটি তারল্য ঋণপ্রবাহ কমাতে পারে এবং আর্থিক পরিবেশকে নাটকীয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা এতদিন প্রবৃদ্ধির জন্য পৃষ্ঠপোষকতামূলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।

সামনে ভীতিকর সব সম্ভাবনার পদযাত্রা (প্যারেড) চলতে পারে। স্মরণ করার আরো মৌলিক বিষয় এই যে বিশ্ব অর্থনীতি ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট থেকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। উপরন্তু, আলোচ্য বিপর্যয় সৃষ্টিকারী বিরাজমান সমস্যাগুলোও পুরোপুরি সমাধান করা হয়নি। একইভাবে বিশ্বজুড়ে সরকার, ব্যবসায়ী পরিবারগুলো অধিক ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছে এবং নীতিনির্ধারকরা বৈশ্বিক বাণিজ্য বিনিয়োগ ব্যবস্থায় আস্থার অবনমন ঘটিয়েছে।

তবে যদিও বিশ্ব অনেকটা দুর্বল হাতে করোনাভাইরাসের তাণ্ডব মোকাবেলা শুরু করেছে, কভিড-১৯ সংকটে আমাদের সাড়া আগের মহামারীর চেয়ে আাারো অনেক ভালো হতে পারত। আমাদের এখন তাত্ক্ষণিক কাজ হওয়া উচিত ব্যাপকতর রোগ নির্ণয় সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ভাইরাসের বিস্তার কমানো, কঠোর কোয়ারেন্টিনের পদক্ষেপ এবং সামাজিক দূরত্ব। অধিকাংশ উন্নত দেশ এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ভালো অবস্থানে রয়েছে। যদিও ইতালি মহামারীতে অনেকটাই কুপোকাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাড়া ঠিক জন-আস্থা উৎসাহিত করতে পারেনি।

বৈশ্বিকভাবে পুরোপুরি নির্মূল করা না গেলে এটি সবসময় ফিরে আসতে পারে কিংবা মৌসুমভিত্তিক গোলযোগে পরিণত হতে পারে। কার্যকর চিকিৎসা শিগগিরই আবিষ্কার করা না গেলে (জিলিডের ভাইরাস প্রতিরোধী ওষুধ রেমিডেসিভির বর্তমানে কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়) সব দেশকেই পুরোপুরিভাবে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করা এবং ভাইরাস নির্মূলে একটি বৈশ্বিক প্রচেষ্টা এগিয়ে নেয়ার মধ্যে যেকোনো একটি পছন্দ বেছে নিতে হবে। বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রথমোক্তটি সম্ভব নয়, শেষোক্তটিই মনে হয় স্বাভাবিক পছন্দ। তবে তার জন্য দরকার হবে উচ্চতর বৈশ্বিক নেতৃত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতা, বর্তমানে যার নিদারুণ অভাব রয়েছে। এবার সৌদি আরবে অনুষ্ঠেয় জি২০ শীর্ষ সম্মেলন এরই মধ্যে অভ্যন্তরীণ বহিঃস্থ বিরোধে পাকেচক্রে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন শুরু থেকেই বহুপক্ষীয় পদক্ষেপের কথা (মাল্টিলেটারেল অ্যাকশন) অস্বীকার করেছে।

এখনো কিছু প্রধান দেশ অনেকটাই লক্ষ্য হাসিল করতে পারে, তারা যদি সহযোগিতার মূল্য বোঝাতে অধিক দেশকে আগ্রহী করে তোলাসহ একটি বৈশ্বিক প্রচেষ্টায়-সাড়ায় নেতৃত্ব দেয়ার পদক্ষেপ নেয়। উদাহরণস্বরূপ, চীন দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মহামারী সামলানোয় তুলনামূলকভাবে সফল হওয়া দেশগুলো তাদের সর্বোত্তম চর্চা বিনিময় করতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি দেশই নিজেদের সীমান্তগুলোয় করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করে তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদ সেইসব দেশে নিয়োজিত করতে পারে, যেখানে অধিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চিকিৎসা পেশাজীবী, রেসপিরেটর, টেস্টিং কিটস, মাস্ক এবং অন্য চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন।

অধিকন্তু, চীন যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্তভাবে সাম্প্রতিক শুল্ক বৃদ্ধি পরিবর্তনে রাজি হতে পারে এবং নতুন আরো হুমকি (যেমন গাড়ির ওপর) প্রয়োগ করতে পারে। যদিও শুল্কে স্বল্পস্থায়ী হ্রাস আন্তঃসীমান্ত বিনিয়োগ সম্প্রসারণে খুব একটা ভূমিকা রাখবে না, তবে এটি অন্তত কিছুটা বাণিজ্য চাঙ্গা করবে। উপরন্তু, একটি চুক্তি মহামারী-পরবর্তী পুনরুদ্ধার সম্পর্কে ব্যবসায়িক মনোভাব বাড়াতে পারে।

ভাইরাস সংক্রমণ রোধে নেয়া পদক্ষেপ বাস্তবায়নের পর দেশগুলোর ভেতরে তাত্ক্ষণিক কাজ হলো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বা গিগ ইকোনমিকে পৃষ্ঠপোষকতা জোগানো, কোয়ারেন্টিন এবং সামাজিক বিচ্ছেদের দ্বারা যাদের জীবিকা ব্যাহত হবে। অর্থনৈতিকভাবে যারা সবচেয়ে নাজুক থাকে, বোধ হয় চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিতে প্রবেশাধিকারও তাদের তুলনামূলক কম। অতএব ওইসব জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ন্যূনতম ক্যাশ ট্রান্সফার প্রদান করা উচিত কিংবা যদি নাজুক জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করা সম্ভব না হয়, তাহলে প্রতিটি নাগরিককেই তা দেয়া উচিত; সঙ্গে ভাইরাসসংক্রান্ত চিকিৎসা ব্যয়ের কাভারেজ বাড়ানোও দরকার। একইভাবে ক্ষুদ্র মাঝারি আকারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করতে কিছুদিন কর-ভ্যাট পরিশোধ স্থগিত করা প্রয়োজন হতে পারে; ঋণপ্রবাহ অব্যাহত রাখতে ঋণ গ্যারান্টি অন্য পদক্ষেপগুলোর শর্ত কিছুটা নমনীয় করা যেতে পারে। 

বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোয় মহামারী ঠিক তখনই প্রকাশ পাবে বা পাচ্ছে, যখন সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রিক্যারিয়েত শ্রেণীতে অনেক মানুষই যোগ দিয়েছে। দলে রয়েছে তরুণ এবং পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের জনগোষ্ঠী। সংজ্ঞাগতভাবেই প্রিক্যারিয়েতভুক্ত সদস্যদের দক্ষতা কিংবা অধিক সুবিধাসম্পন্ন স্থিতিশীল চাকরি নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে এবং এভাবে পুরো ব্যবস্থায় তাদের কমই অংশ (স্টেক) আছে। ক্যাশ ট্রান্সফার একটি বার্তা পাঠাতে পারে যে ব্যবস্থা এখনো মানুষকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু অবশ্যই সামাজিক সুরক্ষা জাল আরো অনেক সম্প্রসারণ করতে হবে এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক মানুষের জন্য সুবিধা বাড়াতে হবে।

জনতুষ্টবাদী দল নেতারা প্রিক্যারিয়েতদের দুর্দশাকে রাজনৈতিকভাবে পুঁজি করেছে, তবে তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, এমনকি যেখানে তারা আসলে ক্ষমতায় আছে, সেখানেও। এখানেও মহামারীর এক সুবিধা আছে। যেসব সরকার প্রতিষ্ঠিত দুর্যোগ প্রস্তুতির এজেন্সি এবং প্রাথমিক সতর্কতা প্রটোকল অবমূল্যায়ন করেছে, তারা এখন বুঝতে পারছে যে তাদের সর্বাত্মকভাবে পেশাজীবী বিশেষজ্ঞদের বড় প্রয়োজন। কভিড-১৯-এর সংক্রমণ দ্রুত অপেশাদারিত্ব অযোগ্যতা উন্মোচন করেছে। যদি পেশাজীবীদের কাজ করতে দেয়া হয় তাহলে পুরো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থায় (এস্টাবলিশমেন্ট) হারানো জনআস্থা তারা কিছুটা পুনরুদ্ধার করতে পারবে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে গড়ে ওঠা একটি অধিকতর পেশাদারি ব্যবস্থা-প্রাতিষ্ঠানিকতার (এস্টাবলিশমেন্ট) সুবিধা থাকবে শ্রেণী যুদ্ধ উচ্চারণ না করে প্রিক্যারিয়েতরা এখন যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলো সমাধান করতে আরো বিবেচনাপ্রসূত নীতি এগিয়ে নেয়ার। তবে এসব সুবিধা (ওপেনিং) চিরকালের জন্য থাকবে না। পেশাজীবীরা যদি সেগুলো কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন, তাহলে মহামারী আর কোনো সুবর্ণ সুযোগ দেবে না; কেবল মৃত্যু, বিভাজন, গোলযোগ এবং দুর্দশা ছাড়া।


[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

রঘুরাম রাজন: ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর শিকাগো বুথ স্কুল অব বিজনেসের ফিন্যান্সের অধ্যাপক; সম্প্রতি প্রকাশিত দ্য থার্ড পিলার: হাউ মার্কেটস অ্যান্ড স্টেট লিভ দ্য কমিউনিটি বিহাইন্ড গ্রন্থের লেখক    

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন