শুক্রবার | আগস্ট ০৭, ২০২০ | ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭

শেষ পাতা

বিপন্ন বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা

বণিক বার্তা ডেস্ক

বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে আতঙ্ক-হুজুগে ভোক্তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক ক্রয়প্রবণতা। অন্যদিকে ব্যাহত হয়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনও। সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি যেতে পারে আরো খারাপের দিকে। অবস্থায় বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তার সংকট দেখা দেয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। খবর রয়টার্স।

পৃথিবীজুড়ে এরই মধ্যে নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে প্রায় লাখ ৭০ হাজার মানুষ। মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজারেরও বেশি। লকডাউনে ঘরবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন কোটি কোটি মানুষ। চলমান পরিস্থিতি থেকে এখনই পরিত্রাণের কোনো সম্ভাবনাও মুহূর্তে নেই। অবস্থায় বিশ্বব্যাপী ভোক্তাদের মধ্যে অস্বাভাবিক ক্রয়প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

যেসব দেশে করোনার সংক্রমণ দেখা গেছে, সেসব দেশের সুপারমার্কেটগুলোর দোকানের তাক এরই মধ্যে খালি হয়ে গেছে। বিশেষ করে টয়লেট পেপার পরিচ্ছন্নতাসামগ্রী খুঁজে পাওয়া এখন বেশ মুশকিল হয়ে উঠেছে। অবস্থায় বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সবখানেই এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

উদ্বেগকে বাড়িয়ে দিচ্ছে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা। খাদ্যপণ্য রফতানিকারক দেশগুলো নিজেরাই এখন মহামারীর কারণে নিজস্ব স্থানীয় বাজারে সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটার ভয়ে রয়েছে। অবস্থায় সামনের দিনগুলোয় এসব দেশ খাদ্যপণ্যের রফতানি নিষিদ্ধ বা সীমিত করে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিষয়ে মেলবোর্নভিত্তিক ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের এগ্রি বিজনেস ইকোনমিস্ট ফিন জাইবেল বলেন, সবাই শঙ্কিত হয়ে উঠছেন। বড় রফতানিকারকরা যদি নিজেদের খাদ্যশস্য ধরে রাখে, তাহলে ক্রেতাদেশগুলো প্রকৃতপক্ষেই উদ্বেগের মধ্যে পড়ে যাবে। যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তা আতঙ্কজনক, কিন্তু যৌক্তিক নয়। কারণ গোটা বিশ্বেই এখন পর্যাপ্ত খাদ্য রয়েছে।

বৈশ্বিক চাল রফতানিতে শীর্ষ দেশ ভারত এরই মধ্যে তিন সপ্তাহের লকডাউনে চলে গেছে। ফলে ভারত থেকে পণ্যটির সরবরাহ চ্যানেলও এখন থমকে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার ভেজিটেবল অয়েল ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে সূর্যমুখীর বীজ রফতানিতে সীমা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাম অয়েলের দ্বিতীয় শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ মালয়েশিয়ায় পণ্যটি উৎপাদনের গতিও এখন বেশ শ্লথ হয়ে এসেছে।

বিপরীতে আমদানিকারক দেশগুলোয় খাদ্যপণ্যের চাহিদাও এখন বাড়তির দিকে। ইরাকে গঠিত এক ক্রাইসিস কমিটি দেশটিতে কৌশলগত খাদ্য মজুদ গড়ে তোলার সুপারিশ জানিয়েছে। এর ভিত্তিতে দেশটি এরই মধ্যে ১০ লাখ টন গম আড়াই লাখ টন চাল আমদানির প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা দিয়েছে।

অবস্থায় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় এখন অহেতুক ব্যাঘাতের আশঙ্কা দেখতে পাচ্ছেন কৃষিপণ্য বিপণনকারীরা।

মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি বিক্রীত খাদ্যশস্য হলো চাল গম। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর কৃষিপণ্য দুটির বৈশ্বিক সম্মিলিত উৎপাদন দাঁড়াবে রেকর্ড ১২৬ কোটি টনে।

ইউএসডিএর তথ্য বলছে, উৎপাদন বৈশ্বিক মোট চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। কারণে বৈশ্বিক চাহিদা মেটানোর পরও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য দুটির সম্মিলিত সমাপনী মজুদও দাঁড়াবে রেকর্ড সর্বোচ্চে, যার পরিমাণ হবে ৪৬ কোটি ৯৪ লাখ টন।

তবে এসব পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে সাধারণত ধরে নেয়া হয়, উৎপাদন ভোগের স্থানে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। একই সঙ্গে স্বাভাবিক থাকবে বিকল্প পণ্যের প্রাপ্যতাও।

রফতানি মূল্য বাড়ায় এরই মধ্যে চালের দাম এখন বাড়তির দিকে। প্রসঙ্গে সিঙ্গাপুরভিত্তিক এক ব্যবসায়ী বলেন, এখানে মূল বিষয় হলো সরবরাহ। ভিয়েতনাম রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। ভারত লকডাউনে। একই পথে হাঁটতে পারে থাইল্যান্ডও।

দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডে এখন চালের বেঞ্চমার্ক মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি টন ৪৯২ ডলার ৫০ সেন্টে, যা ২০১৩ সালের আগস্টের পর সর্বোচ্চ।

এর আগে ২০০৮ সালের খাদ্য সংকটের কালে চালের মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছিল টনপ্রতি হাজার ডলারের কাছাকাছি। সে সময় রফতানিতে সীমা আরোপ এবং আতঙ্কে ক্রয়প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল পণ্যটির মূল্য।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওই ব্যবসায়ীর আশাবাদ, ২০০৮ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখার সম্ভাবনা কম। একটি বিষয় হলো, বিশ্বব্যাপী চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। বিশেষ করে ভারতে, যেখানে মজুদের পরিমাণও অনেক বেশি।

চলতি বছর বৈশ্বিক চালের মজুদ প্রথমবারের মতো ১৮ কোটি টন ছাড়ানোর পূর্বাভাস রয়েছে। ২০১৫-১৬ মৌসুমের পর থেকে এখন পর্যন্ত পণ্যটির মজুদ বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ।

সমস্যা হলো পণ্যটির মজুদ থাকলেও সমবণ্টন নেই। শুধু চীন ভারতএই দুই দেশেই চালের মজুদ আছে ১৫ কোটি ৩০ লাখ টন।

এর অর্থ হলো চালের বাণিজ্য দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে থাকলে পণ্যটির শীর্ষ ফিলিপাইনসহ এশিয়া আফ্রিকার বেশ কয়েকটি আমদানিকারক দেশ নাজুক অবস্থায় পড়বে।

বিষয়ে ফিলিপাইনের কৃষি বিভাগের সচিব উইলিয়াম ডার বলেন, আমাদের যে মজুদ আছে, তা ৬৫ দিনের জন্য পর্যাপ্ত। অর্থাৎ চাল দিয়ে আমরা দুই মাস চলতে পারব।

এর সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমের উৎপাদন যোগ হলে ফিলিপাইন তা দিয়ে চার মাস পর্যন্ত চালিয়ে নিতে পারবে বলে আরো জানান তিনি।

অন্যদিকে শীর্ষ আমদানিকারক ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলোর হাতে জুন পর্যন্ত গমের মজুদ আছে বলে বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি ট্রেডিং কোম্পানির এক ব্যবসায়ী জানান, এখন পর্যন্ত আমরা কোনো আমদানিকারককে স্বাভাবিক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সরবরাহ নিতে হুড়মুড় করে এগিয়ে আসতে দেখিনি।

শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) চলতি মাসে গমের দাম বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন