বৃহস্পতিবার| এপ্রিল ০২, ২০২০| ১৮চৈত্র১৪২৬

সম্পাদকীয়

কভিড-১৯ ব্যবস্থাপনার ধারণাপত্র

ডা. এ এম শামীম

বাংলাদেশে  সময়টা ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম। বিপুলসংখ্যক রোগী জ্বর, কফ, সর্দি, কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ নিয়ে এমনিতেই ভুগে থাকে। অন্য সময় হলে তাদের হয়তো সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার রোগী হিসেবে চিকিৎসা দিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারী পরিস্থিতির কারণে এসব উপসর্গকে নিরীহ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কভিড-১৯ আক্রান্ত বলে সন্দেহ থাকায় যে কাউকে এখন আর সাধারণ সর্দি, কাশি বা জ্বরের চিকিৎসাও দেয়া যাচ্ছে না।

অবশ্য কভিড-১৯ আক্রান্ত বলে সত্যি সত্যি যারা সন্দেহভাজন, তাদের পরীক্ষাও যে ঠিকমতো করা যাচ্ছে, পরিস্থিতি তেমন নয়। এসব কারণে বিপুল জনসংখ্যা আর জনঘনত্বের দেশে ভয়ংকরভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ল্যাবএইডের ধানমন্ডি শাখায় প্রতিদিন অন্তত এক হাজার রোগী আসে বহির্বিভাগে চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে বা পরীক্ষা করাতে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে তাদের ৫০ শতাংশই আসা বন্ধ করেছে। এভাবে চিকিৎসা পরিষেবার বাইরে থাকা প্রাত্যহিক রোগীর সংখ্যা গোটা বাংলাদেশ বিবেচনায় নিলে হয়তো আড়াই লাখের মতো হতে পারে।

এটি গেল মুদ্রার এক পিঠ।

অন্য পিঠ বলছে, বিপুলসংখ্যক রোগী যেহেতু হাসপাতালে বা চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে না, কাজেই স্বাস্থ্যকর্মীদের (চিকিত্সক, নার্স অন্যরা) অর্ধেক অংশ সেক্ষেত্রে কর্মহীন অবস্থায় আছেন। চলমান জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতেও তাদের সেই বিপুল কর্মসক্ষমতাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সুনির্দিষ্ট বেশ কয়েকটি কারণে তারা স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবাও দিতে পারছেন না।

এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই ধারণাপত্রটি প্রণয়ন করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত কর্মসূচির উদ্দেশ্য

) জ্বর, সর্দি, কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা  রয়েছে এমন রোগীর প্রাথমিক পরিচর্যার জন্য সারা দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক প্রস্তুত করা। ) কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত করার জন্য নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি প্রবর্তন এবং অন্যদের থেকে দ্রুত বিচ্ছিন্ন করা।

) সন্দেহভাজন কভিড-১৯ রোগীদের পরীক্ষা করার সুবিধা পরিধি বাড়ানো। ) ইনফ্লুয়েঞ্জা সাধারণ ঠাণ্ডাজ্বরে আক্রান্তসহ সব ধরনের রোগীর জন্য উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

কী কী করা সম্ভব [কর্মসূচির কাঠামো]

প্রশাসনিক কাঠামো: পুরো কর্মসূচি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনেই পরিচালিত হবে। নজিরবিহীন বা ব্যাপক দুর্যোগ পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশজুড়ে ১০০টি করোনা প্রশাসনিক অঞ্চল গঠন করা হবে। প্রতিটি অঞ্চলে একজন প্রশাসক থাকবেন (মধ্য পর্যায়ের একজন নেতা বা কর্নেল/মেজর, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য হলে দৃঢ় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব)

মানবসম্পদ: প্রতিটি অঞ্চলে ১০০ স্বাস্থ্যকর্মীর একটি দল কাজ করবে। এদের মধ্যে ২০ চিকিত্সক ২০ নার্স ছাড়াও থাকবেন অন্যান্য সেবাকর্মী (যেমন নমুনা সংগ্রাহক, অ্যাম্বুলেন্স চালক, ল্যাব টেকনিশিয়ান, উপাত্ত সংগ্রাহক, যোগাযোগ রক্ষাকারী, কাউন্সিলর, নমুনাবাহক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ইত্যাদি)

অন্যান্য সম্পদ (প্রাইমারি কেয়ার ইউনিট): করোনাভাইরাস চিকিৎসার প্রাথমিক পরিচর্যা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্য প্রতিটি অঞ্চলে একটি সুবিধাজনক ভবন চূড়ান্ত করতে হবে (যেমন গোটা ধানমন্ডি এলাকার জন্য আজিমপুর কমিউনিটি সেন্টারের কথা চিন্তা করা যায়) ধরনের অস্থায়ী জরুরি আয়োজনে অল্প কিছু জরুরি শয্যা বায়ুবাহিত রোগজীবাণুনিরোধী সরঞ্জামের ব্যবস্থাও প্রয়োজন হবে। মাঠ পর্যায়ের ধরনের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ছোটখাটো একটি ল্যাবও বসানো দরকার, যাতে দ্রুত কিছু পরীক্ষা করা যায়। আবার স্বাস্থ্যকর্মী রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে ব্যাপকভিত্তিক নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থাও থাকা জরুরি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা এই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের চারপাশের এলাকায় সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার কাজটি করতে পারেন। কার্যক্রম চলবে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা, সপ্তাহের প্রতিদিনই।

অন্যান্য সম্পদ (নিবিড় পরিচর্যা সুবিধা): সারা দেশে অন্তত ৩০টি হাসপাতাল (আইসিইউ ভেন্টিলেটর ইউনিট সুবিধাসংবলিত) প্রস্তুত রাখতে হবে, যাতে কভিড-১৯ আক্রান্ত গুরুতর রোগীদের সেখানে উচ্চতর পরিচর্যা বা চিকিৎসা দেয়া যায়। এসব হাসপাতালের প্রতিটিতে ১০০-১৫০ শয্যার ব্যবস্থা ছাড়াও ভেন্টিলেটর আইসোলেশনের ব্যবস্থা থাকা চাই।

অন্যান্য সম্পদ (পিসিআর ল্যাব): পিসিআর ল্যাব সুবিধা আছে, এমন অন্তত ৩০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার সারা দেশে প্রস্তুত রাখতে হবে।

হটলাইন: প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য আলাদা মোবাইল নম্বরের হটলাইন সুবিধা রাখতে হবে।

অ্যাম্বুলেন্স নমুনা পরিবহনের জন্য মোটরসাইকেল।

কর্মসূচির বিস্তারিত কার্যধারা

জ্বর, সর্দি, কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা নিয়ে যারা কমিউনিটি ক্লিনিকে আসবেন, তাদের জন্য সিরিয়াল নম্বরের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের শরীরে বা পোশাকে নম্বরের স্টিকার সেঁটে দেয়া যায়, যেটা নিয়ে তারা অপেক্ষা করবেন (সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে অপেক্ষা করার স্থানটিতে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চেয়ার বসাতে হবে)

যথাযথ সুরক্ষা পোশাক পরা একজন উপাত্ত সংগ্রাহক রোগীর সঙ্গে কথা বলে তার সমস্যার বিবরণ, মোবাইল নম্বর বর্তমান ঠিকানা লিখে নেবেন। এরপর তাকে উপস্থিত করা হবে চিকিত্সকের সামনে। চিকিত্সক তাকে পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে তার রোগটি বোঝার চেষ্টা করবেন।

ওই রোগী যদি সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হন, চিকিত্সক তাকে যথাযথ চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে ফেরত পাঠাবেন।

আর ওই রোগী যদি কভিড-১৯ সংক্রমিত হিসেবে সন্দেহভাজন হন, তাকে দায়িত্বরত নার্সের কাছে হস্তান্তর করা হবে নমুনা সংগ্রহের বুথে নিয়ে যাওয়ার জন্য। নমুনা সংগ্রহের পর তাকে উপস্থিত করা হবে একজন কাউন্সিলরের কাছে। সেই কাউন্সিলর তাকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বোঝাবেন, একজন স্বাস্থ্যকর্মী অচিরেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। এর মধ্যে তাকে বাড়িতে ফিরে গিয়ে অবশ্যই যথাসম্ভব বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হবে, কারো সংস্পর্শে আসা চলবে না। ধরনের সঙ্গনিরোধে কী কী করণীয়, সেসব বিষয়েও কাউন্সিলর তাকে বিশদ ধারণা দেবেন।

সন্দেহভাজন রোগীর নমুনা উপযুক্ত সুরক্ষার সঙ্গে কাছাকাছি পিসিআর ল্যাবে পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাবেন নমুনাবাহক। ওই একই দিনে ল্যাবের পক্ষ থেকে কমিউনিটি ক্লিনিককে পরীক্ষার ফলাফল জানিয়ে দেয়া হবে। ফলাফল নেগেটিভ হলে কমিউনিটি ক্লিনিকের কাউন্সিলর টেলিফোনে এসএমএস করে সংশ্লিষ্ট রোগীকে সেটি অবগত করবেন। আর যদি পজিটিভ আসে, তাহলে ওই রোগীর বাড়িতে অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে হবে। উপযুক্ত সুরক্ষা পোশাক পরে দুই সদস্যের একটি দল (একজন নার্স একজন কাউন্সিলর) ওই রোগীকে বাড়ি থেকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাবে চিকিৎসার জন্য।

মানুষের যেকোনো সাধারণ প্রশ্ন পরামর্শ দেয়ার জন্য হটলাইনগুলোও সক্রিয় থাকবে।

যোগাযোগ

কমিউনিটি ক্লিনিকের ঠিকানা হটলাইন নম্বরসংবলিত পোস্টার সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় কেবল টিভি নেটওয়ার্কেও তা প্রচার করা দরকার।

ওপিডি কনসালটেশন, পরীক্ষা ভর্তি

) ১০০ কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ) প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতিদিন হাজার থেকে হাজার ৫০০ রোগীকে সেবা দেয়া সম্ভব। অর্থাৎ ১০০টি অঞ্চলে কমবেশি লাখ ৫০ হাজার রোগী, যাদের ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ধরনের উপসর্গ রয়েছে, সেবা দিতে পারার কথা। ) প্রতিদিন গড়ে হাজার কভিড-১৯ পরীক্ষা করা সম্ভব। ) একটি কভিড-১৯ হাসপাতালে কমবেশি হাজার থেকে হাজার শয্যা ভেন্টিলেটর সুবিধা থাকতে পারে।

করোনা পরীক্ষা খরচ

একটি কভিড-১০ পরীক্ষার কিটের খরচ আনুমানিক ৩০০ টাকা। এর সঙ্গে ডায়াগনস্টিক সেন্টার অন্যান্য খরচ বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি পরীক্ষার জন্য ৮০০ টাকা করে ফি নেয়া যেতে পারে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রণোদনা

নিজেদের স্বাস্থ্য জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে যেসব স্বাস্থ্যকর্মী কার্যক্রমে যুক্ত হবেন, কর্মসূচি সফল করতে হলে তাদের জন্য উপযুক্ত প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও মানুষগুলোকে দীর্ঘ সময় কাজ করে যেতে হবে। নিয়মিত বেতন-ভাতার পাশাপাশি বাড়তি হিসেবে প্রতিদিন ডাক্তারদের জন্য হাজার টাকা নার্সদের জন্য হাজার ৪০০ টাকা ভাতা দেয়ার কথা ভাবা যায়। দলের অন্য সদস্যদেরও ভাতা এভাবে ঠিক করা যেতে পারে।

 

ডা. এম শামীম: ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ল্যাবএইড গ্রুপ

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন