বৃহস্পতিবার| এপ্রিল ০২, ২০২০| ১৮চৈত্র১৪২৬

সম্পাদকীয়

কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র নেই ৬৩ জেলায়

দুর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থারই প্রতিচ্ছবি

অতীতে কলেরা, ডায়রিয়া, চিকেন পক্স, স্মল পক্সসহ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নিপাহ, মিজেল, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো নতুন নতুন সংক্রামক রোগ দেখা দিচ্ছে। আর আক্রান্তের সংখ্যা অধিক হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাসেবা পেতে রোগীদের বেগ পেতে হচ্ছে। অথচ দেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে ১১০টি মেডিকেল কলেজ থাকলেও সেখানে সংক্রামক রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় সেভাবে কোনো বিশেষায়িত বিভাগ বা পৃথক ওয়ার্ডের ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালগুলোয় রোগ নির্ণয়ের কাজে নিয়োজিত প্রয়োজনীয়সংখ্যক মাইক্রোবায়োলজিস্ট, আধুনিক ল্যাবরেটরি, জীবাণু শনাক্তকরণ যন্ত্র ও রিএজেন্ট মজুদ সংকট রয়েছে। এতে নতুন নতুন সংক্রামক ও ভাইরাস রোগের প্রকোপে অসংখ্য মানুষ চিকিৎসা ভোগান্তিতে পড়লেও আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে কভিড-১৯-এ সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসায় অতি গুরুত্বপূর্ণ শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্র বা ভেন্টিলেটর নেই দেশের ৬৩টি জেলায়। ঢাকায় এ সুবিধা থাকলেও তাও অত্যন্ত সীমিত। অথচ কভিড-১৯-এ আক্রান্তদের ভেন্টিলেটর ছাড়া বাঁচিয়ে রাখা কঠিন বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এটি আমাদের দুর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থাকেই তুলে ধরে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর বিস্তার উপজেলা পর্যায়ে হলেও যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক সুবিধার ঘাটতি প্রকট। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় খুবই কম। উন্নত বিশ্ব যেখানে শক্তিশালী অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি নিয়ে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, সেখানে আমাদের জেলা পর্যায়েই কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র পর্যন্ত নেই। অক্সিজেন থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও চিকিত্সক-নার্সদের সুরক্ষা উপকরণের স্বল্পতাও আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। করোনা আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার নানা দুর্বলতা তুলে ধরেছে। এগুলো চিহ্নিতপূর্বক আগামী দিনের ঝুঁকি মোকাবেলায় পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।


নভেল করোনাভাইরাস আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার দৈন্যকে তুলে ধরেছে। বর্তমানে নতুন সংক্রামক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় সরকারি-বেসরকারিভাবে স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো অনেক দুর্বল অবস্থানে রয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এখন পর্যন্ত দেশের কোনো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফেকশনাস ডিজিজ বিষয়ে শিক্ষক বা কনসালট্যান্টের পদ তৈরি হয়নি। তাই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর উচিত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসাসেবার জন্য হায়ার স্কিল ম্যানেজমেন্ট, প্রশিক্ষিত চিকিত্সক, স্বাস্থ্যকর্মী, বিভাগ ও প্রতিষেধক তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা; মেডিকেল পাঠ্যসূচিতে সংক্রামক রোগের কলেবর বাড়ানো, রোগ নির্ণয় ও জীবাণু শনাক্তকরণসহ দ্রুত চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া।


সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে স্বয়ং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পাঁচটি কর্মকৌশল নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে কোনো দেশে সংক্রামক রোগ দেখা দিলে দ্রুত শনাক্তকরণ ও উত্স নিয়ন্ত্রণ করা; রোগীদের জন্য মানসম্মত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা; সন্দেহজনক রোগীদের ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলক অতিরিক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি; প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ ও প্রকৌশলগত প্রতিরোধ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ছাড়াও অতীতে বেশকিছু সংক্রামক ও ভাইরাসজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব আতঙ্ক ছড়ালেও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় অস্থায়ী ভিত্তিতে আইসোলেশন ট্রিটমেন্ট ছাড়া কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তাই স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত নীতিনির্ধারকদের উচিত ডব্লিউএইচওর নির্ধারিত নীতিমালা ও কর্মকৌশল অনুসরণ করে সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় প্রতিটি হাসপাতালে অন্তত একটি করে পৃথক ওয়ার্ড চালু করা।


স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নকে সুষম বা সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। যেখানে এতদিন কম মনোযোগ দেয়া হয়েছে, সেখানে বেশি মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবাণুঘটিত রোগের ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ব্যবস্থাসহ পৃথক সংক্রামক ব্যাধি বিভাগ খোলা প্রয়োজন। করোনাভাইরাস নিয়ে যে বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, এখন সরকারের এ বিষয়ে বিশেষ নজর ও আগ্রহ রয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে সংক্রামক ব্যাধি নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল ও স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করার পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। আমাদের সবচেয়ে যেটা বেশি উপলব্ধিতে নিতে হবে তা হলো, ভাইরাসসহ বিভিন্ন ধরনের জীবাণুবিরোধী সামর্থ্য বাড়াতে হবে। এটা থাকা বাঞ্ছনীয়। মনে রাখতে হবে পক্স কিংবা ডায়রিয়ার মতো সংক্রমণের শিকার আগে গরিবরাই হতো। এখন কিন্তু সেটা নয়। আরো মনে রাখতে হবে সংক্রামক ব্যাধি কখনো শেষ হবে না। এর হুমকি সবসময় থেকে যাবে। আবার নতুন একটা ভাইরাস যে আসবে না, সেটা কেউ বলতে পারে না। ৫০টির অধিক জীবাণুর আপনি নাম পাবেন, যেগুলোর নিয়ন্ত্রণ দুরূহ। সুতরাং বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে অত্যাধুনিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে রোগ শনাক্ত করার ব্যবস্থা রাখা। সংক্রামক রোগ নির্ণয় করতে হলে জীবাণু শনাক্ত করতে হবে। আর সেজন্য মাইক্রোবায়োলজিস্টদের কর্মক্ষেত্র বাড়াতে হবে। আমরা প্রতিরোধে এগিয়েছি, কিন্তু অন্যান্য দেশের তুলনায় সংক্রামক রোগ নির্ণয়ে ও চিকিৎসায় কিছুটা পিছিয়ে আছি। একই সঙ্গে রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে যথাযথ উপকরণ ও যন্ত্রপাতির সরবরাহ প্রয়োজন। আমরা কিন্তু কেবল সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা নয়, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) গুণগত চিকিৎসা দেয়ার কথা বলেছি। তাই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় সংক্রামক ব্যাধি অধ্যয়ন, নির্ণয় ও চিকিৎসা তিনটিরই পদ্ধতিগতভাবে ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন