বৃহস্পতিবার| এপ্রিল ০২, ২০২০| ১৮চৈত্র১৪২৬

আন্তর্জাতিক ব্যবসা

মন্দা ঠেকাতে উদ্যোগী হবে জি২০?

বণিক বার্তা ডেস্ক

নভেল করোনাভাইরাসের উৎপত্তি চীনে হলেও এখন এটি আর কেবল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির একার সমস্যা নয়। বৈশ্বিক মহামারী আকার ধারণ করায় বর্তমানে তা পুরো বিশ্বের জন্যই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণস্বাস্থ্য বা জননিরাপত্তার ইস্যু তো রয়েছেই, প্রাণঘাতী ভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিও এখন ভয়াবহ সংকটের মুখে। অভিযোগ রয়েছে, সংকট মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর ভূমিকা খুব সামান্যই। এমন সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই জরুরি ভিত্তিতে বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্রুপ অব টোয়েন্টি বা জি২০।

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোকে নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক ফোরামের বৈঠকটি গতকাল সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা (প্রতিবেদনটি এর আগেই লেখা) তবে এবারের বৈঠকটি কিছুটা ব্যতিক্রম। প্রথমত, এটা পূর্বনির্ধারিত বা নিয়মিত কোনো সম্মেলন নয়। এটা অনেকটা আপত্কালীন জরুরি বৈঠক। দ্বিতীয়ত, করোনাভাইরাস সংক্রামক হওয়ায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের সশরীরে উপস্থিতির পরিবর্তে অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের সভাপতিত্বে বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭টি দেশের নেতাদের এতে যোগ দেয়ার কথা।

বৈঠকটি আয়োজনের উদ্দেশ্য পরিষ্কারনভেল করোনাভাইরাস এর কারণে সৃষ্ট কভিড-১৯ রোগের স্বাস্থ্যগত অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলায় সম্মিলিত বৈশ্বিক প্রচেষ্টার রূপরেখা প্রণয়ন। সৌদি বাদশা সালমান বিন আবদুল আজিজ টুইটারে একটি পোস্টে লিখেছেন, পুরো বিশ্ব এখন কভিড-১৯ মোকাবেলা করছে। রোগের কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। চ্যালেঞ্জ সম্মিলিতভাবে মোকাবেলার জন্য আমরা (জি২০ সদস্যরা) একটি বিশেষ বৈঠকে মিলিত হব, যাতে করে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়।

কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে ভার্চুয়াল বৈঠক আয়োজনের উদ্দেশ্য কী পুরোপুরি পূরণ হবে? বিশ্লেষকরা বলছেন, এখান থেকে বৃহৎ পরিসরে আর্থিক প্রণোদনার কোনো সিদ্ধান্ত না- আসতে পারে। বৈশ্বিক জিডিপিতে জি২০ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবদান ৮০ শতাংশের বেশি। কারণে করোনা মহামারীতে আক্রান্ত অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তার বিষয়ে জি২০ রাষ্ট্রগুলোর কাছে প্রত্যাশাও অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এরই মধ্যে এসব দেশকে আহ্বান জানিয়েছে, বিশ্বের দরিদ্রতম ৭৬টি দেশের মধ্যে যারা জরুরি দ্বিপক্ষীয় ঋণ মওকুফের আবেদন করেছে, জি২০ রাষ্ট্রগুলো যেন তাতে সাড়া দেয়। এদিকে জাতিসংঘ দরিদ্র দেশগুলোকে সাহায্যার্থে ২০০ কোটি পাউন্ডের তহবিল গড়ে তোলার  আহ্বান জানিয়েছে। ধনী দেশগুলো কি আবেদনে সাড়া  দেবে? গতকালের বৈঠকটির সিদ্ধান্তগুলো প্রকাশ হলেই কেবল এর উত্তর মিলবে।

তবে বাস্তবতা হলো, এখনই কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া জি২০ রাষ্ট্রগুলোর সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এরই মধ্যে মন্দার ছায়া দেখা যাচ্ছে। দরিদ্র দেশগুলো তো এতে বিপদে পড়বেই, ধনী দেশগুলোও এর প্রভাব থেকে বাঁচতে পারবে না। রেটিং এজেন্সি মুডিসের বিশ্লেষকরা বুধবার বলেন, চলতি বছরের প্রথমার্ধে জি২০ অর্থনীতিগুলো এমন ধাক্কা খাবে, যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। সংকট বছরজুড়েই থাকবে। ২০২১ সালে হয়তো অবস্থা থেকে উত্তরণ হতে পারে। এদিকে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) প্রধান অ্যাঞ্জেল গুরিয়ার আশঙ্কা, করোনা অর্থনীতিতে যে ক্ষত তৈরি করছে, তার জন্য বিশ্বকে আরো কয়েক বছর ভুগতে হতে পারে। সম্প্রতি বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের ক্ষত এখনো তাজা। এরই মধ্যে নতুন আরেক সংকটের মুখে বিশ্ব অর্থনীতি। তবে এবারের পরিস্থিতি ২০০৮ সালের চেয়েও ভয়াবহ। কারণ এবার ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে পুরো বিশ্বই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। ভাইরাসটির সংক্রমণ প্রতিহত করতে বিশ্বজুড়ে বন্ধ হয়েছে একের পর এক কারখানা। এতে সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে। এছাড়া ৩০০ কোটির বেশি মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক চাহিদাতেও ধস নেমেছে। আর মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণের কারণে পর্যটন পরিবহন খাত তো আগেই মুখ থুবড়ে পড়েছে।

এসবের কারণে জি২০ রাষ্ট্রগুলোর ক্ষতিই তো সবচেয়ে বেশি। মুডিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ফোরামভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত জিডিপি দশমিক শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র জিডিপি হারাতে পারে শতাংশ। আর ইউরো অঞ্চলের অর্থনীতিগুলোকে জিডিপিতে দশমিক শতাংশ সংকোচন দেখতে হতে পারে। বিশ্বের শীর্ষ ব্যাংকগুলো তো মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রে এরই মধ্যে অর্থনৈতিক সংকোচন শুরু হয়ে গেছে। গোল্ডম্যান স্যাকস মার্কিন অর্থনীতিতে দশমিক শতাংশ সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে। আর ডয়েচে ব্যাংক আশঙ্কা করছে, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রকে এমন অর্থনৈতিক সংকোচন দেখতে হতে পারে, যা অন্তত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর দেখা যায়নি।

এমন সংকটের মুখে ধনী দেশগুলো হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এমনিতেই চরম সমালোচনা হচ্ছে যে জি২০ দেশগুলো ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট মোকাবেলায় যে ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল, এবার তার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ২০০৮ সালে ফোরামভুক্ত দেশগুলো দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনীতিগুলোকে সহায়তায় এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু এবার তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ইউরোশিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট আয়ান ব্রেমারের মতে, জি২০ দেশগুলো এখন পর্যন্ত ২০০৮ সালের মতো কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

তাই বৈশ্বিক অর্থনীতির পাশাপাশি নিজেদের স্বার্থেও জি২০ দেশগুলোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। এখন দেখার বিষয়, জরুরি বৈঠকে সে শুভবুদ্ধির প্রতিফলন হয় কিনা।

সূত্র: এএফপি দ্য গার্ডিয়ান

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন