বুধবার| এপ্রিল ০৮, ২০২০| ২৪চৈত্র১৪২৬

ফিচার

খাদ্য জাতীয়তাবাদের পথে বিশ্ব!

বণিক বার্তা অনলাইন

মুদি দোকান থেকে সুপারশপ সব ফাঁকা! শহর লকডাউন ঘোষণার আগেই যে যেমন পেরেছে দুই হাত ভরে কিনেছে। অন্তত মাসখানেকের খাবার, ওষুধ, জীবাণুনাশক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ফেলেছে অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু মহামারীর মধ্যে সামর্থ্যবানদের এই মজুদদারিতে সমাজের আরেকটি বড় অংশ যে অনাহারে মারা পড়তে পারে এ কথা কেউ ভাবছে না।

অবশ্য সাধারণ মানুষেরই শুধু দোষ নয়, করোনা মহামারী দীর্ঘায়িত হলে সম্ভাব্য খাদ্য সঙ্কট মোকাবেলায় এখনি প্রস্তুতি শুরু করেছে বিভিন্ন দেশ। খাদ্যশস্যে রফতানি নিষেধাজ্ঞা দেয়া শুরু হয়েছে। এমনকি ম্যালেরিয়ার ওষুধ ক্লোরোকুইন রফতানিতেও নিধেষাজ্ঞা দিয়েছে ভারত। অনেকে বাড়াচ্ছে মজুদ।

এ তালিকা দিন দিন বাড়ছে। গমের আটার অন্যতম বৃহৎ রফতানিকারক দেশ কাজাখস্তান গাজর, চিনি এবং আলুর পাশাপাশি এ গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যটি রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ভিয়েতনাম নতুন করে চাল রফতানি চুক্তি করছে না। সার্বিয়া সূর্যমুখী তেল ও অন্যান্য রফতানি বন্ধ করেছে। গত সোমবার পরবর্তী ১০ দিন সব ধরনের শস্য রফতানি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। প্রতি সপ্তাহে তারা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে।

এ হলো হাতেগোণা কয়েকটি উদাহরণ যাদের মনোভাব এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। আগামীতে তালিকাতে আরো দেশ যুক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ চীনের সংক্রমণ কমে গেলেও ইউরোপ আমেরিকায় দিন দিন পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে। এর পরের ধাক্কাটি এশিয়াতে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্বায়নের এই সময়ে যখন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পরস্পর নির্ভরশীলতা খুবই স্পষ্ট এবং অনিবার্য তখন কিছু দেশের খাদ্যশস্য মজুদ করার এই প্রবণতা আরেকটি প্রশ্ন সামনে আনছে। দেশে দেশে জাতীয়তাবাদ আর জনতোষণের রাজনীতি যখন শরাণার্থী সঙ্কটসহ পুরো বিশ্বব্যবস্থাকেই এরই মধ্যে ভোগাচ্ছে, তখন করোনা মহামারীর মধ্যে বিশ্ববাসী কি ‘খাদ্য জাতীয়তাবাদ’ এর কদর্য রূপ দেখার অপেক্ষা করছে? এটি হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন এবং বাণিজ্য প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে এরই মধ্যে শঙ্কা প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। লন্ডনের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিষয়ক গবেষণা পরিচালক টিম বেন্টন বলেন, আমরা দেখছি এটা এরই মধ্যে ঘটতে শুরু করেছে। আর লকডাউন পরস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে নিশ্চিত।

খাদ্য সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও লজিস্টিক বাধার কারণে পণ্য পাওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ছে। যেখানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কর্তৃপক্ষকে এমন সব অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে যে মানুষকে প্যানিক বায়িংয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে কর্মসংস্থান সঙ্কোচনের ভয়।

বিশ্বব্যাপী ভোক্তারা এখনো ঘর ভর্তি করে পণ্যসামগ্রী কিনছে। ভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক ধসের কেবল শুরু। কঠোরতর বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের অপচ্ছায়া এখনই স্মৃতিতে নাড়া দিতে শুরু করেছে, মনে করিয়ে দিচ্ছে, সংরক্ষণবাদ কীভাবে ভালোর চেয়ে খারাপটাই বেশি বয়ে আনে। এই ধারণাটি এখন সবচেয়ে বেশি সত্য, যদিও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। ফসলহানী বা অন্যান্য সরবরাহ সমস্যার কারণে নয় বরং মহামারীর কারণে সৃষ্ট উদ্বেগ থেকে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে দেশগুলো।

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে ভারতসহ কয়েকটি দেশের সরকার কারফিউ, জমায়েত সীমিত করা এবং এমনকি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার মতো কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। এই পদক্ষেপ খাদ্য সরবরাহ নীতি পর্যন্ত গড়াতে পারে বলেই মনে করছেন কৃষি বাণিজ্য বিষয়ক স্বাধীন উপদেষ্টা অ্যান বার্গ। ১৯৭৪ সালে লুইস ড্রেফুস কোম্পানিতে চাকরির মাধ্যমে তার ক্যারিয়ার শুরু।

অভিজ্ঞ এ উপদেষ্টা বলেন, আপনি সম্ভবত যুদ্ধকালীন রেশন ব্যবস্থা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ মুজদের চিত্র দেখবেন অচিরেই।

কিছু দেশ এরই মধ্যে মজুদ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। বিশ্বে চালের বৃহত্তম ভোক্তা দেশ চীন। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে এযাবতকালের সর্বাধিক পরিমান চাল কেনার  সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও দেশের নাগরিকদের এক বছর খাওয়ানোর মতো চাল ও গমের বিশাল মজুদ তাদের আছেই।

আলজেয়িা ও তুরস্কের মতো প্রধান গম আমদানিকারক দেশগুলো এরই মধ্যে নতুন টেন্ডার ইস্যু করেছে। মরক্কো বলছে, মধ্য জুন পর্যন্ত তারা গম আমদানিতে শুল্ক স্থগিত রাখবে।

রাষ্ট্রগুলোর এই জাতীয়তাবাদী পদক্ষেপ পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাকেই একটা অস্থিতিশীলতার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে। যেখানে গত কয়েক দশকের মধ্যে পুরো বিশ্বে ব্যাপকভাবে আন্তঃনির্ভরশীলতা বেড়েছে।

সমস্যা হচ্ছে রফতানিযোগ্য পণ্যের ভাণ্ডার হাতেগোনা কয়েকটি দেশের কবজায়। এসব দেশ সরবরাহ সীমিত বা বন্ধ করলে বিশ্বব্যাপীই বিরূপ প্রভাব পড়বে। উদাহরণ স্বরূপ রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম গম রফতানিকারক দেশ। উত্তর আফ্রিকার দেশের প্রধান সরবরাহকারী দেশ তারা। আবার চালের তৃতীয় বৃহত্তম রফতানিকারক দেশ ভিয়েতনাম, এ দেশের বড় বাজার ফিলিপাইন।

চ্যাথাম হাউসের বেন্টন বলছেন, বৈশ্বিক সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকারগুলো সমন্বিতভাবে কাজ না করে শুধু জাতীয় স্বার্থ দেখতে থাকলে ভয়ানক পরিস্থিতিতে পড়বে বিশ্বের বিপুল জনগোষ্ঠী। মহামারীর এই সময়ে একদিকে সাধারণ মানুষের মজুদ প্রবণতা সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের সংরক্ষণবাদ যুক্ত হলে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। এই চক্র স্থায়ী রূপ নিতে পারে। আগামী ফসল তোলার মৌসুম পর্যন্ত এই প্যানিক বায়িং চলতে থাকলে নিঃসন্দেহে খাদ্যশস্যের দাম ক্রমে বাড়তেই থাকবে।

আর খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে এর আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। রুটির মূল্য বৃদ্ধি থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতার ইতিহাস রয়েছে। ২০১১ ও ২০০৮ সালে যখন খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছিল তখন আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের ৩০টির বেশি দেশে তথাকথিত খাদ্য দাঙ্গা বেঁধে গিয়েছিল।

তবে গম, ভুট্টা, সয়াবিন এবং চালের মতো খাদ্যশস্যগুলোর কোনো সঙ্কট আরে আগের মতো নেই। ফলে এখনই এসব পণ্যের দাম বাড়বে বলে মনে করছেন না ব্যবসায়ীরা। যদিও প্যানিক বায়িংয়ের কারণে কিছু খাদ্যপণ্যের দাম এরই মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে ব্রিটেনে মুরগীর ডিম অন্যতম।

তাছাড়া হু হু করে বাড়ছে ডলারের দাম। ফলে যেসব দেশ খাদ্যপণ্য আমদানি করে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। উপদেষ্টা অ্যান বার্গ বলেন, যখনই কোনো কারণে একটা সমস্যা বা সঙ্কট তৈরি হয় তার ফলে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয় অনুন্নত দেশগুলোকে (এলডিসি)। তাদের মুদ্রা বেশ দুর্বল হওয়ার কারণে আমদানি সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ব্লুমবার্গ অবলম্বনে জাহাঙ্গীর আলম

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন