সোমবার | জুলাই ১৩, ২০২০ | ২৮ আষাঢ় ১৪২৭

দুর্দম

ঘুরে দাঁড়াক বাংলাদেশ

এম এ মোমেন

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ঠিক আগের বছরটি নিয়ে আমাদের আকাশছোঁয়া আবেগ ও উচ্ছ্বাসে বিশ্বব্যাধি করোনাভাইরাসের ভয়ংকর অভিঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অতি জনপ্রিয় মন্ত্রীদের করোনা নস্যাৎ করে দেয়া ভাষণ ও বক্তব্য সত্য হলে সন্তুষ্টির কারণ থাকত। বাগাড়ম্বর ও চাটুকারিতা বঙ্গীয় মুসলমান সংস্কৃতির অংশ হয়ে থাকতে পারে। পাকিস্তান আমলের সংসদে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের উপস্থিতিতে পূর্ববঙ্গীয় একজন মন্ত্রী তোয়াজের প্রমিত ভাষায় বলেছিলেন, গত রাতে তার স্ত্রী স্বপ্নে দেখলেন আইয়ুব খানকে দুনিয়াজাহানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়েছে। সে আমলেও চাটুকারদের রাষ্ট্রনায়করা পছন্দ করতেন। তার পরও আইয়ুব খান তাকে ‘স্টুপিড’ বলে থামিয়ে দিয়েছিলেন। সংসদীয় কার্যবিবরণীতে তা এক্সপাঞ্জড হলেও স্মৃতি থেকে তা কি আর এক্সপাঞ্জ করা সম্ভব!

করোনার আঘাতের মাত্রা ও ব্যাপকতা নিয়ে যা বলা হচ্ছে, তার সবই অনুমানভিত্তিক। তবে অর্থনীতিতে মারাত্মক অভিঘাত এর মধ্যেই প্রতিভাত হতে শুরু করেছে। আক্রান্ত ও আক্রমণের সম্ভাব্য শিকার দেশগুলো করোনা প্রতিরোধ ও করোনাভাইরাসের বলয় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যেসব প্যাকেজ সমাধান ঘোষণা করছে, তার প্রথমটাই জনস্বাস্থ্যের। করোনার এপিসেন্টার চীনের উহান নিজেকে লকডাউন করে, কঠোর কোয়ারেন্টিন মেনে পরিস্থিতি সামলে উঠছে এবং সেখানকার করোনা কার্ভ আবার সমতলে নেমে আসছে। মানুষের সচেতনতাতেই তা সম্ভব হয়েছে। অসতর্কতা ও অতিরিক্ত আত্মম্ভরিতার খেসারত দিচ্ছে ইতালি।

ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশও, কিন্তু আশঙ্কা মূল্যটা না খুব বেশি দিতে হয়। সৌভাগ্যের কথা, বাংলাদেশের এবং সার্বিকভাবে মানুষের ইতিহাসই ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। তার পরও কিছু ভ্রান্তি, কিছু উপেক্ষা ইতিহাসের বুকে কিছু অমোচনীয় কলঙ্করেখা রেখে যায়। ১৯১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী যখন ছড়িয়ে পড়ল, মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকল। এদিকে ২৮ সেপ্টেম্বর ফিলাডেলফিয়ার হেলথ কমিশনার উইলমার ক্রুসেন দুই লাখ মানুষের একটি প্যারেড অনুষ্ঠানের অনুমতি দিল। এ প্যারেড আরো বড় সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াল। প্যারেডে অংশগ্রহণকারী অনেকেই সংক্রমিত হলেন এবং তারা আরো বহু মানুষকে সংক্রমিত করলেন। পরবর্তী কিছুদিন সেখানকার হাসপাতালগুলোর মর্গে মরদেহের ওপর মরদেহ স্তূপীকৃত হতে থাকল—শহরে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ১২ হাজারে। বিশ শতকের এইচআইভি/এইডস প্রথম শনাক্ত হয় কঙ্গোতে, ১৯৭৬ সালে। তা বিশ্বব্যাধিতে পরিণত হয় ১৯৮১ সালে। ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটিয়ে এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার অর্থনীতি ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়ার পর এ ব্যাধির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৫৬ সালে চীনে উদ্ভূত ইনফ্লুয়েঞ্জা (H2N2-এর A সাবটাইপ) দুই বছরে ২০ লাখ মানুষ হত্যা করেছে। এর মধ্যে ৭০ হাজার যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯১৮-এর বিশ্বব্যাধি ফ্লুতে মৃত্যু দুই থেকে পাঁচ কোটি।

বাংলাদেশের কলেরা মহামারীর কথা বর্ষীয়ান নাগরিকদের অনেকের স্মৃতিতেই রয়েছে। তারও আগে ১৯১০-১১ সালে ষষ্ঠ কলেরা বিশ্বব্যাধিতে মৃত্যুর সংখ্যা আট লাখের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রাদুর্ভাব ঘটল, কিন্তু রোগীদের জনবিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র ১১-তে সীমাবদ্ধ রাখতে সমর্থ হলো। সংক্রামক রোগীর ক্ষেত্রে রোগীকে বিচ্ছিন্ন করাই যে শ্রেষ্ঠ পন্থা, যুক্তরাষ্ট্র সেই মডেলটিই দাঁড় করিয়ে দিল।

অ্যান্টেনাইন প্লেগ, জাস্টিনিয়ান প্লেগ ও ব্ল্যাক ডেথ পৃথিবীকে তছনছ করে দিয়েছিল। মানুষ তার পরও প্রতিকার খুঁজে বের করেছে, প্রতিষেধক তৈরি করেছে, কোনো কোনো রোগ নির্মূল করেছে এবং শেষ পর্যন্ত আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

বহুল স্বপ্ন ও আশাজাগানিয়া নতুন সহস্রাব্দ প্রযুক্তিতে আমাদের যতই এগিয়ে রাখুক, রোগবালাইয়ের বিরুদ্ধে মানুষের অসহায়ত্ব তেমন হ্রাস করতে পারেনি।

সার্স, ফ্লু, কলেরা, ডেঙ্গু, ইবোলা ভাইরাস, সোয়াইন ফ্লু, জিকা ভাইরাস, কখনো কখনো বিশ্বব্যাধি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের জন্য স্বাধীনতার সংগ্রাম ও যুদ্ধের পর এই প্রথম একটি সর্বজনীন অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। করোনাভাইরাস আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টি বা অন্য যেকোনো দলের নেতা, সদস্য কিংবা সমর্থকের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয়। একবার আক্রমণ করতে পারলে এতটুকুও ছাড় কাউকে দেবে না। অন্তত জীবন বাঁচাতে হলেও একটি বাধ্যতামূলক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি অভিঘাতই উত্তরণের একটি সুযোগ সৃষ্টি করে, সেই সুযোগটির সৃষ্টিশীল ও ন্যায়নিষ্ঠ ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানো।

বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। ১৯৭০-এর প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাস লাখো মানুষ ও উপকূল ভাসিয়ে নিয়ে গেল। বেঁচে থাকা অসহায় মানুষের হাত আবার বলিষ্ঠ ও সক্রিয় হয়ে উঠল। মানুষ দাঁড়াল তাদের পাশে। শূন্য উপকূল, বিরান দ্বীপে আবার প্রাণের সৃষ্টি হলো। মানুষ যখন কেবল মাথা তুলতে শুরু করল, স্বাধীনতা যুদ্ধও আরম্ভ হয়ে গেল। পৃথিবীর অন্যতম একটি নিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামল সাধারণ মানুষ। লাখো জীবন গেল, যুদ্ধে বিধ্বস্ত হলো সারা দেশ। প্রায় শূন্যের ওপর এ দেশের মানুষেরাই সৃষ্টি করল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ১৯৭২-এ তত্কালীন অর্থমন্ত্রী সবসুদ্ধ ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট পেশ করলেন। এর ৯২ শতাংশই খয়রাতি সাহায্য ও ঋণ, মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ দেশীয় সম্পদ। পরের বছর বাজেটের আকার দাঁড়াল ৯৯৫ কোটি টাকা। প্রথম বাজেট পেশ করার ১০ বছর পর ১৯৮২ সালে বাজেটের আকার হলো ৪ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা, আরো ১০ বছর পর ১৯৯২ সালে বাজেটের আকার দাঁড়াল ১৭ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। নতুন সহস্রাব্দে ২০০০-০১ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৩৮ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। এ বাজেট প্রথম লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেল ২০০৯-১০ অর্থবছরে। ২০১৯-২০ অর্থবছর বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এর প্রায় পুরোটাই দেশীয় সম্পদ। বাজেটের টাকা কারো আয় বলে অর্থমন্ত্রী বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে আদেশ করেছিলেন। এখনকার মন্ত্রী এই আক্ষেপ করেননি সত্য, কিন্তু সাবেক মন্ত্রীর চিহ্নিত ভূতেরা করোনা আতঙ্কে পালিয়ে গেছে মনে করার কোনো কারণ নেই। দুর্যোগে বরং ভৌতিক বাণিজ্য বেশিই হয়।

মধ্যম আয়ের দেশের উত্তরণের সোপানে বাংলাদেশ। এটি ছিল আশাব্যঞ্জক এবং সম্মানজনক। ব্যাংকসেবা দেয়ার নামে মূলধন পাচার করেন, ভুয়া রফতানি দেখিয়ে ইনসেনটিভ তুলে নেন এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হন তাদের অধিকাংশ। অর্থনীতির গতিবিধি পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, আরো কোনো কোনো দেশের মতো বাংলাদেশ মিডল ইনকাম ট্র্যাপে পড়ে যাচ্ছে না তো?

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আর্থিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলতে শুরু করেছে যে আমরা অর্থনৈতিক মন্দার খুব কাছাকাছি এসে পড়েছি। কেউ কেউ এখন বলছেন, এ মন্দার আকার ও তীব্রতা ১৯২৯ সালের মহামন্দার (গ্রেট ডিপ্রেশন) চেয়ে কম হবে না। জেপি মরগান হিসাব করে দেখিয়েছে জুলাই নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ মন্দার মধ্যে পড়ে যাবে। পৃথিবীর বৃহৎ অর্থনীতিগুলো হয়তো এ অভিঘাত সাময়িকভাবে হজম করতে সক্ষম হবে, কিন্তু করোনাজনিত লকডাউনে সাপ্লাই চেইন ভগ্নদশায়।

এ ধরনের পরিস্থিতি যদি দীর্ঘমেয়াদেও অব্যাহত থাকে তাহলে বিশ্বমন্দা থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।

বৈশ্বিক উৎপাদনে চীনের কেন্দ্রীয় অবস্থান। চীনের উৎপাদন সূচক পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) তলানিতে নেমে গেছে। বাংলাদেশের শিল্প, ভৌত অবকাঠামোর বৃহৎ অংশ চীন থেকে আনা এবং উৎপাদনের অন্তর্বর্তী উপাদানগুলো চীন থেকেই আমদানীকৃত। এই বৈশ্বিক লকডাউন পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে আঘাত হানবে, তা কাটিয়ে ওঠা কষ্টকর হবে। অধিকতর খারাপ পরিস্থিতিতে সর্বাধিক ৩ দশমিক শূন্য দুই ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের উৎপাদন থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে বলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক একটি ধারণা দিয়েছে। চাকরি ছাঁটাই ঘটতে পারে প্রায় নয় লাখ।

অনুমানভিত্তিক হিসাব হলেও সংকট তীব্রভাবেই অনূভূত হতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত টার্ন অ্যারাউন্ড বা ঘুরে দাঁড়ানোর যে কথা বলা হয়, তা মূলত অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো। দিন আনা দিন খাওয়া শ্রমিকের একটি অংশ এর মধ্যেই কর্মহীন হয়ে পড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ন্যূনতম খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে না পারলে ক্ষুধিত মানুষের হাহাকার সামাল দেয়া একসময় কঠিন হয়ে উঠবে।

পরিস্থিতি বদলেছে। ১৯২৯-এর মহামন্দা কাটিয়ে উৎপাদনে ফিরে আসতে সে সময় জন ম্যানিয়ার্ড কিংস যে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন, তা কাজে লেগেছে। অর্থনীতিতে কার্যকরী হস্তক্ষেপ সংকটকালে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন তার দেশের ৪৭ লাখ মানুষের জন্য ১২ বিলিয়ন ডলারের অন্তর্বর্তী অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। তার চেয়েও বেশি যা প্রয়োজন, মানুষের মধ্যে আশা সঞ্চারিত করেছেন। তিনি নাগরিকের সহায়তা চেয়েছেন, যাতে তারা নিজেকে রক্ষা করেন, প্রতিবেশীকেও উপেক্ষা না করেন। করোনাজনিত বিচ্ছিন্নতা ও অবরুদ্ধ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার সংগ্রামটি তার কেবল নিজের নয়, দেশেরও।

লুটেরা ঠিকাদার, লুটেরা আমলা, লুটেরা রাজনৈতিক—এ চক্র ভাঙতে না পারলে ঘুরে দাঁড়ানোর সদিচ্ছা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বলা আবশ্যক, বাংলাদেশ সেখানে নেই, যখন বলা হয়েছে: বাংলাদেশ ইজ দি এন্ড অব দ্য গ্রেট ডেভেলপমেন্ট ড্রিম। বাংলাদেশ আর আন্তর্জাতিক বাস্কেট কেসও নয়। দারিদ্র্য ও ক্ষুধাকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দেয়ার অহংকারও আমরা করেছি।

করোনাভাইরাস কভিড-১৯ আমাদের বড় পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এ পরীক্ষার সফল মোকাবেলাতেই বাংলাদেশ অনেকটা ঘুরে দাঁড়াবে, যেমন ঘুরে দাঁড়িয়েছে জলোচ্ছ্বাসে, সুনামিতে ও বন্যায়; যেমন ঘুরে দাঁড়িয়েছে স্বাধীনতার যুদ্ধে।

লেখক: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন