বুধবার| এপ্রিল ০৮, ২০২০| ২৪চৈত্র১৪২৬

শেষ পাতা

কভিড-১৯-এর ধাক্কা সামলাতে পারবে আফ্রিকা?

ডেভিড কোপেরা

কভিড-১৯ করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রথম ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে পাঁচ মাসও হয়নি, এর মধ্যেই বিশ্বব্যাপী সংক্রমিতের সংখ্যা সাড়ে লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছে, মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজারের কাছাকাছি গোটা বিশ্বেই সমাজ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ঝড় তুলেছে মহামারী এর মধ্যে বিশেষত আফ্রিকা মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মোকাবেলা করতে যাচ্ছে

তবে নিশ্চিত করে বলতে গেলে যতটা ভয় করা হচ্ছিল, আফ্রিকায় ক্ষতির মাত্রা এখনো ততটা নয়, অন্তত ততদূর যায়নি যদিও মহাদেশে আক্রান্ত দেশের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩টি অন্যান্য স্থানে এটি যতটা দ্রুত ছড়িয়েছে, এখানে ততটা দ্রুত ছড়ায়নি বলেই এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে

কিছু বিজ্ঞানীর ধারণা, এক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা রেখেছে পরিবেশ এক গবেষণায় দেখা গেছে, তুলনামূলক উচ্চ তাপমাত্রায় কভিড-১৯ ভাইরাসের পক্ষে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সম্ভাবনা কম সেক্ষেত্রে সংক্রমণের জন্য অনুকূল তাপমাত্রা হতে হবে দশমিক ৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে আফ্রিকার অধিকাংশ দেশেই তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে কালেভদ্রে তার মানে এই নয়, তুলনামূলক উচ্চতাপমাত্রার পরিবেশে কভিড-১৯ ছড়ায় না এক্ষেত্রে শুধু বলা যায়, বাড়তি তাপমাত্রায় এটির সংক্রমণ রোধ করা তুলনামূলক সহজ

কিন্তু সংক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে অন্যান্য চ্যালেঞ্জ রয়েই যাচ্ছে এর মধ্যে প্রথমেই বলতে হয়, কভিড-১৯-এর সুপ্তাবস্থা সাধারণ সর্দির (আরেক ধরনের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ) চেয়ে বেশি এবং আক্রান্ত যাদের মধ্যে এর লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি, সংক্রমণ ছড়িয়ে বেড়ান তারাও তবে যাদের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে, তারা আরো বেশি সংক্রমণ ছড়াতে পারেন এবং সম্ভবত এটিই ভাইরাস সংক্রমণের প্রাথমিক পদ্ধতি লক্ষণ প্রকাশ না পাওয়া ব্যক্তিরা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারেন, কারণ তাদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ সীমিত করে আনার সম্ভাবনা কম কারণে সংক্রমণ শনাক্ত করা বেশ কঠিনও হয়ে পড়ে

এর পরের ইস্যু হলো ক্ষতির প্রাবল্য কভিড-১৯-এর অধিকাংশ সংক্রমণের ক্ষেত্রেই লক্ষণ প্রকাশ পায় তুলনামূলক স্বল্প থেকে সীমিত কিন্তু বয়স্ক এবং আগে থেকেই হূদরোগ ডায়াবেটিসসহ নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভাইরাসটির প্রভাব বাড়ে মারাত্মক আকারে

বাসিন্দাদের গড় ১৮ বছর বয়স (ইউরোপের অর্ধেকেরও কম) নিয়ে বিশ্বের তরুণতম মহাদেশ আফ্রিকা কারণে মহাদেশটির ভাইরাসের ভয়াবহতা নিয়ে আশঙ্কার অবকাশ তুলনামূলক কম গড়ে ৪৭ দশমিক বছর বয়সী নাগরিকদের দেশ ইতালিতে মৃত্যুহার শতাংশে (আক্রান্তের তুলনায়) দাঁড়ানোকে তাই কাকতালীয় বলা যায় না কোনোভাবেই, যেখানে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুহার দশমিক শতাংশ


কিন্তু স্বাস্থ্যগত দিক থেকে আফ্রিকার অবস্থান অনেক দুর্বল যদিও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগগুলোর প্রকোপ উন্নত দেশগুলোতেই বেশি, এগুলোর প্রাদুর্ভাব যে এখন আফ্রিকাতেও বাড়ছে, তার প্রমাণ রয়েছে উপরন্তু এইচআইভি (এইডসের ভাইরাস) যক্ষ্মা দুই রোগের প্রাদুর্ভাবে আফ্রিকা আগে থেকেই বিপর্যস্ত, দুয়ের কারণে কভিড-১৯- আক্রান্তরাও পড়ে যেতে পারেন মারাত্মক ঝুঁকিতে

বিশ্বের মোট এইচআইভি আক্রান্তের ৭০ শতাংশেরই বাস সাব-সাহারান আফ্রিকায় বিশ্বব্যাপী যক্ষ্মায় নতুন করে আক্রান্ত রোগীরও ২৫ শতাংশের বাস এখানে এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণও যক্ষ্মাসেটিও প্রধানত আফ্রিকাতেই ঘটে থাকে এখন পর্যন্ত যেসব এলাকা করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব এলাকায় এইচআইভি যক্ষ্মার প্রকোপ তুলনামূলক অনেক কম কারণে কভিড-১৯- আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এসব রোগের প্রভাব কী, সে সম্পর্কে খুবই কম তথ্য রয়েছে তবে এটুকু ধরে নেয়াই নিরাপদ, এইচআইভি অথবা যক্ষ্মায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে মারাত্মক চেহারা নিয়ে দেখা দিতে পারে কভিড-১৯

তবে এর পরও আশা রয়েছে কিছু দেশ এরই মধ্যে কভিড-১৯-এর ওপর অ্যান্টি রেট্রোভাইরাল (এইচআইভি বা অন্যান্য রেট্রোভাইরাসের কর্মক্ষমতা নষ্টকারী) ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে এইচআইভির সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাবযুক্ত দক্ষিণ পূর্ব আফ্রিকার ৬০ শতাংশেরও বেশি এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তি এরই মধ্যে অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল চিকিসা গ্রহণ করছেন

কিন্তু সাহস দেয়ার ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা এখনো অনেক দূর যদি এমন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়াও যায়, তার পরও দক্ষিণ পূর্ব আফ্রিকার এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তিদের প্রায় ৪০ শতাংশ ( কোটি লাখ মানুষ) এখনো উচ্চমাত্রায় নাজুক অবস্থানে রয়েছেন

কভিড-১৯ মহামারী চলাকালে আফ্রিকার জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকির হলো এখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা ভাইরাস যেখানে ইতালির মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে, সেখানে সীমিত সম্পদ নিয়ে চলা আফ্রিকার দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কী ঘটবে, তা বলাই বাহুল্য

বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯-এর দ্রুত সংক্রমণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার, এটি শুধু আফ্রিকার সমস্যা নয় ভাইরাসটি যদি আফ্রিকায় জেঁকে বসার সুযোগ পায়, তাহলে তা বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও ফিরে যেতে পারে যেসব দেশ এরই মধ্যে ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণে এনেছে, সেখানে নতুন করে তা আবার ছড়িয়েও পড়তে পারে এক্ষেত্রে বাইরের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য একমাত্র সমাধান হলো আফ্রিকার সরকারগুলোর সঙ্গে একযোগে প্রধান দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে, দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই

(ডেভিড কোপেরা একজন মেডিকেল ভাইরোলজিস্ট এবং আফ্রিকান হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাব-সাহারান আফ্রিকান নেটওয়ার্ক ফর টিবি/এইচআইভি রিসার্চ এক্সেলেন্সের (এসএএনটিএইচই) প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার)

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন