শুক্রবার | আগস্ট ১৪, ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

শেষ পাতা

পাথরের বৃষ্টি ঝরাল আকাশ জমিন ছাড়ল বিষাক্ত বৃশ্চিক

শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের স্নেহধন্য কবি জহির দেহলভির সিপাহি বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থদাস্তান--গদর: দ্য টেল অব দ্য মিউটিনি সিপাহি বিদ্রোহের অমূল্য দলিল নিয়ে শানজিদ অর্ণবের রূপান্তরে ধারাবাহিক আয়োজন

ঝাজ্জার গমন

পথ চিনে নেয়ার পর দ্বিতীয় দিনে আমরা ঝাজ্জারের উদ্দেশে যাত্রা করলাম সেদিনই আমরা ঝাজ্জারে পৌঁছে গেলাম আমরা মামার খোঁজ করে তার বাড়িতে গেলাম

আমাদের চেহারাগুলো দেখেই মামা সাহেব উচ্চৈঃস্বরে হাহাকার শুরু করলেনআহা বেচারা! কী দুর্যোগে তোমরা ফেঁসে গেলে!’

তিনি আমাদের সান্ত্বনা দিলেন, হাত-মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন এবং তার দিওয়ানখানায় নিয়ে গেলেন তিনি আমাদের সেখানেই থাকতে বললেন

তিনি আগা সুলতানকেও ভালোভাবে চিনতেন পরে তিনি আমাকে আমার ছোট ভাইকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন এবং তার স্ত্রী, আমাদের মামিকে বললেন, ‘দেখো, আমার ভাগিনাদের করুণ অবস্থা আমার বোন বাদশাহ বেগম কী যত্নে এদের বড় করেছে আর এখন ওরা এমন খারাপ অবস্থায় আটকে গেছে

মামিও কাঁদতে শুরু করলেন এবং আমাদের বললেন এখানে আসার আগের সব ঘটনা বর্ণনা করতে আমরা তাকে সব খুলে বললাম

পরদিন মামি অনেক কাপড়চোপড় নিয়ে এসে বললেন, ‘তোমরা আর কোথাও যেতে পারবে না তোমরা এখানেই থাকবে 

আমার আটদিন মামার বাসায়ই রইলাম কিন্তু আমাদের ভাগ্যে এটা সহ্য হচ্ছিল না এবং নিয়তি আমাদের ওপর আরেকবার নিষ্ঠুর আঘাত হানল

মধ্যরাতে নওয়াব সাহেব আমার মামাকে ডেকে পাঠালেন এক ঘণ্টা পর চোখে পানি নিয়ে তিনি ফিরে এলেন

কী হয়েছে মামা?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম

আমি আর কী বলব? যে বিপর্যয় তোমাদের এখানে আসতে বাধ্য করেছে, সে বিপদ এখন আমাদের ঘাড়েও চেপে বসল ব্রিটিশ সেনারা এখানে পৌঁছে গেছে দেখা যাক কী হয় কারণেই নওয়াব সাহেব আমাকে ডেকেছিলেন আমার মনে হয় তোমাদের এখান থেকে চলে যাওয়াটাই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হবে সোনেপত হয়ে পানিপথ চলে যাও আমার বলদ টানা গাড়ি তোমাদের সোনেপত নিয়ে যাবে তোমরা সেখানে অন্য কোনো বাহন পেয়ে যাবে তোমাদের মায়ের পক্ষের কিছু আত্মীয়ও সেখানে আছেন হয়তো তারাই তোমাদের আশ্রয় দেবেন

আমরা পানিপথের উদ্দেশে গরুর গাড়িতে রওনা হলাম আমার নানার ভাইদের বাড়ি ছিল সেখানে তারা আমাদের বিদ্রোহ শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানেই থাকতে বললেন

আমি বললাম, ‘আমার বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী বারসাথে চাচির বাড়িতে আছেন

আমি বারসাথে পৌঁছলাম বেলা ১১টায় বাবা উঠানে কাঁদছিলেন এবং আমার নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করছিলেনহে খোদা, যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, একমাত্র আপনিই তাদের মেলাতে পারেন অনুগ্রহ করে আমাকে সন্তানদের সঙ্গে সাক্ষা করিয়ে দিন আমি তাদের আপনার হেফাজতেই ছেড়েছিলাম

আমি ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় পৌঁছেছিলাম এবং বাবাকে ডাকলাম দরজা খুলে দেয়ার জন্য আমার বড় চাচি আমার গলার স্বর চিনতে পেরেছিলেন, তিনি ছুটে এলেন

বাবা তখনো বিহ্বল হয়ে ছিলেন, বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি তখনই বিশ্বাস করলেন, যখন আমার চাচি শপথ করে বললেন, ‘আমি এইমাত্র নওয়াব মির্জার গলা শুনেছি সে দরজায় ডাকছে

দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমি ঝুঁকে পড়ে বাবার চরণ স্পর্শ করলাম তিনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রার্থনা শুরু করলেন

 

আমরা পানিপথে পৌঁছলাম

সময় যেন যোদ্ধার মতো; আর আমি তা অগ্রাহ্য করে

পোশাক পরে আশায় থেকেছি

আঘাত থেকে বাঁচতে

আকাশ অশান্তির প্রস্তরবৃষ্টি করেছে

এবং আমি, এক সাধারণ মানুষ, আশ্রয় খুঁজেছি স্ফটিকের দুর্গে!

কয়েকদিন পর আমরা সবাই পানিপথের উদ্দেশে যাত্রা করলাম সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিলাম আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম জীবিকার জন্য বাণিজ্য করব এবং একটা ছোট দোকান ভাড়া নিলাম কেনাবেচার জন্য আমরা একজনকে নিয়োগ করলাম, তবে অর্থের হিসাব আমিই রাখতাম কাজে দিনে দুবার দোকানে যেতাম

আল্লাহর অনুগ্রহে আমাদের সেই দোকান বেশ ভালো চলতে শুরু করল আমরা ভালোভাবেই দিন গুজরান করছিলাম দোকানের সব খরচ বাদ দিয়েও আমাদের ভালোই মুনাফা হচ্ছিল কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের দোকানে ৩০০-৪০০ রুপির মালপত্র উঠল

আমাদের বাড়িতে দিনে খরচ ছিল দুই রুপি পাঁচটা মাস ভালোই কাটল কিন্তু আবারো ভাগ্যের উপহাস আমাদের সুখ ছিনিয়ে নিল হিংসুটে নিয়তি আবার আমাদের উচ্ছেদ করার সিদ্ধান্ত নিল

আকাশ পাথরের বৃষ্টি ঝরাল আর জমিন শত্রুতা করে বিষাক্ত বৃশ্চিক ছেড়ে দিল বদমাশ গামি এসে পানিপথে হাজির হলো এবং শাস্তি, ফাঁসি দেয়া শুরু হলো তারা দিল্লি থেকে আসা সবাইকে গ্রেফতার করতে শুরু করল

বারসাথে নওয়াব হামিদ আলী খানকে পুরো পরিবারসহ গ্রেফতার করা হয় সব নরক যেন পানিপথে ভেঙে পড়ল, পুরো এলাকা অবরুদ্ধ হলো

পানিপথের মানুষ আমাদের রক্ষা করলেন তারা আমাদের জন্য যা করলেন তা কেবল পুত্রের প্রতি পিতার আচরণের সঙ্গেই তুল্য তারা আমাদের জন্য তাদের জীবন সম্মান লুটিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন তারা আমাদের নারীদের নিজেদের ঘরে লুকিয়ে রাখলেন

তারা আগেই আমাদের অর্থ খাবার দিয়ে সাহায্য করেছিলেন এবং এবার তারা আমাদের জন্য জীবন দিতে দাঁড়িয়ে গেলেন আমার মনে হয় না পানিপথওয়ালারা সেদিন দিল্লিওয়ালাদের যতটা সহায়তা করেছিলেন ততটা কেউ কাউকে করে

অবরুদ্ধ পানিপথ

সবদিক থেকে পানিপথকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছিল শহরে প্রবেশ করার এবং বের হওয়ার সবগুলো সড়ক আটকে দেয়া হয়েছিল একে একে দিল্লিওয়ালাদের গ্রেফতার করা শুরু হয়

এক বিকালে আমি আমাদের বাড়ির পেছন থেকে আমার চাচির বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করলাম তিনি ছিলেন মৌলবি ইব্রাহীম সাহেবের ভাড়াটিয়া সেখানে আমরা চলমান গ্রেফতার অভিযান নিয়ে আলোচনা করেছিলাম একপর্যায়ে আমি উত্তেজিত হয়ে সেখান থেকে চলে এলাম আমার বোন আমাকে থাকতে বলল, কিন্তু আমি চলে এসেছিলাম বের হতেই দেখি এক থানেদার তার দলবল নিয়ে গলির দিকে এগিয়ে আসছে আমি ভাবলাম, যদি এখন আবার বাড়ির ভেতরে ঢুকে যাই, তাহলে তাদের সন্দেহ হবে এবং তখন ভেতরে ঢুকে বাড়ির সবাইকে গ্রেফতার করবে

আমি বেশ একটা উদাসীন ভাব নিয়ে তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বলে উঠলাম, ‘ভাই, এই দিল্লিওয়ালাদের জন্য আমরাও বেশ বিপদে পড়ে গেছি

আমি পাশ দিয়ে চলে গেলাম এবং তারা কিছুই বুঝতে পারল না আমি যে বাড়ি ছেড়ে এলাম, তারা সেটাতেই প্রবেশ করল এরই মধ্যে আমি বাড়ির বিরাট দেওরহির শেষ মাথায় পৌঁছে গেছি তখন বুঝলাম, আমার পা আর এগোতে চাইছে না আমি আর এগোতে পারলাম না এবং এক কোণে রাখা পশুর খাবারের স্তূপের তলায় লুকিয়ে পড়লাম থানেদার আমার চাচা, ভাই, শ্যালককে গ্রেফতার করল এবং আমি যেখানে লুকিয়ে ছিলাম, ঠিক তার পাশ দিয়েই চলে গেল

তারা চলে যাওয়ার পর আমি কাঁদতে কাঁদতে পাগলের মতো ছোটাছুটি শুরু করলাম বেদনায় আর্দ্র হয়ে গিয়েছিলাম শেষমেশ আমি দারুণ ভারাক্রান্ত মনে আমার শাশুড়ির বাড়িতে পৌঁছতে পারলাম এবং সেখানে সব খুলে বললামআমার মনে হয়, এই স্থান ছেড়ে যাওয়াটাই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হবে, নতুবা আমিও যেকোনো মুহূর্তে গ্রেফতার হতে পারি,’ বললাম

আমার শাশুড়ি বু আলী নামে এক স্থানীয়কে ডাকলেন, যার পরিবার তার অধীন কাজ করত তিনি বু আলীকে অনুরোধ করলেন, ‘আমার দুই সন্তানকে এখান থেকে নিরাপদ কোনো জায়গায় নিয়ে যাও

বু আলী বলল, ‘আপনি যেমনটা বলবেন বেগম সাহেবা আমি তাদের নিরাপদ কোনো স্থানে নিয়ে যাব

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন

×