মঙ্গলবার| এপ্রিল ০৭, ২০২০| ২২চৈত্র১৪২৬

দুর্দম

তবু মাথা নোয়াবার নয়

আব্দুল বায়েস

কেউ বলছে মহামারী চলছে সারা বিশ্বে, কেউ বলছে মহাদুর্যোগের মুখোমুখি পুরো পৃথিবী কেউ আবার আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে একটা মহামন্দা গ্রাস করে যাচ্ছে বিশ্বকে তবে যে বিশেষণেই বিভূষিত হোক না কেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে পুরো পৃথিবী যে প্রকম্পিত, তা নিয়ে কোনো সংশয় আছে বলে তো মনে হয় না সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম এই জীবাণুর আক্রমণের তীব্রতা বলতে গিয়ে একটা পরিসংখ্যানই যথেষ্টগেল ২৪ ঘণ্টায় সারা পৃথিবীতে করোনাভাইরাস আক্রমণ থেকে প্রাণ হারিয়েছে দেড় হাজার মানুষ শুধু চীনে আক্রান্ত হয়েছে ৮০ হাজারের ওপরে, মারা গেছে তিন হাজারের ওপর ইতালিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৯ হাজার, আর মারা গেছে পাঁচ হাজারের ওপর মোট কথা, বৈশ্বিক আক্রান্ত সাড়ে তিন লাখ মৃত্যু সাড়ে ১৪ হাজারের বেশি (২৩ মার্চ পর্যন্ত) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, করোনাভাইরাসের ভয়ে কাঁপছে খোদ উন্নত বিশ্ব সারা বিশ্বে ঘরে থাকার নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর প্রাথমিক বিপদ সামলে উঠতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে কিন্তু অন্যান্য দেশে পরিস্থিতি রীতিমতো ভয়ঙ্কর

দুই. বাংলাদেশে প্রাণঘাতী রোগ ছড়াতে শুরু করেছে মাত্র আক্রান্ত মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, যদিও সংখ্যার দিক থেকে এখনো তেমন উদ্বেগজনক নয় তাছাড়া কমিউনিটি পর্যায়ে ভাইরাসটি এখনো বিস্তৃত হয়নি বলে কিছুটা হলেও রক্ষা তবে বাংলাদেশকে নিয়েই দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি প্রধানত তিনটি কারণে. দেশটিতে জনঘনত্ব পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চের অন্যতম প্রতি বর্গকিলোমিটারে এখানে এক হাজারের বেশি লোক বাস করে সারা পৃথিবীর মানুষ যদি আমেরিকায় বসত করে, তখন সেখানে জনঘনত্ব যা হতে পারে, বাংলাদেশে তার চেয়েও বেশি সুতরাং সংক্রামক এই ভাইরাস একবার যদি হানা দেয় তাহলে হাজারে হাজারে এমনকি লাখে লাখে মানুষ মারা যেতে পারে বলে অনেকে মনে করেন

. দেশে মানুষের স্বাস্থ্যসচেতনতা খুবই নিম্নমানের তারা রাস্তায় থুতু ফেলে, কাশতে গিয়ে মুখ ঢাকে না, নাক-মুখ না ঢেকে হা করে হাঁচি দেয় হাত-মুখ ধুয়ে খাবারের আগে পরে শরীর মনকে সতেজ রাখার অভ্যাস নেই করোনাভাইরাস যেহেতু মূলত মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়, তাই বাংলাদেশে এর আক্রমণের তীব্রতা বেশি বলে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান এবং

. পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম বা গণস্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যবস্থার প্রচণ্ড দুর্বলতা - এই তিনটি মূল উপাদান করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মৃতের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি করতে পারে বলে একটা শঙ্কা বিদ্যমান আছে

তবে গল্পের উল্টো পিঠেও গল্প থাকে চীনের আশপাশের দেশ হয়েও রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর তাইওয়ান কেন চীনের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েনি, সেটা একটা গল্পই হবে আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানির মতো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ যেখানে করোনাভাইরাসে কুপোকাত, সেখানে দেশগুলো আছে বেশ ভালো অবস্থায় এর প্রধান কারণ সময়মতো সমস্যাটা হূদয় দিয়ে অনুধাবন করা এবং সেই লক্ষ্যে একটা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া

তিন. বাংলাদেশ যেমন দুর্যোগপ্রবণ দেশ, তেমনি একটা রোল মডেল দুর্যোগ মোকাবেলায়ও স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যা, আইলা-সিডরের ফলে ক্ষয়ক্ষতি ইত্যাদি দুর্যোগ মানুষকে লড়াই করে বাঁচতে শিখিয়েছে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উন্নয়নের রোল মডেলএসবই সম্ভব হয়েছে দেশের মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম আনুক্রমিক সরকারগুলোর যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে

তবে এবারের সংকটের বিস্তৃতি ভয়াবহতা অতীতের সব সংকটকে যেন হার মানাতে চলেছে বস্তুত পুরো পৃথিবীতে তা- চলছে আমাদের রফতানির দুই বৃহৎ বাজার ইউরোপ আমেরিকা বন্ধ হওয়ার পথে আমাদের প্রবাসী প্রেরিত অর্থ নিম্নমুখী হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না কারণ ওইসব দেশে লকডাউন অন্যান্য কারণে কর্মসংস্থানে ভাটা পড়তে পারে আমাদের আমদানির বড় বাজার বিশেষত চীন ভারত নিজের দেশে গৃহীত পদক্ষেপের কারণে অনেকটা সংযোগবিহীন দেশের ভেতরে সার্বিক চাহিদা পড়ন্ত আগামী অর্থবছরের প্রস্তুতি কেমন হবে তা একমাত্র আল্লাহই জানেন

চার. আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন আশাবাদী মানুষ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে দেশটি যেমন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা রীতিমতো নাটকীয় চমকপ্রদ সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও করোনাভাইরাস থেকে মানুষকে বাঁচাতে এবং এর বিরূপ প্রভাব যথাসম্ভব কম রাখতে সরকার যে কোনো কার্পণ্য করবে না, সে ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত লকডাউন অনেক আগে করা উচিত ছিল, তবে এখনো সময় আছে বিশেষত এই সংকটময় মুহূর্তে সেনাবাহিনীর সাহায্য নেয়া হবে একটা সংগত প্রত্যাশিত পদক্ষেপ শহরের বস্তিগুলোয় মানুষকে ঘরে আটকে রেখে আর্থিক সামাজিক কৌশল নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি মুহূর্তে

পাঁচ. সরকার তার নিজস্ব দায়িত্ব পালন করছে এবং করবেও কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মতোই সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের করণীয় খুবই সাধারণ: পারত ঘরের বাইর না হওয়া; জনসমাগম এড়িয়ে চলা, খাওয়ার আগে পরে কিংবা বাইরে থেকে ঘরে প্রবেশ করে সাবান দিয়ে হাত-মুখ ধোয়া, হাত-মুখ ঢেকে কিংবা হাতের কনুইতে ঢেকে হাঁচি দেয়া, মুখ ঢেকে কাশি দেয়া, বিদেশ থেকে আসা কারো সঙ্গ এড়িয়ে চলা এবং হটলাইনে যোগাযোগ করা অন্যতম নাগরিক দায়িত্ব এই সামান্য দায়িত্বটুকু পালনে অবহেলা শুধু নিজের কিংবা পরিবারের জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে না, বরং পুরো একটা জনগোষ্ঠীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে

চলমান সংকট বাংলাদেশকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ সৃষ্টি করেছে প্রথমত, গণস্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যবস্থাকে আরো প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ করে গড়ে তোলা দ্বিতীয়ত, সংকটকালে অসাধু ব্যবসায়ী মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ তৃতীয়ত, বিলাসবহুল ব্যয়সাধ্য উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করার চেয়ে ব্যয়সাশ্রয়ী স্বাস্থ্য শিক্ষামূলক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া চতুর্থত, চীন তথা তার আশপাশের দেশগুলোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এই মহাদুর্যোগ কাটানোর প্রয়াস গ্রহণ করা সব শেষে স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি উদ্যোগকে উৎসাহ প্রদান স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা

বাংলাদেশ জ্বলে-পুড়ে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়অতীতে যেমন, এখনো তেমন যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় দেশ এক অদ্বিতীয় তার পরও মনে মনে পড়িলা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজজোয়ালেমিন শেষ কথাআল্লাহ সবার সহায় হোন

 

আব্দুল বায়েস: অধ্যাপক সাবেক উপাচার্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন