মঙ্গলবার| এপ্রিল ০৭, ২০২০| ২২চৈত্র১৪২৬

দুর্দম

যুদ্ধবিধ্বস্ত-দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশ থেকে স্বনির্ভর কৃষি

শামসুল আলম

অগ্রগতির যাত্রায় আমরা আজকে অনেকদূর পেরিয়ে এসেছি কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি বৈচিত্র্যায়ণে আমাদের সাফল্য গর্ব করার মতো মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩.৬০ শতাংশ এখনো বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল শ্রমশক্তি জরিপের (২০১৬) হিসাবমতে, দেশের মোট শ্রমমক্তির ৪০. শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত

সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি খাতে উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে গত পাঁচ বছরে দেশে অতিদারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশে কমানোর ক্ষেত্রেও কৃষি উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জাতিসংঘের খাদ্য কৃষি সংস্থা, আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে আইএফপিআরের ক্ষুধা নিবারণ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ খাদ্যশস্য (চাল, গম) উৎপাদন এখন পৌঁছেছে প্রায় তিন কোটি আশি লাখ টনে, ১৯৭২ সালে যা ছিল প্রায় এক কোটি টন জাতিসংঘের খাদ্য কৃষিবিষয়ক খাদ্য কৃষি সংস্থার (এফএও) দ্য স্টেট অব ফিশ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮ শীর্ষক প্রতিবেদনে অনুযায়ী, প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে জাতিসংঘের কৃষি খাদ্য সংস্থার তথ্যমতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় আগে শাকসবজির উৎপাদন শীত মৌসুমে ব্যাপ্ত ছিল (মোট উৎপাদনের ৭০ শতাংশ), যা এখন বছরব্যাপী প্রসারিত হয়েছে পোলট্রি ডিম ১৬ কোটি মানুষের চাহিদা মেটাচ্ছে হাজার ৭০০ কোটি পিস এখন আমাদের বার্ষিক (২০১৮-১৯) ডিম উৎপাদন ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ আর ছাগলের মাংস উৎপাদনে পঞ্চম বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল বিশ্বের উন্নত জাত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে কলা চাষে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ নতুন ফলের উদ্ভব ঘটেছে যেমন স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, বাউকুল, আপেল কুল, আরবি খেজুর ইত্যাদি স্বাধীনতার পর থেকে গত প্রায় পাঁচ দশকে কৃষিজমি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেলেও শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় চার গুণ অথচ স্বাধীনতার পর আমরা শুরু করেছিলাম প্রায় শূন্য হাতে কৃষিতে সাড়ে চার দশকে আমাদের উত্থান এক কথায় বিস্ময়কর মুক্তিসংগ্রামের চেয়ে মুক্তিসংগ্রাম-উত্তর বিপর্যস্ত অর্থনীতির বাস্তবতা ছিল শুধু হতাশাপূর্ণ বিজয়ানন্দ ম্লান হয়ে যাচ্ছিল মুক্তিসংগ্রামবিরোধী অতি বাম হতাশাগ্রস্ত রাজনীতির নৈরাজ্য প্রচেষ্টা, কিছু তরুণ মুক্তিযোদ্ধার উচ্ছৃঙ্খল আচরণ আর বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী আন্তর্জাতিক চক্রের অশালীন উক্তি হতাশা ছড়িয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় তলাবিহীন ঝুড়ি, সাহায্য ঝুড়িতে ফেলা কিংবা অর্থনীতিবিদ জাস্ট ফাল্যান্ড জেআর পার্কিনসনের মন্তব্য ছিল, যদি বাংলাদেশ উন্নয়ন করতে পারে, তবে পৃথিবীর আর কোনো দেশই উন্নয়ন করবে না, এমন থাকবে না

নয় মাস যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের জনগণের জন্য খাদ্য আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল যুদ্ধের জন্য অনেক ক্ষেতে ফসল বোনা সম্ভব হয়নি ফলে স্বাধীনতার পর পরই দেখা গেল সরকারি খাদ্যগুদাম শূন্য জনযুদ্ধের ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের প্রাথমিক জরিপে উল্লেখ আছে যে শুধু খাদ্যশস্য আমদানি নয়, আগামী ফসল আবাদের জন্য কৃষকের হাতে তিন ভাগের এক ভাগ বীজধানও ছিল না তখন সার, কীটনাশক ওষুধ, হালের বলদ, পাওয়ার পাম্প, গভীর নলকূপ সবকিছুই নতুন করে সংগ্রহ করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয় জরিপে আরো উল্লেখ করা হয়, বাহাত্তরের কৃষি মৌসুমেই তিন হাজার মণ গম বীজ, বোরো ধান বীজ হাজার মণ, ৩২০ হাজার টন সার, আলুবীজ ১৫০০ হাজার টন, ২০ হাজার পাওয়ার পাম্প তাত্ক্ষণিকভাবে প্রয়োজন অথচ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যা আছে তার পরিমাণ এতই নগণ্য যে তাতে ১০ শতাংশ চাহিদাও মিটবে না বিশ্বব্যাংক জরিপে কৃষি আবাদের এক লাখ বলদ ছাড়াও দুগ্ধবতী গাভির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ফলে আবাদে যেমন বিঘ্ন ঘটবে, তেমনি সারা দেশে শিশুরা দুধের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগবে বিশ্বব্যাংকের জরিপে বসতবাড়িসহ সরকারি-বেসরকারি যেসব অফিস-আদালত, খাদ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, গুদামঘর, স্কুল পুড়িয়ে দেয়া হয় সেই বিবরণে শুধু গ্রামাঞ্চলেই ৪৩ লাখ বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল উল্লেখ করা হয়েছিল যারা ফিরে এসেছে তাদের জন্য কমপক্ষে ১০ লাখ বসতবাড়ি নির্মাণের প্রয়োজন তাত্ক্ষণিকভাবে ৩০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতির কথা ওই জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে পাকিস্তানিরা চট্টগ্রাম বন্দরটি সম্পূর্ণভাবে শুধু ধ্বংসই করেনি, বন্দর থেকে বহুদূর পর্যন্ত সমুদ্রপথে মাইন পুঁতে রেখেছিল, ফলে খাদ্যশস্য নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে কোনো জাহাজ এসে যে আউটারে নোঙর করবে, সে উপায় ছিল না তাছাড়া স্থলপথের রেল যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল সড়ক যোগাযোগও ধ্বংস করা হয়েছিল সেতুগুলো উড়িয়ে দিয়ে খাদ্য পরিবহনকারী ট্রাক রেলবগিগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল রেল ইঞ্জিন মেরামতের কারখানাটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল ডিনামাইট দিয়ে সড়ক বিভাগের রিপোর্টে (১৯৭২) উল্লেখ করা হয়েছিল, তাত্ক্ষণিকভাবে ১৩০টি বড় মধ্যম ধরনের সেতু সম্পূর্ণ নতুন করে নির্মাণ করতে হবে ১৫০টি ইঞ্জিনচালিত ফেরির প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, যতদিন সেতু নির্মাণ না করা হয় অভ্যন্তরীণ নদীপথের সংস্কার কমপক্ষে ১৫০০টি খাদ্যবাহী কার্গোর প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল অর্থাৎ এতসব অভাব পূরণ হলে তবেই সুষ্ঠু খাদ্যশস্য পরিবহন সম্ভব ২৩৭টি মাঝারি বড় আকারের শিল্প-কারখানার ১৯৫টি কারখানাই আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত, এগুলো সংস্কারের জন্য যন্ত্রাংশ কারিগরিভাবে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন প্রায় সব মিল-কারখানারই মালিক ছিল অবাঙালি-ব্যবস্থাপক পরিচালকরাও ৬৬৩টি ছোট ধরনের কারখানার প্রায় সবকটিই বন্ধ বিশ্বব্যাংকের মন্তব্য ছিল শুধু ছোট ছোট কারখানা চালু করার জন্যই সে সময়ে প্রায় কোটি ডলার প্রয়োজন বিদেশ থেকে কাঁচামাল খরিদের জন্য ওই প্রতিবেদনে আরো মন্তব্য করা হয়েছিল কলকারখানা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশে আপাতত কোনো দক্ষ পরিচালক নেই ৯০০ কলেজ, হাজার হাইস্কুল কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক জরিপ হিসেবে বলা হয়েছিল, স্কুল-কলেজগুলোর জন্য তাত্ক্ষণিক প্রয়োজন ১০ হাজার শিক্ষকের সারা দেশ বিদ্যুিবচ্ছিন্ন স্থানীয়ভাবে কিছু বিদ্যুতের ব্যবস্থা টিকে ছিল শিল্পের জন্যও বিদ্যুতের ব্যাপক অভাব ছিল তবে তাত্ক্ষণিকভাবে প্রয়োজন ছিল ১১ হাজার বিদ্যুৎ খুঁটির ১৬ ডিসেম্বর সকালে স্টেট ব্যাংকের টাকা ব্যাংকের সামনের চত্বরে এনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল এক হিসাবে দেখা যায়, যুদ্ধে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে যে সম্পদ ধ্বংস হয়েছে এবং যুদ্ধ-পরবর্তীকালে তার যে অর্থনৈতিক প্রভাব সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ তত্কালীন বাজারমূল্যে প্রায় ২৩.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তত্কালীন বিনিময় হার অনুযায়ী ১১,২৩৮.৩৬ কোটি টাকা এক কথায়, ৩০ লাখ শহীদের আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে ১৯৭১ যখন স্বাধীনতা পেলাম, তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি বলতে কিছুই ছিল না প্রতিটি গ্রাম ছিল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বৃহত্তর অর্থনীতির সঙ্গে প্রায় সংযোগবিহীন সবুজ শ্যামল দেশকে বিরাণ শ্মশান করেই হানাদার বাহিনী দেশ ছেড়েছে

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেই বঙ্গবন্ধু দেখেন যে মাত্র মাস যুদ্ধে বাংলার জনপদের, জনগণের যে ক্ষতি ধ্বংস সাধন করা হয়েছে তা অভূতপূর্ব বিশ্বযুদ্ধের সময়ও কোনো দেশের শত্রুপক্ষ এমন গ্রাম-গ্রামাঞ্চলব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞ করেনি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম, সর্বত্রই ধ্বংসযজ্ঞের বিশৃঙ্খল স্তূপ নামেমাত্র যে শিল্প-কারখানা ছিল, পাকিস্তানিরা ফেলে পালিয়েছে, সশস্ত্র যুদ্ধের নয় মাসে সবই ধ্বংসপ্রাপ্ত, এক কোটির বেশি দেশে ফেরতপ্রত্যাশী শরণার্থী, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় কিংবা তাদের ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ায় গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে একাত্তরের শেষে তেমন ফসল-ফলাদি ঘরে তোলা যায়নি মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে, সব বয়সী মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সহায়তাদানকারীরা বিজয়ীর বেশে ঘরে ফেরেন লক্ষ অস্ত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যত্রতত্র রাস্তা-সড়ক জনপথ, ব্রিজ, কালভার্ট জনযুদ্ধের কৌশলে সবই ধ্বংস করা হয়েছিল রাষ্ট্র ভাণ্ডারশূন্য ব্যাংকের টাকা পোড়ানো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তহবিল শূন্য করা, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা, খাদ্যগুদাম পুড়িয়ে দেয়া, কৃষি ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়া এসব ছিল বাঙালি জাতিকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পিত যজ্ঞ স্বাধীনতা অর্জনের পর দেখা দিল প্রশাসন ব্যবস্থা দাঁড় করানোর অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ দু-তিনটি দেশ ছাড়া নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি মেলেনি তখনো বাণিজ্য অবকাঠামো নেই স্বাধীনতা-উত্তরকালের বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থার পর্যালোচনা করে বিশ্বজুড়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ৫০ লাখ মানুষ অনাহারে প্রাণ হারাবে, দেখা দেবে দুর্ভিক্ষ ১৯৭২- দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল অক্সফাম, বিশ্বব্যাংক, ইউএসএআইডি ১৯৭২ কিংবা ১৯৭৩- সে দুর্ভিক্ষ হয়নি ১৯৭৪- ব্যাপক দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় বোরো আমন বিনষ্ট হয়ে খাদ্য ঘাটতি প্রকট রূপ নেয় সেটাও হয়তো কাটানো যেত, কিউবায় পাট রফতানির অজুহাতে পিএল ৪৮০ চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে খাদ্যশস্য প্রেরণ বন্ধ করে দিলে দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থার সৃষ্টি হয় এমনি এক ভয়াবহ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ শাসনভার গ্রহণ করেছিল সেই চ্যালেঞ্জের দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টি, মহানুভবতা, প্রজ্ঞা অন্তর্দৃষ্টি, বিশেষভাবে দ্রুত প্রশাসন কাঠামো দাঁড় করানো, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত অস্ত্রগুলো রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে নেয়া, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য সফল কূটনীতি পরিচালনা করা, সংবিধান প্রণয়নে এগিয়ে যাওয়া, ভারতীয় সৈন্যদের দেশে পাঠানো, অর্থনীতি পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করা, বিশেষভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে পুনঃসক্রিয় করা, দেশে ফেরার ১৯ দিনের মাথায় পরিকল্পনা কমিশন প্রতিষ্ঠা করা, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে রাষ্ট্রীয়করণ করা, একটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্পন্ন করা, ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠন; নিশ্চিত বলা যায়, মাত্র সাড়ে তিন বছর সময়ে এটা কখনই সম্ভব হতো না বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের অগ্রাধিকার খাত ছিল কৃষি কৃষিকে আধুনিক করা এবং খাত উন্নয়নের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেন উদ্দেশ্য ছিল যাতে খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা যায়, দরিদ্র কৃষককে বাঁচানো যায়, সর্বোপরি কৃষিতে কীভাবে বহুমুখিতা আনা যায় তাত্ক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয় ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা রহিত করা হয় ধান, পাট, তামাক, আখসহ গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের ন্যূনতম ন্যায্যমূল্য বেঁধে দেয়া হয়, যাতে কৃষিপণ্যের ন্যায়সংগত মূল্য কৃষকরা পান দরিদ্র কৃষকদের বাঁচানোর স্বার্থে সুবিধাজনক নিম্নমূল্যের রেশন সুবিধা তাদের আয়ত্তে নিয়ে আসা হয় স্বল্পমূল্যে খাদ্যশস্য সরবরাহে রেশন ব্যবস্থাকে বিস্তৃত করা হয়

খাসজমি নতুন চর বিনা মূল্যে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন ঋণে জর্জরিত কৃষকদের মুক্তির জন্য খায়-খালাসি আইন পাস, বন্ধকি চুক্তি কবলা জমি সাত বছর ভোগ করা হলে তা মালিককে ফেরত প্রদান, যাতে জোতদারদের কাছ থেকে কৃষক জমি ফেরত পায়

১৯৭৩-৭৪ সাল বঙ্গবন্ধু সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল দেশ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে ১৯৭৪ সালের দিকে বঙ্গবন্ধুর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সূচনা হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে সোনার বাংলা গড়ে তুলতে, দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক গ্রামীণ উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালের জুলাই প্রণীত হয় বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) পরিকল্পনাকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, A Plan for reconstruction and development of the economy taking into account the inescapable political, social and economic realities of Bangladesh অবকাঠামো পুনর্গঠনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি পরিকল্পনায় কৃষি ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিতে সর্বাধিক মনোযোগ দেন ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মসূচিতে তিনি ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন শুধু কৃষি খাতের জন্য নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছেন, সমৃদ্ধ কৃষিই স্বনির্ভর অর্থনীতির পূর্বশর্ত তাই দেশের প্রথম বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপির বড় অংশই ছিল খাতের উন্নয়নে মোট ৭০১ কোটি টাকার প্রথম বাজেট ৫০০ কোটি টাকাই ছিল পুনর্বাসন উন্নয়নের জন্য

পরিকল্পনারও একটি পরিব্যাপী লক্ষ্যমাত্রা ছিল কৃষি খাতের উন্নয়ন, কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন পরিকল্পনার যে ১২টি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল তার দ্বিতীয়টি ছিল অর্থনীতির প্রধান খাতগুলোর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে কৃষি শিল্প খাতের উল্লেখ্য, সেই সময়ে কৃষিই ছিল অর্থনীতির মূলধারামোট দেশজ উৎপাদনের সিংহভাগই আসত কৃষি খাত থেকে পরিকল্পনার চতুর্থ উদ্দেশ্য হিসেবে বিবৃত হয়েছে আবশ্যিক ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, যা মূলত কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়াস সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কৌশল ছিল অর্থনীতির সেই খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি করা, যে খাত অধিকসংখ্যক মানুষের শ্রমে নিয়োজিত থাকার নিশ্চয়তা দেয় এবং ব্যবহার করে শ্রমঘন উৎপাদন পদ্ধতি ১৯৭২-৭৩ সালে জিডিপির ৫৬. শতাংশ আসত কৃষি খাত (শস্য, প্রাণিসম্পদ, বন মত্স্য) থেকে উদ্দেশ্য ছিল খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো পরিকল্পনায় কৃষিমূল্য সংযোজন (agricultural value added) বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয় স্বাভাবিকভাবেই তত্কালীন ১২টি উন্নয়ন খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পায় কৃষি পানিসম্পদ পরিকল্পনা দলিলে কৃষি খাতের উদ্দেশ্য সার্বিক কৌশল বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ হয় বলা হয়, পরবর্তী দুই দশকের জন্য কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচির উদ্দেশ্য হবে প্রথাগত আবহাওয়ানির্ভর অনিশ্চিত কৃষির স্থলে ক্রমান্বয়ে টেকসই আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল দুটি: খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং গ্রামীণ বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য মৌলিক সর্বনিম্ন খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় আয় নিশ্চয়তা প্রদান খাতের অন্যান্য উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল: কৃষি আয় বৃদ্ধি; গ্রামীণ শ্রমশক্তির জন্য উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান; ক্ষুদ্র খামারি ভূমিহীনদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাসহ গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস এবং আয় বণ্টনে অসমতা দূরীকরণ

১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ করা হয়েছিল ১০১ কোটি টাকা, যা তত্কালীন সময়ে অনুপাত হিসেবে দেশে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি দ্রুত খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করার পূর্বঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী বরাদ্দ করা হয়েছিল বরাদ্দের তাত্পর্যপূর্ণ দিক ছিল ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে ১৫ লাখ একর থেকে ৩৬ লাখ একর জমি উচ্চ উৎপাদনশীল খাদ্য উৎপাদনের আওতায় আনা, লাখ ২৫ হাজার পাম্প স্থাপন, ২৪০০ গভীর নলকূপ ৪০০০ অগভীর নলকূপ খনন করা কৃষকেরা যাতে সহজে রাসায়নিক সার পেতে পারেন, সেজন্য এর মণপ্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০ টাকা এই দাম ছিল সরকারের ক্রয়মূল্যের অর্ধেক কৃষির প্রতি বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগ ছিল সার্বিক, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন উৎপাদন বিকাশ দ্রুততর করা

বাংলাদেশের কৃষি খাতে আজকের যে সাফল্য তার ভিত্তিটাই স্থাপন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সাল নাগাদ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়তে শুরু করে ১৯৭৪-৭৫ সালের বাজেটে প্রবৃদ্ধি আরো আশান্বিত করে বড় আকারের বন্যা হওয়ার পরও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় চিনি, লবণ, কাপড়, সুতা, মেশিন, নিউজপ্রিন্ট, ইলেকট্রনিকস যন্ত্রাংশ, ডিজেল ইঞ্জিন, চট তৈরির তাঁত, সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প, ফাইব্রিফেক্স সোডিয়াম সিলিকেট প্রভৃতি ক্ষেত্রে বেশ উন্নতি হয় ১৯৭৫ সালের এপ্রিল থেকে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে থাকে চালের দাম কেজিতে থেকে .৫০, আলু .০৫ থেকে .৫০ টাকায় নেমে আসে কাপড়, সার, কাগজ উৎপাদনও লক্ষণীয় পরিমাণ বৃদ্ধি পায় বঙ্গবন্ধুর শাসনামলেই বাংলাদেশে কৃষি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হয়

যুদ্ধ-পরবর্তী দেশে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং প্রতিবন্ধকতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ কৃষির উন্নয়নে যে কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

. ১৩ মাসের মধ্যে কৃষকদের মাঝে ১০ কোটি টাকার তাকাভী ঋণ বণ্টন

. কোটি টাকার সমবায় ঋণ বণ্টন

. ৮৩ হাজার টন সার সংগ্রহ এবং ৫০ হাজার টন বিতরণ

. হাজার ১২৫ মণ বোরো ধানের বীজ সরবরাহ

. হাজার মণ গম বীজ বণ্টন

. হাজার ৭০০ মণ আলু বীজ বণ্টন

. সেচের জন্য ৯৪টি গভীর নলকূপ বসানো

. ইঞ্চি ব্যাসের ১০০ অগভীর নলকূপ বসানো

. ২০ হাজার পাওয়ার পাম্প সরবরাহ

১০. ৮০ লাখ একর জমিতে সেচের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা

১১. ২১টি ট্রাক্টর সরবরাহ করা

১২. কলের লাঙল ২১টি সরবরাহ করা হয় নামমাত্র মূল্যে

১৩. লাখ হালচাষের বলদ সরবরাহ করা হয় নামমাত্র মূল্যে

১৪. ৫০ হাজার দুগ্ধবতী গাভি সরবরাহ করা হয় ভর্তুকি মূল্যে

১৫. ৫৩টি চাল আটাকল স্থাপন এবং ২৯১টি পুনঃসংস্করণ করা হয় এসব কাজ জরুরি ভিত্তিতে করার জন্য প্রায় হাজার নতুন লোকের চাকরিতে নিয়োগ করা হয়

১৬. জাতিসংঘের সহায়তায় ১০ লাখ বসতবাড়ি নির্মাণ সংস্কার

১৭. একটানা তিন মাস ধরে চলমান ৩০ কোটি টাকার রিলিফ বিতরণ, বিশেষ করে খাদ্য বিতরণ

১৮. ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৮টি সরকারি খাদ্যগুদাম থানা পর্যায়ে বিধ্বস্ত হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ করা হয়

 

সরকারের এসব পদক্ষেপের কারণে উচ্চফলনশীল ধান গম চাষের একরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছিল একরের হিসাবে দুই ফসলের চাষ বেড়েছিল শতকরা ৭৫ ভাগ

বঙ্গবন্ধুর কৃষি উন্নয়নের বৈপ্লবিক পদক্ষেপের মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হলো কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন, পুনঃসংস্কার, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তান কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ করে দিলে স্থানীয়ভাবে তুলার উৎপাদনের গুরুত্ব অনুভূত হয়েছিল সময় আমাদের বস্ত্র শিল্পগুলো কাঁচামালের অভাবে মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল এই অবস্থায় ১৯৭২ সালে দেশে তুলার চাষ সম্প্রসারণ করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয় তুলা উন্নয়ন বোর্ড ১৯৭৪-৭৫ সালে মাঠপর্যায়ে আমেরিকান আপল্যান্ড তুলা দিয়ে পরীক্ষামূলক তুলার চাষ শুরু করে বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন অর্থনৈতিকভাবে উন্নত সমৃদ্ধ একটি সোনার বাংলা গড়তে কৃষি শিল্পের উন্নয়ন অপরিহার্য কৃষি গবেষণা ছাড়া যে কৃষির উন্নতি সম্ভব নয়, বঙ্গবন্ধু তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে দেশে কৃষি গবেষণাধর্মী কাজ পরিচালনার জন্য তেমন কোনো সমন্বয়ধর্মী প্রতিষ্ঠান ছিল না তাই ১৯৭৩ সালেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, কৃষিতে গবেষণা সমন্বয়ের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান; এটি গঠনের দায়িত্ব প্রদান করেন স্বনামখ্যাত কৃষিবিদ . কাজী বদরুদ্দোজাকে ১৯৭২ সালে নতুন নামে পুনর্গঠন বিস্তৃতি ঘটান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তখনই ঢাকার আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে কৃষি পারমাণবিক গবেষণা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (ইনা) প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন, যা ১৯৭৫ সালের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (বিনা) হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে স্থানান্তর হয় কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (বিনা) এসবের অবদান সর্বজনের জানা রয়েছে পুনর্গঠন করা হয় হর্টিকালচার বোর্ড, সিড সার্টিফিকেশন এজেন্সি রাবার উন্নয়ন কার্যক্রম বঙ্গবন্ধু কৃষি সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বীজ সার সরবরাহের প্রতিষ্ঠান বিএডিসিকে পুনর্গঠন এবং সারা দেশে এর বীজ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন ১৯৭৫ সালে এই বিএডিসিই আধুনিক কৃষি সেচ ব্যবস্থার প্রচলন করে দেশে ইরি বীজ সরবরাহে প্রতিষ্ঠান একক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে স্বাধীনতার পর জুট অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে প্রাক্তন জুট এগ্রিকালচার রিসার্চ ল্যাবরেটরিকে জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউট নামে পুনর্গঠন করা হয়

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এক সোনালি অধ্যায়ের নাম কৃষি, যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দেশের কৃষক পরিবারের অক্লান্ত পরিশ্রম উৎসর্গ উপযুক্ত গ্রাহকের কাছে কৃষিঋণের অবাধ প্রবাহের সুযোগ সৃষ্টি এবং পল্লী অঞ্চলে কৃষিঋণের প্রবাহ বৃদ্ধি করে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ব্যতিরেকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয় কৃষি কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নয়নে প্রয়োজন আধুনিক কৃষি-প্রযুক্তি এবং যন্ত্রপাতি; যা নিজস্ব অর্থায়নে ক্রয় করার সামর্থ্য দেশের অধিকাংশ কৃষকেরই নেই নগদ অর্থের প্রয়োজনে কৃষককে প্রায়ই দ্বারস্থ হতে হয় অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎসের, যার ফলে প্রায়ই তাদের পরিশোধ করতে হয় উচ্চহারের সুদ অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের উচ্চ সুদহারের জাল থেকে কৃষকের মুক্তির পথ সৃষ্টি এবং কৃষির উন্নয়ন প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য তিনি ১৯৭৩ সালের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক অধ্যাদেশের (President’s Order No 27 of ১৯৭৩) মাধ্যমে একটি বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত করেন গ্রাম-বাংলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে কৃষির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য ব্যাংকের সৃষ্টি দেশে কৃষিঋণ পরিচালনা কর্মকাণ্ডের সিংহভাগই এককভাবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অবদান

কৃষিকাজে কৃষকদের ব্যাপকভাবে মনোনিবেশ করানোর ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু অবদান সর্বোচ্চ কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অবদান এবং কৃষি উৎপাদনের উৎসাহ দানের জন্য বঙ্গবন্ধু জাতীয় পুরস্কার দানের কথা ঘোষণা করেছিলেন ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২৯/১৯৭৩-এর মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কৃষি খাতে নতুন নতুন জ্ঞান অর্জন, কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়

১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে ছাত্র-জনতার সমাবেশে বঙ্গবন্ধু ডাক্তার, প্রকৌশলী কৃষিবিদদের জন্য ক্যাডার সার্ভিস বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে সমমর্যাদার ঘোষণা দেন এবং তা কার্যকর করেন সেদিন থেকেই কৃষি শিক্ষা একটি সম্মানজনক শিক্ষা পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এই কৃষিবিজ্ঞানীরা দেশের প্রতিষ্ঠিত কৃষি গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে কৃষি প্রযুক্তি, ফসলের জাত উন্নয়ন, জলবায়ুর অভিঘাত সহনশীল জাত উদ্ভাবনসহ কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনে প্রতিনিয়ত গবেষণায় ব্যাপৃত রয়েছেন আজকের কৃষিক্ষেত্রে যে বৈচিত্র্যময় সাফল্য, বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য পুষ্টিনিরাপত্তা দানে সক্ষমতা এবং আগামী দিনের জলবায়ুর অভিঘাত বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য সরবরাহের চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সামর্থ্য, সেই ভিত্তিটাই বঙ্গবন্ধু নিষ্ঠা দূরদর্শিতার সঙ্গে কৃষকের প্রতি অন্তরতম মমত্বে স্থাপন করে গিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর স্বল্পতম শাসনকালে তার অবদান স্মরণীয় করে রাখতে ২০১১ সাল থেকে কৃষিবিদরা দিনটিকে কৃষিবিদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন তিনি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন বর্ধিত জনগোষ্ঠীকে খাওয়াতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে আর উৎপাদন বাড়াতে হলে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে এর জন্য দক্ষ কৃষিবিজ্ঞানীর বিকল্প নেই তাই কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের মর্যাদার আসনে না বসালে সেক্টরে মেধার সমাবেশ ঘটবে না আর মেধার সমাবেশ না ঘটাতে পারলে উন্নত প্রযুক্তিরও উদ্ভাবন সম্ভব হবে না বর্তমানে উন্নত জাতের ধানবীজসহ বিভিন্ন ধরনের প্রধান অপ্রধান শস্যের বীজ উদ্ভাবিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে

কৃষিক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে সেচ টেকসই কৃষি ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সেচের জন্য পানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি টেকসই কৃষি ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, বিশেষ করে খাদ্যশস্য যেমন ধানের জন্য সবচেয়ে জরুরি বঙ্গবন্ধু সরকার কৃষিতে সেচের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ১৯৭৩ সালে ২০ হাজার পাওয়ার পাম্প স্থাপন করেছিলেন এবং ৮০ লাখ একর জমিতে সেচের ব্যবস্থা করেছিলেন

বন্যা নিয়ন্ত্রণে বঙ্গবন্ধু সবসময় সচেষ্ট ছিলেন তিনি সবসময় ভাবতেন যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে উৎপাদন বাড়বে না লক্ষ্যে তিনি ১৯৭৫ সালে ১৮ এপ্রিল ফারাক্কাসংক্রান্ত অন্তর্বর্তীকালীন একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর জোরালো ভূমিকার কারণেই চুক্তির শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যে এপ্রিল-মে শুকনো মৌসুমে ভারত ১১ থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করবে, কিন্তু বাংলাদেশ পাবে ৪৪ হাজার কিউসেক পানি ফারাক্কাসংক্রান্ত এর চেয়ে ভালো বন্দোবস্ত পরবর্তীকালের কোনো প্রশাসনই উপহার দিতে পারেনি

বঙ্গবন্ধু প্রথম পঞ্চবার্ষিক (১৯৭৩-১৯৭৭) পরিকল্পনায় বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন তথা গ্রামীণ প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেন গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব অবহেলিত সমাজসেবা কার্যক্রমকে স্বাধীন দেশের উপযোগী, গতিশীল প্রাণবন্ত করে তোলেন এজন্য গ্রামোন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় তিনি Pilot project for extended rural social upliftment প্রবর্তনের জন্য পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৯০ লাখ টাকার সংস্থান রাখেন এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে দেশের তত্কালীন ১৯টি জেলার ১৯টি থানায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মেখ মুজিবুর রহমান Rural Social Services (RSS) বা পল্লী সমাজসেবা কার্যক্রম প্রবর্তন করেন কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ছিল সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে পল্লীর জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন ক্ষমতায়ন বাংলাদেশের ইতিহাসে কার্যক্রমটি সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের প্রধান পথিকৃৎ হিসেবে সুবিদিত এবং দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত বাংলাদেশে ১৯৭৩-৭৭ মেয়াদি প্রকল্প শতভাগ সাফল্য অর্জন করায় সরকার দেশের সব উপজেলাকে কার্যক্রমের আওতায় আনে এবং রাজস্ব বাজেটে কর্মসূচিটি অন্তর্ভুক্ত করে (পল্লী সমাজসেবা কার্যক্রম, বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০১০)

বঙ্গবন্ধুই দেশে কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন নিয়েছিলেন নানা যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যার মধ্যে আধুনিক কৃষি গবেষণার ব্যবস্থা করা, কৃষিতে ভর্তুকি প্রদান, কৃষিঋণের সহজীকরণ সমবায় চাষ পদ্ধতির প্রচলন অন্যতম

শেষ কথা

আজ বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তিনি আছেন আমাদের স্বাধীনতায়, ভাষায়, সমাজ, সংস্কৃতি সভ্যতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন দেশে মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন তার মধ্যে তিনি বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন বাস্তবায়ন করেছিলেন অনেক অসাধ্য কর্মসূচির একটি দেশ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য, বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর একটি সময়োপযোগী আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তিনি একটি রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় এমন কোনো বিষয় নেই যে তিনি সেই স্বল্প শাসনকালে স্পর্শহীন রেখেছেন রেখে গেছেন কৃষিসহ বাংলাদেশের সব উন্নয়নের শক্ত ভিত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার কাজে তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ধ্যান, মন, প্রাণ পুরোপুরি সঁপে দিয়েছেন কৃষকের হাতে আধুনিক উপকরণ দেয়ারও অঙ্গীকার বঙ্গবন্ধু করেছিলেন, যা বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে কৃষকদের বাঁচানোর জন্য যে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দরকার তা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সরকারের রয়েছে বঙ্গবন্ধুর কৃষকপ্রীতির কথা মনে রেখেই বর্তমান সরকার কৃষকদের জন্য স্বল্প, মধ্য দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে তারই নীতি অনুসরণ করে তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে পথে এগোচ্ছেন এবং কৃষিতে অভাবনীয় সফলতা এনে বিশ্বদরবারে রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন

 

শামসুল আলম: মুজিব বর্ষে অর্থনীতিতে একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন