মঙ্গলবার| এপ্রিল ০৭, ২০২০| ২২চৈত্র১৪২৬

দুর্দম

বন্যাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়া

মো. আবদুল লতিফ মন্ডল

যে ভৌগোলিক সীমারেখা নিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ গঠিত, সে এলাকাটি ঐতিহাসিকভাবে দুর্যোগপূর্ণ হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ আমল থেকে যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশে আঘাত হেনে আসছে, সেগুলোর প্রথম সারিতে রয়েছে বন্যা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় খরা এসবের মধ্যে বন্যা হচ্ছে একটি পুনঃ পুনঃ সংঘটিত দুর্যোগ এটি কখনো দেশের এক বা একাধিক এলাকায় এবং কখনো প্রায় পুরো দেশে সংঘটিত হয় স্বাভাবিক বন্যা অনেক সময় দেশের সার্বিক কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় উপখাত শস্য উপখাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও প্রলয়ংকরী বন্যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে প্রলয়ংকরী বন্যায় দেশের অর্থনীতির যেসব খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সার্বিক কৃষি খাতের শস্য উপখাত এবং মত্স্য প্রাণিসম্পদ উপখাত, যোগাযোগব্যবস্থা অর্থাৎ সড়ক, মহাসড়ক, কালভার্ট, সেতু, রেলপথ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং জনগণের বাড়িঘর তাছাড়া বন্যায় বিস্তার ঘটে নানা সংক্রামক ব্যাধির

২০০৫ সালে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন প্রণীত Unlocking the Potential: National Strategy for Accelerated Poverty Reduction অনুযায়ী ১৮৭০ থেকে ২০০৪ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে যেসব প্রলয়ংকরী বন্যা সংঘটিত হয়, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল (the worst floods) ১৯৮৮ ১৯৯৮ সালের দুটি বন্যা তবে ১৯৮৮ ১৯৯৮ সালের মহাপ্রলয়ংকরী বন্যা একদিকে যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতির ভয়াবহ ক্ষতি করেছে এবং মানুষের চরম দুর্ভোগ বয়ে এনেছে, তেমনি অন্যদিকে মানুষকে শিখিয়েছে বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে এবং বন্যার ক্ষয়ক্ষতি সামলে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৮৮ সালের বন্যাটি ছিল দেশের প্রথম প্রলয়ংকরী বন্যা মিডিয়া রিপোর্ট এবং বন্যা-পরবর্তী সময়ে বন্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত জরিপ প্রণীত পরিকল্পনা থেকে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে সারা দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে প্রলয়ংকরী বন্যায় মাত্র তিন দিনে দেশের তিনটি প্রধান নদীতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হয় এতে প্রায় ৮২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা অর্থাৎ সারা দেশের ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪৭টি বন্যায় প্লাবিত হয় স্থানভেদে বন্যা ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল

বন্যায় এক কোটি কৃষক ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পতিত হয়েছিল প্রায় ২০ লাখ একর জমির ফসল পুরোপুরি এবং ১৫ লাখ একর জমির ফসল আংশিকভাবে ভেসে যায় সরকারি হিসাবে ফসল ক্ষতি হয় ২০ লাখ টন এছাড়া বন্যায় হাজার হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয়

প্রলয়ংকরী বন্যার ছোবলে দেশের হাজার ১৭৫ কিলোমিটার মহাসড়ক ধ্বংস হয় এছাড়া হাজার ৪০০ কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে দেশের ২৪৬টি সেতু কালভার্ট বিধ্বস্ত এবং প্রায় আড়াই হাজার ফুট রেলপথ বন্যায় ভেসে যায়

মহাপ্লাবনে দেশের রাজধানী ঢাকা মহানগরীর অনেক এলাকা প্লাবিত হয় বন্যার পানি বিমানবন্দরের রানওয়েতে উঠে যাওয়ায় ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়

বন্যায় দেশের প্রায় ৮০ লাখ ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয় বাস্তুহারা হয় ৩০ লাখ মানুষ বন্যায় কোটির বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় 

১৯৯৮ সালের বন্যায় দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এলাকা দুই মাসের অধিক সময় বন্যাকবলিত হয় বন্যার ব্যাপ্তি অনুযায়ী এটি ১৯৮৮ সালের বন্যার সঙ্গে তুলনীয় বন্যা-পরবর্তী জরিপ এবং রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ব্যাপক বৃষ্টিপাত, একই সময়ে দেশের তিনটি প্রধান নদীর প্রবাহ ঘটার ফলে ব্যাক ওয়াটার অ্যাফেক্টের কারণে বন্যা ঘটে

ভয়ংকর বন্যায় বাংলাদেশের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫২টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের ৬৫ হাজার একর জমি দীর্ঘদিন ধরে বন্যায় ডুবে থাকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বন্যায় সার্বিক কৃষি খাতের শস্য উপখাতে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নষ্ট শস্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ লাখ টনের ওপরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রাণিসম্পদ উপখাত অর্থ মন্ত্রণালয় প্রণীত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০০ অনুযায়ী উপখাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০৭৯ কোটি টাকা

বন্যায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক জনপথ অধিদপ্তরের বন্যা-পরবর্তী জরিপ থেকে জানা যায়, মোট ৩১৪৪ কিলোমিটার জাতীয় সড়কের মধ্যে ৮২০ কিলোমিটার, মোট ১৭৪৬ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে ২৬২ কিলোমিটার এবং মোট ১৫৯৬৪ কিলোমিটার ফিডার টাইপ- সড়কের মধ্যে ৯৪২০ কিলোমিটার সম্পূর্ণরূপে পানিমগ্ন হয়ে পড়ে পানিমগ্নতার কারণে ৪৩৩০ কিলোমিটার সড়কবাঁধ এবং প্রায় ৪২৪৪ কিলোমিটার পেভমেন্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাছাড়া, তীব্র বন্যার ফলে বিভিন্ন ধরনের ১২৬৩টি সেতু এবং সড়ক নেটওয়ার্কের বিভিন্ন পয়েন্টে ৫৪টি ফেরিঘাট ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়

ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের বিপুলসংখ্যক প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেশের নিম্নাঞ্চলে কয়েক লাখ নলকূপ পানিতে ডুবে যাওয়ায় তথায় খাবার পানির সংকট চরমভাবে দেখা দেয়

১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং জনজীবনে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হওয়ার কারণে বন্যা সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপক স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যে সরকার পরিকল্পনা প্রণয়নে উদ্যোগী হয় লক্ষ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ জরিপ চালানো হয়, যার ফলে ১৯৮৯ সালে বন্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা (এফএপি) প্রণীত হয় তাছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৮ সালের বন্যায় রাজধানী ঢাকা আক্রান্ত হওয়ায় সরকার ঢাকা রক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সে উদ্যোগেই মিটফোর্ড হাসপাতালের পেছন থেকে ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের নবাবগঞ্জ, হাজারীবাগ, গাবতলী, মিরপুর হয়ে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয় ফলে ১৯৯৮-এর প্রলয়ংকরী বন্যা এবং পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা হলেও রাজধানী ঢাকায় বন্যার পানি ঢুকতে পারেনি

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি জাতীয় অর্থনীতিতে সার্বিক কৃষি খাতের (শস্য, প্রাণিসম্পদ বন সমন্বয়ে সার্বিক কৃষি খাত) গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যার পর নব্বই দশকের শুরুতেই কৃষির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের বিনিয়োগ এবং অধিক পরিমাণে কৃষকদের প্রণোদনা প্রদান বৃদ্ধি পেতে থাকে কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আগ্রহ কঠোর পরিশ্রমের কারণে ১৯৯৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যা সত্ত্বেও ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে দেশে ধান উৎপাদনে শীর্ষ ফসল বোরো খাদ্যশস্য উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গমের বাম্পার ফলন হয় চালের উৎপাদন দাঁড়ায় কোটি লাখ ৫২ হাজার টনে আর গম উৎপাদন হয় ১৯ লাখ হাজার টন এটা ওই সময় পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ পরিমাণ বোরো গম উৎপাদনের রেকর্ড এর পর থেকে আমাদের প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদন অনেকটা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে এবং বর্তমানে দেশ চাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে

১৯৮৮ ১৯৯৮ সালের দুটি প্রলয়ংকরী বন্যার পর দেশে সড়ক, মহাসড়ক এবং বাঁধ নির্মাণে কৌশলগত পরিবর্তন আসতে শুরু করে প্রলয়ংকরী বন্যার সময় এসব অবকাঠামো যাতে মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহূত হতে পারে সেদিকে লক্ষ রেখে এগুলো যথাসম্ভব উঁচু মজবুত করে নির্মাণের ওপর জোর দেয়া হয়

বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে ঘুরে দাঁড়ানোয় বাংলাদেশের মানুষের রেজিলেন্স সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের দক্ষতা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশকে হার মানিয়েছে বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার দেশে হানা দেবে এবং এসব দুর্যোগ মোকাবেলা করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে বিশ্বাস মনোবল নিয়ে আমাদের আগামী দিনের চলার পথকে মসৃণ করে তুলতে হবে বর্তমানে বৈশ্বিক প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বাংলাদেশেও হানা দিয়েছে ভাইরাসে এরই মধ্যে দেশের চারটি মূল্যবান প্রাণ নষ্ট হয়েছে আরো অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো দুর্যোগ মোকাবেলার মনোবল নিয়ে এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেশ নিয়মাবলি মেনে চলে আমরা ভাইরাসকে পরাজিত করব সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হবেন

 

মো. আবদুল লতিফ মন্ডল: সাবেক খাদ্য সচিব কলাম লেখক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন