বৃহস্পতিবার| এপ্রিল ০২, ২০২০| ১৮চৈত্র১৪২৬

দুর্দম

সিডর ও আইলার ধ্বংস থেকে জেগে ওঠা জনপদ

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে, যা গোর্কি নামে খ্যাত, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ অন্যান্য প্রাণিসম্পদ, অবকাঠামো ফলফসলের যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়; প্রাকৃতিক সে দুর্যোগ মোকাবেলায় পাকিস্তান সরকারের সক্ষমতা উদ্যোগের দীনতা-হীনতা তথা দায়িত্বহীনতা আজও উপমহাদেশের আর্থসামাজিক রাজনৈতিক ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত অতি অসহায়ত্বে আপতিত পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের এই অবজ্ঞা-অবহেলার চরম মূল্য তাদের দিতে হয়েছিল সেবারের সাধারণ নির্বাচনে, যেখানে স্বাধিকার আদায়ের স্বপক্ষে সোচ্চার সমর্থন দেয় সবাই এবং মূলত যার সূত্র ধরে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তানের অঙ্গচ্ছেদ হয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের এই চরম শিক্ষা থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় স্বয়ম্ভর সক্ষমতা অর্জনে যত্নবান হয় প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশ ফলে ২০ বছর পর ১৯৯১-এর ২৯ এপ্রিল-পরবর্তী বৃহত্তম ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় যথেষ্ট দক্ষতা পারঙ্গমতার পরিচয় দেয় বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার ২০০৭ ২০০৯ সালে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে যথাক্রমে সিডর আইলার মতো দুটি সিভিয়ার সাইক্লোন মোকাবেলায় বাংলাদেশ যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়

দুর্যোগ মোকাবেলায় দুর্যোগ-পূর্ব দুর্যোগ-উত্তর দুটি পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে প্রথমত, আগাম সতর্কতা সচেতন সক্রিয়তায় নিরাপদ আশ্রয়-প্রশ্রয়দানের মাধ্যমে নিরাপত্তা বিধানের দ্বারা প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তুলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমানো দুর্যোগ-পূর্বকালের কাজ এবং দুর্যোগ-উত্তরকালে ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত শুমার ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অন্যতম দায়িত্ব উভয় পর্বেই সরকার, প্রশাসন, বেসরকারি ব্যক্তি খাত এবং সর্বোপরি জনগণের সক্রিয়তা সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে ওঠে সরকারের দায়িত্ব থাকে সব পক্ষকে উপলব্ধির সমন্বয়ের শামিয়ানার নিচে আনা এবং একটা স্বতঃপ্রণোদিত পরিবেশ সৃষ্টির প্রেরণা হিসেবে মুখ্য ভূমিকা পালন ১৯৭০- গোর্কির সময় পূর্বপ্রস্তুতি তথা যথা সময়ে যথা সতর্কীকরণ আশ্রয়কেন্দ্রে (ছিলই না) নিরাপত্তা বিধানে এবং ঘূর্ণিঝড়ের পর পুনর্বাসনে অবজ্ঞার চরম ধৃষ্টতা দেখায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৯১-এর ঘূর্ণিঝড়ের সময় সতর্কীকরণ পূর্বপ্রস্তুতি পর্বে সদ্য নির্বাচিত সরকারের তরফে কিছুটা অপ্রস্তুতি থাকলেও পুনর্বাসন পর্বে ছিল যথেষ্ট মনোযোগ ২০০৭ সালে সিডর যখন আক্রমণ করে তখন দেশে দুর্যোগ মোকাবেলায় অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিস্থিতির আগাম নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে পক্ষান্তরে সিডরের ধ্বংসযজ্ঞতার ব্যাপকতা এত বেশি ছিল যে পুনর্বাসন পর্বে হিমশিম খেতে হয়, তবে দায়িত্বশীল উদ্যোগ আয়োজন প্রয়াস প্রচেষ্টায় কোনো কমতি ছিল না ২০০৯ সালে আইলার দুর্যোগ মোকাবেলায় উভয় পর্বে নতুন সরকার যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দেয় বলাবাহুল্য ১৯৯১, ২০০৭ ২০০৯ সালে এমনকি ২০১৫ সালে মাহাসেন, ২০১৮ সালে ফণী এবং ২০১৯ সালে বুলবুল মোকাবেলার সময় প্রস্তুতি ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাত, এনজিও এবং সর্বোপরি জনসাধারণের সহযোগিতা সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল প্রশংসনীয় আশাব্যঞ্জক

উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ বাতাসকে ভয় পায় না, ভয় পায় পানিকে আর জোয়ারের সময় ঘূর্ণিঝড় হলে তা বিশাল রূপ নেয় ১৯৭০ ১৯৯১ সালে সেটাই হয়েছিল এটা ঠিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটি সবসময় পূর্ণাঙ্গভাবে উঠে আসে না কারণ তখন তথ্য সংরক্ষণের ততটা ব্যবস্থা ছিল না সরকারি কর্তৃপক্ষ ডেডবডি কাউন্ট করে, সরকার ডেডবডি না পেলে মৃত হিসেবে লিপিবদ্ধ করে না সাগরে যারা হারিয়ে গেছে, তাদের হিসাব তো করা হয় না রেডক্রসের তথ্যানুযায়ী সিডরে ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল কিন্তু সরকার বলেছিল ছয় হাজার সুতরাং ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সবসময় ঠিকভাবে উঠে আসে না সিডরের তুলনায় আইলায় কম মানুষ মারা গিয়েছিল, দিনের বেলা হওয়ায় অনেকে সরে যেতে পেরেছিল

ঘূর্ণিঝড় সিডর ছিল অতি মারাত্মক শ্রেণীর ঘূর্ণিঝড় (ভেরি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম) আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ২০০৭ সালের নভেম্বর একটি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি হয় ১১ নভেম্বর আবহাওয়া বার্তায় সামান্য দুর্যোগের আভাস দেয়া হয় এবং এর পরেরদিনই এটি ঘূর্ণিঝড় সিডরে পরিণত হয় বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে এটি দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে এবং বাংলাদেশে একটি ব্যাপক দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি করে শ্রীলংকান শব্দ সিডর বা চোখ-এর নামে এর নামকরণ করা হয় নভেম্বর ১৩ তারিখে ক্যাটাগরি- সমতুল্য ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবক পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে অগ্রিম মোতায়েন করা হয় বাংলাদেশের ১১টি উপকূলীয় জেলায় ৪২ হাজার ৬৭৫ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত করা হয় লোকজনকে আশয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয় যদিও উপকূল অঞ্চল থেকে জনগণকে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয় কিন্তু তখন উপকূলের ১০ মিলিয়ন মানুষের জন্য মাত্র লাখ লোকের আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল নভেম্বর ১৪ তারিখ রাত ৮টার পর মোংলা বন্দরের সব কার্যক্রম এবং রাত ১০টায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্ধরে বিমান ওঠানামা বন্ধ করে দেয়া হয় ঝড়ের আশঙ্কায় ঢাকা জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ সতর্ক ব্যবস্থা নেয়া হয় এবং নভেম্বর ১৫ তারিখে ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় অঞ্চলে নৌ চলাচল বন্ধ রাখা হয়

সিডরের কেন্দ্রীয় অংশ নভেম্বর ১৫ তারিখ সন্ধ্যা ৬টার পর বাংলাদেশের পাথরঘাটায় বলেশ্বর নদের কাছে উপকূল অতিক্রম করে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল -মিনিট স্থিতি: ২১৫ কিমি/ঘণ্টা (১৩০ মাইল) এবং -মিনিট স্থিতি: ২৫০ কিমি/ঘণ্টা (১৫৫ মাইল) কারণে সাফির-সিম্পসন স্কেল অনুযাযী একে ক্যাটাগরি- মাত্রার ঘূর্ণিঝড় হিসেবেও আখ্যা দেয়া হয় সিডর আইলার বিরুদ্ধে রিট (২০১৩) শীর্ষক রস রচনায় সিডরের অভিযানের বিবরণ রকম: সিডরের পরিকল্পনা শাণিত সপ্রতিভ, তবে বেশ প্যাঁচানো এর গ্রন্থি সিডরের চোখ ট্যাঁরা, বোঝা যায় না সে কোন দিকে তাকাচ্ছে তার চাহনি দেখে আবহাওয়া দপ্তর তার গতিবিধি আঁচ করতে গিয়ে রীতিমতো ফাঁপরে পড়ে যায় বেশ সুকৌশলে সে এগোতে থাকে, কখনো একটু দ্রুত এগোয়, আবার কখনো ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে থাকে এর ফলে ক্রিকেটে স্পিনারের মতো ঢেউ খেলানো বার্তা পৌঁছায় আবহাওয়া দপ্তরের ডিজিটাল পর্দায় ভালো করে যেমন ঠাওর করতে পারে না পুষ্টিহীনতায় ভোগা ব্যাটসম্যান, আবহাওয়া দপ্তরের ভারপ্রাপ্তরা তেমন যেন বিশেষভাবে অজ্ঞতার ভান করে থাকে, সবসময় হতে পারে জাতীয় হেঁয়ালি বার্তা ব্যাট করে খোদ মার্কিন মুলুক থেকে বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে বসে পিরোজপুরের পুখুরিয়া গ্রামের বড় ভাই পিলু তার ভাই মিলুকে ফোন করেন রাত সাড়ে ৯টায়, বলেন, ব্যাটা সিডর এখন কিন্তু হরিণঘাটা-বলেশ্বরের মোহনা দিয়ে উপরের দিকে এগোচ্ছে বেশ প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে, তাদের বহুদিনের স্মৃতিঘেরা কাঠের দোতালা বাড়িটি এখনো ঠিক আছে তো? মিলু ঝড়ের ঝাপটায় ভালো শুনতে পারেন না, তবে আশ্চর্য হন হাজার হাজার মাইল দূর থেকে, বলতে গেলে সাত সমুদ্দুর আর তেরো নদীর ওপার থেকে তার বড় ভাই সিডরের গতিবিধি জানাতে পারছেন আর তাদের আবহাওয়া দপ্তর দেশব্যাপী নয় নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা দিয়ে খালাস সিডরের সব সীমাবদ্ধতার কথা জানে, তাই সে তার মতো অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাম পাশের সুন্দরবন দাবড়িয়ে মাড়িয়ে ডান পাশের সব দ্বীপ সমতল সবই তোলপাড় করে পিরোজপুরের সন্ধ্যা কচা নদী অবধি এসে পৌঁছে রাত ১১টার দিকে , তার হিংস্র চোখ দিয়ে তখনো আগুনের গোলা বের হচ্ছে, যেখানে পড়ছে সেখানে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে, বড় বড় গাছ ধরাশায়ী করে, ঘরবাড়ি ভেঙেচুরে সে তার ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে হুলারহাটের কাছে এসে সে তার নীলনকশায় চোখ রাখল, হ্যাঁ, তার পরিকল্পনামতো কাজ হচ্ছে তবে সে একটু ভাবল এখন যে ডিরেকশনে আছে সে এভাবে এগোলে দেশের খোদ রাজধানী তার সরাসরি টার্গেটে পড়ে, যেখানে দেশের নিয়ন্ত্রকরা থাকেন সেখানে এভাবে আক্রমণ করাটা কেন জানি তার মনে হলো ঠিক হবে না, সেখানে মাত্র ১১ মাস বয়সী এক নির্দলীয় কর্তৃপক্ষ, তাদেরও বেসামাল করে ফেললে পরে উদ্ধারকাজ চালানোর বা নিয়ন্ত্রণ করার কেউ থাকবে না এমনকি তার অভিযানের কাহিনী নিয়ে যারা নকশা গল্প সচিত্র প্রতিবেদন ইতিহাস নির্মাণ করবেন তারাও যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে সেটা শোভনীয় সমীচীন হবে না সিডর ভাবল তার গতিপথ একটু পরিবর্তন করে রাজধানীকে পাশ কাটিয়ে গেলে কেমন হয় রাত পৌনে ১২টার সময় কাউখালী স্টিমারঘাটের কাছে থাকা তার সেকেন্ড লেফটেন্যান্টকে সে ডিরেকশন ডিগ্রি পূর্বমুখী হেলাতে নির্দেশ দিল এরই মধ্যে মূল ভূখণ্ডে এসে তার আক্রমণের তীব্রতা একটু কমে এসেছে নতুন ডিরেকশন অনুযায়ী উজিরপুর মুলাদী গোসাইরহাট হয়ে চাঁদপুরের দিকে সে ছুটে চলে সেখান থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, পার হয়ে আসাম অবধি গিয়ে তার অভিযান শেষ হয় সুন্দরবনের লাখ লাখ গাছ, লোকালয়ের শত সহস্র ঘরবাড়ি, গাছগাছালি সব শেষ করে লক্ষকোটি মানুষকে পানিবন্দি করে, অসংখ্য প্রাণী পশু সম্পদের সর্বনাশ সাধন করে সিডর প্রকৃতি, পরিবেশ প্রাণিসম্পদের, ফলফসলের, জীবন জীবিকার অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে

ঝড়ের তাণ্ডবে উপকূলীয় জেলাগুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বিপুল পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয় ঘূর্ণিঝড়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশের বিদ্যুত ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দেয় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ফলে ঢাকাসহ সারা দেশেই দেখা দেয় পানি সমস্যা সরকার সিডরকে জাতীয় দুর্যোগ বলে ঘোষণা করে

সে সময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক রিপোর্টে বলা হয়, সিডরের আক্রমণে বাংলাদেশের প্রায় ছয় লাখ টন ধান নষ্ট হয়েছে সুন্দরবনের পশুর নদে বেশকিছু হরিণের মৃতদেহ ভাসতে দেখা গেছে এবং বিপুলসংখ্যক প্রাণীর মৃত্যু হয় ঝড়ের প্রভাবে প্রায় লাখ ৬৮ হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং ২১ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয় ঝড়ে প্রায় লাখ ৪২ হাজার গৃহপালিত পশু হাঁসমুরগি মারা যায় সিডরের পরই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পাঁচটি জাহাজ খাদ্য, ওষুধ ত্রাণসামগ্রীসহ সর্বাধিক দুর্যোগকবলিত এলাকার উদ্দেশে রওনা হয় ইউরোপীয় কমিশন . মিলিয়ন ইউরো সমপরিমাণ ত্রাণসামগ্রী বাংলাদেশকে দান করে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার তত্পরতা চালানোর জন্য ইউএসএস এসেক্স ইউএসএস কিয়ারসার্জ নামে দুটি নৌযানসহ যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড স্টেট নেভি প্রায় ,৫০০ জন নৌ সেনা সিডর-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমে সাহায্যের জন্য প্রেরণ করে ঘূর্ণিঝড় দুর্গতদের সাহায্যের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ২১ লাখ ডলার অর্থসহায়তা পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র ওয়ার্ল্ডভিশন ২০ হাজার গৃহহীন লোকজনের গৃহ নির্মাণে সাহায্যের জন্য স্বেচ্ছাসেবক প্রেরণ করে রেড ক্রসও উদ্ধার তত্পরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পোপ বেনেডিক্ট ষোড়শ রোববারের প্রার্থনায় বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড় দুর্গতদের ত্রাণসহ সব রকমের সাহায্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, যুক্তরাজ্য ফিলিপিনো সরকার, ইউএসএইড, ইসলামিক রিলিফ-ইউকে এবং স্পেন সাহায্যে এগিয়ে আসে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম দুর্গত মানুষের জন্য ১০ হাজার টন চাল ২০০ টন উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ বিস্কুটের অনুমোদন দেয়

আইলা ২০০৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা প্রবল ঘূর্ণিঝড়, যার বাতাসের গতিবেগ ছিল সর্বোচ্চ গতি -মিনিট স্থিতি: ১১০ কিমি/ঘণ্টা (৭০ মাইল) -মিনিট স্থিতি: ১২০ কিমি/ঘণ্টা (৭৫ মাইল) আইলা ঘাপটি মেরে থাকা আপসহীন মনোভাব নিয়ে অতর্কিত আক্রমণে বাংলাদেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় অবর্ণনীয় দুর্যোগ দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগের কারণ সৃষ্টি করে আইলা দুদেশের সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল কালিন্দীর মোহনা দিয়ে উঠে এসে ব্যাপক জলোচ্ছ্বাস ঘটায়, ফলে উভয় পারের সুন্দরবনের প্রাণিসম্পদের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয় আর সুন্দরবনসংলগ্ন লোকালয়ের নিম্নাঞ্চল হঠাৎ প্লাবনের পানিতে তলিয়ে যায় পরে সেখানে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় জনবসতিতে, কৃষিক্ষেতে, মত্স্য চাষে মুহূর্তের মধ্যে সহায়-সম্বল গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ

ঘূর্ণিঝড় আইলার নামকরণ করেন মালদ্বীপের আবহাওয়াবিদরা আইলা শব্দের অর্থ ডলফিন বা শুশুকজাতীয় জলচর প্রাণী নামটি এই ঘূর্ণিঝড়ের জন্য নির্ধারণ করেন জাতিসংঘের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের আবহাওয়াবিদদের সংস্থা ইউএন এসকাপ-এর বিজ্ঞানীরা আইলা পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীর হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ, খুলনা সাতক্ষীরা জেলায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে আইলার প্রভাবে নিঝুম দ্বীপ সুন্দরবনের এলাকার সব পুকুরের পানি লবণাক্ত হয়ে পড়ে খুলনা সাতক্ষীরায় ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয় ফলে লোনা পানিতে তলিয়ে যায় খুলনার দাকোপ কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর আশাশুনি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন কাজ হারায় ৭৩ হাজার কৃষক কৃষিমজুর এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোয় পানীয় জলের উৎস সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় জলোচ্ছ্বাস লোনা পানির প্রভাবে গবাদি পশুর মধ্যে কমপক্ষে ৫০০ গরু ,৫০০ ছাগল মারা যায় ঘূর্ণিঝড়ের কয়েক মাস পর থেকে এলাকাগুলোয় গাছপালা মরতে শুরু করে বিরানভূমিতে পরিণত হয় কমপক্ষে লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় পর পর দুই মৌসুম কৃষিকাজ না হওয়ায় প্রায় লাখ টন খাদ্যঘাটতি সৃষ্টি হয় খুলনা সাতক্ষীরায় প্রাণ হারান ১৯৩ জন মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের ফলে দাকোপের ঢাকী নদীর তীর বাঁধ ভেঙে তার বিস্তার বেড়েছে দক্ষিণে এর ফলে ছোট জালিয়াখালি নামক গ্রামটি সম্পূর্ণ নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে, ফলে পাল্টে গেছে কামারখোলা ইউনিয়নের মানচিত্র

আইলা-পরবর্তী উপকূলভাগের মানুষের জীবনযাত্রায় আসে আমূল পরিবর্তন পরিতাপের বিষয় এক দশক পরও ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের ব্যাপক এলাকায় এখনো সেখানে পানীয় জলের সংকট লোনা জলের আগ্রাসনে জমিতে উৎপাদন কমে গেছে বছরে যেখানে দুবার কি তিনবার ফসল চাষ করা যেত, এখনো সেখানে মাত্র একবার ফসল চাষ করা যায়

 

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন