শুক্রবার | আগস্ট ১৪, ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

সাক্ষাৎকার

অর্থনীতি সচল রাখতে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বেসিক ইনকাম গ্রান্ট দিতে হবে

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অর্থনীতির অধ্যাপক। তিনি একাডেমিয়া, সরকার, থিংক ট্যাংক, আন্তর্জাতিক সংস্থা, মিডিয়াসহ বিবিধ ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি এবং উন্নয়ন ফিন্যান্সিয়াল অর্থনীতিতে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি কার্লটন অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যনীতি ব্যবসায়িক কূটনীতির ওপর সনদধারী। অধ্যাপক তিতুমীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক দেশীয় সংগঠনের পরিষদ সদস্য এবং স্বাধীন মাল্টি ডিসিপ্লিনারি থিংক ট্যাংক উন্নয়ন অন্বেষণে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর অনেক বই প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। করোনা প্রাদুর্ভাবে অর্থনৈতিক প্রভাব এটি মোকাবেলায় করণীয় বিষয়ে সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এমএম মুসা

অর্থনীতিতেকরোনাভাইরাস সংক্রমণেরকী ধরনেরপ্রভাব পড়ছে?

করোনাভাইরাস মহামারী পৃথিবীর এক ক্রান্তিকালে এসেছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমাজে, অর্থনীতিতে রাজনীতিতে পড়বে। প্রশ্ন হলো, এটি আমরা কীভাবে মোকাবেলা করব? মোকাবেলার মাধ্যমেই আমাদের সামনের দিকে এগোতে হবে। সেই অনুযায়ী আমাদের এক ধরনের ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, যার মাধ্যমে আমরা সামনের দিকে এগোতে পারি এবং সম্ভাবনা-সমৃদ্ধির পথে হাঁটতে পারি। সেক্ষেত্রে কী ধরনের নীতি-কৌশল নিতে হবে তা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি এরই মধ্যে বাংলাদেশে কতগুলো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। বিতর্কে-কুতর্কে না গিয়ে চ্যালেঞ্জগুলোকে পরিসংখ্যানের আলোকে দেখতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সূচক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের জানাচ্ছে। সেই বিষয়গুলো সামনে রেখে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হলে আমরা অবশ্যই সামনের দিকে এগোতে পারব। খেয়াল করলে দেখা যাবে বাংলাদেশে এক ধরনের প্রবৃদ্ধি ঘটলেও এর সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ তেমন ঘটেনি। অনেকেই মনে করেন এবং পরিসংখ্যানও তা- বলে, এখানে একটা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। অনেকেই আবার কর্মসংস্থানে নিয়োজিত থাকলেও দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। অর্থাৎ কর্মসংস্থানযুক্ত দারিদ্র্যে মানুষও আছে। তার সঙ্গে একটা কাঠামোগত বিষয় আছে। মোটাদাগে কর্মসংস্থানের প্রায় পুরোটাই হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাতে। রকম পরিস্থিতিতে আমরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ (২০১৬-১৭) লক্ষ করি তাহলে দেখব বাংলাদেশে বেকারত্বের হার বেশ ওপরে। অর্থাৎ দশমিক শতাংশ। তার মধ্যে যুব বেকারত্ব অর্থাৎ যারা ১৪ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে আছেন, তারা ১২ দশমিক শতাংশ। আর দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের হার (যারা এক বছরের বেশি বেকার আছেন) ১৫ দশমিক শতাংশ। তাহলে দেখা যাচ্ছে বেকারত্বের হার যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। বিষয়কে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে মোকাবেলা করতে হবে।

এখন দেখা যাক দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি কেমন? লক্ষ করলে দেখা যাবে দেশে দারিদ্র্য কমার হার কমে গেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা জরিপ অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্য কমার হার ছিল বছরওয়ারি এক দশমিক শতাংশীয় পয়েন্ট। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালে তা দাঁড়িয়েছিল এক দশমিক শতাংশীয় পয়েন্ট। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে তা ছিল দশমিক শতাংশীয় পয়েন্ট। অর্থাৎ দারিদ্র্য কমার হার কমে গেছে। কেন বাংলাদেশে আগে বড় মাত্রায় দারিদ্র্য কমেছিল? এর কারণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল। শ্রমশক্তি জরিপের পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি, বরং বেকারত্বের হার বেড়ে গেছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আসলে দারিদ্র্য কমেনি। কর্মসংস্থান বাড়ানো আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

আগেই বলেছি বাংলাদেশের অর্থনীতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনানুষ্ঠানিক। সর্বশেষ অর্থনৈতিক জরিপের (ইকোনমনিক এন্টারপ্রাইজ সার্ভে ২০১৩) তথ্যানুযায়ী, ৭৮ লাখ ২০ হাজারের মতো এন্টারপ্রাইজ রয়েছে। সেখানে ৭৮ লাখ ১০ হাজারই হলো কোনো না কোনোভাবে অনানুষ্ঠানিক খাতের। তার সঙ্গে কুটির শিল্প যোগ করলে সেই পরিমাণই দেখা যাবে। তার মানে আমাদের আসলে অনানুষ্ঠানিক খাতের অর্থনীতি। শ্রমবাজার লক্ষ করলে দেখা যাবে, গত এক দশকে যে কর্মসংস্থান হয়েছে, তা মূলত হয়েছে অনানুষ্ঠানিক খাতে। শ্রমবাজার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে চলতি অর্থবছরে আমাদের প্রধান রফতানিমুখী শিল্প পোশাক খাত ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে। গত বছর শেষে খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির হার দশমিক শতাংশ। একদিকে রফতানিমুখী শিল্প খাতে বাজার সীমিত, আবার পণ্যের বৈচিত্র্যকরণও দৃশ্যমান নয়। আমাদের শিল্প খাত ক্রমাগত কেন্দ্রীভূত হয়েছে পোশাক শিল্পে। পোশাক রফতানিতে আমাদের অবস্থান দ্বিতীয় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে ভিয়েতনাম দ্বিতীয় অবস্থান দখল করেছে। কাজেই রফতানি খাতের বৈচিত্র্য বাড়ানো আমাদের আরেকটি চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় চালক প্রবাসী আয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে কৃষি খাতে থাকা উদ্বৃত্ত শ্রমিক পোশাক খাতে যখন গেছেন কিংবা বিদেশে কাজ করতে গেছেন, তখন প্রাপ্ত মজুরিটাই গ্রামীণ অর্থনীতি তথা সারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভোগব্যয় বাড়িয়েছে। আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের বড় অংশ জুড়ে আছে ভোগব্যয়। বিশেষত গত ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসী আয় কমেছে। সেক্ষেত্রেও খবরটা খুব একটা সুখকর নয়। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময়ও প্রবাসী আয়ের ওপর এত বড় ধকল পড়েনি। এক্ষেত্রেও আমাদের চিন্তা করতে হবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে। কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের আগে আরো দুটি পরিস্থিতি যোগ হয়েছিল। এক. চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ। দুই. বিভিন্ন দেশে জনতুষ্টিবাদের বিস্তার। ফলে বিভিন্ন স্লোগান তোলা হয়েছিল এবং যেগুলো মূলত প্রতিরক্ষণশীল স্লোগান, যেমন আমাদের দেশকে আরো মহৎ করুন অথবা অভিবাসী বাদ দিলে বা বিচ্ছিন্ন হলে অর্থনীতি আরো গতিশীল হবে ইত্যাদি। রকম আন্তঃসর্ম্পক বিশ্বব্যবস্থায় জনতুষ্টিবাদও এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এর সঙ্গে মহামারীর যে প্রাদুর্ভাব এসেছে, তা যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুতর। এর সঙ্গে স্প্যানিশ ফ্লুর তুলনা করা যাবে না। এক্ষেত্রে রাস্তা আমাদের দুটো। হয় বিপর্যয়, নতুবা সমৃদ্ধি। এখন আমাদের পথ যদি সামনে এগোনোর, সমৃদ্ধি অর্জনের পথ হয়, তাহলে বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করবে। আমরা চাই সেই পথেই বাংলাদেশ হাঁটুক। 

মুহূর্তেকী কীপদক্ষেপ নেয়াউচিত?

আমাদের মোকাবেলার রূপরেখা তৈরি করা দরকার। সেই রূপরেখায় নীতি কাঠামো থাকতে হবে। তার আলোকে বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করতে হবে। অধিকাংশ মানুষই যাতে সুফল পায়। সর্বজনের এবং সমষ্টিগত বাংলাদেশের সমৃদ্ধি হতে হবে। এটিই হতে হবে কাঠামোর মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশে হাউজহোল্ড বা খানাকে কেন্দ্র করে সব নীতি কাঠামো তৈরি করতে হবে। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতের মধ্যেই আছে। এদের হাত ধরেই বাংলাদেশ এগিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে কম নয়। অন্য নির্দেশকে পিছিয়ে থাকলেও নির্দেশকে তারা অনেক এগিয়ে। সেটি চিন্তা করে আমাদের কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে। কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে খানা অর্থাৎ সর্বজন। সাম্প্রতিককালে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশেই খানাকে কেন্দ্র হিসেবে নিয়েছে।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের সব মানুষকে কীভাবে সামাজিক নিরাপত্তা পরিধির আওতায় আনা হবে? এখানে একটা সুখকর বিষয় হলো, আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন করা হয়েছিল। আমাদের এই পরিসংখ্যান আছে, যা যেকোনো ধরনের অপব্যবহার হ্রাস করতে পারে। আগে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা জাল বা কর্মসূচিতে অনিয়ম লক্ষ করা গেছে। এখন করোনার প্রাদুর্ভাবের সময়ে খানাকে কেন্দ্র করে ছয় মাসব্যাপী আমাদের একটি বেসিক ইনকাম গ্রান্ট দিতে হবে। এতে সবাই অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। ফলে তারা পুরো অর্থনীতিকে সচল রাখবে। সেটি করতে পারলে ভোগব্যয় চালু থাকবে। অতীতে লক্ষ করেছি, ভোগব্যয় চালু থাকলে অর্থনীতি সচল থাকে। অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য আমাদের বেসিক ইনকাম গ্রান্ট দিতে হবে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে। এটি কঠিন নয়। যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই, তারা জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে চলতি মাস থেকেই হিসাব খুললে অর্থ দেয়া সহজ হবে। এতে সবার হাতে অর্থ থাকবে এবং অর্থনীতি সচল থাকবে। এটি ত্বরিত জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে নিতে হবে।

দ্বিতীয় হলো, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়লে অর্থনীতি সচল থাকে। আগে আমরা যতটা এগিয়েছি, তা স্বল্প দক্ষতা দিয়ে। অধিক দক্ষ লোককে আমাদের দেশে অন্য দেশ থেকে আনতে হয়েছে। যার কারণে অনেক অনেক অর্থ বাইরে চলে যাচ্ছে। তাদের কাছ থেকে রাজস্বও তেমন আদায় করতে পারেনি। এখন অর্থনীতি আগের সনাতন কায়দায় চলবে না। কাজেই আমাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। সেটি করতে হলে স্বাস্থ্যবান জনগোষ্ঠী নিশ্চিত করতে হবে। তার মানে স্বাস্থ্যসেবায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। মহামারী মোকাবেলায় যারা সফল হচ্ছেন, তারা সর্বজনীন জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা জারি রেখেছেন। সর্বজনীন জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বাংলাদেশে করা কঠিন বিষয় নয়। 

অর্থনীতির দ্বিতীয় ইউনিট হলো ফার্ম, কোম্পানি বা কারবার। কারবারের ক্ষেত্রে কী হবে? কারবারের ক্ষেত্রে দুটো বিষয় এবং তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ করছি আর্থিক খাতের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা পুঁজিবাজার এক ধরনের বিশৃঙ্খল সময় পার করছে। বিভিন্ন সুযোগ দেয়া সত্ত্বেও ব্যাংক খাতে প্রায় লাখ কোটির মতো খেলাপি ঋণ রয়ে গেছে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, এর পরিমাণ আরো বেশি হবে। তাদের ভাষায়, এটি দ্বিগুণ পরিমাণ। বাংলাদেশে আসলে যখনই অর্থ দেয়া হয় তখনই খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বেড়ে যায়। কিন্তু লক্ষ রাখতে হবে, খেলাপি ঋণের সিংহভাগই মুষ্টিমেয়র হাতে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান যে খেলাপি হয় তা বলা যাবে না। তবে মুষ্টিমেয়রাই অধিকাংশ ঋণ পেয়ে থাকে। এটি একটি বড় রকমের সমস্যা। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ পুঁজি পাচার। ক্রমাগত আস্থাহীনতার অভাবে দিন দিন পুঁজি পাচার বাড়ছে। পুঁজিবাজার থেকেই আসলে ইকুইটি আসার কথা। কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এখনো অর্থায়ন ব্যাংকনির্ভর, পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক নয়। এখনো ব্যাংক থেকেই ইকুইটি সংগ্রহ করা হয়। পুঁজিবাজারে মাঝে মাঝেই ধস নামে। বৃহত্তর অর্থনীতির স্বার্থে ব্যাংক ব্যবস্থা পুঁজিবাজারকে ঠিক করতে হবে। 

আমরা লক্ষ করেছি বিশেষ করে পোশাক খাতের ক্ষেত্রে যতটা না উদ্যোক্তারা মার্কিন ডলারের বিনিময়ে টাকার অবমূল্যায়ন চেয়েছেন, কিন্তু উৎপাদনশীলতা কীভাবে বাড়ানো যায়, প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন করা যায়, সেদিকে ততটা মনোযোগ দেয়নি। একইভাবে বাংলাদেশে নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসা এবং এর মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো অনুপস্থিত। আমাদের অবশ্যই প্রণোদনা দিতে হবেএতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কোনো ধরনের চাপে পড়ে নয়। যারা কর্মসংস্থান তৈরি করবে, যে প্রতিষ্ঠান উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবে, তাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতার জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। তাছাড়া যারা ব্যাপক পরিমাণ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকবে, তাদের বড় ধরনের প্রণোদনা ছাড় দিতে হবে। বিপুল পরিমাণ পুঁজি পাচারের মতো ঘটনার আলোকে বলা যায়, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা খুব ভালো নয়। সেজন্যই বাংলাদেশের ক্ষুদ্র, ছোট মাঝারি শিল্পগুলোকে বড় আকারে প্রণোদনা দিতে হবে। তবে বড় শিল্প-কারখানার ক্ষেত্রে অবশ্যই শর্তযুক্ত সুবিধা রাখতে হবে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কাজের মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ করতে পারে, কেবল সেক্ষেত্রেই তারা প্রণোদনার আওতায় আসবে। শর্তহীন প্রণোদনা দিলে সেটা কাজ করবে না।

পূর্ব এশিয়ার সংকটে বিশেষ করে মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে লক্ষ করা গেছে যখনই ধরনের শর্তযুক্ত সহায়তা দেয়া হয়েছে, তখনই প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাই আমাদের বড় ধরনের পুনরুদ্ধার প্যাকেজ নিয়ে আসতে হবে। যার লক্ষ্য হবে বৈচিত্র্যকরণ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃৎ-কৌশলগত উন্নয়ন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। তাহলেই মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং অর্থনীতিতে বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন ঘটবে এবং যে পরিবর্তন আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান তথা আচার, আচরণ, ব্যবহার উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখে। কভিড-১৯ মোকাবেলার ক্ষেত্রেও অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম। সামাজিক দূরত্ববজায় থাকার কালে টেলিভিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মসূচি এবং কার্যকরী প্রথা চর্চাকে সহজেই সম্প্রচার করা যেতে পারে। যার মাধ্যমে সাধারণ জনগণ সচেতন হবে এবং নিজেরাই প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসম্মত চর্চা অব্যাহত রাখবে। আমাদের নিজস্ব রকম অনানুষ্ঠানিক প্রথা চর্চা তাত্ক্ষণিকভাবে পাওয়া না গেলে জাপান বা কোরিয়ার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা যেতে পারে। ডাবিং করে প্রচারণা চালানো যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আপনার যে হাতটি কম ব্যবহূত হয় (সাধারণত বাম হাত), ওটাদিয়ে লিফটের বোতাম, দরজার হাতল, টাকা-পয়সা ইত্যাদি ব্যবহারের চেষ্টা করা যেতে পারে। ওই হাতটি সহজে নাকে, মুখে বা চোখে যায় না। দক্ষিণ কোরিয়ানরা পদ্ধতি ব্যবহার করে উপকৃত হয়েছে। 

প্যাকেজবাস্তবায়নের অর্থায়নটাকোত্থেকে আসবে?

এখানে দুটো বিষয় রয়েছে। সরকারকে তিনটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, কেন্দ্রবিন্দু নির্ধারণ নীতি কৌশল প্রণয়ন। দ্বিতীয়ত, সরকারকে কার্যকর বাস্তবায়নযোগ্য পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, সবসময় পুনর্বীক্ষণ করতে হবে এবং পরিস্থিতির আলোকে শিক্ষা গ্রহণ করে পরিস্থিতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে নীতি-কাঠামোর পরিবর্তন করতে হবে। প্রশ্ন হলো, অর্থের সমাগম হবে কোথা থেকে? সরকারের হাতে দুই ধরনের নীতি কাঠামো আছে। একটি হচ্ছে রাজস্বনীতি, অন্যটি মুদ্রানীতি। আমরা যদি বাংলাদেশের পরিসংখ্যানগুলো খেয়াল করি তাহলে কতগুলো বিষয় কিন্তু পরিষ্কার হয়ে যায়। বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় এবং মোট দেশজ উৎপাদনের সম্পর্ক লক্ষ করলে দেখা যায়, সরকার যেসব ক্ষেত্রে গুণক প্রভাব বিবেচনা করে বিনিয়োগ করেছে, তাতে ইতিবাচকভাবে মোট দেশজ উৎপাদনের ওপর প্রভাব রেখেছে। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুদ্রা সরবরাহের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায় না। একই কায়দায় লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, মুদ্রা সরবরাহ এবং তার সঙ্গে সুদহারেরও কিন্তু কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এগুলো ঘটেছে বহিঃস্থ চলক দ্বারা, অর্থাৎ হয় রাজনৈতিক কারণে, নয় ব্যবসায়ীদের অতিলোভের মানসিকতা থেকে। বাংলাদেশের মোট ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনশীলতা অনুপাত কিন্তু অনেক বড় নয়। আরো যে মৌলিক বিষয়টিতে আমাদের স্পষ্ট হতে হবে তা হচ্ছে, অর্থ সরকারই তৈরি করে। এবার প্রশ্ন, অর্থের ব্যবহার কীভাবে হবে? অর্থের ব্যবহার যদি এমনভাবে করা হয়, যার ফলে গুণক প্রভাব তৈরি করবে এবং তা দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যাবে, তবে তা অর্থনীতির জন্য ভালো। শর্তসাপেক্ষ নীতি অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনবে এবং সামনের দিকে নিয়ে যাবে।

বলা হয়, সরকারি বিনিয়োগ মানে নাগরিকদের জন্য ভবিষ্যতের কর। বিষয়টি প্রমাণিত নয়। অতীতে যেমন বলা হতো, অর্থনীতিতে মোট মুদ্রা সরবরাহই হচ্ছে দেশজ উৎপাদন। অর্থাৎ রাজস্বনীতির কোনো দরকার নেই, মুদ্রানীতি আসলে একমাত্র পদ্ধতি, যার মাধ্যমে সরকার অর্থনীতিকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তত্ত্ব কিন্তু বাদ হয়ে গেছে। ২০০৮ সাল থেকে একটা তত্ত্ব জারি করা হচ্ছিল যে অর্থনীতিতে যদি চাহিদা কম থাকে, সামষ্টিক চাহিদা বৃদ্ধির জন্য সরকার অর্থ দিতে পারে। এর সঙ্গে বাজেটের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি মনে রাখতে হবে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট মোকাবেলায় এটিও কিন্তু কাজ করেনি।

বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকার, যারা তাদের রাজনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে ধরনের কাঠামোর প্রসার ঘটিয়েছিল, তারাও কিন্তু এটা থেকে সরে আসছে। তার মানে এই যে ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট কিংবা বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের শতাংশ বেশি হতে পারবে না কিংবা অর্থছাড়ের মাধ্যমে ঘাটতিতে ভারসাম্য আনার নীতিগুলো সেকেলে হয়ে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে ধারা আমরা লক্ষ করি, সব ক্ষেত্রেই সরকারের একটা ক্রিয়াশীল ভূমিকা লক্ষণীয়। সেটি চীনের ক্ষেত্রে বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষেত্রে দেখা গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কোন শর্তে দিচ্ছে? সরকার পুঁজিপতিকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখছে কিনা? অর্থাৎ শৃঙ্খলাটা মূল লক্ষ্য।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করেছি যে পুঁজির যে পরিমাণ রিটার্ন, তার তুলনায় শ্রমে রিটার্ন অনেক কম। যার জন্য দিন দিন বৈষম্য বেড়ে চলেছে। সামাজিক সুরক্ষা নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সবার হাতে অর্থ পৌঁছলে তা বৈষম্য হ্রাসের একটা সম্ভাবনা তৈরি করবে। অর্থাৎ গৃহস্থালির সবার হাতে যদি অর্থ যায় তাহলে অর্থনীতিতে ভার্চুয়াস সাইকেল তৈরি হবে। আমাদের মূল কাঠামোগত সমস্যা হচ্ছে, আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত কম। যখন অধিকাংশ মানুষের কাছে টাকা যাবে, আয়কর তখনই এক নম্বর খাত হিসেবে আবির্ভূত হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের পরিষেবা প্রদানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এক্ষেত্রে যদি ঋণ গ্রহণ করা হয়, তবে সে ঋণের কত অংশ কী শর্তে হবে তা সরকারকে মনে রাখতে হবে। বিদেশী ঋণ পরিতাজ্য নীতিই ভালো। বরং নিজস্ব জনগণের কাছ থেকে ঋণ বা অন্যান্য পন্থা গ্রহণে অসুবিধা নেই। তবে ঋণের পরিমাণ হ্রাস করে তারল্য আনতে হবে। জনগণের কাছে যদি তারল্যের প্রভাব পৌঁছে তাহলে অর্থনীতিতে সচলতা তৈরি হবে এবং তা সামনের দিকে নিয়ে যাবে।

জনগণের হাতে যদি টাকা যায় তাহলে চাহিদা বাড়বে। আর চাহিদা বাড়লে আমদানি বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে রফতানি বৃদ্ধির বিষয়টি যদি বিলম্বিত হয়, সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক লেনদেন ভারসাম্যে এক ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ব্যাপারে আমার বক্তব্য হচ্ছে, আমরা যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান লক্ষ করি তাহলে রফতানির পাশাপাশি আমদানি কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক লেনদেন ভারসাম্যের ঘাটতির পরিমাণ কমে এসেছিল। বাংলাদেশে যে পরিমাণ রিজার্ভ মজুদ রয়েছে, সেখানে ছয় মাসের বেশি আমদানি সম্ভব। আমরা জানি, অর্থনীতিতে যেকোনো প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হয়। তবে জনগণের শর্তসাপেক্ষ অর্থ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে যখন যাবে এবং তা উৎপাদনশীল পুঁজিতে পরিণত হবে, তখন অর্থনীতিতে সচলতা তৈরি হবে।

প্যাকেজগুলোবিতরণ কারাকরবে? অপব্যয়েরধারাটা কীভাবেপ্রতিহত করাযাবে?

অতীতের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা জাল কর্মসূচি থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। আমি মনে করি, ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে এটি বিতরণ করতে হবে। বাংলাদেশে সুবিধা রয়েছে। সবার যেহেতু জাতীয় পরিচয়পত্র আছে এবং তা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলা যায়। তাছাড়া দেশের গ্রামীণ এলাকার অনেক মানুষ কিন্তু ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহক। তাই অর্থনীতিতে সংকোচন শুরু হলে তাদের ওপরও প্রভাব পড়বে। তারা কিস্তি পরিশোধ করতে পারবে না। গ্রামীণ অর্থনীতির বিরাট অংশ ছিল অভিবাসী আয়, যা চলমান পরিস্থিতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে, তবে এর সঙ্গে যদি বেসিক ইনকাম গ্রান্ট ক্ষুদ্র ঋণ যোগ হয় তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সচলতার চাকা তৈরি করবে। অপব্যয় হ্রাসের অন্যতম পন্থা ব্যাংকিং চ্যানেলের মধ্যে নিয়ে আসা।

আমাদের পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির দিকে যেতে হবে। শিশুর, মায়ের, যুবকের, বৃদ্ধের কী দরকার জীবনচক্র অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করতে হবে। আমরা লক্ষ করেছি সামাজিক নিরাপত্তা জাল কাজ করছে না। সামাজিক প্রতিরক্ষণ ব্যবস্থা কিংবা পেনশন ব্যবস্থার নামে বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। আমাদের সামগ্রিক, সামষ্টিক সর্বজনের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা দরকার। সব সামাজিক নিরাপত্তা জালের অর্থ এর সঙ্গে সামান্য কিছু অর্থের প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ এটি করতে পারবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু পরিস্থিতিকে মোকাবেলাই করবে না, সবাইকে অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেবে। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সবাইকে নিবন্ধিত করার জন্য প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হবে। পরবর্তীতে আমাদের তদারক করতে হবে এবং বয়স ধরন হিসেবে সুবিধাগুলোর বণ্টন করতে হবে।

থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ায় স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের দেশে এক ধরনের অবকাঠামো রয়েছে। আমাদের দেশে তৃতীয় স্তরের তথা বড় জেলাগুলোয় মেডিকেল কলেজ অনেক শয্যার হাসপাতাল রয়েছে। রয়েছে বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট হাসপাতাল। দরকার নিচের দিকের অবকাঠামো তৈরি করা। অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্য পারিবারিক চিকিত্সক। আমদের যেমন জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে, তেমনি প্রত্যেকের জন্য জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কার্ড নিশ্চিত করতে হবে। রেফারেল পদ্ধতিতে ওপর-নিচ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। নতুন ডাক্তার নার্স লাগবে। নার্সের জোগান বাড়াতে হবে। এভাবে আমরা সর্বজনীন জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালু করতে পারি। একই সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দক্ষতা বাড়ানো দরকার। সংকট আমাদের সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সংকটকে সম্ভাবনায় পরিণত করার বিষয়টি নির্ভর করবে রাষ্ট্র রাজনীতির ওপর।

আন্তর্জাতিকপরিস্থিতি কীমনে করছেন?

১৯১৯ সালে জন মেইনার্ড কেইন্স ইকোনমিক কনসিকুয়েন্স অব পিসনামে একটি বই রচনা করেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে যোগ দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভার্সাই চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি ব্রিটিশ দলের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি লক্ষ করেন যে চুক্তিতে বড় রকমের বৈষম্য আছে এবং চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে আমরা লক্ষ করেছি লিগ অব নেশনও হয়নি, পরিস্থিতি অন্যদিকে গেছে, হিটলার এসেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে। অর্থাৎ জোর করে চাপিয়ে দেয়া বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করা হয়, তাহলে সেখান থেকে উত্তরণ সম্ভব হয় না; বরং সেটার একটা নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করেএটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেয়। ১৯৭৩ সালে তেল সংকটের ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বে আন্তর্জাতিক লেনদেন ভারসাম্যে যে ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, সেটাকে মোকাবেলা করার জন্য তৎকালীন রাজনীতিবিদরা জোটবদ্ধ হয়ে বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মাধ্যমে কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি তৈরি করেন। কিন্তু বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে শুধু বাজার নির্ভরতা দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। আফ্রিকা সাবসাহারা অঞ্চলে বাজারভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বিপ্রতীপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পরবর্তীতে তা সংশোধন করার জন্য চেষ্টা করা হয়েছে। সুশাসন যদি প্রতিষ্ঠা না হয় তাহলে কাজ করবে না। আসলে প্রতিষ্ঠান একটি বড় বিষয়, এখন সবাই একমত।

এর বিপরীতে সাফল্য অর্জন করেছে এমন কিছু দৃষ্টান্তও রয়েছে। ফ্রেডরিখ রুজভেল্ট আমেরিকার জনগণকে বলেছিলেন, আপনাদের বিশ্বের বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ছাড় দিতে হবে। আমরা লক্ষ করেছি যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো জার্মানিকে শর্ত চাপিয়ে না দিয়ে, কিছু অংশ কৌশলগত কারণে অবশ্যই, জাপানে তারা এক ধরনের নতুন সংবিধান তৈরি করে এবং নতুন সহযাত্রার অগ্রযাত্রা সূচনা করে। তেমনি যুদ্ধাবস্থার ইউরোপকে পুনরুদ্ধার করার জন্য ব্রেটেন-উডস কনফারেন্সের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের জন্ম দিয়ে মার্শাল প্ল্যানের অধীনে পুনরুদ্ধার কর্মসূচি গ্রহণ করে। উদ্যোগটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করেছে, কিন্তু দুটি সংস্থার বিভিন্ন ধরনের কট্টর আচরণের কারণে তারা পরবর্তীতে সমালোচনার সম্মুখীন হয়। 

দক্ষিণ এশীয় সংকটের কালে মালয়েশিয়া যেভাবে তা মোকাবেলা করেছিল, তা তাদের দ্রুত উত্তরণের সক্ষমতা দান করে। কিন্তু ২০০৮ সালের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করেছি পুরোমাত্রায় আর্থিক নীতি বাজেট ভারসাম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেছে। এতে বড় বড় করপোরেশনের লাভ হলেও অর্থনীতি তেমনভাবে পুনরুদ্ধার হয়নি। জাপান এখনো মন্দায় রয়েছে, ইউরোপের দেশ যেমন গ্রিসে সংকট তৈরি হয়েছে। এসব দিক পর্যালোচনা করে কোনটা সার্থক হয়েছে, সেটাকে আমাদের গ্রহণ করা দরকার।

একটা বিষয় ঋণাত্মকভাবে শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে যে বাহাস, যাকে অনেকেই এক ধরনের বাণিজ্যযুদ্ধ মনে করেন, তার সঙ্গে জনতুষ্টিবাদের বড় ধরনের উল্লফনের ফলে আন্তর্জাতিকতা বোধ এবং বহুপক্ষীয় সংস্থার ওপর আস্থার এক ধরনের সংকটও লক্ষ করা যায়। এমন পরিস্থিতিতে যদি সামনের দিকে পৃথিবীকে যেতে হয় তাহলে রাষ্ট্রনায়ক দরকার। জনতুষ্টিবাদী নেতা কেবল তার নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে জনসমর্থন জোগাতে পারে। গণতান্ত্রিকতার ত্রুটি বা সুযোগের কারণে নেতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হবেন না। পুরো প্রক্রিয়াটার একটা আন্তর্জাতিক বিষয় রয়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকা বা অন্যান্য দেশে যাদের ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি, সেসব দেশে কী হবে? দ্বিতীয় হচ্ছে, কোন ধরনের নীতির মাধ্যমে ভূমিকা রাখা যেতে পারে এবং সেক্ষেত্রে বড় অর্থনীতির বিশেষ করে চীন কিংবা যুক্তরাষ্টের ভূমিকা কী হবে? এবং তারা বিষয়গুলোকে কীভাবে সামলাবে? ব্রেটেন উডসের ব্যর্থতা সার্থকতাকে সামনে রেখে কী পরিস্থিতি তৈরি করবে, যার ফলে আন্তর্জাতিক গণদ্রব্য সরবরাহিত হবে। কারণ ধরনের মহামারী তো আমরা লক্ষ করছি। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষার উন্নয়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক গণদ্রব্য কীভাবে অর্থায়িত হবে, তার সঙ্গে যেসব দেশের বৈদেশিক লেনদেনের স্থিতির ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা যাবে, সেসব দেশে ঘাটতি কমিয়ে আনা বা মোকাবেলা জন্য কী ধরনের সহায়তার প্যাকেজ তৈরি করতে হবে তাও লক্ষণীয়। এখানে জাতিসংঘের যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তেমনি সব দেশের ভূমিকা আছে। প্রতিটি দেশ আমাদের সবার কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ। কারণ তারা বলেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা টেকসই বা স্থায়িত্বশীল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায়। বিশ্বের সব রাষ্ট্র রাষ্ট্রপ্রধানরা যেহেতু স্থায়িত্বশীল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ, তাই তাদের সেভাবেই অগ্রসর হতে হবে। তার মানে একদিকে যেমন টেকসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে, পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, সবুজ শিল্পায়ন বৈষম্য নিরসনের পাশাপাশি যে নতুন ব্যাধিটি যোগ হলো, তা যাতে সংক্রমিত না হয়, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সবার মধ্যে সহমর্মিতা সংক্রমিত হোক। ব্যাধি নয়, সহযোগিতার সংক্রমণই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

শ্রুতলিখন:হুমায়ুন কবির রুহিনাফেরদৌস

সাক্ষাৎকারটি দেখুন ...

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন

×