রবিবার | জুলাই ১২, ২০২০ | ২৮ আষাঢ় ১৪২৭

খেলা

মি. শ্যাঙ্কলি, আপনি ভুল ছিলেন!

হাসনাত শোয়েব

‘কোন কোন মানুষ মনে করে ফুটবল জীবন মরণ সমস্যা। তারা ভুল বলেন। ফুটবল তার চেয়েও বেশি কিছু।’ ফুটবলের জয়গান গাইতে গিয়ে বিখ্যাত এ উক্তি করেছিলেন লিভারপুল কিংবদন্তি বিল শ্যাঙ্কলি। এখনো বিভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে তার উক্তিটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক নভেল করোনাভাইরাসে গোটা দুনিয়া যখন ভয়ঙ্কর সংকটে, তখন শ্যাঙ্কলির এ উক্তিটা যেন বিদ্রুপের মতো শোনাচ্ছে। কারণ করোনার আঘাত থেকে বাদ যায়নি ফুটবল দুনিয়াও। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়-কোচসহ ফুটবলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব আক্রান্ত হয়েছেন। মারাও গেছেন একাধিকজন, যা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে জীবনের কিছুই বড় নয়। কোনো কিছুই নয়। মি. শ্যাঙ্কলি আপনি বড্ড ভুল ছিলেন।
চীন থেকে শুরু হয়েছিল করোনার প্রকোপ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। করোনার আগ্রাসনে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে ইউরোপের দেশগুলো। যাদের মাঝে ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি উল্লেখযোগ্য। কাকতালীয়ভাবে এসব দেশের ক্লাব ফুটবল সারা বিশ্বের জনপ্রিয়। রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, লিভারপুল, বায়ার্ন মিউনিখ কিংবা জুভেন্টাস শিরোপা জিতলে তার আনন্দ ছুঁয়ে যায় বিশ্বের নানা প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীদের। আন্তর্জাতিক ফুটবল নির্দিষ্ট সময় পরপর হওয়ার কারণে সারা বছর এ দেশগুলোর লিগ এবং ইউরোপ সেরার প্রতিযোগিতাগুলোর ওপরই চোখ থাকে সবচেয়ে বেশি। এমনকি বাংলাদেশেও রয়েছে শীর্ষ সারির ক্লাবগুলোর সমর্থক গোষ্ঠী। কিন্তু করোনার কারণে সব খেলাধুলার মতো ফুটবলও এখন বন্ধ। খেলোয়াড়-কোচরা নিজেদের বন্দি করেছেন ঘরের ভেতর। এর মাঝে আসছে প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হওয়ার খবরও। পাওলো দিবালা, পাওলো মালদিনি, ব্লেস মাতুইদি, ড্যানিয়েল রুগানি, মিকেল আরতেতাসহ হাইপ্রোফাইল অনেক কোচ ও বর্তমান-সাবেক খেলোয়াড়রা আক্রান্ত হয়েছেন। মারাও গিয়েছেন একাধিকজন। যাদের মাঝে আছেন রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক সভাপতি লরেঞ্জো সাঞ্জ। অদৃশ্য এক ভাইরাস কেবল ফুটবলকেই সাময়িকভাবে মুছে দেয়নি, অনেক কিংবদন্তিকে কেড়ে নিয়েছে পৃথিবী থেকেও। মানুষের জীবন-মরণ যখন এতটাই হুমকির মুখে যে, কেবল ফুটবল কেন সবকিছুই এখন তুচ্ছ। মানুষের জীবনের অধিক মূল্যবান নয় কোনো কিছুই।
এমনকি জীবন-মরণের এ নজিরবিহীন সংকটে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে ফুটবলকেও। অনেকের মতে ইতালিতে করোনার ভয়াবহ বিস্তৃতির জন্য মূলত দায়ী হচ্ছে আটালান্টা ও ভ্যালেন্সিয়ার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্বের ম্যাচটি। ইতিহাস গড়া সেই ম্যাচে আটালান্টা জিতেছিল ৪-১ গোলে। নিজেদের মাঠ অনুপযুক্ত হওয়ায় সেদিনের ম্যাচটি হয়েছিল মিলানের মাঠ সান সিরোতে। প্রিয় দলকে সমর্থন দিতে সেদিন ৪০ হাজার আটালান্টা সমর্থক হাজির হয়েছিলেন বেরগামো শহর থেকে। প্রিয় দলের জয়ের পর গোটা বেরগামোবাসী নেচে-গেয়ে উদযাপন করেছিল। আটালান্টার উল্লাসের সেই রাতটিই অনেকের মতে ইতালিয়ানদের চিরকালীন কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনায় এখন সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে এ দেশটিতে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যেসব নতুন ইউরোপ গড়ার সাক্ষী, সেই বৃদ্ধ লোকদের মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
অবশ্য কেবল ইতালিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি করোনার আগ্রাসন। এরপর স্পেন, ফ্রান্স ও জার্মানিকেও তা আক্রান্ত করেছে। তবে মানবজাতিকে সংকটে ফেলা এ মহামারীকে মোকাবেলায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। এরই মধ্যে লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, পেপ গার্দিওলার মতো তারকারাসহ যে যেভাবে পারছেন, এগিয়ে এসেছেন। ক্লাবগুলোও নিজ নিজ জায়গা থেকে চেষ্টা করছে ভূমিকা রাখার। লক্ষ্য একটাই, মৃত্যুকে হারিয়ে দেয়ার চেষ্টায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আর মৃত্যুর দ্বার রুদ্ধ করে মানুষকে জীবনের পথে নিয়ে আসাই পারে ফুটবলকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিতে।
এদিকে অবিরাম স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাওয়া লড়াকুদেরসহ সব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে এরই মধ্যে ৩১টি দেশের ১৮০টি রেডিও স্টেশন একসঙ্গে বাজিয়েছে শ্যাঙ্কলির দল লিভারপুলের গান ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন’। তবে সবার প্রত্যাশা, এ গান দ্রুত ফিরে আসুক অ্যানফিল্ডে। তার নিজের ঘরে। প্রাণ ফিরে আসুক ফুটবলে। পৃথিবী ফিরে পাক তার আপন মুখ। ‘অল রেড’ সমর্থকরা যখন আবার হাতে হাত রেখে একসঙ্গে গেয়ে উঠবেন এ গান, অন্য জগতে নিশ্চয় শ্যাঙ্কলির চেয়ে বেশি আনন্দিত আর কেউ হবেন না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন