শুক্রবার | আগস্ট ১৪, ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

নীতি-পর্যালোচনা

অর্থনীতি রক্ষায় আপত্কালীন ব্যবস্থা নিতে হবে

ড. আরএম দেবনাথ

গত কয়েকদিন আগের ঘটনা একটি বড় ওষুধের দোকানে গেছি মাসের ওষুধ কেনার জন্য বলা বাহুল্য, এই দোকান থেকেই আমি বরাবর ওষুধ কিনি অবাক হয়ে দেখলাম, মানুষ দোকানে ঢুকছে স্রোতের মতো ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই বিক্রেতারা পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে ক্রেতার সেবা দিতে দোকানিদের একজন আমার ভালো পরিচিত একটু জায়গা করে দিল, একটা বেঞ্চ দিল দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না বলে, এতে বসলাম যথারীতি প্রেসক্রিপশন দিলাম ১০ মিনিট, ২০ মিনিট, আধাঘণ্টা যায়, ওষুধের কোনো খবর নেই ঘণ্টা বাদে বিক্রেতা খবর দিল সব ওষুধ নেই রাগ আমার মাথায় এত পরে এই নেতিবাচক খবর দোকানে ক্রেতাদের হইচই আমি ধৈর্য ধরে বসলাম তিনটি অতীব প্রয়োজনীয় ওষুধ বাদে অন্যান্য ওষুধ পেলাম ভাবছি কী করা যায় গেলাম অন্য একটি পরিচিত দোকানে সেখানে একটা পেলাম এভাবে তৃতীয় দোকানে গিয়ে আমার ওষুধের চাহিদা মিটল শুনলাম বুঝলাম মানুষ পাগলের মতো ওষুধপত্র, মাস্ক, স্যানিটাইজার টিস্যু পেপার কিনছে

ঘটনাক্রমে এসব জিনিস আজকাল ওষুধের দোকানেই পাওয়া যায় দোকানিদের জিজ্ঞেস করে জানলাম, একেকজন এক মাস, দুই মাসের ওষুধ কিনছে একই অবস্থা দেখলাম মনিহারি দোকানে অর্ডার দিলে জবাব আসছে এটা নেই, ওটা নেই মাছের সরবরাহ কম, কাঁচাবাজারেও সরবরাহ কম দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে সরবরাহ সংকট এসব দেখেশুনে বুঝলাম, মানুষ বাঁচতে চায় মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে কারণেই কোনো দুর্যোগকালে, আপত্কালে, সংকটকালে মানুষ অতিরিক্ত পণ্যদ্রব্য কেনে এবার শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নয়, ওষুধপত্র কিনছে মানুষ জরুরিকালীন অবস্থার জন্য

এতে মদদ দিচ্ছে বিদেশ থেকে আত্মীয়স্বজনরা নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সব দেশ থেকে আত্মীয়স্বজনরা দুর্যোগের খবর দিচ্ছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নেই মল সব খালি, স্টোর সব খালি, মানুষ স্টক করছে এসব খবর মুহূর্তে মুহূর্তে চালাচালি হচ্ছে করণীয়, অকরণীয় জানাজানি হচ্ছে বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থায় মানুষ বাঁচার জন্য পাগলের মতো আচরণ করছে চারদিক থেকে খবর আসছে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা, আসছে মৃতের সংখ্যাও মিডিয়া ফলাও করে তা প্রকাশ করছে মিডিয়ার জন্য এটা বড় বাজার এখন মানুষ খবর শুনছে, পত্রিকা পড়ছে দিশেহারা মানুষ শুনছে এত বড় বিপর্যয় এর আগে কখনো আসেনি দুনিয়ার দেশে দেশে জরুরি অবস্থা মানুষে মানুষে যোগাযোগ বন্ধ, কমিউনিটিতে যোগাযোগ বন্ধ, হোটেল, রেস্টুরেন্ট বন্ধ, বিমান চলাচল বন্ধ, সাধারণ যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার উপক্রম ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি লাটে উঠছে নানা দুঃসংবাদ, গুজব চারদিকে এমন বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা আর কখনো দেখা যায়নি সবচেয়ে বড় কথা মানুষের অসহায়ত্ব মানুষ চাঁদে গেছে কয়েক দশক আগে কলেরা, যক্ষ্মা, বসন্ত, উদরাময় জয় করেছে ম্যালেরিয়া জয় করেছে মানুষ মঙ্গলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে সেখানে আগাম বুকিং দিচ্ছেন ধনাট্য ব্যক্তিরা আনন্দ-ফুর্তি, আরাম-আয়েশের এত আয়োজন আমাদের পূর্বতন প্রজন্মরা দেখেনি ভোগবিলাস, কমফোর্ট-প্লেজার নজিরবিহীন এতসব সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে মানুষ নিতান্তই অসহায় করোনাভাইরাসের কাছে কোনো ওষুধ নেই, পথ্য নেই রোগে চিকিৎসকরা আতঙ্কিত, নার্সরা আতঙ্কিত, রাজা-বাদশাহরা আতঙ্কিত প্রার্থনার জায়গা পর্যন্ত বন্ধ একেই বলে উপরওয়ালার মার’—বললেন এক সাধারণ রিকশাওয়ালা

যে রিকশাওয়ালার কথা বলছি, সে বেশি উদ্বিগ্ন নয় বলে মনে হলো ওই আমাকে এক ওষুধের দোকান থেকে অন্য ওষুধের দোকানে, অবশেষে বাসায় দিয়ে গেছে বুঝলাম হাত ধোয়ার নিয়ম সে জানে না জানলেও সাবান কেনার টাকা কোথায়? ঘণ্টায় ঘণ্টায় হাত ধোয়ার অবসর কোথায়? এই ডেডলি রোগের থেকে বাঁচার জন্য প্রতিষেধক কী, সে জানে না জানলেও সে অসহায় যখন তার রিকশায় উঠি, সে কোনো ভাড়া চাইল না, অথচ অন্যদিন তারা চায় অসহায়ের মতো বলল, ‘‘স্যার, আমাদের বাঁচতে দেন তিন-চারদিন যাবৎ খ্যাপ পাচ্ছি না এমনিতে দিনে ৫০০-৬০০ টাকা রোজগার হতো ১৫ দিন ঢাকায় থাকলে - হাজার টাকা নিয়ে রংপুর যেতে পারতাম এবার মনে হয় তা হবে না রোজগার অর্ধেকে নেমেছে যাত্রী নেই স্কুল-কলেজ বন্ধ’’

বিকালে মানুষ রাস্তায় বেরোয় না বয়স্করা রাস্তায় নেই যাত্রী নেই, ভাড়া নেই মালিকের টাকা জোগাড় করে খাওয়ার খরচ হচ্ছে না এই রকম একই অবস্থা খেটে খাওয়া মানুষের, বস্তিবাসী মানুষের গত শুক্রবারের (২০.০৩.২০) বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবরেও তা- দেখলাম খবরের শিরোনাম: বেশি বিপদগ্রস্ত হবে বস্তিবাসী খবরটিতে দেখলাম, সারা দেশে বস্তির সংখ্যা ১৩ হাজার ৯৩৫টি ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, খুলনা সিলেটে বস্তিবাসী সবচেয়ে বেশি এদের পেশা নানা ধরনের যথা রিকশা ভ্যানচালক, ব্যবসা, গার্মেন্টকর্মী, চাকরিজীবী, নির্মাণ শ্রমিক, মুটে/দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, গৃহকর্মী, হোটেল শ্রমিক, হকার, কৃষি শ্রমিক, কুটির শিল্পের শ্রমিক অন্যান্য বলা বাহুল্য এই খেটে খাওয়া মানুষের বিপদই এখন সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে বেওয়া-বিধবারা, স্বামী পরিত্যক্ত নারী, প্রতিবন্ধী, বেকার যুবক-যুবতীরা শোনা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও চাকরিও যেতে শুরু হয়েছে, যা এই মুহূর্তে ঘটলে, তা হবে অমানবিক কে শোনে মানবতার কথা সবার স্বার্থই এক নম্বরে লোকসান কেউ দিতে চায় না অতএব গরিব, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, খেটে খাওয়া মানুষজনই হবে সারা বিশ্বের ক্ষতিগ্রস্ত এটাই সবসময় হয়

যারা অতিরিক্ত ওষুধ কিনছে, অতিরিক্ত চাল-ডাল কিনছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনছে, তাদের ভালো আয়-রোজগার-সঞ্চয় আছে তারা বর্তমান সংকটে এক-দুই-তিন-চার মাস বেঁচে থাকতে পারবে, যদি না করোনাতে আক্রান্ত হয় কিন্তু কোটি কোটি সাধারণ মানুষের কী হবে? এদের বাঁচানোর জন্য কোনো ব্যবস্থা হবে কি? মুশকিল হচ্ছে শ্রেণীর মানুষের কথা বলার কেউ নেই যাদের বলার লোক আছে, তাদের জন্য সবসময় সরকার দুই হাত বাড়িয়ে রাখে এবারো তাই হবে কারণ অর্থনীতির স্বার্থে তার প্রয়োজন আছে আমদানি-রফতানি ব্যবসা নেই গার্মেন্টস রফতানি বিঘ্নিত এই খাতে ক্রয়াদেশ বাতিল হচ্ছে গার্মেন্টসের কাপড়, সুতা ইত্যাদি আমদানি বন্ধ বহু শিল্পে উৎপাদন বন্ধ হচ্ছে বা হবে এদের কী হবে? আমার সন্দেহ ছিল ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, আমদানিকারক রফতানিকারকদের লোকসানের সব বোঝা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের ওপর চাপানো হবে ঘটনা তাই ঘটেছে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা ঠিক রেখে, তা প্রয়োগে কিছু শিথিলতার কথা ঘোষণা করেছে আমদানির টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ, বিপরীতে রফতানির টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় দেশে আনয়নের ক্ষেত্রে নিয়মাবলি শিথিল করা হয়েছে আমার মনে হয় না এসব পদক্ষেপে বড় বেশি কাজ হবে দরকার হবে নতুন ঋণের, দরকার হবে অনেক শিল্পের পুনর্বাসনের বোঝা দরকার ব্যবসা-বাণিজ্যে একবার অধোগতি দেখা দিলে, ব্যবসায়ীরা একবার লোকসানে পড়লে, কেনা-বেচায় একবার ছেদ পড়লে, তা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে বিশেষ করে অনিশ্চয়তা চারদিকে আমাদের আমদানির প্রধান উৎস চীন ভারত এবং রফতানির প্রধান প্রধান গন্তব্যস্থল ইউরোপ, কানাডা আমেরিকা করোনাভাইরাসে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ইতালি স্পেনের খবর খুবই খারাপ অথচ এসব ইউরোপীয় দেশে রয়েছে অনেক বাংলাদেশী, যারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান তার মানে বোঝা যাচ্ছে, রফতানি আমদানি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত, তেমনি রেমিট্যান্সও হবে ক্ষতিগ্রস্ত শুধু কি তাই? সরকারের রাজস্ব আয়ও হবে বিঘ্নিত এরই মধ্যে খবরে দেখলাম, সরকার ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়ে ফেলেছে সত্যি কি মিথ্যা জানি না একটা খবরে দাবি করা হয়েছে, সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও ঋণ নিচ্ছে এটি হলে তা খুবই খারাপ খবর

মোদ্দাকথা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসে আমরা প্রচণ্ড বড় একটা হোঁচট খাচ্ছি এবং তা আন্তর্জাতিক বাজারে বাজারে আমদানি-রফতানি ব্যবসা পুনরুজ্জীবিত না হলে, জ্বালানি তেলের মূল্য ঠিক না থাকলে বিদেশের বাজারে আমাদের আমদানি পণ্যের দাম ঠিক না থাকলে, আমাদের কষ্টের সীমা থাকবে না আশা করি, সরকারের ভাবনা-পরিকল্পনার মধ্যে এসব সমস্যার কথা আছে এখন দেখার বিষয় কীভাবে সরকার এগোয় আমার ধারণা, অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমাদের আপত্কালীন ব্যবস্থা নিতে হবে নতুবা অর্থমন্ত্রী কর্তৃক গৃহীত অনেক নতুন পদক্ষেপ ভেস্তে যাবে

 

. আর এম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন