বুধবার| এপ্রিল ০৮, ২০২০| ২৪চৈত্র১৪২৬

আপন অঙ্গন

করোনাভাইরাসের ঘরোয়া প্রতিরোধ

সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করেছে করোনাভাইরাস থেকে সৃষ্ট কভিড-১৯ বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় এর প্রকোপ এখনো অজানা, যা এরই মধ্যে আতঙ্ক, সংশয় অস্থিরতা তৈরি করেছে চিকিৎসাবিজ্ঞান ভাইরাসের প্রতিকার প্রতিরোধক নিয়ে নানা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে কোনো ধরনের প্রতিষেধক আবিষ্কার এবং সারা বিশ্বে তার সহজলভ্যতা অনেক সময়সাপেক্ষ কেউ আক্রান্ত হলে তাকে কোয়ারেন্টিন (অন্যদের থেকে পৃথক রাখার ব্যবস্থা) রাখাই এখন সমাধান

গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, কীভাবে আক্রান্তদের চিকিৎসার পাশাপাশি এর বিস্তার প্রতিরোধ করা যায়? আপাতত সব চিকিৎসা বিজ্ঞানীই (বায়োমেডিকেল অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবস্থা) প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর অনেক বেশি জোর দিচ্ছেন এবং ভাইরাসটি যাতে ছড়াতে না পারে তার জন্য বিভিন্ন সতর্কতামূলক স্বাস্থ্যচর্চার পরামর্শ দিচ্ছেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, জীবাণুনাশক দিয়ে হাত-মুখ ধোয়া ইত্যাদি

একটু সচেতন আর সাংস্কৃতিক স্বাস্থ্যজ্ঞান থাকলেই বাড়তি খরচ ছাড়াই আমরা ঘরোয়াভাবে যেকোনো ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে পারি কভিড-১৯ নতুন হলেও ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা আমাদের আক্রান্তদের দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করবে এবং অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমাবে চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে সাংস্কৃতিক চিকিৎসা ব্যবস্থাগুলোকে (কালচারাল/এথনিক মেডিকেল প্র্যাকটিসেস) অনেক গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করি সে রকম কিছু প্রমাণিত ঘরোয়া স্বাস্থ্যচর্চা ওষুধের ব্যবহার নিয়ে এখানে কথা বলছি

প্রথম কথা হলো, আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই দ্রুততম সময়ের মধ্যে কোয়ারেন্টিন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের ব্যবস্থা নিতে হবে খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাসাবাড়ির বাইরে যাওয়া ঠিক নয়, বিশেষ করে বেশি মানুষের সমাগম হয় এমন স্থানে ঘরের ভেতরে থাকার মাধ্যমে আক্রান্ত হওয়ার এবং অন্যকে আক্রান্ত করা বন্ধ করা যাবে যেহেতু কোনো ধরনের প্রতিষেধক নেই এবং কভিড-১৯ করোনা গোত্রীয় ভাইরাস, যা মূলত রেসপিরেটরি ইনফেকশন (মুখ, নাক, চোখ, কানের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে), সেজন্য এর মূল চিকিৎসায় অ্যান্টিহিস্টামিন বেশি ব্যবহার হচ্ছে মনে রাখার বিষয়, করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত একটি মাত্র লক্ষণ ধারাবাহিকভাবে একে অন্য ভাইরাসজনিত রোগ থেকে আলাদা করেছে, আর তা হলো করোনাভাইরাস সংক্রমণে হাঁচি হয় না (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তেমনই বলছে, কিন্তু বাস্তবে মানুষ সেদিকে নজর না দিয়ে আতঙ্কিত হতে দেখা যাচ্ছে) যেহেতু বলা হচ্ছে ফুসফুসের দুর্বলতা বা রোগ থাকা কিংবা আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিরা ভাইরাসের আক্রান্ত হলে তাকে সুস্থ করা বেশি মুশকিলের যে কারণে আগে থাকা ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসজনিত অসুস্থতার সঙ্গে করোনাভাইরাস যোগ হতে পারে বলেই অনেক চিকিৎসক অ্যান্টিহিস্টামিনের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকেরও পরামর্শ দিচ্ছেন তবে দ্রুত আরোগ্যের জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মধ্যে শারীরিক সুস্থতা এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর এখন পর্যন্ত চিকিৎসকরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন, ভিটামিন-সি এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

ক্ষারযুক্ত সাবান অন্যান্য জীবাণুনাশক

আমাদের হাতের মাধ্যমে মূলত করোনাভাইরাস নাক, মুখ চোখে প্রবেশ করতে পারে বলা হচ্ছে যদিও রেসপিরেটরি ইনফেকশনের ক্ষেত্র কানও হতে পারে আবার ভাইরাস লেগেছে এমন পোশাক থেকে হাতে আসতে পারে যেজন্য হাত, মুখ জীবাণুমুক্ত রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কিন্তু বাজারের জীবাণুনাশক (স্যানিটাইজার, হ্যান্ডরাব, ডেটল, স্যাভলন ইত্যাদিকেনার সার্মথ্য অনেকের না- থাকতে পারে কারণ এখন সেগুলোও অনেক চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে কিংবা পাওয়া যাচ্ছে না গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, যেটাই ব্যবহার করি না কেন তাতে অ্যালকোহল (অন্তত ৬০ শতাংশের উপরে), অ্যাম্ফিফিলসক্লোরোহেক্সাডিন, ইথানল ধরনের উপাদানের উপস্থিতি থাকতে হবে তার চেয়ে আমরা সহজে কাপড় কাচার সাবান বা ডিটারজেন্ট দিয়ে কভিড-১৯ প্রতিরোধ করতে পারি


আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বলছে, পুরনো সময়ে ব্যবহূত সাধারণ সাবানেও অ্যাম্ফিফিলস কিংবা সোডিয়াম লরেথ সালফেট নামের উপাদান আছে, সেগুলো কভিড-১৯-এর মতো ভাইরাসকে দুর্বল করে দিতে এবং প্রতিরোধ করতে পারে কিন্তু আমেরিকায় সে রকম সাবান বাজারে থাকলেও বাংলাদেশের বাজারে সঠিক উপাদানসহ সাবান বাজারে পাওয়া নিয়ে সন্দেহ আছে তবে কাপড় কাচার সাবান ডিটারজেন্টে সাধারণত উপাদানগুলো ব্যবহার হয় আরেকভাবে বললে, ক্ষারযুক্ত সাবানগুলো বেশি কার্যকর; যা কাপড় কাচার সাবানে বেশি ব্যবহার হয় এছাড়া আমরা মেঝে পরিষ্কার করার জন্য তরল জীবাণুনাশক ব্যবহার করি, যেমন ফিনাইল বা লাইজল সম্প্রতি আইসিডিডিআর,বি গবেষকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানি দিয়ে হাত ধোয়ার পরামর্শ দিতে দেখা গেছে মোট কথা, সঠিক স্যানিটাইজার কিনতে না পারলে সমস্যা নেই বাসায় থাকা কাপড় কাচা সাবান বা ডিটারজেন্ট হাত ধোয়ার জন্য যথেষ্ট সুতরাং সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন এছাড়া ঘরের পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখা খুব জরুরি এবং ক্লোরিন দিয়ে তা খুব সহজেই করা যায়, যাতে কভিড-১৯-এর মতো জীবাণুর বিস্তার দমন সম্ভব সবচেয়ে সাধারণভাবে ব্যবহূত ক্লোরিন বাজারে পাওয়া যায়, যা আমরা ব্লিচিং পাউডার নামে চিনি সময় ঘরের মেঝে, বিছানাপত্র পোশাক ধোয়া বা পরিষ্কারের কাজে ব্লিচিং পাউডারের ব্যবহার আমাদের করোনাভাইরাসের সংক্রমণের চিন্তা কমাতে পারে

বড় কথা হলো, মুহূর্তে কভিড-১৯-এর বিস্তার রোধে এবং আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাইরে যাওয়া বন্ধ করা প্রথম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে রাখা দরকার আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি পাশাপাশি উল্লিখিত বিষয়গুলো মেনে চললে দ্রুততম সময়ে আরোগ্যলাভ কিংবা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে আক্রান্ত হলে হাসপাতালের সেবার জন্য আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য সেলফোন বা অনলাইনে চালু হওয়া সরকারি-বেসরকারি সাহায্য নেয়া যেতে পারে

ভিটামিন-সি

বিশ্বের সব চিকিৎসা ব্যবস্থাতেই এটি প্রমাণিত স্বীকৃত বিষয় যে বাহ্যিক ওষুধ তখনই সবচেয়ে বেশি কার্যকরিভাবে কাজ করে, যখন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভিটামিন-সি, যা শরীরের মৌলিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ধরে রাখে সুতরাং ভিটামিন-সির মজুদ পর্যাপ্ত থাকলেই তা যেকোনো অবস্থায় বাহ্যিক ওষুধের সঙ্গে দ্রুততম সময়ে রোগ প্রতিরোধে কাজ করে এবং রোগীকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে ভাইরাস সংক্রমণেও প্রক্রিয়া সবচেয়ে বেশি কার্যকরী মোট কথা, অন্যান্য রোগসহ বর্তমান করোনার ক্ষেত্রেও প্রতিদিনের খাবারে ভিটামিন-সি অপরিহার্য সব চিকিৎসাবিজ্ঞানী একটা কথায় একমত যে বাজারে পাওয়া ভিটামিন-সি ওষুধের চেয়ে সরাসরি খাবারের মধ্যে ভিটামিন-সি অনেক বেশি কার্যকর, যা প্রতিদিনের খাবারের মাধ্যমেই আসতে পারে

আমেরিকার খাদ্য ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) একটা খাদ্যতালিকা আছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন-সি ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে যার সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকার মিল আছে তবে সে তালিকা থেকে আমাদের দেশে সহজে কম দামে পাওয়া কিংবা প্রতিদিনের খাবারে দরকারি খাদ্যে যেসবে ভিটামিন-সি বেশি পাওয়া যায় সেগুলো হলো, কাঁচামরিচ, পেয়ারা, টমেটো, কমলা, মাল্টা, বাতাবি লেবু, গোলমরিচ, পেঁপে, মিষ্টি আলু, লেবু, ব্রোকলি ফুলকপি এছাড়া দামি সবজি ফলের মধ্যে রয়েছে স্ট্রবেরি, কিউই, দেশী জাম, আঙ্গুর, আমলকী করোনার সংক্রমণের সময়ে খাবারগুলো প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি ভিটামিন-সি যেমন ভাইরাস প্রতিরোধে কাজ করবে, তেমনি আক্রান্ত হলে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবং দ্রুত আরোগ্য লাভেও সহায়ক হবে

হলুদ (টারমারিক/কারকিউমিন): শক্তিশালী অ্যান্টিবায়েটিক ভাইরাস ধ্বংসকারী

এশিয়ার বিভিন্ন সংস্কৃতিতে সুপ্রাচীনকাল থেকেই রোগের প্রতিষেধক প্রতিরোধক হিসেবে হলুদ (কাঁচা বাটা হলুদ) সফলভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে তবে এখন পর্যন্ত বায়োমেডিকেল বিজ্ঞানীরা এটিকে বিকল্প চিকিৎসার (অল্টারনেটিভ/কমপ্লিমেন্টারি মেডিকেল সিস্টেম) বিষয় হিসেবে শনাক্ত করে এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ফার্মাকোলজিক্যাল উপাদান হিসেবে অগ্রাহ্য করে এসেছেন আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে হলুদের চিকিৎসা গুণাগুণের তথ্য খোদ বায়োমেডিকেল গবেষকদেরই ক্লিনিক্যাল গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে হলুদের অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা বেশ অনেকদিন ধরেই হচ্ছে তবে সবচেয়ে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা প্রবন্ধে জার্মানি ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল ফ্রান্সের ভিরোলজি (ভাইরাসবিদ) মাইক্রোবায়োলজির একদল গবেষক খুবই আশাব্যঞ্জক ফল নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন তারা নিজেরাও দুঃখের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে হলুদ এখনো একটি চিকিৎসাযোগ্য ভাইরাসবিরোধী উপাদান (থেরাপিউটিক অ্যান্টিভাইরাল এজেন্ট) হিসেবে বায়োমেডিকেল স্বীকৃতিদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন পায়নি সে কারণেই হলুদ দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধক ওষুধ তৈরি করা যাচ্ছে না

ওই প্রবন্ধে গবেষকরা দাবি করেন, হলুদযার ওষুধ বিজ্ঞানীয় নাম কারকিউমিনএকসারি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ফাঙ্গাস প্রতিরোধ করে গবেষকরা হলুদের রাসায়নিক গঠন (কেমিক্যাল স্ট্রাকচার) বিশ্লেষণ করে প্রমাণ দেখান যে কারকিউমিন অন্যান্য ভাইরাসের সঙ্গে ইনফ্লুয়েঞ্জা, এইচআইভি (এইডস) হেপাটাইটিসের মতো রোগের প্রতিরোধে সক্ষম প্রবন্ধ ২০১৯ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয় ফলে হলুদের ব্যবহারে কভিড-১৯-এর মতো ভাইরাসের প্রতিরোধ সম্ভব কিনা, তা পরীক্ষাসাপেক্ষ ব্যাপার কিন্তু অবশ্যই আমরা সাধারণভাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে হলুদের ঔষধি প্রয়োগে চেষ্টা করতে পারি প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে কাঁচা হলুদ খাওয়া বা রান্নায় তার ব্যবহার বাড়াতে পারি এতে যেকোনো ভাইরাসজনিত অসুখে শরীর সহজে মোকাবেলা করতে পারবে

দারচিনি গোলমরিচ দুটি মসলা আমরা রান্নায় ব্যবহার করি গবেষণায় দেখা গেছে, দুটি মসলা কয়েক রকমের ব্যাকটেরিয়া ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিশেষ করে গলাব্যথা খাবার হজমের সমস্যার জন্য দায়ী জীবাণুর বিরুদ্ধে ফলে খাবারে এগুলোর পরিমাণ বৃদ্ধি করলে ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীর আরো বেশি প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে পারবে

 

নুর নেওয়াজ খান: এএনইউ- বায়োমেডিকেল চিকিৎসা নিয়ে পিএইচডি গবেষণারত এবং প্রভাষক, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন