রবিবার | জুলাই ১২, ২০২০ | ২৭ আষাঢ় ১৪২৭

সাক্ষাৎকার

বঙ্গবন্ধু সারা জীবন সমতা ও বৈষম্যহীনতার কথা বলে গেছেন

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব। অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। বহুমাত্রিক কর্মজীবনে তিনি কাজ করেছেন জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির উপ-আবাসিক আবাসিক প্রতিনিধি, বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন   সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে। তিনি জাতীয় শিক্ষা কমিটির সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য। বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের প্রধান উপদেষ্টা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রঞ্জন মল্লিক 


বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব হিসেবে আপনার কাজ কী ছিল?

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে আমার কাজ করার যে বিরল সুযোগ হয়েছিল, সেখানে কর্তব্যের মধ্যে ছিল, বঙ্গবন্ধু প্রথমে সরকারপ্রধান, তারপর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার কাজ যেন সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পারেন তা নিশ্চিত করা। নতুন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হলে তার কোনো ব্রিফ আছে কি না। কোনো পলিসির বিষয়ে তার কথা বলা দরকার এবং এর ব্রিফ সংশ্লিষ্ট বিভাগ তৈরি করেছে কিনা বা আমরা তৈরি করতে পারব কিনা তা দেখা। বঙ্গবন্ধু বিদেশে গেলে কাকে দেখা করতে দেয়া হবে, কাকে দেয়া হবে না, কোন মিটিংয়ে কখন তিনি যাবেন, কী প্রস্তুতি তার আছে এগুলো হলো রুটিন। এসব দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা আমার কাজ ছিল।

আর বাইরে আমার বড় ক্রেডিট ছিল, আমি তার রক্ষী হিসেবে কাজ করেছি। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আর আমার একটা বড় কাজ ছিল দেশে আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক বিষয়ে কোথায় কোনো অসংগতি আছে কিনা এবং কোথায় ভালো কাজ হচ্ছে, সেটা তাকে জানানো। নিয়োগপ্রাপ্তির পর প্রথম দিনে ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, বাবারে দেখ্, আমার কাছে বহু রকমের লোক আসে, তো যারা ভদ্রলোক তাদের দেখা করতে দেস কিনা, তারা তাদের কাজ করিয়েই নিবে। কিন্তু আমার অনেক বন্ধু চাষাভুষা, শ্রমজীবী মানুষ আসবে, তাদের তুই যদি আমার সাথে দেখা করতে না দিস, তাদের কাজ করতে সাহায্য না করিস, তাহলে তাদের কাজ কোনো সময়ই হবে না। গ্রামবাংলার মানুষ খুবই অসহায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল কারণ ছিল সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন করা, কল্যাণ রাষ্ট্র সৃষ্টি করা।

একান্ত সচিব হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কোন কাজগুলো আপনার কাছে অধিক পছন্দ বলে মনে হতো; কোন কাজগুলোর সাথে একাত্মতা পোষণ করতে পারেননি?

তিনি এমন কোনো কাজ করেননি যা কোনো বাঙালি অপছন্দ করবে। তিনি যে কাজই করেছেন বাঙালির মঙ্গলের জন্যই করেছেন, দেশের অগ্রগতির জন্যই কাজ করেছেন। তাকে যে বলা হয় বঙ্গবন্ধু সত্যিই তিনি জনগণের বন্ধু ছিলেন। কাজেই তিনি যেসব কাজ করেছেন, তার সব কাজই আমার পছন্দ। বিশেষ করে, যদি বেশি পছন্দ বলতে চান, তা হলো প্রথমত যখন বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়, তখন তিনি যেভাবে একটা ভঙ্গুর অর্থনীতি অর্থাৎ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ডিনাইয়েল পলিসিতে ১৯৭১ সালে সবকিছু ভেঙে চুরমার করে যায়। তাকে জোড়া লাগানো। অর্থনীতির পুনর্বাসন করা। একে নতুন করে সৃষ্টি করা। খুবই কঠিন কাজ ছিল। যেমন আমি আপনাকে বলি, ভান্ডারে কোনো খাদ্য ছিল না। মাঠে কোনো ফসল ছিল না। কারণ কৃষাণ-কৃষাণীরা যুদ্ধ করেছেন। নয় মাস মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন। যুদ্ধের সময় কি ফসল বোনা সম্ভব। সদ্য স্বাধীন দেশে শেখ মুজিবুর রহমান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সৃষ্টি করলেন। একটা কনজিউমার সারপ্রাইজ অব বাংলাদেশ সৃষ্টি করলেন। টিসিবির মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য, চিনি, ভোজ্যতেল, কেরোসিনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিস তিনি আমদানি করার ব্যবস্থা করলেন ত্বরিত গতিতে। আপৎকালীন ব্যবস্থার মতোই একটা সুরাহা করেন। আর কনজিউমার্স সারপ্রাইজ করপোরেশনের মাধ্যমে সারা দেশে শাখা খুলে ওই শাখার মাধ্যমে অত্যন্ত সুলভ মূল্যে এসব পণ্য মানুষের কাছে পৌঁছার দায়িত্ব বণ্টন করে দেন। একটা দুর্ভিক্ষের হাত থেকে মানুষকে বাঁচালেন। এর পর পরই যেটা তিনি করেছেন সেটা হলো অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ। পাকিস্তানি বাহিনী সব ধ্বংস করে দিয়েছিল। কাজেই নৌ সমুদ্রবন্দর, রাস্তাঘাট, রেল, ব্রিজ, স্কুল, কলেজে, মাদ্রাসা ওইগুলোকে পুনর্বাসন করলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক স্থাপন করে ব্যাংকিং ব্যবস্থা স্থাপন করেছেন এবং সারা পৃথিবীতে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নয়নে সচেষ্ট হলেন। তার পররাষ্ট্রনীতি ছিল ফ্রেন্ডশিপ টু অল ম্যালাইস টু নান। এই কাজগুলো আমার বেশি পছন্দ ছিল। শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতা চালু করেন জাতির পিতা।

আপনি অনেকগুলো অবকাঠামোর কথা বলছেন, বঙ্গবন্ধু কলকারখানা, রাস্তাঘাট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেই ক্ষেত্রে ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা কতটা যৌক্তিক ছিল?

শিক্ষা ক্ষেত্রে জাতির পিতার চিন্তা অত্যন্ত মৌলিক ছিল। প্রথমত, তিনি প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক শিক্ষাবিদ কুদরাত--খুদার নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। ওই কমিশনের দুটি বড় সুপারিশ ছিল। তার মধ্যে একটি ছিল প্রাথমিক শিক্ষা হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত মাতৃভাষায়। ওইটাকে ধরে তিনি লেখাপড়াকে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত সার্বজনীন করেন অর্থাৎ বাধ্যতামূলক করেন। সদ্য স্বাধীন দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করেন। সব প্রাথমিক শিক্ষককে সরকারি কর্মচারী হিসেবে আওতাভুক্ত করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এর সঠিক বাস্তবায়ন করেছিলেন তিনি।

এটার যৌক্তিকতা কতটুকু ছিল প্রশ্নের উত্তর হলো, সুবিধা যেটা হয়েছে ১৯৭২ সালে দেশে শিক্ষার হার ছিল শতকরা মাত্র ২৩ ভাগ। আর এখন ৪৯ বছর পর শিক্ষার হার হয়েছে শতকরা ৭৩ ভাগ। শুধু তা- নয়, আমাদের প্রাইমারি পর্যায়ে যে ভর্তি এটা প্রায় একশত ভাগ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের দেশে প্রথম দিকে প্রাইমারি স্কুল থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা ছিল শতকরা ৫০ ভাগের বেশি। এসব কারণে প্রথমদিকে শিক্ষার হার বৃদ্ধির গতি শ্লথ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৯ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারের অনেক বলিষ্ঠ অগ্রাধিকারের কারণে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো বলতে হবে যে শিক্ষার গুণগত মানে প্রশ্ন রয়েছে।

এটা তো বঙ্গবন্ধুর আমলে সৃষ্টি হয়নি। সম্পর্কে আরো নজর দিতে হবে। আর দুই নম্বর গুরুত্বপূর্ণ হলো এখন যে শিক্ষার প্রসারটা হচ্ছে তার মধ্যে কিন্তু সাধারণ শিক্ষার প্রাধান্য রয়েছে। এজন্য এটা বলা হচ্ছে যে বর্তমানে যারা বেকার তাদের অধিকাংশই হলো শিক্ষিত বেকার। অর্থাৎ বৃত্তিমূলক শিক্ষা মাধ্যমিক পর্যন্ত যেটা কুদরাত--খুদা কমিশনে ছিল এবং পরবর্তী সময়ে টেকনোলজিক্যাল এডুকেশন, যা উচ্চ পর্যায়ে আছে এসব বিষয়কে সুচারু সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করলে একটা বিজ্ঞানমনস্ক, আধুনিক, শিক্ষিত, রুচিশীল সংস্কৃতিমান সমাজ গড়ে উঠবে অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর যে আদর্শ উদ্দেশ্য ছিল তা আরো সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে। 

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল, তখন আমাদের অর্থ ছিল নাবৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভর করে দেশ চালাতে হতোসে মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু এত বড় পদক্ষেপ নিলেন, এটা তো বর্তমান সময়ে এসেও ভাবনার বিষয়...

বঙ্গবন্ধুর কাজ রকমই ছিল। সাধারণের চোখে মনে হবে একেবারেই অসম্ভব, সেই কাজকেই সম্ভব করতেন তিনি। তার অভিধানে অসম্ভব বলে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু আপনি ঠিক বলেছেন, তখন অর্থকড়ির তীব্র অভাব ছিল, বড় অনটন ছিল। তবে বলতে হবে, শুধু যে বিদেশ থেকে ঋণ করে আনা তা কিন্তু নয়, শেখ মুজিব এবং বাংলাদেশের প্রচণ্ড একটা গুডউইল সারা পৃথিবীতে ছিল। কারণ, পাকিস্তানিরা আমাদের নির্যাতিত করেছে, অত্যাচার করেছে, ধ্বংস করেছে, আমাদের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেছে। আমরা নির্বাচনে জিতেছি, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছেন কিন্তু তার হাতে ক্ষমতা দেয়নি। ফলে সারা পৃথিবীতে যে একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে তার প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে। সারা পৃথিবী থেকে কিন্তু অনেক সম্পদ বাংলাদেশে এসেছে। এটা হলো এক নম্বর। আর দুই নম্বর হলো, বিশ্বব্যাংকের সহায়তা। যদিও সরকারের ভেতরে যারা কট্টর সমাজবাদী ছিলেন, সমাজতন্ত্রী ছিলেন তারা বাধা দেয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা বাংলাদেশের স্বার্থে এবং আমাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। তাদের কাছ থেকে অত্যন্ত সহজ শর্তে প্রায় মঞ্জুরির মতো সাহায্য নিয়েছেন। এসব অর্থ দিয়ে যুগান্তকারী সব কর্মকাণ্ড করেছেন। কিন্তু এটা বলতে দ্বিধা নেই, তাত্ক্ষণিকভাবে তার নেয়া কিছু পদক্ষেপ থেকে ফললাভ হয়নি বা এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদি ছিল। এসব পদক্ষেপ অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ তাত্ক্ষণিক ফলফল দেয় না। কিন্তু ওই যে এগ্রিকালচার বা কৃষি বিষয়ে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন যেমন ক্ষমতায় বসেই কৃষকের পাঁচ লাখ সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করে নিলেন। জমির সিলিং বেঁধে দিলেন যাতে করে উদ্বৃত্ত জমি বিত্তহীনদের মধ্যে দেয়া যায়। অত্যন্ত সহজ সুলভ মূল্যে যত রকমের কৃষি উপকরণ আছে, বীজ বলেন, সার বলেন, তখন কীটনাশক ব্যবহার করা হতো এবং কৃষিঋণ এগুলো আমাদের চাষী ভাইদের কিষান-কিষানির ঘরে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এসব উদ্যোগ ছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের উপস্থিতিতে যে অনুপ্রেরণা তাতে কিন্তু প্রচণ্ড পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, জিডিপি বাড়া শুরু করে। রাজস্ব আসা শুরু করে। কিন্তু প্রথম দিকে সদ্য স্বাধীন দেশে রাজস্ব আদায় ছিল না বলে, কাজগুলো করতে মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি ছিল।

প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের পর তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমান সময়ে সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নেয়ার একটা ব্যবস্থা করছে। পঁচাত্তরের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিলেন, তারা নিয়ে কী করলেন?

আমি প্রশ্নের উত্তর দেব না। তখনকার সরকারে যারা ছিলেন, তারা উত্তর দেবেন। আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল এবং ২০০৯ থেকে সরকার সেদিকেই যাচ্ছে বলে সঠিক পদক্ষেপে অগ্রসর হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানকে কাছ থেকে দেখেছেন। তার বিশেষ কিছু স্মৃতি যদি বলতেন পাঠকের জন্য...

বঙ্গবন্ধু দুপুরের খাবারটা অফিসে অর্থাৎ গণভবনে খেতেন। খাবার আসত স্বাধীনতার জন্মস্থান ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে। মহীয়সী নারী ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের সযতন তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধুর সহজ-সরল খানা পাক করা হতো। খাবারের পছন্দ সম্পর্কে অনেকেই প্রশ্ন করে আমাকে। বিশেষ করে এই পুঁটি মাছ, টেংরা মাছ, হলুদ ছোট টেংরাটা পছন্দ করতেন। পাবদা, মলা আর কৈ মাছ খেতেন। এগুলো তিনি পছন্দ করতেন। সাদা ভাত খেতেন, মাছের ঝোল, ডাল পছন্দ করতেন। সবজি পছন্দ করতেন। প্রায়ই আমরা যারা আশপাশে ছিলাম তাদের নিয়ে খেতে বসতেন। তিনি জানতেন যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কম ছিল। সদ্য স্বাধীন দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কমিয়ে দেয়া হয়েছিল, যেহেতু দেশের কোষাগারে বেশি অর্থ ছিল না, তাই চলতে এদের কষ্ট হতো। তিনি পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করতেন, আমরা অকপটে তার কাছে সব কথা বলতে পারতাম।

আর দু-একটা ঘটনা যা হূদয় স্পর্শ করার মতো ছিল। একদিনের কথা বলছি, আমার বাড়ির যিনি কাজ করতেন, তার মা মারা গেলেন লিভার সিরোসিসে। তো আমার মনটা খুব ভার ছিল। মহামান্য রাষ্ট্রপতি বললেন, কিরে মন খারাপ, বাবা কত দরদ, বাড়ির কাজের লোকের মা মারা গেছেন। এটাই তো মানুষের মতো মানুষের কাজ। তো একটা কাজ কর, টাকা কত লাগবে। তার জানাজা করতে কবর দিতে। একজন রাষ্ট্রপতি, তখন তিনি প্রেসিডেন্ট। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই।

এত ছোটখাটো ব্যাপারে তার মন থাকা এবং ব্যাপারে সাহায্য করার প্রবণতা থাকা, এতে বোঝা যায় যে তার মনটা কত বড় ছিল। মানুষের জন্য তার দরদও ছিল অপরিসীম। বিভিন্ন জায়গায় আমরা যখন গিয়েছি, যেমন জাতিসংঘে গেলাম, তিনি বাংলায় বক্তৃতা দিলেন, সব লোক এসে তাকে করমর্দন করল। ফিদেল কাস্ত্রো এলেন, কাস্ত্রো তখন বড় নেতা। বললেন, তুমি তো সাংঘাতিক বক্তৃতা দিয়েছ, তুমি বক্তৃতায় বাংলাদেশের কথা যতটুকু না বলেছ তার চেয়ে বেশি বলেছ বিশ্বের মজলুম মানুষের কথা। এবং বলেছ তাদের সমস্যার সমাধান হলে বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান হবে। তবে কিন্তু তোমাকে সবকিছু পাল্টাতে হবে। পুরনো প্রশাসনে চলবে না, ঢেলে সাজাতে হবে। বাকশালের আইডিয়াটা ওইখান থেকেই এসেছিল বলে মনে হয়।

আমি দেখেছি তার একটা শিশুসুলভ মন। হয়তো দলের কোনো কর্মী মারা যাওয়ার সংবাদ এসেছে। একেবারে হাউমাউ করে কাঁদতেন। এসব চোখের সামনে দেখেছি। একটা ঘটনার কথা বলি, সুলতান মাহমুদ খান, তিনি পরবর্তী সময়ে বিমান বাহিনীর প্রধান হয়েছিলেন। তো নিয়ম ছিল যখন কোনো সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন হেলিকপ্টার চালকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হতো। তো সুলতান মাহমুদ তখন উইং কমান্ডার ছিলেন। তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু বললেন, দাগনভূঞার আবদুল লতিফের ছেলে না তুই। তোর যে একটা ছোট ভাই ছিল, সে কেমন আছে। এই হলো শেখ মুজিবুর রহমান। এই হলো তার স্মৃতি। শুধু স্মৃতি নয়, কথার মধ্যে দরদ ছিল। যেকোনো মানুষের সঙ্গে দেখা হলে সে মানুষকে তার হূদয় দিয়ে মন জয় করে ফেলতেন।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেখেছি ১০ টাকার নোটের মধ্যে আপনার স্বাক্ষর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পাশে বঙ্গবন্ধুর ছবি। এটা কত সালে করলেন এবং কীভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন?

এটার একটা ছোট ইতিহাস আছে। ১৯৭৫ সালের বিয়োগান্তক, ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের পর আর কোনো বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত নোট ছাপা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত টাকা ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়। কিন্তু পঁচাত্তর সালের ধিক্কারজনক ঘটনার পর এটা ছাপা হতো না। এটা আস্তে আস্তে তলিয়ে গিয়েছিল। তখন টাকায় থাকত পার্লামেন্ট ভবন, পুরাকীর্তি ইত্যাদি। জাতির পিতার ছবিসংবলিত নোট তুলে নেয়া হচ্ছিল। আমাকে যখন ১৯৯৮ সালে সদাশয় সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দিলেন এতে সোৎসাহে যোগদান করার অন্যতম কারণ ছিল দেশের কারেন্সি নোটের ব্যাপারে যে অনাচার হচ্ছে তা ঠিক করা। গভর্নর হওয়ার কিছুদিন পর ধাতস্থ হয়ে বসে একটা ডিজাইন করালাম। আমাদের যে টাঁকশাল আছে, যোগ্য লোকজন আছে, সেখানে মাহমুদা, সানজিদা আপার ছোট বোন সে নকশা করতেন। তাকে বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ একশ টাকার নোটের নকশা করার নির্দেশ দিলাম। তিনি নকশা আঁকলেন বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ। নকশা নিয়ে গেলাম অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেবের কাছে। তিনি একটু থতমত খেয়ে গেলেন, উদ্যোগটা কিন্তু অনেক বড়। একটা নোট ছাপানো সোজা কথা নয়। বঙ্গবন্ধু নেই কিন্তু তার নকশাসংবলিত নোট। কিবরিয়া সাহেব বললেন যে আপনে উদ্যোগ নিয়েছেন কাজ করছেন ভালোই। আপনাকে মোবারকবাদ দিই। আমি বলি, স্যার এতেই তো হবে না। আপনি এটা নিয়ে যান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য। আমি কিন্তু ১৯৯৯ সালের কথা বলছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। কিবরিয়া সাহেব বললেন, আমি কেন, এটা কী করে হয়। আপনি বানাইছেন এত কষ্ট করে, আর আমি নিয়ে যাব। অন্য কেউ হলে কিন্তু বলতেন যে দেন। নকশাটা নিয়ে গিয়ে বলত যে আমি করিয়েছি।

তিনি গেলেন না। আমি সাহস করে নিয়ে গেলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনা, উনি নকশা দেখে ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে গেলেন। ভালো করে দেখে বললেন, ডিজাইন খুব সুন্দর হয়েছে। এভাবে পুনঃচালু হলো শেখ মুজিবের ছবিসংবলিত একশ, পঞ্চাশ দশ টাকার নোট। দুঃখের একটা বিষয় আছে এখানে, শুধু যে দশ টাকার কাগজের নোট তা না, এই নোটটাকে আমি পলিমার করতে চেয়েছিলাম। পলিমার করেছিলামও। দশ টাকার নোটটা পরীক্ষামূলকভাবে করেছিলাম। কিন্তু এদিকে আমার মেয়াদ শেষ হয়ে গেল। নভেম্বর ২০০১-এর পর পলিমারটা বাদ দিয়ে দিল, আবার কাগজের নোট চালু হলো।

দেশ স্বাধীনের আগে আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মদিনের কথা শুনেছি সাদামাটাভাবে উদযাপন করতে পছন্দ করতেন। পরবর্তীকালে দেশ স্বাধীনের পরও জন্মদিন পালিত হয়েছে। ওইসব জন্মদিনে আপনিও অংশ নিয়েছেন, সম্পর্কে জানতে চাই...

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মদিনের কথা। আমি বলব যে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তিনি শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। তিনি চাইতেন তার জন্মদিনে শিশুরা যেন সবার আগে থাকে। ঘর থেকে বের হয়েই যেন শিশুদের দেখতে পান। আমরা সেভাবে আয়োজন করতাম। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেনঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে এই আপ্তবাক্যটি। তাই তার বাড়িতে সকাল থেকেই বিভিন্ন শিশুসংগঠনের শিশুরা ফুল দিতে আসত। তিনি নিজেও শিশুদের সংগঠনগুলোতে যেতেন যেমন, কচিকাঁচার মেলা খেলাঘরের মতো সংগঠনে।

শিশুদের সঙ্গে সাক্ষাতের পরই সমাজ রাষ্ট্রের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। নীলিমা আপা প্রত্যেক বছর আসতেন। প্রফেসর নীলিমা ইব্রাহীম। না এলে বঙ্গবন্ধু খোঁজ করতেন কোথায় আছেন তিনি। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আসতেন। প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন তিনি। তারা দল বেঁধে আসতেন। আর বেশকিছু মুক্তিযোদ্ধা যারা হয়তো পঙ্গু, যারা হয়তো চলাফেরা করতে পারতেন না। এই রীতিটা এখনো চালু আছে।

তাদের বিশেষ বিশেষ দিনে গণভবনে ডাকা হয়। অতি সাধারণ মানুষও ফুল দিয়ে জাতির পিতাকে সম্মান জানাতে পারতেন। জন্মদিনে শেখ মুজিব কোনো বাহুল্য আয়োজন করতে দিতেন না। সাদামাটা মানুষের মতো। তবে সুযোগে আপনি আমাকে কথা বলার সুযোগ করে দিলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গেছেন, অনেক সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান, অনেক উপঢৌকন দিতেন তাকে। অনেক গিফট পেতেন। সব গিফট দেশে ফিরে এসে তিনি তোষাখানায় দিয়ে দিতেন। অর্থাৎ সরকারি জিম্মায় চলে যেত ফিরে রাষ্ট্রীয় উপঢৌকন।

তোষাখানা সম্পর্কে জানতে চাই।

সরকারের যেসব প্রয়োজনীয় বা দামি জিনিসপত্র সংরক্ষণ করা হয় তাকে তোষাখানা বলে। যে কারণে তাকে হত্যার পরও খুনি মোশতাক যে একটা হোয়াইট পেপার তৈরি করেছিল ৩২ নম্বর বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছু পায়নি। কাজেই তার সততা যে খুবই উঁচু মাত্রার ছিল আবারো প্রমাণ হয়েছে। শুধু একটা ছোট সোনার মুকুট পেয়েছিল সেটা উল্লেখ করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার কিছুদিন আগে জামাল কামালের বিয়ে হয়েছিল। একটা ছোট সোনার মুকুট একজন আত্মীয় দিয়েছিলেন।এইটা আমি রাখি বাবা বেগম মুজিব বলেছিলেন, মহীয়সী রমণী। আমি বলেছিলাম, খালাম্মা এইটা রাখেন। ওই মুকুট ছাড়া আর কোনো দামি জিনিস হত্যাকারীদের প্রতিনিধিরা ৩২ নম্বরের বাড়িতে খুঁজে পায়নি।

রাষ্ট্রের সম্পত্তি তার নিজের কাছে রাখেননি। রাষ্ট্রের তোষাখানায় রেখেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা শেখ রেহানা তাদের যা আছে সবকিছু রাষ্ট্রকে দিয়ে দিয়েছেন।

২০২০ সালের ১৭ মার্চ, দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০০তম জন্মদিন পালিত হচ্ছে। শততম জন্মদিনকে জাতি কীভাবে উদযাপন করলে তার সোনার বাংলার স্বপ্ন পূরণ হবে বলে মনে করেন?

কথাটা হচ্ছে আনুষ্ঠানিকতা এক বিষয় আর কাজ করা আরেক বিষয়। আপনার প্রশ্নের মধ্যে সেটা আছে। আনুষ্ঠানিকতা থাকবে কিন্তু সেখানে বোধ হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কোনো ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। আমাদের একটা তালিকা করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কী কী কাজ আমাদের করতে হবে বলে শিখিয়েছিলেন, কী বলেছিলেন এর বেশির ভাগই কিন্তু অন ট্র্যাক আছে। অর্থাৎ জনবন্ধু শেখ হাসিনা কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত কাজগুলো তার আদর্শ ধরেই করছেন। কিন্তু এর দুইটা বিষয় আছে যেমন কোঅপারেটিভ (সমবায়), এটা বঙ্গবন্ধুর একেবারে তার হূদয়ের গভীরতম প্রদেশে ছিল। এটা আমরা করতে পারলাম কিনা।

সমবায় করার কথা বঙ্গবন্ধু যেভাবে চেয়েছিলেন আমরা করতে পারলে, বাজারে যে ফাটকাবাজি হয় তা কিন্তু হতো না। যদি আমরা গ্রামে-গঞ্জে কিষান-কিষানিদের উৎপাদন বিপনন সমবায় করি এবং তাতে যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দান করি, আমাদের খাদ্যগুদামের ক্যাপাসিটি যদি ১৫ লাখ টন থেকে ৩০ লাখ টনে উন্নীত হয়, কোঅপারেটিভে যদি শতাংশ সুদে ঋণ দেয়কৃষকদের যদি এসব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হতো, তারা নিজেদের উদ্বৃত্ত ধান-চালটা তারা নিজেরাই কিনে রাখবে বা রাখতে পারত। আর যদি ফাটকাবাজিতে ওস্তাদ মিল মালিক অসাধু সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে না গিয়ে ক্ষমতা কৃষকদের হাতে রাখা যেত, তারা নিজেরাই কিনে সমবায়ের মাধ্যমে গুদামে রাখতেন এবং সারা বছর ধরে ধান-চাল গুদাম থেকে বিক্রি করতেন, কৃষকরা উৎপাদিত শস্যের বেশি মূল্য পেতেন আর দেশের মানুষ কম দামে খাদ্যদ্রব্য কিনতে পারতেন। এটা কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ধারণার মধ্যেই ছিল। তবে বঙ্গবন্ধু যে সারা জীবন সমতা বৈষম্যহীনতার কথা বলে গেছেন সেক্ষেত্রে আমরা কি পিছিয়ে পড়ছি?

রকম কোনো কোনো কাজ, যেমন ইটলস (ITLOS), ইটলস যে জননেত্রী শেখ হাসিনা জিতলেন। অসামান্য বিষয় কিন্তু এসব ধারণা শেখ মুজিবই দেখিয়ে গেছেন। সমুদ্রসীমার আইনটা তিনিই সারা বিশ্বের মধ্যে প্রথম চালু করেন। বাংলাদেশে আইনটা করা হয়, সেটা দেখে জাতিসংঘ আইনটা পাস করে। এসব কাজ যা তিনি করে গেছেন, বেশির ভাগই তার জ্যেষ্ঠ সন্তান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টানা তৃতীয়বার চতুর্থবার বাস্তবায়ন করছেন।

কিন্তু তার মধ্যে কোনটা হয়নি সেটা দেখা দরকার। তিনি তো প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে এগুলো বলে গেছেন। এখন তো সময় পরিস্থিতি বদলেছে। তাই সে অনুযায়ী কোনো কিছু বদলালে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব বিষয় পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। মূল্যায়নটা বস্তুনিষ্ঠ হওয়া দরকার এবং তা অবশ্যই আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে করতে হবে। আবেগ ঠিক আছে প্রকাশ করতে হবে কিন্তু তিনি যে সোনার বাংলার কথা বলেছেন, এই যে