বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

প্রথম পাতা

নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধ

কোয়ারান্টাইনে গোটা ইতালি, কঠোর অবস্থানে অন্যরাও

বণিক বার্তা ডেস্ক

বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। রোগটি মোকাবেলায় নানা প্রস্তুতির পদক্ষেপ নিয়েও খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। তার পরও চালু রয়েছে প্রতিরোধ। চীন এরই মধ্যে রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পথে। হিমশিম খাচ্ছে ইতালি-ইরান। নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কাতার-সৌদি আরবও।

চীনের বাইরে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইতালি। ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধের সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে গতকাল দেশটির ছয় কোটি নাগরিকের চলাচলের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জুসেপ্পে কন্তে গতকাল টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে জানান, গতকাল থেকেই দেশটিতে লকডাউন কার্যক্রম পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে। তিনি বলেন, আমি এমন এক ডিক্রিতে সই করতে যাচ্ছি, যেটিকে এক বাক্যে বলতে হয়, এখন থেকে আমি ঘরেই থাকছি। যথোপযুক্ত পেশাগত বা স্বাস্থ্যগত কারণ না থাকলে গোটা উপদ্বীপেই এখন থেকে ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে হবে।

এতদিন পর্যন্ত ইতালির লকডাউন কার্যক্রম সীমিত ছিল দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শিল্পকেন্দ্র মিলান ভেনিস পর্যন্ত। এবার তা প্রয়োগ করা হলো জাতীয় পর্যায়ে। আগামী এপ্রিল পর্যন্ত চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপিত থাকবে। ওই সময় পর্যন্ত দেশটির স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বন্ধ।

সময় ইতালীয়রা শুধু কর্মক্ষেত্র বিশেষ জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বেরোতে পারবেন। গণপরিবহনও চালু থাকবে। তবে বাইরে চলাচলের ক্ষেত্রে জনসাধারণকে কারণ ব্যাখ্যা করে ঘোষণাপত্রে সই করতে হবে। বিয়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াসহ সব ধরনের জনসমাগম স্থগিত থাকবে। রেস্তোরাঁ বারগুলোকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করে দিতে হবে।

ইতালির জনসাধারণও ঘর থেকে বের হওয়া এক রকম বন্ধ করেই দিয়েছেন। প্রয়োজনের তাগিদে যাদের বেরোতে হচ্ছে, সর্বত্রই অন্যদের সঙ্গে ন্যূনতম দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান-চলাচল করছেন তারা।

ইতালীয়রা ফুটবলপাগল জাতি হলেও নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশটিতে এরই মধ্যে সিরি-এসহ সব ধরনের ফুটবল টুর্নামেন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাতিল হয়েছে সব ধরনের খেলাধুলার প্রতিযোগিতামূলক ইভেন্টও। জিম, সুইমিং পুল, থিয়েটার বেটিং শপগুলোও এরই মধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

কভিড-১৯ প্রতিরোধী লড়াইয়ের সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে জরুরি অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণার পাশাপাশি বন্ধকি ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়ও স্থগিত করে দিয়েছে ইতালি সরকার। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এরই মধ্যে হাজার কোটি ইউরোর তহবিল গঠন করেছে দেশটি। গতকাল দেশটির মন্ত্রীরা জানান, তহবিলের ব্যাপ্তি আরো বাড়ানো হবে। এছাড়া প্রাদুর্ভাব চলাকালে বন্ধকিসহ সব ধরনের ঋণ পরিশোধের দায়ও স্থগিত থাকবে দেশটিতে।

নতুন পদক্ষেপের কারণে দেশটিতে বছর বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ইতালির অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রী স্তেফানো পাতুয়ানেলি।

এর পরও রোগটিকে ঠেকানোয় এখন পর্যন্ত খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারছে না ইতালি। কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর ভিড়ে দেশটির  হাসপাতালগুলো এরই মধ্যে আসন সংকটে ভুগছে। এখন পর্যন্ত চীনের বাইরে কভিড-১৯- আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৬২ জনের। তাদের অর্ধেকই ইতালির বাসিন্দা।

নভেল করোনাভাইরাসে পর্যুদস্ত দেশগুলোর মধ্যে ইতালির পরের অবস্থানেই রয়েছে ইরান। তেহরান টাইমসের দাবি, দেশটিকে কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশ্বের জন্য রোল মডেল হিসেবে আখ্যা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)

রোগ সংক্রমণের আতঙ্কে ইরানে এরই মধ্যে গণপরিবহনে বড় ধরনের যাত্রী সংকট দেখা দিয়েছে। তার পরও নিয়মিতভাবে এসব পরিবহন জীবাণুমুক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে, যাতে তদারকি করছে স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষগুলো।

কভিড-১৯ থেকে সুরক্ষা দিতে এরই মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার কয়েদিকে মুক্ত করে দিয়েছে ইরান। তবে গণকারামুক্তি কার্যক্রমের আওতা সীমিত রাখা হয়েছে যাদের মুক্ত করলে দেশটির আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়বে না, শুধু তাদের পর্যন্তই। এছাড়া এসব কয়েদিকে কবে নাগাদ জেলে ফিরতে হবে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছু জানায়নি দেশটি।

এছাড়া এরই মধ্যে চলাচল সীমিত করে দেয়ার পাশাপাশি জুমার নামাজও বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি। এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া সাংস্কৃতিক ক্রীড়া ইভেন্টগুলোও এখন বন্ধ। কমিয়ে আনা হয়েছে কর্মঘণ্টা।

তবে মুহূর্তে ইরানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে কভিড-১৯ সংক্রান্ত গুজব নিয়ন্ত্রণ। গুজবের কারণে করোনায় আক্রান্ত না হয়েও গণপ্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ দেশটিতে গুজব ছড়ায়, মদ্যপান নভেল করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা দেয়। গুজবে বিশ্বাস করে বিষাক্ত মদ খেয়ে গতকাল সোমবার দুই দিনে কমপক্ষে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে কাতারও। -সংক্রান্ত আদেশ গতকালই কার্যকর করেছে দোহা। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত -সংক্রান্ত আদেশ বহাল থাকবে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। এছাড়া যেসব দেশে কভিড-১৯-এর ঝুঁকি বেশি বলে মনে করছে দেশটি, বাংলাদেশসহ এমন ১৪টি দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশদ্বার রুদ্ধ করে দিয়েছে কাতার।

একই সঙ্গে ইতালিমুখী সব ফ্লাইট বাতিল করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত কাতার এয়ারওয়েজ। এছাড়া নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করতে নিজ নাগরিকদের প্রতি নির্দেশনা জারি করেছে দেশটি। আলাদা করে রাখা হয়েছে কাতারে অবস্থানরত সব নাগরিককে।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, লেবানন, সিরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, মিসর, ইতালি ইরাকে নৌ, স্থল আকাশপথে ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আগে থেকেই আরোপ করে রেখেছিল সৌদি আরব। সম্প্রতি তালিকায় যুক্ত হয়েছে ওমান, ফ্রান্স, জার্মানি, তুরস্ক স্পেনের নামও। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থামাতে এসব দেশের নাগরিক বাসিন্দাদেরও সৌদি আরবে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে।

এছাড়া দেশটিতে প্রবেশকালে প্রত্যেকের প্রতি নিজ নিজ স্বাস্থ্যগত তথ্য সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করেছে সৌদি আরব। এক্ষেত্রে কেউ নিজের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো তথ্য গোপন করলে তাকে লাখ রিয়াল ( লাখ ৩৩ হাজার ডলার) জরিমানা করা হবে বলে ঘোষণা করেছে রিয়াদ। এছাড়া কোনো সৌদি নাগরিক ইরানে ভ্রমণ করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণেরও ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।

সৌদি আরব এরই মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটি ওমরাহর ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছে, তা এখনো বলবত্ রয়েছে। একই সঙ্গে পবিত্র মসজিদুল হারামে প্রবেশের ওপর প্রথমে নিষেধাজ্ঞা দিলেও পরে সীমিত আকারে (ওমরাহ গমনেচ্ছু ছাড়া) উন্মুক্ত করে দেয় দেশটির সরকার। তবে এক্ষেত্রে পবিত্র কাবা ঘর স্পর্শের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। এছাড়া করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে পূর্বাঞ্চলীয় শহর কাতিফকে কোয়ারান্টাইন করে রেখেছে দেশটি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন