শুক্রবার| এপ্রিল ০৩, ২০২০| ১৮চৈত্র১৪২৬

প্রথম পাতা

প্রভাবশালীরাই ডুবিয়েছেন ইয়েস ব্যাংককে

বণিক বার্তা ডেস্ক

ঝুঁকির মুখে থাকা কোম্পানিগুলোকেই বড় অংকের ঋণ দিয়ে বিপদে পড়েছে ইয়েস ব্যাংক। ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণও বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। ইয়েস ব্যাংকের পতনে দায়ী এসব কোম্পানির তালিকায় রয়েছে অনিল আম্বানি-সুভাষ চন্দ্রের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানও। এরা দুজনই আবার সে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

মন্দ ঋণের বোঝা ইয়েস ব্যাংকের নিট ওয়ার্থ নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। বিষয়টির দায়ভার কাঁধে তুলে দিয়ে ব্যাংকটির গোটা পরিচালনা পর্ষদকে বরখাস্ত করেছে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই)

ইয়েস ব্যাংকের পতনে বিপাকে পড়ে গেছেন আমানতকারীরা। ব্যাংকটির দুরবস্থায় এমনিতেই দুশ্চিন্তায় ছিলেন তারা। এ দুশ্চিন্তা আতঙ্কে পরিণত হয় আরবিআইয়ের ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণের খবরে। উপরন্তু আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের ওপর সীমাবদ্ধতাও আরোপ করে আরবিআই। প্রতিক্রিয়ায় ব্যাংকটির শাখা ও এটিএম বুথের সামনে ভিড় জমান আমানতকারীরা। বেহাল দশায় পড়ে যায় ব্যাংকটির এটিএম ও অনলাইন ব্যাংকিং পরিষেবা। চাপ সামলাতে না পেরে বর্তমানে ইয়েস ব্যাংকের গোটা অনলাইন পরিষেবাই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এটিএম আছে। তবে তাতে অর্থ নেই।

শুধু আমানতকারীরা নয়, ব্যাংক পতনের এ ক্ল্যাসিক প্রতিক্রিয়ার ধাক্কা সামলাতে   হয়েছে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদেরও। আরবিআইয়ের ইয়েস ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণের বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে দেশটির শেয়ারবাজারে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকটির শেয়ারমূল্যের দরপতন ঘটে অস্বাভাবিক হারে। একই সঙ্গে নিম্নমুখী হয়ে ওঠে শেয়ারবাজারের সব সূচক। এমনকি আরবিআইয়ের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াকে (এসবিআই) দিয়ে বিনিয়োগ করানোর মাধ্যমে ইয়েস ব্যাংককে টেনে তোলার পরিকল্পনার খবরেও এ পতন ঠেকাতে পারেনি। দুদিন আগেই এ বিষয়ে এসবিআইয়ের সম্মতি মিললেও আরবিআইয়ের এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে গতকালই।

সরকারি জায়ান্টদের কাজে লাগিয়ে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানকে টেনে তোলার (বেইল আউট) এ অতিপরিচিত কৌশল এখন বড় ধরনের ঝড় তুলেছে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাওনা আদায়ে মনোযোগ না দিয়ে ব্যাংকটিকে টেনে তোলায় আরবিআইয়ের যেনতেন কৌশলকে মোটেও ভালোভাবে নিচ্ছেন না সমালোচকরা। এ সন্দেহকে আরো উসকে দিচ্ছে ইয়েস ব্যাংকের বড় অংকের কয়েকটি মন্দ ঋণের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা।

বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে নির্মলা সীতারমণকেও। এক সংবাদ সম্মেলনে এমনই এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ২০১৪ সালের আগে অতিঝুঁকির মুখে থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে নাজুক অবস্থানে পড়ে যায় ইয়েস ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকটির নাম একেবারেই অতিপরিচিতঅনিল আম্বানি (গ্রুপ), এসসেল গ্রুপ, ডিএইচএফএল, আইএলঅ্যান্ডএফএস, ভোডাফোন ইত্যাদি।

ইয়েস ব্যাংকের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে অনিল আম্বানি ও সুভাষ চন্দ্রের (এসসেল গ্রুপ চেয়ারম্যান) প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য নরেন্দ্র মোদি সরকারকে আবারো ঠেলে দিল বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে। আসলে কয়েক বছর ধরেই লুটেরা পুঁজির (ক্রনি ক্যাপিটালিজম) উত্থানের বিষয়টি মোদি সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছে। সে প্রশ্নকে আরো জোরালো করে তুলল ইয়েস ব্যাংক বিতর্ক।

নানা সময়েই অনিল আম্বানি ও এসসেল গ্রুপকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে মোদি সরকার। একসময় ভারতে ফরাসি উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দ্যাসল্ট এভিয়েশনের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিল হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটিকে হঠিয়ে দ্যাসল্টের ভারতীয় অংশীদার হয় অনিল আম্বানি গ্রুপ। ২০১৫ সালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য রাফাল জেট ফাইটার সরবরাহের কাজ পায় দ্যাসল্ট এভিয়েশন। পরবর্তী সময়ে নাগপুরে ফ্যালকন ও রাফাল উড়োজাহাজের জন্য পার্টস তৈরির উদ্দেশ্যে অনিল আম্বানির সঙ্গে একটি জয়েন্ট ভেঞ্চার গড়ে তোলে ফরাসি প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে সুভাষ চন্দ্রের বইদ্য জেড ফ্যাক্টর উন্মোচন করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি।

নির্মলা সীতারমণের ভাষ্যমতে, বিরোধীরা বরাবরই আঙুল তাক করতে উৎসাহী। এ কারণেই ইয়েস ব্যাংকের মন্দ ঋণের সঙ্গে জড়িতদের নাম প্রকাশ করেছেন তিনি।

তবে শেষ পর্যন্ত দায়টা বিরোধীদের ঘাড়েই চাপিয়েছেন তিনি। নির্মলা সীতারমণ বলেন, আমি কোনো উত্তরাধিকারের গল্প বলতে আসিনি এখানে। হ্যাঁ, ভারতের ব্যাংকিং খাত অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। এজন্য ২০০৪-১৪ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর খাতটিকে সামলানোর প্রক্রিয়াই দায়ী। তাদের অভিযুক্ত করার পেছনে কারণ রয়েছে আমার হাতে।

অন্যদিকে এসবিআইকে দিয়ে বিনিয়োগ করিয়ে ইয়েস ব্যাংককে টেনে তোলার পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করেছেন ভারতের কংগ্রেস নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম। তার মতে, এসবিআইকে দিয়ে জোর করে বিনিয়োগ করানোর বদলে ব্যাংকটিকে দিয়ে এক রুপিতে ইয়েস ব্যাংকের ঋণগুলো অধিগ্রহণ করানো, সেগুলো আদায় করানো এবং একই সঙ্গে অর্থের সুরক্ষার বিষয়ে আমানতকারীদের নিশ্চয়তা দেয়ানোটাই বেশি জরুরি ছিল।

আরবিআইয়ের খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইয়েস ব্যাংকে এসবিআইয়ের মালিকানাকে উন্নীত করতে হবে ৪৯ শতাংশে। এজন্য প্রতিটি ১০ রুপি মূল্যে ২৪৫ কোটি অতিরিক্ত শেয়ার কিনতে হবে এসবিআইকে। বিনিয়োগের পরবর্তী তিন বছর ইয়েস ব্যাংকে নিজের মালিকানা ২৬ শতাংশের নিচে নিতে পারবে না এসবিআই। ইয়েস ব্যাংকে একটি নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে, যেখানে এসবিআইয়ের প্রতিনিধি থাকবেন দুজন। পুনর্গঠিত ব্যাংকটিতে আরবিআই নিজেও অতিরিক্ত কয়েকজন পরিচালক নিয়োগ দিতে পারে।

তবে বিনিয়োগকারীদের অনেকেই আরবিআইয়ের এ পরিকল্পনা মেনে নিতে পারেননি। বিশেষ করে ব্যাংকটির বন্ডহোল্ডাররা। ইয়েস ব্যাংকের বন্ড পোর্টফলিওর মধ্যে বেশ কয়েকটি মিউচুয়াল ফান্ডও রয়েছে। ব্যাসেল থ্রি ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী এসব ইনস্ট্রুমেন্টকে শ্রেণীকৃত করা আছে অ্যাডিশনাল টায়ার-১ ক্যাপিটাল হিসেবে। আরবিআইয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইয়েস ব্যাংকের ইস্যুকৃত এ ধরনের ইনস্ট্রুমেন্টকে পুরোপুরি অবলোপন করা হবে। সেক্ষেত্রে এসব বন্ডে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের অর্থের গোটাটাই গচ্চা যাবে।

এ খসড়া পরিকল্পনা বর্তমানে আলোচনার জন্য জনসমক্ষে উত্থাপন করা হয়েছে। আরবিআই বলছে, ৯ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া উপদেশ-সুপারিশ ও মন্তব্যের ভিত্তিতে ইয়েস ব্যাংক উদ্ধার পরিকল্পনার খসড় চূড়ান্ত করা হবে।

ইয়েস ব্যাংকের মন্দ ভাগ্যের সঙ্গে যাদের নাম উঠে আসছে, ভারতের কেন্দ্র সরকার এখন তাদের সঙ্গে নিজের দূরত্ব প্রমাণে ব্যস্ত। দেশটির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এরই মধ্যে ইয়েস ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা রানা কাপুরের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে। এ রানা কাপুরই নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার বেশ কিছুদিন পর ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে এক টুইট বার্তায় লিখেছিলেন, ভারতের হয়ে বৈশ্বিক আস্থা অর্জন করে নিয়েছেন মোদি। ব্যবসায়িক বিনিয়োগের সেরা কেন্দ্র এখন ভারতেই।

নির্মলা সীতারমণ জানিয়েছেন, ইয়েস ব্যাংকের ক্ষেত্রে গলদ কোথায় এবং ব্যক্তি পর্যায়ে এর দায়ভার কার কার, সে বিষয়ে তদন্ত চালানোর জন্য আরবিআইকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

অন্যদিকে পি চিদাম্বরম এক টুইট বার্তায় বলেন, আজ ছয় বছর হয় বিজেপি ক্ষমতায়। তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালানো ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কতদূর, তা পুরোপুরি ফাঁস হয়ে পড়েছে। প্রথমে গেল পিএমসি ব্যাংক। এবার ইয়েস ব্যাংক।

এর জবাবে সাবেক ইউপিএ সরকারকে দায়ী করে বক্তব্য দেন নির্মলা সীতারমণ। উত্তরে পি চিদাম্বরম মোদি সরকারের প্রতি একটি তথ্যকে মিথ্যা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। পি চিদাম্বরমের দেয়া ওই তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ অর্থবছরে (২০১৩-১৪) ইয়েস ব্যাংকের পাওনা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৫ হাজার কোটি রুপি। ২০১৯ অর্থবছরের মধ্যেই এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি রুপিতে।

পি চিদাম্বরম প্রশ্ন তোলেন, যেখানে এ সময়ের মধ্যে গোটা (ভারতীয়) ব্যাংকিং খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ, সেখানে ইয়েস ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার কী করে প্রায় ৩৫ শতাংশে দাঁড়াল?

টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া অবলম্বনে

>>ইয়েস ব্যাংকের পতন

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন